বিশেষ

বায়ান্ন তাসের বাপ্পা মজুমদার

বায়ান্ন তাসের বাপ্পা মজুমদার

এই ২০১৮ সালে বাংলাদেশের কোন সঙ্গিত প্রেমীকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, সে “বাপ্পা মজুমদার” কে চিনে কিনা, খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে যে চিনবে না। পুরো নাম তার শুভাশীষ মজুমদার বাপ্পা, কিন্তু “বাপ্পা মজুমদার” কিংবা “বাপ্পা দা” নামেই শ্রোতা সমাজে সে অনেক বেশি পরিচিত।

তিনি একজন গায়ক এবং বাদক ছাড়াও একজন গীতিকার এবং সুরকারও। সঞ্জীব চৌধুরীর সাথে দলছুট ব্যান্ডের সহ প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ১৯৭২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি এই উপমহাদেশের অন্যতম একজন সঙ্গীত বিশারদ ওস্তাদ বারীণ মজুমদার এবং ইলা মজুমদারের ঘরে জন্ম নেন এই শিল্পী। পিতা-মাতা উভয়ই শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী। তাই তার নিজ বাসাতেই তার সংগীত শেখা এবং চর্চা শুরু হয়। পরবর্তীতে যদিও সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ বারীন মজুমদারের সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “মণিহার সঙ্গীত একাডেমী” তে পাঁচ বছরের একটা কোর্স করেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উপর। তবে তার মতে ক্লাসিকাল মিউজিকের উপর এইটুকু শিক্ষা পর্যাপ্ত নয়, তিনি বলেন, “আমি মনে করি না ক্লাসিকাল গানের এই প্রশিক্ষণ পর্যাপ্ত তাই এই ধরনের গান গাওয়ার জন্য রত থাকতে পারি না।” এছাড়াও তার বড় ভাই পার্থ মজুমদারের কাছে তার গিটারে হাতেখড়ি।

বাপ্পা মজুমদার

৯০ এর শুরুর দিকে সঞ্জীব চৌধুরী ঢাকার শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে আড্ডা দিতো এবং গানের করতো। ১৯৯৩ সালের দিকে তখনকার গায়ক হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন বাপ্পা মজুমদারের। দু’জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯৯৫ বাংলাদেশের ব্যান্ড সংস্কৃতি পেয়েছে ‘দলছুট” কে। সাথে, তার নিজের একক এলবামেরও কাজ চালিয়ে যান তিনি। ১৯৯৫ সালে প্রথম একক এলব্যাম “তখন ভোর বেলা” দিয়ে মিউজিক ক্যারিয়ার শুরু করেন বাপ্পা মজুমদার। এই ক্যারিয়ারের পথচলতে চলতেই “পরী”, “বাজি”, “দিন বাড়ি যায়”, “বায়োস্কোপ” সহ আরো কিছু অসাধারণ গান তিনি তার ভক্তদের উপহার দেন। পাশাপাশি দলছুটও একের পর এক অসাধারণ সব এলবাম রিলিজ করতে থাকে। ২০০৭ সালে সঞ্জীব চৌধুরীর মৃত্যুর পরও বাপ্পা মজুমদার হাল ধরে রাখেন সেই ব্যান্ডের।

দলছুট ব্যান্ডের হয়ে সঞ্জীব চৌধুরী এবং বাপ্পা মজুমদার

তিনি এ পর্যন্ত ১০টি স্টুডিও এলবাম এবং ২০০ এরও বেশি এলবাম প্রযোজনা করেছেন। তার কিছু এলবামের নাম নিচে দেয়া হলো,

১) তখন ভোরবেলা(১৯৯৫)
২) কোথাও কেউ নেই (১৯৯৭)
৩) রাতের ট্রেন (১৯৯৯)
৪) ধুলো পড়া চিঠি (২০০১)
৫) ক’দিন পর ছুটি (২০০৪)
৬) দিন বাড়ি যায় (২০০৬)
৭) সূর্যস্নানে চল (২০০৮)
৯) বেঁচে থাক সবুজ (২০১২)
১০) জানি না কোন মন্তরে (২০১৪)
১১) রাত প্রহরী(২০১৫)

বাপ্পা মজুমদারকে নিয়ে কিছু অজানা তথ্যঃ 

১) জিন্স এবং টিশার্টেই বেশি স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করেন তিনি। পাঞ্জাবীও খুবই প্রিয় জিনিস তার। দেশাল এবং স্বপ্নবাজের পোশাক বেশি পছন্দ করেন।
২) হুগো বস এবং অ্যাজ্জারো ক্রোম ব্রান্ডের সুগন্ধি খুবই প্রিয় তার।
৩) তিনি দুধ-চা খেতে খুবই পছন্দ করেন।
৪) চ্যানেল ওয়ান এর অনুষ্ঠান “দ্য ওয়ান, আ মিউজিকাল টক শো” এর উপস্থাপনাও করেছেন তিনি। যেই চ্যানেলটির পরে ২০১০ সালে সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
৫) তিনি ব্যান্ড এবং নিজের জন্য ছাড়াও অন্য শিল্পীদের জন্য অনেক গান লিখেছেন।
৬) তার হেলিকপ্টার নিয়ে অনেক আগ্রহ আছে, তার একটি কালেকশনও আছে আরসি চপারের।
৭) তিনি একজন প্রযুক্তি আসক্ত ব্যক্তি যিনি কম্পিউটার গেমস, গান এবং কম্পিউটার সফটওয়্যার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করেন।
৮) তিনি ফটোগ্রাফিও অনেক ভালোবাসেন।
৯) বাপ্পার প্রথম এলবাম “তখন ভোরবেলা” এর “রানী ঘুমায়” গানটি বাপ্পার খুব পছন্দের যদিও শ্রোতাদের কাছে সেটি অতোটা পৌছায়নি
১০) বাপ্পা মজুমদার একবার আমেরিকায় ভ্রমণের সময় এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে যেতে ড্রাইভ করতে করতে তার এক বড়ভাই আবীর আলমগীর বলেন, উনি কয়েকটা লাইন লিখেছেন। তারপর সেটা তাকে শুনালেন। লাইন গুলো ছিলো-
“এক পশলা বৃষ্টিতে হেঁটে এলো মেয়েটি,
ক্যাফে হিল সাইড এভিনিউ“

এখানে “ক্যাফে হিলসাইড এভিনিউ” শব্দটা বাপ্পার ভীষণ রকম ভালো লাগে এবং তিনি তাকে লেখা শেষ করতে বলেন। তারপর উনি পুরো গানের একটি অন্তর লেখা শেষ করে বাপ্পকে দেখালে বাপ্পা নিউইয়র্কে থাকাকালীন সুর করেছিলেন এবং সেই সুরের উপর ভিত্তি করে তিনি দ্বিতীয় অন্তরটি লিখেন। সেই লেখা গানটিই হচ্ছে “জানিনা কোন মন্তরে” এর “ক্যাফে হিলসাইড এভিনিউ” গানটি।
বাপ্পা মজুমদার ২০০৮ সালের ২১শে মার্চ মডেল, অভিনেত্রী এবং নৃত্যশিল্পী “মেহবুবা মাহনুর চাঁদনী” কে বিয়ে করেন।

স্ত্রী চাঁদনীর সাথে বাপ্পা মজুমদার

তার আজকের অবস্থানে আসার জন্য তিনি মনে করেন, “সঞ্জীব চৌধুরী” এর অনেক অবদান আছে তো বটেই সাথে তার ভক্তদেরও অনেক অবদান আছে। তিনি ভক্তদের উদ্দেশ্য বলেন,

“আপনারা যারা আমার গান শোনেন, আমার গান ভালোবাসেন, আমার গান পছন্দ করেন, তাদের জন্যই আজকে আমি এই অবস্থানে আছি। আপনাদের জন্য আমার অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। দোয়া রাখবেন গান গেয়ে আপনাদের মুগ্ধতা দিয়েই যেন জীবনটা কেটে যায়। আপনারা সকলে অনেক ভালো থাকবেন। আর হ্যাঁ, একজনশিল্পী হিসেবে আমি চাইবো আপনারা সকলে বাংলাদেশের বাংলা গান শুনবেন। তবে ফ্রি ডাউনলোড করে নয় বরং কিনে শুনবেন।”

তথ্যসূত্রঃ

১. শুভাশিস মজুমদার বাপ্পা
২. বাপ্পা মজুমদার

Most Popular

To Top