বাউন্ডুলে

কেমন ছিল নব্বই দশকের শৈশব?

কেমন ছিল নব্বই দশকের শৈশব?- Neon Aloy

আমাদের ছেলেবেলা নিয়ে লেখার জন্য খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখতে পাই বিটিভির “দ্য এডভেঞ্চার অফ সিন্দবাদ” এর মিভ, রঙ্গার কিংবা ড্যুবারকে। ছিলো চুল লম্বা সুদর্শন রবিনহুড, একুশে টিভির থীফ অফ বাগদাদ কিংবা টারজান! এসব টানটান উত্তেজনার টিভি শো’র মাঝেমাঝে বিজ্ঞাপন আসতো বম্বে সুইটসের পটেটো ক্র্যাকার্সের, “যেখানেই যাবে… হাত বাড়ালেই পাবে…!” কিংবা গন্ধরাজ হাসমার্কা নারিকেল তেলের, “ওগো অনন্যা… কোথা হতে আনলে গো এমন চুলের বন্যা…!”

কেমন ছিল নব্বই দশকের শৈশব?

চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখতে পাই বিটিভির “দ্য এডভেঞ্চার অফ সিন্দবাদ” এর মিভ, রঙ্গার কিংবা ড্যুবারকে

ক্লাস ফাইভের আগ পর্যন্ত বড় হয়েছি গ্রামে। মাসে একবার বাড়িতে নাপিত আসতো। সেই নাপিত চুল কাটার বদলে নিতেন ধান অথবা চাল। উঠানে ভাই-বোন সবাই পিঁড়ি নিয়ে বসে আছি। নাপিত চুল কাটছে; সবার জন্যই একই রকম বাটি ছাঁট। নাপিত চুল কেটে যাচ্ছে। আমার শরীর ভর্তি চুল আর চোখ ভর্তি পানি।

একটু একটু বুদ্ধি যখন হচ্ছে, তখন গ্রামের মার্কেটে একটা সেলুন হলো। স্কুল শেষে আম্মু সেই সেলুনে চুল কাটাতে নিয়ে যেতো। তবে প্রথম শর্ত জ্যুস কিনে দিতে হবে। তখন প্রাণের অরেঞ্জ জ্যুস পাওয়া যেতো রাউন্ড শেপের পাতলা প্লাস্টিকের বোতলে। সেই জ্যুস কিনলে স্টিকার ফ্রী পাওয়া যেতো। জ্যুস খেতে যেমনই হোক, জ্যুস কেনার প্রধান উদ্দেশ্য ঐ স্টিকার; ক্রিকেটার, টিভিতে দেখা সিন্দবাদ, রবিনহুডদের সেসব স্টীকার লাগানো হতো বইয়ের মলাটে কিংবা পেন্সিল বক্সে।

মুদির দোকানে পাওয়া যেতো এক টাকা দামের ম্যাচবক্সের মতো বক্সে ‘পাখির ডিম’। সেই পাখির ডিমের প্যাকেটের ভেতর পাওয়া যেতো মৌসুমী-শাবনূরদের ছবি। এক টাকায় পাওয়া যেতো চারটা ঝাল হজমি লজেন্স। প্রাইমারী স্কুলের মাঠে এক বৃদ্ধ কাঠের বক্সে আইসক্রিম বিক্রি করতেন। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আট আনায় একটা বস্তা আইসক্রীম কিনতাম, বস্তা আইসক্রীমের রঙে জিহব্বা কখনো হতো হলুদ কখনো বা লাল।

রোলার কোস্টার রাইডের চেয়েও বেশি থ্রীলিং ছিলো সুপারী গাছের খোলে বসে চড়া। পালা করে একজন একজন বসতো, বাকিরা টেনে নিয়ে যেতো সেই খোল, আমাদের স্বপ্নের পুষ্পক রথ!

রোলার কোস্টার রাইডের চেয়েও বেশি থ্রীলিং ছিলো সুপারী গাছের খোলে বসে চড়া

আব্বু চাকরীর কারণে থাকতো সিলেট। বাড়ি আসার সময় শহর থেকে পাউরুটি কিনে আনতো। সেই পাউরুটির কয়েকটা পিসে একটা করে ছোট মোরব্বার টুকরো পাওয়া যেতো। কার ভাগের পাউরুটিতে মোরব্বা পড়ছে, তখন সেটাই ছিলো অনেক বড় ভাগ্যের ব্যাপার!

তখন হলুদ টু স্ট্রোক বেবী ট্যাক্সির যুগ। ভটভট করে বেবী ট্যাক্সি চলতো। কাছের পথকেও দূরের মনে হতো অনেক। শব্দটা শুনতে খারাপ ছিলো না। কানের মধ্যে একবার বসাতে পারলে রিদমিক মনে হতো! আমি এখনো সেই বেবী ট্যাক্সি মিস করি।

আমাদের শৈশব ছিল টু স্ট্রোক বেবী ট্যাক্সির যুগ

জটিলতা কিংবা জীবনের দুঃখ বলতে ছিলো ‘শোলক’ বলা কাজলা দিদি’র মরে যাওয়া, ক্লাস থ্রীতে পড়া ইব্রাহীম খাঁ’র লেখা ‘পুটু’ গল্পে ‘পুটু’ নামের ছাগল ছানার কোরবানিতে জবাই হবার কষ্ট, মেঘনায় ঢলে আমিনার ডুবে মারা যাওয়া, ছিন্নমুকুল কবিতায় ছোট্ট শিশুটির মৃত্যু, ‘রাজা’ গল্পে কবুতর ‘রাজা’র মৃত্যু!

একটা সময় মনে হতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যেতে পারলে খুব ভালো হতো। বড়দের জন্য সব সহজ, সব নিজের মতো সুন্দর।
বুঝি নি, বড় হতে হতে জীবনটা আর নিজের থাকে না। বড় হতে হতে চোখ গুলো পৃথিবীর যতো সুন্দর, তাঁর কিছুই আর দেখতে পায় না।

বড়দের পৃথিবী মিথ্যা পৃথিবী, রংহীন সাদা-কালো পৃথিবী।
আমি বুঝি নি।

Most Popular

To Top