ইতিহাস

নভেরা আহমেদঃ এক অভিমানী ভাস্কর

নোভেরা আহমেদঃ এক অভিমানী ভাস্কর

মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়, পাকিস্তানি শাসকরা শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার  উপর খড়গ চালাচ্ছেন ইচ্ছে মতো। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন অনেক কষ্টে চারুকলা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাও আছে মাত্র দুটি বিভাগ, একটি হলো ড্রয়িং ও পেইনটিং এবং আরেকটি কমার্শিয়াল আর্ট বিভাগ। কিন্তু এই দুটি বিভাগ নিয়েও অনিশ্চয়তার শেষ ছিলনা। কারণ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা পাকিস্তানি শাসকেরা চারুকলা ইন্সটিটিউট বন্ধ করে দিতে একবাক্যে রাজি। চারুকলার প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকেই মৃত্যুর হুমকি পর্যন্ত পেয়েছিলেন, অনেকে আবার ধর্মান্দদের হাতে লাঞ্ছিতও হয়েছেন। এমন পরিবেশে ভাস্কর্য বিভাগ খোলা কিংবা প্রদর্শনী করার চিন্তাও মাথায় নেই কারো।

এর মধ্যে ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট সবাইকে চমকে দিয়ে ঢাকার কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গনে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার) শুরু হল ভাস্কর্য প্রদর্শনী। পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতির উদ্যোগে এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত “ইনার গেজ” শিরোনামের সেই প্রদর্শনীতে আছে নভেরা আহমেদ নামে ইউরোপ ফেরত এক নারী শিল্পীর নিজের করা কিছু ভাস্কর্য।পঁচাত্তরটি ভাস্কর্য নিয়ে করা ঐ দশ দিনব্যাপী প্রদর্শনীটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা ছিল।
পাকিস্তানের সে সময়কার দমবন্ধ অবস্থায় একজন নারী ভাস্কর্যশিল্পী হিসেবে পাকিস্তানের প্রথম ভাস্কর্য প্রদর্শনী করতে যে কি পরিমাণ সাহসের দরকার হয় সেটা আর না-ইবা বললাম।

সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের পথিকৃৎ সেই শিল্পী নভেরা আহমেদকে আমরা কখনোই কাজের উপযুক্ত সম্মান দিতে পারিনি, তার কাজের যথাযথ মুল্যায়নও করতে পারিনি।আজ এই লেখার মাধ্যমে তাকে স্মরণ করার সামান্য চেষ্টা।

নভেরার করা একটি শিল্পকর্ম

শৈশব :
১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মার্চ খুলনার সুন্দরবনে জন্ম নভেরা আহমেদের। পৈত্রিক বাড়ি চট্টগ্রামের আস্কারদিঘীর পাড়। বাবা সৈয়দ আহমেদের চাকরির সুবাদে নভেরা আহমেদের জন্ম এবং শৈশব কেটেছে সুন্দরবনে।
নামকরণ উৎসবে চাচা তাঁর নাম রাখেন নভেরা। ফারসি এই শব্দটির অর্থ হল “নবাগত বা নতুন জন্ম”। চাচা যে সার্থক নাম রেখেছিলেন সেটা নভেরা আহমেদের পরবর্তী জীবন দেখলেই বোঝা যায়।

কয়েকবছর পরে বাবার কলকাতায় বদলি হলে তিনি স্ব-পরিবারে কলকাতায় চলে যান। সেখানে তাকে লরেটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। নভেরা আহমেদের পারিবারিক আবহ ছিল সমসাময়িক অন্যান্য পরিবারের চেয়ে অনেকটা উদার ও আধুনিক। তাই নভেরা আহমেদ স্কুলে ভর্তি হয়ে নাচ গান সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। সেসময় থেকেই নভেরা আহমেদ মাটি দিয়ে মূর্তি তৈরি করার প্রতি আগ্রহী হন এবং আস্তে আস্তে ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হন। দেশ ভাগের পরে তারা কুমিল্লায় চলে আসেন এবং নভেরা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তীতে বাবা অবসর নিলে নভেরা আহমেদের পৈত্রিক আবাসস্থলে চলে যান এবং চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। অল্প বয়সে পারিবারিক ভাবে নভেরার বিয়ে হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই তা ভেঙ্গে যায়। এরপরে প্রগতিশীল বাবা আইন পড়ার জন্য নভেরাকে ১৯৫০ সালে লন্ডনে পাঠান। কিন্তু নভেরার মন ভাস্কর্যের দিকে থাকায় পরের বছরই তিনি ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের পাঁচ বছর মেয়াদের মডেলিং ও স্কাল্পচার ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়ে যান। ১৯৫৫ সালে কোর্স শেষ হলে নভেরা আহমেদ ভাস্কর্যে আরো পারদর্শী হবার জন্য ইতালির ফ্লোরেন্স ও ভেনিসে চলে যান।

নভেরা আহমেদ এবং শহীদ মিনার ঃ
শহীদ মিনার এর স্থপতি হিসেবে আমরা হামিদুর রহমানকেই জানি। তবে এই শহীদ মিনারের নকশায় যে নভেরা আহমেদেরও অবদান ছিল সেটা অনেকেরই অজানা থেকে গেছে আজও। ১৯৫৬ সালের দিকে হামিদুর রহমান এবং নভেরা আহমেদ লন্ডন থেকে আসেন এবং একসাথে কাজ করতে থাকেন। ১৯৫২ সালের স্থাপিত শহীদ মিনারটি আংশিকভাবে ভেঙ্গে ফেলা হলে ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সে সময়কার মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান এই শহীদ মিনারকে নতুন করে বানানোর পরিকল্পনা নেন এবং সরকারি প্রধান প্রকৌশলী জব্বার এবং জয়নুল আবেদিনকে এই কাজের দায়িত্ব দেন। জব্বার আহমেদের সহকর্মী প্রকৌশলী শফিকুল হক ছিলেন নভেরা আহমেদের দুলাভাই এবং তিনি নভেরা আহমেদেকে এই পরিকল্পনার কথা বলেন। তখন হামিদুর রহমান এবং নভেরা আহমেদ মিলে নকশা জমা দেন। সেই নকশায় নভেরা আহমেদের কিছু ভাস্কর্য স্থাপনের কথাও ছিল।

কিন্তু ১৯৫৮ সালে সামরিকজান্তা ক্ষমতায় এসে সামরিক আইন জারী করে এবং শহীদ মিনারের কাজও অর্ধসমাপ্ত রয়ে যায়।বিভিন্ন ঝামেলা পেরিয়ে শহীদ মিনার পুনর্নির্মাণ আরম্ভ হলেও সেখানে নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য আর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই পরবর্তীতে আর নভেরা আহমেদের নাম শহীদ মিনারের স্থাপনার সাথে উচ্চারিত হয়নি।

নভেরা আহমেদের কাজের বৈশিষ্ট্য ঃ
বিমূর্ত নারী প্রতিমূর্তি । যেখানে তিনি ফিগারেটিভ এক্সপ্রেশনের দিকেই বরাবর মনোযোগ দিয়েছেন। দেশে যেহেতু তখনো কোনো প্রতিষ্ঠিত ভাস্কর ছিলেন না তাই তিনি ইউরোপীয় ভাস্কর্যের কাজের অনুসারী হবেন সেটাই স্বাভাবিক এবং তার কাজের ক্ষেত্রে সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে ব্রিটিশ ভাস্কর হেনরী মুর এর স্টাইল। তখনকার সময়ে নারীদেরকে শুধুমাত্র ছবির অনুষঙ্গ কিংবা প্রেমময়ী মমতাময়ী রূপে চিত্রায়ন করা হতো। নারীদের বলিষ্ঠ এবং কর্মঠ রূপটাকে তেমন ফুটিয়ে তোলা হতো না। কিন্তু নভেরা আহমেদ তার কাজে মেয়েদের কোমল রূপের পাশাপাশি তাদের শক্তিমান দিককেও ফুটিয়ে তোলেন যত্ন দিয়ে। ইউরোপীয়ান ধাঁচের ভাস্কর্যের সাথে নভেরা আহমেদ মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন লোকজ বাংলার কুমোরের হাতে তৈরি টেপা পুতুলের ফর্মটাকে। তিনকোণা মাথার লম্বা গ্রীবার নারী ভাস্কর্যগুলোতে আবার যুক্ত হয়েছে প্রাচীন ভারতের নানা ধাঁচের ছাপ। পরবর্তীতে মিয়ানমার ভ্রমণে গিয়ে সেখানকার বৌদ্ধমূর্তিগুলো দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং তার আদলে কিছু কাজ করেন। এছাড়া বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে স্টেইনলেস স্টিল বা ওয়েল্ডেড মেটাল নিয়েও তার কয়েকটা ভাস্কর্য রয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণগ্রন্থাগারে প্রথম ভাস্কর্যের প্রদর্শনী হলেও ব্যাংকক এবং প্যারিস সহ নানা দেশে নভেরা আহমেদ একক কিংবা যৌথ প্রদর্শনী করেছেন।

কাজে মগ্ন নভেরা

সম্মাননা এবং স্মারকগ্রন্থ :
নভেরা আহমেদের প্রথম পুরস্কার প্রাপ্তি হয় ১৯৬১ সালে,অল পাকিস্তান পেইন্টিং এন্ড স্কাল্পচার এক্সিবিশনে। সেখানে তিনি ছয়টি ভাস্কর্য জমা দেন যেখানে একটির নাম ছিল “চাইল্ড ফিলসফার”।এই “চাইল্ড ফিলসফার” ভাস্কর্যটি বানানো হয়েছিল বাড়িতে নভেরার কাজে সাহায্যকারী দশ বছরের একটি বালককে মডেল হিসেবে ধরে নিয়ে।সেই এক্সিবিশনে এই ভাস্কর্যটিই প্রথম পুরস্কার লাভ করে।

পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে সম্মানিত করেন।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি হল এবং বাংলা একাডেমির একটি হলের নাম “ভাস্কর নভেরা আহমেদ হল” রাখা হয়েছে।

নভেরা আহমেদের উপর ১৯৯৫ সালে হাসনাত আব্দুল হাই এর সম্পাদনায় রচিত ‘নভেরা” শিরোনামের জীবনী উপন্যাস এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এর প্রযোজনায় প্রামাণ্যচিত্র “শিল্পী নভেরা আহমেদের সৃজন ভুবন ন হন্যতে” এই দুটি তথ্যসংকলন ছাড়া আর তেমন কিছু পাওয়া যায় না।

নভেরা আহমেদ নিয়ে লেখা বইয়ের প্রচ্ছদ

 জীবনের শেষ ভাগ ঃ
অনেকটা অভিমান করেই হয়তোবা নভেরা আহমেদ দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। সেখানেই স্থায়ী হয়েছিলেন।তাঁর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া কিংবা সময়ের চেয়ে আধুনিকভাবে চলা নভেরা আহমেদের প্রতি সমাজের তির্যক দৃষ্টি কোনটি যে তাকে এমন দুঃখ দিয়েছিল তা জানা যায়নি কখনো। শৈল্পিক মন নিয়ে তিনি বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে থাকেন কিন্তু বাংলাদেশে আসতে নারাজ ছিলেন। ১৯৭৪ সালে নভেরার প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনা হয়। তখন তার শুভাকাঙ্ক্ষী গ্রেগরি দ্য ব্রুহন তার সার্বিক দেখাশোনা করেন। এরপর ১৯৮৪ সালে তারা বিয়ে করেন এবং প্যারিসে থাকা শুরু করেন।

শেষ জীবনের সঙ্গীর সাথে নভেরা

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা একত্রে ছিলেন। নভেরা আহমেদ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে দেশের সাথে যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দেন এবং লোকমুখে শোনা যায় তিনি বাংলা ভাষায় কথা বলাও কমিয়ে দেন। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করলে তিনি দেশে আসতে না চাইলেও পরবর্তীতে আসেন এবং পুরষ্কার গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে শ্বাসকষ্ট সহ নানা রোগে ভুগে অভিমানী এই ভাস্কর মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে প্যারিসেই সমাহিত করা হয়।

Most Popular

To Top