বিশেষ

গোবরের শিল্পকর্ম ‘ইমিগোনগো’

গোবরের শিল্পকর্ম ‘ইমিগোনগো’- নিয়ন আলোয়

নিশ্চয়ই ভ্রূ কুঁচকে আছেন। ভাবছেন, এ মা! এ কি কথা, গোবরের আবার শিল্পকর্ম কি?

হ্যাঁ, আছে ভাই আছে। গোবর দিয়েও শিল্পকর্ম সম্ভব। আজ আপনাকে সেই কথা জানাতেই এই লেখালিখি।

আচ্ছা, আপনারা গ্রামের বাড়িতে অনেকেই হয়তো দেখেছেন কাঠিতে গোবর লাগিয়ে অথবা কোন বাঁশের বেড়ায় ছাপ ছাপ করে গোবর লাগিয়ে রাখা হয়। আর শুকিয়ে গেলে সে গোবর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমাদের গ্রাম বাংলায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এই পদ্ধতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে।

তবে, এবার আমরা আপনাদের এমন একটা দেশের কথা জানাবো যেখানে কাঁচা গোবর দিয়ে বিভিন্ন আর্ট, সুভ্যনির, দেয়ালসজ্জা, ঘরের অন্দরসজ্জা, শোপিস, পুতুল তৈরি করা হয়। আর এই শৈল্পিক চর্চাই সেই দেশের মানুষের অর্থনৈতিক দূরাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করছে। এই শিল্পকর্মগুলো দেখলে আপনি বিশ্বাসই করতে চাইবেন না যে এগুলো গোবর দিয়ে তৈরি। আমি নিশ্চিত, আপনার চোখ কপালে উঠবে!

সেন্ট্রাল আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা গোবর ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম তৈরির জন্য বেশ বিখ্যাত। এই শিল্প ইমিগোনগো নামে পরিচিত। ইমিগোনগো তৈরি করে, পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করছে রুয়ান্ডার নারীরা। বাড়িতে বসেই ইমিগোনগো তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করেন রুয়ান্ডা- তানজানিয়া সীমান্তের কাছের কিরেচে এলাকার নারীরা। আঙ্গুলের সাহায্যে নিখুঁতভাবে কাঠের বোর্ডের ওপর গোবর দিয়ে জ্যামিতিক নকশা করেন তারা। এগুলো শুকিয়ে যাওয়ার পর লাল মাটি, ছাই, সাদা চীনামাটি বা প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে রঙ করা হয়। এবং তৈরি হয় অভূতপূর্ব শৈল্পিক সামগ্রী বা চিত্র।

“ইমিগোনগো” মূলত আঠারো শতাব্দীতে তৈরি শুরু হলেও পরবর্তীতে সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয়। গিসাকার রাজা কিমেনিই’র ছেলে প্রিন্স কাকিরা এটি প্রথম তৈরি করেন। প্রিন্স কাকিরা তার বাড়ির অভ্যন্তর প্রাচীরকে সজ্জিত করার জন্য গোবরের সাথে রঙ, ছাই ও কাদা মিশিয়ে তৈরি করেন অভিনব এক শিল্পকর্ম। নতুন আঙ্গিকের এই আর্ট ফর্মকে রাজকীয় নামের সাথে মিলিয়ে নামকরণ করা হয়, গিসাক-ইমিগোনগো

গিসাক-ইমিগোনগো

বর্তমান সময়েও এই আর্টওয়ার্কটি বেশিরভাগই দেয়াল সজ্জায় ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণত পোর্টেবল কাঠের প্যানেল, প্লেট বা প্রাচীরের পর্দার উপর আঁকা হয়, যা রুয়ান্ডায় আসা পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠেছে অত্যন্ত আর্কষনীয় বিষয়বস্তু। শিল্পকর্মগুলোকে রঙিন করতে তারা ব্যবহার করেন সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে সংগ্রহ করা রঙ।

শিল্পের এক অস্বাভাবিক মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও, ঐতিহ্যগত ইমিগনগো পেইন্টিং, রঙিন জ্যামিতিক ধরনে তৈরি হওয়ায় এটি বর্তমানের সবচেয়ে আধুনিক সাজসজ্জা সঙ্গেও মানানসই। আর এই শিল্প আপনি পাবেন শুধুমাত্র রুয়ান্ডাতেই, পৃথিবীর আর কোথাও এর চর্চা নেই।

এই রুয়ান্ডান স্বদেশী নৈপুণ্যের শিল্পীরা অধিকাংশই ‘রুয়ান্ডা জেনোসাইডের’ সময় মারা গিয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন শিল্পী নিয়ে বর্তমান রুয়ান্ডার পূর্ব প্রদেশে কয়েকটি সমবায় সংগঠন গড়ে উঠেছে যা এ শিল্পকে জীবন্ত রেখেছে এবং প্রকৃতপক্ষে, করেছে আগের চেয়েও সমৃদ্ধশালী। শিল্পীরা মূলত নারী, গণহত্যায় স্বামী হারিয়ে যারা বিধবা হয়েছেন।

কাকিরা সমবায় সমিতি তেমনই একটি সংগঠন। ১৯৯৭ সালে আটজন নারীর উদ্যোগে শুরু হয় এই কাকিরা ইমিগোনগো কো-অপারেটিভ। সম্প্রতি এ সমবায়ে কাজ করছেন ১৫ জন নারী। যাদের বেশিরভাগই বিধবা। ১৯৯৪ সালের গণহত্যায় বেঁচে যান এই নারী শিল্পীরা। বিলুপ্তপ্রায় এ শিল্পকর্মকে নতুন করে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন তারা।

কাকিরা সমবায়ের সদস্য জিন ডি আর্ক ন্যাইরেঞ্জা নিজের কথা জানান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাছে। তিনি বলেন, “আমি আঁকতে পারি, নকশা ও রঙ করতে পারি। এভাবেই এখানে সবাই কাজ করে। সবকিছুই আমাদের শেখানো হয়েছে। যখন আমরা কোনো নতুন ক্রেতা পাই, তার ইচ্ছানুসারে আমরা কাজ করি।”

গোবরের শিল্পকর্ম ‘ইমিগোনগো’- নিয়ন আলোয়

জেনে উগিরাইবো নামে এক ইমিগোনগো বিক্রেতা বলেন, এগুলো বেশ কয়েকটি দোকানে বিক্রি হয়। বিদেশিরাও এগুলো কিনতে আগ্রহী। অনেকেই বাড়িতে এগুলো সাজিয়ে রাখেন।

কাকিরা সমবায়ের পরিচালক বাজিলিসা উয়ামারিয়া নামে এক নারী তুলে ধরেন তাদের কাজের উদ্দেশ্য। “আমরা আমাদের সংস্কৃতি ধরে রাখতে চাই। কারণ এটিই আমাদের অস্তিত্ব। আমরা দেখাতে চাই, আমাদের পূর্বপুরুষেরা কীভাবে বসবাস করতেন। আর এভাবেই আমাদের শিশুদের ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে চাই। এটাই আমাদের এ সমবায়ের মূল লক্ষ্য।”

রুয়ান্ডায় গণহত্যার সময় সে দেশের হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান। অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। কর্মক্ষম পুরুষ হারিয়ে বেশিরভাগ পরিবারই হয়ে পড়ে অসহায়। যারা বিধবা হয়েছিলেন, সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাদের উপর। এরা অন্য কোন কাজ না পারায় উপার্জনের জন্য বেছে নেন ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে। পর্যটকদের কাছে এগুলো বিক্রি করে তাদের যা আয় হয় তা দিয়েই পরিবার নিয়ে ঘুরে দাঁড়ান তারা। সর্পিল, জ্যামিতিক নকশার এই শিল্পকর্ম শুধু দেয়ালে ঝুলানো শোপিস, বা শৈল্পিক ম্যাট নয়। রুয়ান্ডার হোটেল, বাড়ির দেয়াল বা ভেতরের ইন্টেনিয়র ডিজাইনের সব কিছুতে পাবেন ইমিগোনগোর ছোঁয়া। প্রথা ও চাহিদার মিশেলে এখন তাই এর কারিগর বা শিল্পী সংখ্যা বাড়ছে। সমবায়গুলোতে প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন নতুন শিল্পী তৈরি করা হচ্ছে।

রুয়ান্ডা দেশটির পেশা, সামাজিক অবস্থান সবকিছুর সাথে জড়িয়ে আছে গবাদি পশু পালন। সেখানে যার যত গবাদি পশু আছে, তার অবস্থান তত উপরে। দেশটিকে বিশ্বমানচিত্রে দুধের দেশ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেখানকার প্রধান দু’টি সম্প্রদায় তুতসি ও হুতু। সংখ্যাগুরু হুতু সম্প্রদায় ও তুতসিদের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা গণহত্যায় রূপ নেয় ১৯৯৪ সালে। এ গণহত্যায় প্রায় আট লাখ মানুষ মারা যাওয়ার খবর আসে সেসময়ের গণমাধ্যমে। কোথাও কোথাও সংখ্যাটা আরো বেশি উল্লেখ করা হয়েছিলো। পাঠক, ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক অধ্যায় সম্পর্কে আমরা আরেকদিন আলোচনা করবো। এখন গোবরের শিল্পকর্ম দেখে শুধু অবাক হওয়ার পালা।

রুয়ান্ডা ছাড়াও ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকর্মটির বেশ কদর রয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। সম্প্রতি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রদর্শিত হয় ইমিগোনগো। ২০১৮-তে প্রদর্শনী হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top