টেক

অমরত্বের চাবি কি আমাদের হাতের মুঠোয়?

উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের প্রথম অর্ধ ছিল শিল্প বিপ্লবের যুগ। তারপর বিজ্ঞানের জগতে রাজত্ব করতে এসেছে কম্পিউটার। এখন আমরা যে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছি, বিজ্ঞানের যে কোন শাখার গবেষণা ও চর্চার জন্য কোন না কোনভাবে নির্ভর করতে হয় কম্পিউটার বিজ্ঞানের উপর। এটি সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত মতামত, পাঠকের যে কোন ধরনের মতপার্থক্য হলে আলোচনার জন্য আহবান জানাচ্ছি।

কম্পিউটার বিজ্ঞানের পর কে আসবে রাজত্ব করতে? আমার ভোট জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর পক্ষে।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে প্রাণীর Gene-modification সম্পর্কিত বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিক। জীবের জীবনের ধারা-বর্ণনার কাজটা জিনের, একটা জীব দেখতে কেমন হবে, তার বৈশিষ্ট্য কেমন হবে এই তথ্যগুলো পরমাণু আকারে সাজিয়ে রাখা আছে জিনের মধ্যে। জোড়ায় জোড়ায় সাজানো চারটা নিউক্লিওটাইড একটা কোড তৈরী করে, যেখানে একটা জীব, প্রাণী বা উদ্ভিদ, তার জীবনযাপনের যাবতীয় সব নির্দেশনা দেয়া আছে।

এই জিন মডিফিকেশনের ইতিহাস অনেক পুরোনো। মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই নিজের প্রয়োজনে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংকে ব্যবহার করে আসছে। গৃহপালিত প্রাণীর বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে মেটিং ঘটিয়ে আরো প্রজাতি উৎপাদন থেকে শুরু করে উন্নত ফসল উৎপাদন- জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল মানুষের “সারভাইভাল সায়েন্স”।

“জিন” জিনিসটায় মানুষ সরাসরি গুঁতা দেয়া অর্থাৎ ম্যানিপুলেট (পরিবর্তন/সংযোজন/বিয়োজন) করা শুরু করে গত শতাব্দীর ৭০ দশক থেকে। এর আগে, ষাটের দশকে রেডিয়েশন প্রয়োগে উদ্ভিদের জেনেটিক কোডে মিউটেশন ঘটে কিনা পরীক্ষা করা হয় এবং কিছুক্ষত্রে সফলও হয়। ১৯৭৪ সালে জন্ম নেয় প্রথম জেনেটিকালি মডিফাইড প্রাণী। এটি ছিলো এক ধরনের ইঁদুর, মূলত রিসার্চ এবং এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।

এখন, বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের সাথে সাথে এগিয়ে গেছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংও। জেনেটিক মডিফিকেশনের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে দ্রুত বর্ধনশীল স্যামন মাছ, পালকহীন মুরগী, স্বচ্ছ চামড়ার ব্যাঙ, ফ্লোরোসেন্ট জেব্রাফিশ। আর জাপান পরিবহনের সুবিধার্থে উৎপন্ন করেছে কিউব আকৃতির তরমুজ! সত্যিই আজব!

আচ্ছা, মানুষের উপর কি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করা যায় না?

জটিল প্রশ্ন- এর উত্তর আসলে হ্যাঁ বা না দিয়ে দেয়া যায় না, দেখতে হবে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটা করা হয়েছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং খুবই কার্যকরী একটা হাতিয়ার হতে যাচ্ছে মানুষের জন্য। বিশেষ করে  ক্যানসার এবং এইডসের মত প্রাণঘাতী রোগ নিরাময়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যবহার এখন গবেষণার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। কিন্তু আমি যদি বলি, মানুষের জিনোম কোডকে কি এমনভাবে ডিজাইন করা যায় না যেন মানুষ ক্যানসার বা এইডস এমনকি কোন রোগেই কখনও আক্রান্ত না হয়?

অল্প কিছুদিন আগে, ২০১৫ সালে, চীনের হুয়াং ল্যাবরেটরিতে ৮৬টি মানব-ভ্রুণের বিটা-থ্যালাসেমিয়া নামক একটি ব্লাড ডিজঅর্ডারের জন্য দায়ী Beta-globin gene (HBB) মেরামত করার চেষ্টা করা হয়। ৮৬ টির মধ্যে ৪ টি ভ্রুণের জিন ত্রুটি দূর করা সম্ভব হয়। তবে দেখা যায়, এই চারটি জিনের কারণে অন্যান্য সুস্থ জিনগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অবশ্য ভ্রূণগুলোকে অল্প কয়েকদিনের বেশি সংরক্ষণ করা হয়নি এবং সেগুলোকে মাতৃদেহে স্থাপন করার কোন প্ল্যানও বিজ্ঞানীদের ছিল না। যাই হোক, অন্তত এটা প্রমাণিত হয় যে মানব-ভ্রূণে জেনেটিক মডিফিকেশন করা সম্ভব, এবং আরও গবেষণা এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করা গেলে হয়তো সম্পুর্ণ ত্রুটিমুক্ত ভ্রূণও তৈরী করা অসম্ভব কিছু না।

টেকনোলজিকাল অ্যাডভান্সমেন্ট এক্সপোনেনশিয়াল ধারায় এগোয়, সেই হিসেবে বলা যায় জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং একসময় এতটা উন্নত হবে যে তা মানুষের উপর প্রয়োগ করা গেলে উচ্চ রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা, দীর্ঘ আয়ুষ্কাল, দৈহিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে উন্নত মানুষ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এমনকি, প্রত্যাশার পারদ চড়িয়ে বলা যায়, মানুষ হবে আজীবন রোগ ও জরামুক্ত।

Lobstar, Turritopsis nutricula, planarian  প্রাণী গুলো কিন্তু জরামুক্ত, অর্থাৎ তাদের বয়স বাড়ে না। আবার হাইড্রা বলতে গেলে অমর, তার স্বাভাবিক মৃত্যু নেই। তাদের জিনের রহস্য ভেদ করে তা মানুষের উপর প্রয়োগ করার চিন্তাও একেবারে আকাশ-কুসুম কল্পনা নয়। এমনকি ভ্রুণের জিনোম কোডিংযে পরিবর্তন এনে তাদের জন্ম দেয়া যাবে ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানী, শিল্পী কিংবা দক্ষ বিজনেস মাইন্ড হিসেবে। এই ভাবনা থেকে উঠে এসেছে “ডিজাইনার বেবী” নামে একটি ধারনা, যা বলে জিন মডিফিকেশনের মাধ্যমে একটি বুদ্ধিবৃত্তি ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে“সিলেকটিভ ব্রিডিং” করা সম্ভব।

মানুষের উপর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংযের প্রয়োগ তো দেখা যাচ্ছে সবই ইতিবাচক, তবে সমস্যাটা কোথায়? কেন বললাম যে মানুষের উপর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করা যায় কি না তার উত্তর এক কথায় দেয়া যায় না?

এর উত্তর যতটা টেকনিক্যাল, ততটাই ইথিকাল। বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি সবসময় সমরেখায় নাও চলতে পারে। করা যাবে বলেই করা উচিৎ?

তা কিন্তু সবসময় নাও হতে পারে। মানুষের জিন মডিফাই করতে গেলে কিছু নৈতিক প্রশ্ন চলে আসে, জন্মের পূর্বেই তার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে দেয়ার অনুমতি বা অধিকার কি আমাদের আছে?  একটু আগে বলেছিলাম, “উন্নত মানুষ উৎপাদন করা সম্ভব হবে” কিন্তু নিজের ইচ্ছামত মানুষ “উৎপাদন” করা কতটা নৈতিক? মানুষ কি আদৌ “উৎপাদন” করার মত প্রাণী (মানুষ উৎপাদনের সাথে শিশু জন্ম দেয়া গুলিয়ে ফেলবেন না দয়া করে)। একটা ভ্রুণ বিজ্ঞানী হবে না পুলিশ অফিসার সেটা নির্ধারণ করে দেয়ার আমরা কে?

প্রশ্নগুলো আমার নয়, প্রশ্নগুলো নীতিনির্ধারকদের। যখনই মানুষের জিন মডিফিকেশনের কথা উঠেছে, তখনই উঠেছে এর সাথে জড়িত নৈতিকতার প্রশ্ন। মানব-ভ্রুণের জিন মডিফিকেশন খুবই কনট্রভার্শিয়াল একটা ব্যাপার, এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বিতর্ক রয়েছে।

ভবিষ্যতবাদীদের একটি আশংকা রয়েছে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে উন্নত মানব-প্রজাতি সৃষ্টি হলে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার্ড মানুষ এবং নন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার্ড মানুষের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হবে। মানুষের একটা খারাপ বৈশিষ্ট্য হলো তারা স্বভাবগত ভাবেই বিভক্ত হতে ভালোবাসে, ভাগ হওয়ার যে কোন সুযোগ তারা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে লুফে নেয়।

আরেকটু প্র্যাকটিকাল সমস্যায় আসি। “জার্মলাইন মডিফিকেশন” টার্মটির সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। ভ্রূণের জিনে যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা কিন্তু তার ভবিষ্যৎ বংশধরদের মধ্যেও প্রবাহিত হবে। যেকোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই ভুল আসতে পারে, এখন ভুলটা যদি ঘটে মানব-ভ্রূণে, তখন যে কেবল সে-ই ভুগবে তাই না, ভোগান্তিটা তার ভবিষ্যত প্রজন্মেও প্রবাহিত হবে।

পৃথিবীর অনেক দেশের সংবিধানে মানব-ভ্রূণে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত আইন নেই, কিন্তু যাদের আছে তারা কিন্তু ব্যাপারটা আইনত নিষিদ্ধ করে রেখেছে। অনেক বিজ্ঞানী এই আইনকে বৈজ্ঞানিক প্রগতির জন্য বাধা মনে করছেন। অনেকেই মনে করছেন, “Greater good” এর খাতিরে মানব-ভ্রূণে জেনেটিক মডিফিকেশনের জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া উচিৎ।

“হিউম্যান ক্লোনিং” এর বিষয়টা ইচ্ছে করেই আজকে উহ্য রাখলাম। পরে একদিন এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বলার পরিকল্পনা রয়েছে ।

মানব-ভ্রূনে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিতর্ক এবং এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনাদের মতামত শোনার আগ্রহ রইল।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top