ফ্লাডলাইট

“কালা পারা না” লিটন দাস!

"কালা পারা না" লিটন দাস!- নিয়ন আলোয়

তিনি নাকি “কালা পারা না”, তিনি নাকি ঘরোয়া ক্রিকেটের “ব্র্যাডম্যান”; জাতীয় দলে আসলেই “গোল্লা” মারেন, তাকে নেয়া মানে দশজন নিয়ে খেলা।

এই তিনি আমাদের লিটন কুমার দাস, ট্রল বিশেষজ্ঞ বাঙালিদের পছন্দের তালিকায় প্রথম দিকে যার নাম।

গতকালের ইনিংসে পরে আসি, লিটনের টেস্ট ক্যারিয়ার নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করি। যদিও তিনি মূলত ওপেনার, কখনো কখনো তিন বা চার নাম্বারে ব্যাট করেন, কিন্তু জাতীয় দলে তার জায়গা সাত নাম্বারে। তার পরে থাকেন মিরাজ, তাইজুল, মুস্তাফিজ গং।

যারা খেলাটা বুঝেন, মানে যারা ক্লাস চিনেন তারা লিটনকে চিনেছিলেন অভিষেক ইনিংসে। ফতুল্লায় ভারতের ৪৬২ রানের বিপক্ষে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের টপ অর্ডার যখন ধ্বসে পড়েছিলো (১৭২/৫) তখন উইকেটে এসে পাল্টা আক্রমনাত্বক একটা ইনিংস খেলেন লিটন। সঙ্গীর অভাবে ভুগছিলেন, অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হবার আগে ৪৫ বলে ৪৪ রান করেন, ৮ চার আর ১ ছক্কায়। কমেন্ট্রি বক্সে বসা প্রতিটা ধারাভাষ্যকর সেদিন প্রশংসা করেছিলেন লিটনের। অশ্বিন, হরভজনকে দারুণ হাতে সামলেছিলেন। স্পিন খেলার টেকনিক এতোটাই মুগ্ধ করেছিলো রবি শাস্ত্রী আর সঞ্জয় মাঞ্জেরেকারকে যে বাংলাদেশ যখন ভারতে একমাত্র টেস্ট খেলতে যায় তখন দুইজনই বারবার বলেছিলেন “লিটন দাস কই”!

পরের ম্যাচে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে একমাত্র ইনিংসে তুলে নেন প্রথম ফিফটি। এই ইনিংসেও ১৯৫/৫ রানের সময় উইকেটে আসেন লিটন। অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হবার সময় করেন ৫০ (১০২)! জুটি গড়েন সাকিব আর মোহাম্মদ শহীদের সাথে।

খেলা না পারলেও নিজের প্রথম দুই ইনিংসে দলের কঠিন সময়ে ঠিকই রান করেন এবং জুটি গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সাত নাম্বারে কিছু রিস্ক ব্যাট হাতে নিতেই হয়, না হয় বাংলাদেশের টেল এন্ড কি আর ভরসা করার মতো!

প্রথম দুই টেস্টে সম্ভাবনার আলো ছড়ালেও ২০১৬ সালে ঘরের মাটিতে খেলা বাংলাদেশের দুই টেস্টে লিটন সুযোগ পাননি। আমার বিশ্বাস ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐ দুই টেস্টে লিটনকে সুযোগ দেয়া উচিৎ ছিলো। অন্তত শুভাগত হোমকে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে না খেলিয়ে লিটনকে খেলানো যেত। বছরের শেষে নিউজিল্যান্ড সফরে নেয়া হলো সোহানকে। সোহানকে নেয়াতে কোন সমস্যা নাই, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ঠিক কি কারনে সোহানকে নেয়া হয়েছিলো লিটনকে ড্রপ করে? সোহান ঘরোয়া ক্রিকেটে আহামরি কিছুই করেনি তখন! এসব হচ্ছে সিলেকশন পলিসির অদূরদর্শীতা! সোহানকেও যেমন এখন ছুঁড়ে ফেলেছে। ৩২ জনের স্কোয়াডেও রাখা হয়না।

ভারতে একমাত্র টেস্টে জায়গা হয়নি লিটনের। কিন্তু বিসিএলে ২১৯ রানের ইনিংস খেলে জায়গা পান শ্রীলংকা সফরে। গল টেস্টের দুই ইনিংসে করেন ৫ এবং ৩৫ রান। পরের টেস্টে খেলা হয়নি। ১০৪/৫ উইকেট পড়ে যাবার পর লিটনের ৩৫ রানের ইনিংসটা খারাপ ছিলোনা টার্নিং পিচে।

শ্রীলংকা সফরের পর ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে আবার ড্রপ! কেন? বিভিন্ন সূত্রে জানা গেলো মুশফিক কিপিং ছাড়তে চাননা, এমনকি স্কোয়াডে এক্সট্রা কিপার দিলেও একাদশে রাখতে চাননা (হাবিবুল বাশার নিজেই বলেছেন কথাটা)।

অনেক জল ঘোলা করার পর সাউথ আফ্রিকা সফরে জায়গা পান একাদশে। কিপার হিসেবে। প্রথম টেস্টে ১৪৬ ওভার কিপিং করে দশ মিনিটের ব্যবধানে ওপেন করতে নামেন। শুরুটা দারুন হলেও ২৫ রান করে আউট হয়ে যান। হুম অনেক বাইরের বল চেজ করে আউট হয়েছিলেন, কিন্তু এরকম আউট মনেহয় ইতিহাসে আর কেউ হয়নি। শুরু হয়ে গেলো আবার “কোটার প্লেয়ার”, “স্যার”, “লর্ড” ট্রল। পুরা সাউথ আফ্রিকা সফরে কয়জন ব্যাটসম্যান ভালো করেছিলো বাংলাদেশের? গ্লাভস হাতে লিটন ছিলেন দেখার মতো, বাভুমার ক্যাচটা নিশ্চয় মনে আছে?

দ্বিতীয় টেস্টে লিটন খেলেন ৭৭ বলে ৭০ রানের চমৎকার একটা পাল্টা আক্রমনাত্বক ইনিংস, অন্য পাশে উইকেট পড়ে যাচ্ছে এমন সময় দারুন দারুন সব শট খেলেন উইকেটের দুই পাশেই। ফেসবুক এক্সপার্টরা বলেন লিটনের নাকি পেস বলে দূর্বলতা। সাউথ আফ্রিকার সাথে যার দুইটা ফিফটি তার কিভাবে দূর্বলতা হয়? পুরা সাউথ আফ্রিকা সিরিজে লিটন কখনোই বাউন্স বলে হিমশিম খায়নি, শর্ট বলে ডাক করেনি। বরং অনেক ফ্লুয়েন্টলি খেলেছে ছোট্ট ইনিংস গুলাতে। হুম সমস্যা ছিলো শট সিলেকশন আর অফস্ট্যাম্পের বলগুলার লাইন বিচার করাতে। ইরর অফ জাজমেন্ট, বল ছেড়ে আউট হয়েছেন, যেটা চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম ইনিংসেও হয়েছে। কিন্তু এটা সমাধান হবেনা এরকম কিছুনা, আচ্ছা ওয়ানডে বা বিপিএলে দেখেছেন লিটনকে এভাবে বল ছাড়তে? কখনোই না। তার মানে হয়তো সে ভাবে টেস্টে বল লিভ করার সুযোগ আছে তাই লিভ করি! কিন্তু দ্রুতই শিখেছে লিটন। দ্বিতীয় ইনিংসে এভাবে বল ছাড়েনি।

প্রথম ইনিংসে গোল্ডেন ডাক মারার পর এমনই ট্রল হয়েছে যেন ইতিহাসের একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে লিটন ডাক মেরেছেন। অথচ গোল্ডেন ডাক হচ্ছে ক্রিকেটে শুধুমাত্র একটা “দূর্ভাগ্যজনক বিষয়”। ব্যাটসম্যান ভালো না মন্দ খেলেছে বা ফর্মে আছে কি নাই তার কিছুই ডাক মারলে আর আলোচনা করা হয়না। এক বল দিয়ে কি বিচার করবেন?

এবার আসি মাস্টার পিসে! গতকাল দিন শুরুর আগে ৮১/৩ ছিলো। যে যাই ভাবেন আমি ভেবেছিলাম ম্যাচ হারবে বাংলাদেশ। মজা করেই ক্রিকসেলের গ্রুপ চ্যাটে বলেছিলাম লিটন ম্যাচ বাঁচাবে। আর মনে মনে ভাবতেছিলাম লিটন সেঞ্চুরী করবে, ট্রল বন্ধ হবে, কল্পনা আরকি। লিটনকে নিয়ে আমি সবসময় বড় বড় কল্পনাই করি!

ইনিংসের বিবরন আমি না দেই, এখন সবাই জানেন খেলা না পারা লর্ড লিটন এক ইনিংসের ব্যবধানে খেলা শিখে গিয়েছে। শুধু এইটা বলি পঞ্চম দিনের চাপ মাথায় নিয়ে আমাদের কয়টা ব্যাটসম্যান এভাবেই ব্যাট করেছে? মমিনুলের সাথে মিলে ম্যাচটা বাঁচিয়েছেন।

চোখ ধাঁধানো স্কয়ার কাট, কাট, আদর্শ সব সুইপ যার একটাও বাতাসে ভাসেনি, মাটি কামড়ে চার হয়েছে, আই প্লিজিং কাভার ড্রাইভ, পুল, স্ট্রেইট ড্রাইভ …..শট দেখেই বোঝা যায় অভিজাত শ্রেনীর ব্যাটসম্যান।

আফসোস শুধু “মোমেন্ট অব ম্যাডনেস” এর কারনে নিশ্চিত আর প্রাপ্য সেঞ্চুরী মিস করলেন। মমিনুল যখন নব্বই-এর ঘরে লিটন বেশ দুই তিনবার যেয়ে তার সাথে কথা বলেছে। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ উইকেটে এসে নিজেই কিছুটা আক্রমনাত্বক ছিলেন, তার প্রভাবই কি লিটনের উপর পড়েছিলো কিনা!

লিটনের ক্লাস, লেভেল, সামর্থ্য, ট্যালেন্ট নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেন তাদের ক্রিকেট সেন্স নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

কাদের উপর ভরসা রাখা যায় আর কাদের পেছনে ইনভেস্ট করা উচিৎ এটা জানাটা ক্রিকেটে অনেক বড় একটা গুন, মেধা প্রয়োজন হয় এজন্য। অতীতের মত এক সিরিজ খেলানো আবার পরের সিরিজে বসিয়ে দেয়া এভাবে লিটনের ক্যারিয়ারের অন্তত দুই বছর নষ্ট করা হয়েছে।

আশার কথা মুশফিক এখন গ্লাভস ছাড়তে রাজি হয়েছেন, ফলে লিটনের জন্য সুযোগ এসেছে কিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলার। আর এখন নতুন নিয়মে বদলি ফিল্ডার (কিপার) যেহেতু কিপিং করতে পারেন সুতরাং সব সিরিজের স্কোয়াডে লিটনের থাকা নিশ্চিত অন্য কেউ কিপিং করলেও। আর হতাশার কথা এই সিরিজ শেষে আবার সাত নাম্বারে ফিরে যেতে হবে। যেখানে অনেক সময়েই সামর্থ্য থাকলেও সর্বোচ্চ দেয়া যায়না।

যারা ট্রল করেন তাদের আসলে কোন কাজ নাই, হয়তো পার্সোনাল লাইফে নিজেরাই ট্রলের শিকার তাই অনলাইনে অন্যকে ট্রল করে চরম পূলক লাভ করেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসেই সেঞ্চুরী করবে তাও লোয়ার অর্ডারে এরকম কেন ভাবেন? আর “In and Out” অবস্থায় রাখলে একটা ব্যাটসম্যান তার স্বাভাবিক খেলা দিতে পারেনা কখনোই।

লিটনকে টানা খেলানো হোক, ড্রপ না করে, তাকে নিশ্চয়তা দেয়া হোক। এই লিটন বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান হবে, একথা খোদ মাশরাফি থেকে শুরু করে এনামুল হক মনি সবাই বলেছেন।

লিটনের মতো ট্যালেন্টেড প্লেয়ার সবসময় আসেনা, সেটা কিপার হিসেবেও সত্যি, ব্যাটসম্যান হিসেবেও সত্যি। তাই ট্রল করা বাদ দেন, সাপোর্ট দিয়ে যান শুধু, লিটনের মত প্লেয়াররা হতাশ করেনা!

সব শেষে লিটনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, সমালোচনার জবাব ব্যাট হাতেই দিতে হয়। আর বড় প্লেয়াররা পারফর্ম করার জন্য বড় মঞ্চই বেঁছে নেয় সেকথা যেন লিটন আবারো প্রমান করে দিলেন।

লোয়ার অর্ডারে বাংলাদেশের বিখ্যাত টেল সাথে নিয়ে ব্যাট করে ১১ ইনিংসে যার গড় ৩২, আছে তিনটা ফিফটি অর্থাৎ প্রতি চার ইনিংসে যার একটা ফিফটি সে নাকি খেলা পারেনা!

অনেক কথা শুনেছি লিটনকে সাপোর্ট করে। সবচেয়ে বিরক্ত লাগতো “কবে রান করবে? অবসরের পর?” এই কথাটা। তারা নিশ্চয় এখন জানেন “অবসরের পর না, দলের সবচেয়ে প্রয়োজনেই লিটন রান করেন, অভিষেকের পর থেকে খেলা তিনটা ফিফটি আর একমাত্র চল্লিশের ঘরের ইনিংসটা মিলায় দেখেন”!

Most Popular

To Top