ফ্লাডলাইট

একজন সালাহ’র রাজত্ব

তার পায়ে ভর করেই মিশর যাচ্ছে রাশিয়ায়

Mo Salah Mo Salah…. running down the wind, salah la la la la… The Egyptian king

গানটি যেন ফুটবল ফ্যানদের মুখে মুখে। লিভারপুলের মধ্যমণি এখন তিনি। ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী ছেলেটি। যার পায়ে বল যাওয়া মানে ডিফেন্ডারদের হার্টবিট বেড়ে যাওয়া। ক্ষিপ্র গতি, অসাধারণ একুরেসি কি নেই তার! ইংরেজি উচ্চারণ- মুহাম্মেদ সালাহ (বাংলায় মোহাম্মদ সালা) বলা যায়। জন্ম ১৫ই জুন ১৯৯২ সালে মিশরের গারবিয়ার নাগরিগে। ডাক নাম তার মোমো। মেসির মতো ছোটখাটো গড়নের, বাঁ পায়ের খেলোয়াড়। সালাহ-বন্দনা যেন এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার খেলা, গোল করার ক্ষমতা, পাসিং তাকে লিভারপুলের মেসি নামেই পরিচিত করে তুলেছে। তবে সালাহর জন্য এসব নতুন কিছু না, তার এই উত্থানের শুরু হয় আরো অনেক আগে থেকে।

মিশরের ক্লাব “আরব কন্ট্রাক্টর স্পোর্টিং ক্লাব” তাদের ইয়ুথ একাডেমির জন্য প্রসিদ্ধ – সেখানে সালাহ ভর্তি হন মাত্র ১৪ বছর বয়সে। সেখানেই কাটে তার বাল্যকাল। এরপর প্রায় চার বছর পর ২০০৯/১০ মৌসুমে সিনিয়র টিমে অভিষেক হয় ঐ ক্লাবের খেলোয়াড় হিসেবে। সালাহ আরব ক্লাবের হয়ে প্রথম গোল করেন আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ক্লাব আল আহলি’র বিপক্ষে। আর তাতেই সালাহ চলে আসেন সবার নজরে। সেবছর জিতে নেন আফ্রিকার সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরষ্কার। আফ্রিকাতে দুর্দান্ত প্রদর্শনী তাকে নিয়ে আসে ইউরোপিয়ান ক্লাবের নজরে, ট্রান্সফার মার্কেটে মোটামুটি হট কেকই ছিলেন তিনি।

সুইস ক্লাব এফসি বাসেল মাত্র ২.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কিনে নেয় ২০ বছর বয়সী মোহাম্মদ সালাহকে। ২০১২-২০১৪ পর্যন্ত সেখানে ৭৯ ম্যাচ খেলে ২০ গোল এবং ১৭ এসিস্ট করেন তিনি। বাসেলের হয়ে ২০১২-১৩ মৌসুমে ইউরোপা লিগে বেনিতেজের চেলসির সাথে দেখা হয় সালাহ’র বাসেলের, সেখানে তার একটি গোল ছিল। কিন্তু বড় চমক আসে পরের মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ গ্রুপ পর্বে, যেখানে বাসেলের গ্রুপে ছিল হোসে মরিনহোর চেলসি। গ্রুপ পর্বে বাকি কোন ম্যাচ জিততে না পারলেও চেলসির সাথে দুই লেগেই জিতে বসে বাসেল এবং দুটো গোলই আসে সালাহ’র পা থেকে। প্রথম লেগে চেলসির মাঠে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে ৭১ মিনিটে সালাহর বাঁকানো শটে সমতায় ফেরে বাসেল এবং পরে ২-১ গোলে ম্যাচ জিতে নেয়। সবাই ভেবেছিল ঝড়ে বক মরেছে। তবে সালাহর গোলটা যে কোন অপ্রত্যাশিত কিছু ছিলনা সেটার প্রমাণ আসে ফিরতি লেগে। নিজেদের মাঠে সালাহ ছিলেন আরো অপ্রতিরোধ্য, এবার ম্যাচের ৮৭ মিনিটে কাউন্টার এটাকে সালাহর গতি এবং ড্রিবলে পরাস্ত হয় দি বাস পার্কিং নামে খ্যাত মরিনহোর চেলসি ডিফেন্স। ১-০ গোলে ম্যাচ জিতে বাসেল আর নায়ক বনে যান “দি ফারাও” নামে খ্যাত মোহাম্মদ সালাহ। “যদি কাউকে হারাতে না পারো তাহলে তাকে কিনে ফেল” – এইটা যদি কোন প্রতিযোগিতার নীতি হয়ে থাকে, তাহলে সেটার সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিল চেলসি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চেলসিকে অনেকটা একক প্রচেষ্টায় হারিয়ে ইউরোপে পরিচিত হয়ে উঠেছিল সালাহ। আর সেই চেলসিই কেমন করে ছেড়ে দেয় এই উদীয়মান ফুটবলারকে!

বাসেলের হয়ে নজরে আসেন সবার

বাসেলের হয়ে নজরে আসেন সবার

ওই মৌসুমের জানুয়ারি ট্রান্সফার উইন্ডোতেই তাকে স্টামফোর্ড ব্রীজে নিয়ে আসে মরিনহো। শুরু হয় সালাহ’র নতুন যাত্রা।আরব কন্ট্রাক্টরের হয়ে ২০০৯ এ ডেব্যু হবার পাঁচ বছর পর মোমো এখন ইউরোপের টপ ক্লাবের টপ র‍্যাকের খেলোয়াড়। নিঃসন্দেহে তার এবং মিশরের জন্য এটি অনেক বড় অর্জন। কিন্তু বড় জায়গাতে টিকে থাকাও অনেক চ্যালেঞ্জিং আর চেলসিতে সেই চ্যালেঞ্জেরই মুখোমুখি হন সালাহ।

চেলসির প্রথম একাদশে জায়গা পেতে যেন সমস্যাই হচ্ছিল সালাহ’র। মরিনহো ভরসা রাখছিলেন উইলিয়ান, হ্যাজার্ড এবং রামিরেস, ওস্কারের ওপর। তবে কি সালাহ হতে যাচ্ছেন আরেক মরিনহো ভিকটিম! চেলসির জন্য অবশ্য তরুণ প্লেয়ার কিনে লোনে পাঠিয়ে দেয়াটা নতুন কিছু না। সালাহর ক্ষেত্রেও তাই ঘটল, মাত্র এক বছরে চেলসি স্পেলে খেলেছিলেন মাত্র ১৯ ম্যাচ, গোল করেছেন মাত্র ২ টি। যেটি কিনা বাসেলের হয়ে করা গোলসংখ্যার অনেক অনেক কম।
“চেলসির সময়টা ছিল আমার ক্যারিয়ার এবং জীবনের জন্য শিক্ষণীয় একটি অধ্যায়” – সালাহর ভাষ্য। এমন অসাধারণ প্লেয়ারের জন্য এটা সংকটময় সময়ই বলা যায়। সালাহ হারিয়ে যেতে পারতেন, অথবা চেলসিতে বেঞ্চে বসেই কাটিয়ে দিতে পারতেন আরো কয়েকটি বছর।

যতটুকু সুযোগ হয়েছে কাজে লাগিয়েছেন চেলসিতে

যখন রোমার হয়ে মাঠ কাপাচ্ছেন সালাহ

কিন্তু মাঠে থাকার তীব্র আকাঙখা তাকে থামাতে পারেনি। সেই হার না মানা মানসিকতা থেকেই বেরিয়ে আসে আরো দূর্ধর্ষ এবং আরো ভয়ঙ্কর সালাহ। দলে নিয়মিত হবার ইচ্ছা থেকে ২০১৫ এর জানুয়ারিতে লোনে আসেন ইতালির ক্লাব ফিওরেন্তিনাতে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির শহর, ফ্লোরেন্সে। সালাহ’র গতি, ড্রিবলিং এ মুগ্ধ ফিওরেন্তিনা দর্শকরা, দ্রুতই ফ্যান ফেভারিটে পরিণত হন সালাহ। আটলান্টার সাথে বদলি নেমে ডেব্যু হয়। প্রথম একাদশে আসেন সাসুলোর বিপক্ষে। ৩-১ গোলে জয়ের পথে গোল করার পাশাপাশি আরেকটি গোলে এসিস্টও করেন সালাহ। দুর্দান্ত শুরুর পর ফিওরেন্তিনা দর্শকদের সালাহ বন্দনা যেন ফুলঝুড়ির মতই ফুটছিল। অনেকটা প্রথম দর্শনেই প্রেমের মতো সালাহকে ভালোবেসে ফেলে ফ্লোরেন্সবাসী। সেই ভালোবাসার প্রতিদানও আসে জুভেন্তাসের বিপক্ষে কোপা ইতালিয়ার সেমিফাইনালে দুই গোল করে। তার আগে ইউরোপা লীগে টটেনহামকে ৩-১ গোলে হারায় ফিওরেন্তিনা। সেখানেও গোল করেন সালাহ। এরপর আবার ইন্টারমিলানের বিপক্ষে করেন জয়সূচক গোলটি।

নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নতির উচ্চশিখরে নিয়ে যাওয়া সালাহ তখন সিরি আ’র টপ রেটেড প্লেয়ার। মৌসুম শেষে ফিওরেন্তিনা তাকে একেবারে কিনে ফেলতে চায়, কিন্তু সালাহ সেটাতে রাজি ছিলেন না।

এবার আরো একটি লোন ডিলে পাড়ি জমান রোমাতে। এএস রোমাতে ২০১৫-১৬ মৌসুমে ৪২ ম্যাচ খেলে করেন ১৫ গোল, এসিস্ট করেন আরো ৯ গোলে। দারুণ মৌসুম উপহার দেবার পর রোমাও তাকে একেবারে দলে ভিড়ানোর প্রস্তাব দেয়। এবার সালাহ ইতালিয়ান ক্লাবটিতে চুক্তিবদ্ধ হতে দ্বিধাবোধ করেনি। রোমাতে সালাহর এটাকিং পার্টনার হিসেবে ছিল ইদেন জেকো।। সেখানে ফারাও এর খেলার পজিশন রাইট উইং এ থাকলেও নাম্বার টেন কিংবা ফলস নাইনেও খেলতে অভ্যস্ত ছিলেন। ২০১৪-১৫ তে এএস রোমার গোল ছিল যেখানে ৫৪, সালাহ আসার পর সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩ তে। ওই মৌসুমে সিরি আ-র সর্বোচ্চ দলীয় গোল সংখ্যা। পরের ২০১৬-১৭ মৌসুমে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ তে। সালাহর স্কিল নিয়ে কারো কোন সন্দেহ না থাকলেও তার ফিনিশিং কোয়ালিটি নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন ছিল। তার পায়ের গতি, যেকোন টাইট ডিফেন্সকে ছন্নছাড়া করতে পারত। সবই ঠিক ছিল, কিন্তু শেষ পেরেকে কিছুটা জড়তা ছিল তার। যেটা স্পষ্ট হয় ২০১৫-১৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের সাথে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নক আউট পর্বের খেলায়। হ্যাট্রিক করার সুযোগ ছিল সালাহ’র, কিন্তু একটার পর একটা সুযোগ নষ্ট করায় হতাশায় শেষ হয় ইউরোপের দৌড়।

যখন রোমার হয়ে মাঠ কাপাচ্ছেন সালাহ

প্রথম দর্শনেই প্রেমের মতো সালাহকে ভালোবেসে ফেলে ফ্লোরেন্সবাসী

সেই ম্যাচ পর ইতালি মিডিয়ায় সমালোচিত হন। এরপর ফিনিশিং এর উপর অনেক জোর দেন সালাহ। কঠোর পরিশ্রম করে ফিরে আসেন পরের মৌসুমে। ২০১৬-১৭ তে সালাহ’র পা থেকে আসে ১৯ গোল এবং ১৫ এসিস্ট। ক্যারিয়ার সেরা পরিসংখ্যান ছিল সেইবার। ওই সিজনে তার ফিনিশিং রেট ১৯% থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২২% এ। এমনকি তার ১৯ গোলের মধ্যে ৪টি করেন ডান পায়ে। ওই মৌসুমে অবশেষে সালাহ নিজেকে পরিপূর্ণ ফরোয়ার্ডের কাতারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। সত্যিই সালাহ এখন পরিণত। পুরষ্কার হসেবে মাত্র ৩৪.৩ মিলিয়ন পাউন্ডে ফিরে আসেন ইংল্যান্ডে, তবে নীলের পরিবর্তে বেছে নিয়েছেন “অল রেড”। এরপরের গল্পতো সবারই জানা।

“চেলসিতে আমি ছোট ছিলাম, চার বছর পর এখন আমার তিনটা ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা হয়েছে। সবকিছু এখন অন্যরকম, বিষয়গুলো ভালোই বুঝে উঠতে পেরেছি।” – লিভারপুলকে দেয়া একটা সাক্ষাৎকারে ব্যাক্ত করেন সালাহ। অভিষেকে করেছেন গোল, অবদান ছিল বাকি গোলেও। লিগ রাইভাল আর্সেনালকে ৪-০ গোলে হারানোর পথে তার অদম্য সলো রানে করা গোল তাকে আবারো আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। একসময়ের প্রিমিয়ার লীগের ফ্লপ কি তবে ফিরে এসেছে রুদ্র রূপে!

সালাহর নতুন রূপ যেন আরও অপ্রতিরোধ্য, সিজনের অর্ধেক শেষ করেছেন প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ স্কোরার হিসেবে। ইতিমধ্যে করেছেন ক্যারিয়ার সেরা ১৭ লিগ গোল। এসিস্ট করেছেন আরো ৫ গোলে। শট একুরেসি ৫১%। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে করেছেন ৬ ম্যাচে ৫ গোল। এই সালাহকে আগে দেখেনি কেউ। যেন কোন ব্যক্তিগত মিশন নিয়ে হাজির হয়েছেন প্রিমিয়ার লিগে। হ্যারি কেইনের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে এখন লিগ টপ স্কোরারের অবস্থানে আছেন দুই-এ। তবে মৌসুম শেষ হবার আগ পর্যন্ত বলা যাচ্ছেনা শেষ পর্যন্ত কে জিতবেন প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বল। তবে এই বছরের আফ্রিকান গোল্ডেন বল জিতে নিয়েছেন মুহাম্মেদ মোমো সালাহ। আর জিতবেন না কেন? তার হাত ধরেইতো গুটি গুটি পায়ে ২৮ বছর পর মিশর টিকিট পেয়েছে বিশ্বকাপের। ৯৫ মিনিটে তার নেয়া পেনাল্টি কিকে কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে পূরণ করেন তার শৈশবের স্বপ্ন। মিশরকে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে দেখবে বিশ্ব।

নিজ দেশের স্বপ্ন পূরনের পথে

নিজ দেশের স্বপ্ন পূরনের পথে

কোয়ালিফায়ারের পরে এক টুইটার বার্তায় বলেন, “পেনাল্টিটি ১০০ মিলিয়ন মানুষের স্বপ্ন পূরনের জন্য ছিল,যদিও অনেক চাপ ছিল, তবে ১০০ মিলিয়ন মানুষের বিশ্বাসের ওপর ভর করেই এখানে আসা।”

শুধু খেলোয়াড় সালাহ নয়, মানুষ হিসেবেও সালাহ অসাধারণ। তার এই বিশাল অর্জনের পর মিশরের প্রেসিডেন্ট যখন তাকে একটি বিলাসবহুল বাগানবাড়ি পুরষ্কার দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তখন সে না বলে এবং বলেন বাড়িটি নাগরিগ গ্রামের মানুষকে দান করলে সে বেশি খুশি হবে। তার এই অর্জন এখনেই সীমাবদ্ধ না। তার প্রাক্তন স্কুলটিও তার নামে পরিবর্তিত করা হয়েছে। এমনকি তার গ্রামের যুব উন্নয়ন সংস্থাও তার নামে করা। মানুষ কিংবা খেলোয়াড় দুইদিকেই সালাহ অতুলনীয়। বেতনের অধিকাংশ অংশই সে খরচ করে তার দেশের মানুষের উন্নয়নে। নো হেটার গোত্রের এই প্লেয়ারটি খেলেও তেমন অসাধারণ।

টিকে থাকুক তার ফর্ম, ফুটবল প্রেমীদের এভাবেই মাতিয়ে রাখুক আরও অনেক বছর- এই প্রত্যাশাই ফুটবল ভক্তদের।

Most Popular

To Top