নাগরিক কথা

গত দুই বছরের যত উপাচার্য অবরোধ!

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম উপাচার্য অবরুদ্ধের ঘটনা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হলেন উপাচার্য তাই শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিংবা প্রশাসনের কর্মচারী সবারই দাবি-দাওয়া তাঁর কাছে। আর এই পদের জন্য লড়াইও নেহাত কম নয়। দেশে বর্তমানে সরকার প্রতিষ্ঠিত ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় স্বায়ত্ত শাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এর পরিচালনার সর্ব্বোচ্চ পদে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

পাঠকরা হয়তো চিন্তা করছেন হঠাৎ উপাচার্য নিয়ে এতো মাতামাতি শুরু করলাম কেন? মনে মনে ভাবছেন, আরে ভাই এসবই তো জানা কথা, নতুন কিছু থাকলে বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনাদের বিরক্ত করা মোটেও আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অবরুদ্ধের ঘটনায় মনে হলো, আচ্ছা প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ব্বোচ্চ পদ উপাচার্য অবরুদ্ধের ঘটনা কেন ঘটে? প্রতিটি ঘটনা কি এতই জটিল আকার ধারণ করে যে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে তবেই দাবি আদায় করতে হবে? নাকি এটা নিছকই একটা আন্দোলনের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে?

যাক, এমন প্রশ্নের সিদ্ধান্ত আপনারাই নেবেন। আমরা শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই গত দুই বছরে কোন কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কয়বার ও কেন অবরুদ্ধ হয়েছিলো। আর এই পরিসংখ্যান বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে করা হয়েছে।

অতি সম্প্রতি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল, প্রক্টরের অপসারণসহ চার দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানকে অবরুদ্ধ করে একদল শিক্ষার্থী। ঢাবি উপাচার্য অবরুদ্ধের মধ্য দিয়েই শুরু হলো ২০১৮ সালের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আলোচিত ঘটনা ‘ভিসি অবরুদ্ধ’।

বছরের শুরুতেই অবরুদ্ধ ঢাবি উপাচার্য

এখন চলুন এক ঝলক দেখে নেয়া যাক ২০১৭ সালের উপাচার্য অবরুদ্ধের ঘটনা।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখার সাবেক নেতাদের যোগ্যতা ও অ্যাডহকের ভিত্তিতে চাকরি দেয়ার দাবিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ কে এম নূর-উন- নবীকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটে। কতিপয় শিক্ষার্থীসহ সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের দ্বারা অবরুদ্ধের এই ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালের ৩ মে।

৬৫তম সিন্ডিকেট সভা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আলী আশরাফকে অবরুদ্ধ করে শিক্ষক সমিতির নেতা ও সদস্যবৃন্দ। ১০ মার্চ ২০১৭ সালে উপাচার্যের বাসভবনের কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করা হয়।

উপাচার্যের বাসার সামনে অবস্থান নিয়ে আছেন শিক্ষকরা

ক্রেডিট পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে ২০১৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি- (রুয়েট) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বেগকে অবরুদ্ধ করে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনে দুপুর থেকে রাতভর উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরবর্তী বর্ষে উত্তীর্ণ হতে নূন্যতম ৩৩ ক্রেডিট প্রাপ্তির আবশ্যকতার বিরুদ্ধে কিছুদিন আন্দোলনের পর উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করার এই ঘটনা ঘটে।

আন্দোলনে রুয়েটের শিক্ষার্থীরা

শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী লাঞ্চনার বিচারের দাবিতে দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অবরুদ্ধ হন। ঘটনাটি ঘটে ১২ জুন ২০১৭ তে। এদিন উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ আবুল কাশেমসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তিন ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। একই বছর আবারো অবরুদ্ধ হন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ আবুল কাশেম। এবার তাকে অবরুদ্ধ করে শিক্ষকরা। ঘটনাটি ২০১৭ এর ২০ নভেম্বর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক হারুন- উর- রশিদকে অব্যাহতি দেয়ায় ক্ষুব্দ শিক্ষকরা এই অবরুদ্ধের ঘটনা ঘটায়।

একই বছরে দু’বার অবরুদ্ধ উপাচার্য আবুল কাশেম

গত বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসের দিন ক্লাস নেয়ার অভিযোগ ওঠে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। এর প্রেক্ষিতে তাকে এক মাসের বাধ্যতামূলক ছুটি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে ক্ষুব্দ হয়ে ১৭ আগস্ট উপাচার্য অধ্যাপক আলী আশরাফকে অবরুদ্ধ করে শিক্ষকরা।

ফিরে দেখা ‘উপাচার্য অবরুদ্ধ’- ২০১৬ ২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল অবরুদ্ধ হন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সাত্তার। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী নাসির উদ্দিন বাদলসহ পাঁচ শিক্ষার্থীর স্থায়ী বহিষ্কার ও শিক্ষার্থীদের নামে করা তথ্য প্রযুক্তি আইন-৫৭ ধারার মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এই অবরুদ্ধের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরী বদিউজ্জামান বাদলের ছোট ভাই দ্বারা এক মেয়ে শিক্ষার্থীকে লাঞ্চিত করা নিয়ে বদিউজ্জামান বাদল এবং তার লোকজন ও শিক্ষার্থী নাসির উদ্দিন বাদলসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এর প্রেক্ষিতে দুই বাদলসহ আরো পাঁচ শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার করেছিলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

৯ মার্চ ২০১৬ তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ হাসিনা হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও এবং প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে রাখে। হলের সিট সংকটের সমাধানের দাবিতে করা আন্দোলনের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেয় তারা।

২১ ডিসেম্বর ২০১৬ তে ২১ ঘন্টা অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে। ২০ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের দুই পক্ষের ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া এবং বোমাবাজির কারনে বিশ্ববিদ্যালয় ১৭ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল হক ভূঁইয়াকে অবরুদ্ধ করে।

শাবিপ্রবি’র ভিসি অবরুদ্ধ

১ জুলাই ২০১৬ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগ, শিক্ষক নিয়োগের নতুন সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করেছিলো এবং অবরুদ্ধ করা হয়েছিলো উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম নূর- উন- নবীকে।

ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে যখনই কোন আন্দোলন তীব্র হয়, তা শেষ হয় উপাচার্য অবরুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এটা কতটা ঠিক যে সর্বোচ্চ অভিভাবককে আটকে রাখার ভেতরেই আছে সমস্যার সমাধান! অনেক সময় দেখা যায়, তুচ্ছ কারণেই আটকে রাখা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবককে। তখন সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হন তিনি। সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই নানা খবর ছাপা হয়। সামাজিক ভাবে, পারিবারিক ভাবে হেয় হন তিনি। কিন্তু আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, শান্তিপূর্ন আন্দোলন বা দাবি-দাওয়া উপস্থাপনে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসন কান দেয়নি যতক্ষণ না উপাচার্য অবরুদ্ধ হয়েছেন। আর এ কারণেই বহুকাল ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর হেলাফেলার সংস্কৃতি ছাত্র-শিক্ষকদের বাধ্য করছে উপাচার্য অবরোধের মত কঠোর কর্মসূচিতে যেতে।

এখন পাঠক, আপনারাই সিদ্ধান্ত নেবেন যে এ সংস্কৃতির পেছনে কোন কারণ দায়ী? আর এটা আদতেই কি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা করে কিনা?

Most Popular

To Top