বিশেষ

স্মরণে ঋত্বিক ঘটক

স্মরণে ঋত্বিক ঘটক

৪২ বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে গেছেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের প্রবাদ- প্রতিম পুরুষ ঋত্বিক ঘটক। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হন কিংবদন্তি এ চলচ্চিত্রকার। বাংলা চলচ্চিত্রের এই দিকপালের প্রতি শ্রদ্ধা।

ঋত্বিক ঘটক

বিখ্যাত এই বাঙালি চিত্রপরিচালকের তুলনা করা হয় সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের সঙ্গে । ১৯২৫ সালে জন্ম নিয়েছিলেন তৎকালীন ঢাকার ঋষিকেশ দাশ লেনে। ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের পরে পরিবার সহ চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়। ঋত্বিকের বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং কবি ও নাট্যকার, মা ইন্দুবালা দেবী। পরিবারেই পেয়েছেন সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা।

নিজে শরণার্থী হয়েছিলেন তাই এর যন্ত্রণা বুঝেছিলেন যে কারো চাইতে বেশি। তাইতো দেশ বিভাগের ফলে উদ্বাস্তু মানুষ আর নাগরিক জীবনের যন্ত্রণাকে ধারণ করেছে তার বেশিরভাগ চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রকে তিনি নিয়েছিলেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে।
মানুষের হৃদয়ের কাছে পৌছানোর মাধ্যম হিসেবে মানতেন চলচ্চিত্রকে। এর চেয়ে জোরালো মাধ্যম পেলে সেটাই বেছে নিতেন, তা ফুটে উঠে তার নিজের কথাতেই। তিনি বলেছিলেন,

আজ যদি চলচ্চিত্রের চাইতে আরও শক্তিশালী মাধ্যমের আবির্ভাব ঘটে; চলচ্চিত্রকে লাথি মেরে চলে যাব, আমি মশাই চলচ্চিত্রের প্রেমে পড়িনি।

শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ নয়, নির্দেশনা দিয়েছেন মঞ্চনাটকেও। নির্মাণ করেছেন অসাধারণ সব তথ্যচিত্র। মাত্র ৪৯ বছরের জীবনে, আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য এবং নয়টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আর ছয়টি তথ্যচিত্রের নির্মাতা, ঋত্বিক।

“তিতাস একটি নদীর নাম” ছবির সেটে নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ার সময়ই বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালিখি শুরু করেন ঋত্বিক। ৫০ এর দশকে সেসময়ের পত্রিকা অগ্রণী, দেশ, শনিবারের চিঠি -তে নিয়মিত লিখতেন। তবে তারও আগে থেকে নাটক লিখা শুরু করেছিলেন সব্যসাচী এ মানুষটি। ১৯৪৮ সালে প্রথম নাটক লেখেন তিনি, নাম ছিলো ‘কালো সায়র’।

বেঁচে থাকতে তিনি আটটি চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষ করতে পেরেছিলেন। নাগরিক, অযান্ত্রিক, বাড়ি থেকে পালিয়ে, মেঘে ঢাকা তারা, কোমলগান্ধার, সুবর্ণরেখা, তিতাস একটি নদীর নাম এবং যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো নামে এই আটটি সিনেমা বাংলার চলচ্চিত্রের এক একটি ইতিহাস।

শিল্প-আন্দোলনে একেবারেই মাঠের লোক তিনি। কৈশোরেই যুক্ত হন গণনাট্যের সঙ্গে। একের পর এক বদলেছেন মাধ্যম, নাট্য রচনা থেকে গল্প, গল্প থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ। ঋত্বিক নির্মিত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘অযান্ত্রিক’। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে। তবে, তিনি প্রথম নির্মাণ করেছিলেন ‘নাগরিক’ নামে চলচ্চিত্র। তার জীবদ্দশায় মুক্তি পায়নি এটি। মৃত্যুর পর ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় ‘নাগরিক’।
শেষ সিনেমা যুক্তি তক্কো আর গপ্পোর কাজ চলাকালীন সময়ে, স্বাস্থ্যের দুরাবস্থা ও অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই চলচ্চিত্র অনেকটা আত্মজীবনীমূলক এবং এটি তাঁর অন্যান্য চলচ্চিত্র থেকে ভিন্ন ধাঁচের। এর পর থেকেই জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছেন হাসপাতালে।

ঋত্বিকের স্ত্রী সুরমা ঘটক এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন যে, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন কিংবদন্তি এই নির্মাতা। এজন্য তাকে ১৯৬৯ সালে মানুসিক হাসপাতালেও ভর্তি করা হয়েছিলো।

সর্বশেষ নির্মাণ যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো সিনেমাটিতে নায়কের কণ্ঠে এক ডায়ালগ ছিলো- ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো। ঋত্বিক ঘটকের নির্মিত চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলী তাই আজো ভাবায় চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তিনি নির্মাণ করেছিলেন প্রামাণ্য চিত্র- ‘দূর্বার গতি পদ্মা’। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে নিজ জন্মভূমি বাংলাদেশে আসেন এই চলচ্চিত্রস্রষ্টা। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন তাঁর অমূল্য সৃষ্টি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিটি।

তিতাস একটি নদীর নাম, ছবির একটি দৃশ্য

ঋত্বিক ঘটক, বাংলা চলচ্চিত্রের নিজস্ব ঘরানার উদ্ভাবন আর সিনেমার ভাষাকে মাটি ও মানুষের অন্তরঙ্গ করে তোলার প্রচেষ্টায় রত ছিলেন আমৃত্যু । ১৯৭০ সালে কীর্তিমান এ নির্মাতাকে পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করেন ভারত সরকার।

Most Popular

To Top