ইতিহাস

পাবলো এসকোবারঃ অন্ধ ক্রোধ, আর প্রতিহিংসার আত্মহনন

প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ঘরের ভেতর, ফায়ারপ্লেসে কাঠ নেই। এমন সময় মেয়েটা বাবাকে বলল, “বাবা অনেক ঠাণ্ডা লাগছে, কষ্ট হচ্ছে আমার”।

এ সময় একজন বাবা কি করতে পারেন? একটু ভাবা যাক। অনেক কিছুই করতে পারেন মেয়ের কষ্ট লাঘবের জন্য। কিন্তু এই বাবা যা করলেন তা কিন্তু আমাদের সবার ধারণাকে ছাড়িয়ে যায়। তিনি রুমটা গরম করার জন্য ফায়ারপ্লেসে আগুন ধরাতে চাইলেন, কিন্তু আগুন ধরানোর জন্য কাঠ পেলেন না। কাঠ না পেয়ে একটা আস্ত টাকার বান্ডিলেই আগুন ধরিয়ে ফায়ারপ্লেসে দিলেন। শীতবস্ত্র কেনার কথাও ভাবলেন না কারণ তাতে সময় লাগবে। মেয়ের কষ্ট লাঘবের জন্য সেদিন আগুনে পুড়লো ২ মিলিয়ন ইউএস ডলার!

কোকেইন সম্রাট পাবলো

মেয়েকে সামান্য শীত থেকে রক্ষা করার জন্য যে মানুষটা এতোগুলো টাকা এভাবে পুড়িয়ে ফেললো, ঠিক এই মানুষটাই তাঁর ৪৫ বছরের জীবদ্দশায় হত্যা করেছেন কলম্বিয়ার তিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, দুইশত বিচারক, এক হাজার পুলিশসহ প্রায় চার হাজার মানুষকে।
হ্যাঁ, বলছিলাম ৮০ দশকের কোকেইন সম্রাট পাবলো এস্কোবারের কথা। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত একটানা ‘ফরবেস’ ম্যাগাজিনের ইন্টারন্যাশনাল লিস্ট অব বিলিয়নিয়ারে ছিল যার নাম, ইউএসএ তে প্রতিদিন গড়ে ১৫ টন কোকেন সাপ্লাই দিতেন, এই সেই পাবলো এস্কোবার।

পুরো নাম পাবলো এমিলিও এস্কোবার গারাভিয়া। কলম্বিয়ার রিওনিগ্রোতে কৃষক বাবা আবেল দেল জিসুস দারি এস্কোবার এবং শিক্ষিকা মা হারমিলদা গারাভিয়ার ঘরে ১৯৪৯ সালের ১ ডিসেম্বর জন্ম তাঁর। বাবা-মায়ের সাত সন্তানের ভেতর পাবলো ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলায় দুটো স্বপ্ন দেখতেন, ২২ বছরের মধ্যে মিলিয়নিয়ার হবেন আর জীবদ্দশায় একদিন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হবেন। প্রথম স্বপ্ন পূরণে বেশি দেরি হয়নি, ২৬ বছর বয়সেই ছিলেন বিলিয়নারদের কাতারে। দ্বিতীয় স্বপ্ন পূরণ করার মিশনেই জীবনের মোড় শুরু হয়।

অপকর্মের দুনিয়াতে প্রবেশ করেছিলেন গাড়ি চুরির মধ্য দিয়ে। কবরস্থান থেকে পাথর চুরি করে পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করতেন বলেও শোনা যায়। কিন্তু তাঁর একমাত্র পুত্র, জুয়ান পাবলো এস্কোবার (বর্তমান নাম সেবাস্তিয়ান ম্যানোকুয়িন) বলেছেন, তার বাবার অপকর্মের শুরুটা হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নকল সার্টিফিকেট বিক্রির মধ্য দিয়ে। যুবক বয়সে সন্ত্রাসীদের দেহরক্ষী হিসেবেও কাজ করেছেন।

একবার মেদেলিনের সম্ভ্রান্ত এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে পেয়ে গেলেন ১০০,০০০ ইউএস ডলার। টাকাটা কাজে লাগাতে চাইলেন। পাবলোর চিন্তাভাবনা ছিল সুদূরপ্রসারী। কোকেইন ব্যবসায় লাভের অপার সম্ভাবনা দেখতে পেলেন। লক্ষণীয়, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই কলম্বিয়া ছিল কোকেইন পাচারের জন্য সবচেয়ে ভাল রাস্তা। কোঁকা ভাণ্ডার পেরু, বলিভিয়া আর কোকেইনের সবচেয়ে বড় বাজার ইউএস এর সন্ধিপথ হচ্ছে কলম্বিয়া।

 

পরিবারের সাথে পাবলো

 

পাবলো এই ভৌগোলিক অবস্থানকে পুঁজি করে কোকেনের রাজ্য খুলে বসলেন। তৎকালীন মাফিয়া পরিবার ওচোয়া ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে মিলে গঠন করেন ‘মেদেলিন কার্টেল’। মধ্য ৭০ দশকে ‘মেদেলিন কার্টেল’ কোকেইন রাজ্যে রাজত্ব করতে শুরু করে। ‘মেদেলিন কার্টেল’র কাজ ছিল বলিভিয়াতে কোঁকা উৎপাদন, কলোম্বিয়াতে নিজ কারখানায় কোকেইন প্রস্তুতকরণ এবং নিজেদের যানবাহনে কোকেইন ইউএসএ তে পাচার করা।

প্রথমে, বিমানের টায়ারে করে কোকেইন চালান করা হতো ইউএসএ তে। এক সময় চালান আরও বাড়াতে ট্রাকের চাকা, জাহাজে করেও পাঠানো শুরু করা হলো। ব্যবসা একসময় এতো বৃদ্ধি হলো যে, পাবলো দুটো সাবমেরিনও ব্যবহার করা শুরু করলেন পাচার করার জন্য। ভাই রবার্তো এস্কোবার সব টাকা পয়সা আর ব্যবসার হিসাব রাখতেন। তাঁর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এসময় পাবলোর ধনসম্পত্তির মূল্য ছিল ৩০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। প্রতিমাসে টাকার বান্ডিলের জন্য ২৫০০ ডলার খরচ হতো শুধু রবার ব্যান্ড কিনতেই। শৌখিন পাবলো এ সময় ৭০০০ একর জমির উপর এক প্রাসাদে বসবাস করতেন, যেখানে মিনি চিড়িয়াখানাও ছিল। সেই চিড়িয়াখানায় ছিল জিরাফ, জলহস্তী, হাতি, উটসহ আরও অনেক প্রাণী। পাবলোর মৃত্যুর পর তাঁর ১৪২টি প্লেন, ২০টি হেলিকপ্টার, ৩২টি প্রমোদতরী এবং ১৪১টি বাসা-অফিসের সাথে চিড়িয়াখানাটিও সরকারের অধিকারে আসে। চিড়িয়াখানাটি এখনও চালু আছে।

পাবলোর বসবাস করা এক বাড়ি

কোকেইন সাম্রাজ্যের সম্রাট পাবলো এস্কোবার গরীবের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘রবিনহুড’ নামে। মেদেলিনের বহু হাসপাতাল, স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাবলো। প্রায় ১২টি সকার টিমকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন। গরীব মানুষকে অবাধে অর্থদান করতেন। এর ফলে অচিরেই জনগণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

তাঁর জনপ্রিয়তা এতোটাই তুঙ্গে ছিল যে, ১৯৮২ সালে তিনি কংগ্রেসের সদস্যপদ লাভ করেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার দিকে এগিয়েও যাচ্ছিলেন। বাধা হয়ে দাঁড়ায় তৎকালীন কলম্বিয়ান আইনমন্ত্রী রদ্রিগো লারা বনিলা। তিনিই কলম্বিয়ান কংগ্রেসের সামনে পাবলোর আয়ের উৎস এবং নানান অপকর্মের সাথে তাঁর যোগসূত্র তুলে ধরেন। এর ফলে সদস্যপদ পাওয়ার দুই বছরের মাথায় পাবলোকে কংগ্রেস ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্নও শেষ হয়ে যায়। অবশ্য প্রতিশোধ নিতেও দেরি হয়নি, পাবলোর ভাড়া করা খুনি ইভান দারিওর হাতে কয়েকদিনের মধ্যেই বোগোটায় খুন হন রদ্রিগো।

১৯৭৫ সালে একবার ইকুয়েডর থেকে কোকেইনের বিরাট চালান (৩৯ পাউন্ড) নিয়ে আসার সময় গ্রেফতার হন পাবলো। বিচারকদের ঘুষ দিতে ব্যর্থ হলে পাবলো খুন করে এই কেসের সাথে জড়িত থাকা দুই পুলিশ অফিসারকে। তখন এই মামলা তুলে নেয়া হয়। এই ঘটনার থেকেই পাবলো নতুন কৌশল প্রয়োগ করা শুরু করলো। পুলিশ, বিচারকের জন্য তাঁর দর্শন ছিল একটাই- “plata o plomo”, যার অর্থ রুপা (ঘুষ) কিংবা সীসা (গুলি)।

নতুন দর্শনে উদ্দজীবিত হয়ে পাবলো সরাতে থাকে কোকেইনের রাজ্যের পথের কাঁটাদের। একের পর এক খুন হতে থাকে পুলিশ অফিসার, বিচারক, সরকারি কর্মচারীসহ সাধারণ মানুষ। এক তথ্য দাতাকে হত্যা করতে পাবলো এক বিমানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটান, প্রায় শতাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এই হত্যাকান্ডের ফলে ডিইএ (ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) পাবলোকে টপ টার্গেট চিহ্নিত করে এক্সট্রাডিশনের ঘোষণা দেয়। এক্সট্রাডিশন হল মাদক পাচারকারীদের উপর প্রয়োগকৃত আইন, যার ফলে অপরাধীকে ইউএসএ তে যাবৎজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এই ঘোষণা দেয়ার পর খুব ফলাও ভাবে পাবলোর অনুসন্ধান শুরু হয়।

পাবলো এক্সট্রাডিশন অনেক ভয় পেত। এই ঘোষণার পর পাবলোও হিংস্র হয়ে ওঠে। M-19 নামক গেরিলা গ্রুপের সহায়তায় ১৯ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাবলো। এসময় গুলি করা হয় শতাধিক বিচারককে, আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় সব কাগজপত্রে। এর ফলে পাবলোর বিরুদ্ধে সকল রেকর্ড পুড়ে যায়। অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন অফিসারদেরও মোটা অংক ঘুষ দিতে থাকে পাবলো। এক্সট্রাডিশন বন্ধে পাবলো কলম্বিয়ার সকল দেনা শোধ করে দিতে রাজি হয় যা ছিলো ১০ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য। অবশেষে, ১৯৯১র জুনে কলম্বিয়ান কংগ্রেস এক্সট্রাডিশন আইন সংবিধান থেকে তুলে নেয়। পাবলোও আত্মসমর্পণে রাজি হয়। কিন্তু আত্মসমর্পণের শর্ত অনুযায়ী পাবলোকে জেলবন্দি করা হয় তাঁর নিজের তৈরি ‘লা কাতেদরাল’এ।

 

এমন প্রাসদের মতো বাড়িতে থাকতেন পাবলো

 

‘লা কাতেদরাল’ কে জেল না বলে রাজপ্রাসাদ বললেই বেশি মানায়। নাইটক্লাব, সকার মাঠ, ঝর্ণা, লেকের পাশাপাশি এর ভিতর ছিল টেলিফোন, ফ্যাক্স, টিভির সুব্যবস্থা। পাবলো এইখানে বসেই অবাধে তাঁর কোকেইন রাজত্ব চালাতে থাকে। রাগের মাথায় একদিন পাবলো কার্টেলের দুই সদস্যকে হত্যা করে ফেললে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় তাঁকে কম সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন কোথাও প্রেরণ করতে। কিন্তু প্রেরণ করার আগেই পাবলো পালিয়ে যায়। সরকারের এ কর্মকাণ্ডে ক্ষেপে যান পাবলো। নতুনভাবে সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে চান। কিন্তু সে সময় কলম্বিয়ার পুলিশ সদস্য এবং ডিইএ এজেন্টদের সম্মিলিত মিশন ‘সার্চ ব্লক’কের জালে ধরা পরতে থাকে পাবলোর পুরো সংগঠন।

অন্যদিকে, পাবলো কতৃর্ক আক্রান্ত, খুন হওয়া অন্য কার্টেলের মাফিয়াদের সম্মিলিত সংগঠন ‘লস পেপেস’ মেদেলিন কার্টেল পুরোপুরি শেষ করে দেয়ার মিশন নেয়। তাদের আক্রমণে পাবলোর আত্মীয়স্বজন এবং কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ৩০০ জন খুন হয়। এর ফলে পাবলোর সাম্রাজ্য প্রায় ভেঙ্গে যায়। নিজের লোকের বিশ্বাসঘাতকতায় পাবলোর আশ্রয়স্থল গুলো উন্মুক্ত হয়ে যায়। এমন সময় পাবলো পুরোদমে গা ঢাকা দেয়। কোনভাবেই তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। পাবলো এস্কোবারের কথা মানুষ ভুলেই যাচ্ছিলো। শুধু আশা ছাড়েনি সার্চ ব্লকের সদস্যরা। তারা হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে।

১৯৯৩ সালের ২ ডিসেম্বর সকালে প্রতিদিনের মতোই মেদেলিনের রাস্তায় রাডারের সিগন্যাল গুলো শুনছিলেন সার্চ ব্লকের জনৈক সদস্য। এক ছেলে তাঁর বাবাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল। কথাবার্তা শুনতে শুনতে শিউরে উঠলেন তিনি। পাবলোকেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে তাঁর পুত্র জুয়ান পাবলো। দ্রুত এ তথ্য জানালেন সার্চ ব্লকের লিডার কর্নেল মার্টিনেজকে। দ্রুত ঘেরাও করা হয় বাসার চারিদিক। টের পেয়ে গুলি করতে করতে পালানোর চেষ্টা করলেন পাবলো। পাল্টা গুলিতে আহতও হলেন। অবশেষে, ঘোষণা দেয়া হলো, কানে গুলি খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন পাবলো এস্কোবার। যদিও পাবলোর আত্মীয়রা এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে, কারণ পাবলো বেঁচে থাকতে নাকি বলতেন, কখনও যদি পুলিশের হাতে ধরা পরে তবে নিজের কানে গুলি করে আত্মহত্যা করবেন।

মৃত্যুর পরও পাবলোর লেগ্যাসি শেষ হয়নি। তাঁর শবদেহে জড়ো হয় ২৫০০০’র অধিক মানুষ। তাঁকে নিয়ে বানানো হয়েছে অনেক ডকুমেন্টারি, মুভি, সিরিজ। সম্প্রতিকালে, নেটফ্লিক্স প্রচারিত ‘নার্কোস’ এর মূল থিম পাবলো এস্কোবারই। পাবলো চরিত্রে অভিনয় করেছেন ব্রাজিলিয়ান অভিনেতা ওয়াঙ্গার মউরা।

পাবলো কে নিয়ে বানানো টিভি সিরিজ

জীবদ্দশায় তিনি যেরকম আলোচনার বিষয় ছিলেন এমন খুব কম মানুষই হতে পেরেছেন। যতদিন পৃথিবীতে কোকেইনের করাল গ্রাস থাকবে পাবলো এস্কোবারের দায় থেকে যাবে ততদিনই!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top