টুকিটাকি

নেকড়ে মানব কি সত্যিই আছে?

নেকড়ে মানব কি সত্যিই আছে?

ওয়্যার উলফ সিন্ড্রোম নেকড়ে মানব বা মায়া নেকড়ের কথা আমরা অনেক শুনেছি। এ নিয়ে মানুষের কৌতুহলও নিতান্ত কম নয়। পাশ্চাত্যের পৌরানিক বা লোককাহিনীতে এদের উপস্থিতি দেখা যায়। রূপকথায় দেখা পাওয়া এই নেকড়ে মানব হলো, যে ইচ্ছাপূর্বক বা অভিশপ্ত হয়ে নেকড়ে বা নেকড়ের মতো জীবে পরিণত হয়। আবার বলা হয়, কোন নেকড়ে মানব কাউকে কামড় অথবা খামচি দিলেও সেই ব্যক্তি নেকড়ে মানবে রূপান্তরিত হয়। ইউরোপের প্রায় সকল নেকড়ে অধ্যুষিত এলাকায় নেকড়ে মানব নিয়ে রূপকথার প্রচলন আছে।

Werewolf এ আক্রান্ত ব্যক্তি শুধুমাত্র পূর্ণ চাঁদের আলো বা জোৎস্নার সময় নেকড়ে রূপ ধারণ করবে। যতক্ষণ চাঁদের আলো থাকবে, ততক্ষণ সে মায়া নেকড়ে থাকবে । এমনকি সে মায়া নেকড়ে হবে নিজের অজান্তেই। আবার মানুষ রূপ ফিরে পাবার পর সে রাতের ঘটনা দিব্যি ভুলে যাবে। পূর্ণ চাঁদের আলো থাকতে থাকতেই মায়া নেকড়েকে মেরে ফেলা সম্ভব হলে তবেই সে ফিরে পাবে আগের স্বাভাবিক মানুষের জীবন।

প্রাচীন লোকগাথার এই গল্পের উপর ভিত্তি করেই হলিউডে নির্মিত হয়েছে অসাধারণ সব সিনেমা ও গেমস। রূপকথার রাজ্যে ভাসতে ভাসতে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে রহস্যময় এই পৃথিবীতে মায়া নেকড়ে কি সত্যিই আছে? নাকি শুধুই প্রাচীন লোকগাথার অংশ?

আমেরিকার বুনো পশ্চিমে অনেকে দাবি করেন, তারা নেকড়ে মানব দেখেছেন। তবে বাস্তব প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
সেই প্রাচীন কাল থেকেই পাশ্চাত্যে নেকড়ে মানবের ধারণার কথা জানা যায়, এই ধারণা ষোড়শ শতাব্দিতে ফ্রান্সের মানুষের মধ্যে গেড়ে বসে। এমনকি বহু মানুষও আছেন যারা নিজেদেরকে নেকড়ে মানব ভাবেন!

চিকিৎসা বিজ্ঞান কি বলে এই বিষয়ে? এমন কি আদৌ হওয়া সম্ভব? উত্তর হচ্ছে হা সম্ভব!
তবে এটিকে একটি বিরল রোগ হিসেবেই দেখছে চিকিৎসা বিজ্ঞান। কিন্তু কোনো চাঁদনী রাতে নেকড়ে মানব বনে যাওয়াটা শুধুই রূপকথা, বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল নেই।

তবে এমন একটি রোগ আছে যাতে আক্রান্ত হলে সেই ব্যক্তি নেকড়ের মতো দেখতে হয়ে যায়। রোগটির নাম হাইপারট্রিকোসিস বা ওয়্যার উলফ সিন্ড্রোম। এটি মূলত হরমোনের তারতম্যজনিত অসুখ।

এর ফলে দেহে অস্বাভাবিক ভাবে চুল গজাতে থাকে। আজব এই রোগটি বংশগতও হতে পারে। ছেলে কিংবা মেয়ে যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের নানা জায়গায় চুল গজাতে শুরু করে, স্বাভাবিক ভাবে সেসব স্থানে চুল জন্মায় না। অনেকে এই সমস্যাটি নিয়েই জন্ম নিতে পারে আবার অনেকের ক্ষেত্রে পরিণত বয়সে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত রোগীর দেহ ধীরে ধীরে অনেকটা নেকড়ে বা ওয়্যার উলফের মত হয়ে যায়। প্রাচীনকালে এমন কোন ব্যক্তিকে নিয়েই হয়তো শুরু হয়েছিলো নানা কাল্পনিক ব্যাখ্যা।

২০১৫ সালে এএফপিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে আসে ওয়্যার উলফ সিন্ড্রোমে আক্রান্ত এক ব্যক্তির কথা।
মেক্সিকো সিটির জেসাস আকিভস। আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো নয় তার জীবন। বাইরে বের হলে নিজের মুখ ঢেকে রাখতে হয়। কারণ ৪১ বছর বয়সী আকিভস এক বিরল রোগ ‘হাইপারট্রিকোসিস’ এ আক্রান্ত। তার সমস্ত শরীর ও মুখে অস্বাভাবিক লোমে ছেয়ে গেছে, দেখতে নেকড়ের মত মনে হয়। পুরো পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া মাত্র ৫০ জন ‘হাইপারট্রিকোসিস’রোগীর মধ্যে ১৩ জনই মেক্সিকোর লরেটো শহরের একই পরিবারের সদস্য। সেই পরিবারেরই একজন আকিভস। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতার কারণে কমবয়সে স্কুল ত্যাগ, চাকরি না পাওয়া এমন বিভিন্ন প্রতিকূলতার শিকার হতে হয়েছে তাকে।

‘হাইপারট্রিকোসিস’ রোগে চুলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো উপসর্গ নেই। শুধু শারীরিকভাবে অন্যদের চাইতে আলাদা হওয়ার কারণে সারাজীবন অস্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হয় এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের। বাংলাদেশেও এমন একজন রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। বিরল রোগ হাইপারট্রিকোসিস বা ওয়্যার উলফ সিন্ড্রোমে আক্রান্ত বিথী নামে এই নারীর চিকিৎসা চলছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। চিকিৎসকরা আশা করছেন, এই রোগ থেকে বিথী অচিরেই সেরে উঠবেন। আর তা যদি সত্যি হয় তাহলে বিথী হবে বাংলাদেশের চিকিৎসার সফলতার নতুন প্রতীক।

Most Popular

To Top