টুকিটাকি

“তুমি একটা নির্লজ্জ চোর বিল গেটস”- স্টিভ জবস

“তুমি একটা নির্লজ্জ চোর বিল গেটস”- স্টিভ জবস- নিয়ন আলোয়

আমার লেখার শিরোনাম হয়তোবা অনেকের কাছেই বিব্রতকর মনে হচ্ছে, বানোয়াটও মনে হতে পারে অনেকের। কারণ যাকে চোর বলা হচ্ছে এবং যিনি চোর হিসেবে ডাকছেন তাদেরকে প্রযুক্তির সাম্রাজ্যে দুই মহারথী হিসেবে মানা হয়ে থাকে। কেউ যদি প্রযুক্তির ইতিহাস নিয়ে কোনো বই লেখতে চান তবে বিল গেটস আর স্টিভ জবসের নাম বাদ দিলে সে বইটি অর্ধেকই অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, স্টিভ জবস নিজেই ছিলেন একটা চোর এবং বিল গেটস চোরের উপর শুধু বাটপারি করেছিলেন মাত্র। তাই স্টিভ জবস রেগে গিয়ে আগুণ খেয়ে অঙ্গার বাহ্যি করার মত অবস্থা হলেও বিল গেটসকে শুধুমাত্র ধমক দিতে পেরেছিলেন, এছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। আজ তাহলে সেই কাহিনীটাই শোনা যাক।

সত্তরের দশকে চলে যাই আমরা, কম্পিউটার তখনো সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে আসেনি। বাজারে আইবিএমের ঢাউস ঢাউস কম্পিউটারগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে,সেই মস্ত মস্ত কম্পিউটারগুলোকে রাখার জন্যই লাগতো মস্ত একটা রুম। প্রায় একই সময়ে আমেরিকার দুই প্রান্তের দুই যুবক চিন্তা করলেন এই কম্পিউটারগুলোর মাঝখানে পরিবর্তন এনে কম্পিউটারকে মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসতে পারলে সেটা হবে অনেক বড় বিনিয়োগ এবং তাতে লাভ ছাড়া আর্থিক কোনো ক্ষতি হবেনা। সিয়াটলে বসবাসকারী অবস্থাবান পরিবারের ভালোমানুষ চেহারার বিল গেটস ছিলেন কোডিং-এ এক্সপার্ট, হাইস্কুল থেকেই কোডিং করতেন। পরে হার্ভার্ডে পড়ার সময় আরেক কম্পিউটার এক্সপার্ট বন্ধু পল এলেন সহ ১৯৭৫ সালে মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আর ক্যালিফোর্নিয়ার পালো এটলোর দুই বন্ধু ছিল স্টিভ জবস আর স্টিভ ওজনিয়াক। নতুন নতুন প্রযুক্তি আর কম্পিউটারের নেশায় মত্ত থাকতেন তারা সবসময়। একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন যে দুই বন্ধু মিলে বানাবেন নতুন কিছু। তাই ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে তারা প্রতিষ্ঠা করেন এপল কোম্পানি। এভাবে জন্ম নেয় দুই প্রতিষ্ঠান যারা প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে কয়েক দশক ধরে।

যদিও তারা কখনো একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেনি, কিন্তু তারা একত্রে একটি মাইলফলক দাঁড় করেছিল। স্টিভ ছিল টাকা পয়সার প্রতি অতটা মনোযোগ না দেওয়া বদমেজাজী এক উদাসীন ভবঘুরে আর বিল হচ্ছে সবসময় বাণিজ্যিক মনোভাব নিয়ে কাজ করা ঠান্ডা মাথার এক লোক। এটাই তাদের দুজনকে সম্পূর্ণভাবে এবং সবদিক দিয়ে আলাদা করে দিয়েছিল “

– সত্তরের দশকে বিল গেটস আর স্টিভ জবস দুজনের সাথে কাজ করা সাংবাদিক রবার্ট ক্রিংগলি এমন অভিমতই ব্যক্ত করেন।

একসাথে কাজ করা
মাইক্রোসফট প্রথমদিকে সফটওয়্যার তৈরি করতো বিভিন্ন কোম্পানির জন্য, তারা বেসিক নামের একটি সফটওয়্যার তৈরি করে এবং অধিকাংশ বড় কোম্পানীগুলোতে এই সফটওয়্যারটি বিক্রি করে তারা ভালোই মুনাফা করে। আর তার কাছাকাছি সময়ে এপল কোম্পানি কাজ করছিল সাধারণ মানুষদের জন্য কম্পিউটার তৈরিতে। তাদের বানানো এপল-টু মডেলের কম্পিউটারটি অনেক উন্নত হলেও সেখানকার সফটওয়্যারে কিছু গুরুতর সমস্যা ছিল। আর সেই সমস্যার সমাধান ছিল মাইক্রোসফটের বেসিক নামক সফটওয়্যারে। এজন্য এপল কোম্পানীর মাইক্রোসফটের সাথে একত্রে কাজ করার চুক্তি করতে হয় এবং ঠিক হয় যে মাইক্রোসফট এপলের জন্য সফটওয়্যার লেখার কাজ করে দেবে। এভাবেই স্টিভ আর বিল গেটস পরস্পরের সাথে যুক্ত হন এবং তখনো তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালোই ছিল।

এরপরে এপল আর একটি বড় প্রজেক্টে জড়িয়ে পড়েন, যার নাম ম্যাকিনটশ। তখনকার দিনের কম্পিউটারগুলোতে সামান্য কাজ করতে গেলেও কমান্ড লাইন দিয়ে অনবরত কমান্ড টাইপ করে যেতে হত, যা ছিল সাধারণ মানুষদের কাজে সম্পূর্ণ অজানা একটা বিষয়। স্টিভ আর ওজনিয়াক দুজনে মিলেই এই সমস্যাটিকে দূর করার জন্য চিন্তা করছিলেন।

স্টিভ জবসের চুরি
স্টিভ জানতে পারেন যে জেরক্স নামের একটি রিসার্চ প্রতিষ্ঠান কমান্ড টাইপ করা ছাড়াই এক ক্লিকে সব কাজ করার মত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। স্টিভ জেরক্সের এই উদ্ভাবন দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন এবং জেরক্সের সাথে একটি চুক্তি করেন। চুক্তি মোতাবেক জেরক্স যদি এপলকে তাদের নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোর ডেমো দেখতে দেয় তবে তার বিনিময়ে জেরক্স কোম্পানি এক মিলিয়ন ডলারে এপলের একলক্ষ শেয়ার কিনতে পারবে। এই চুক্তি মোতাবেক জেরক্স এপলকে তাদের উদ্ভাবিত তিনটি জিনিসের ডেমো দেখায়- ইথারনেট, বস্তুভিত্তিক ভাষা এবং গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস। এর মধ্যে গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেসটি দেখে স্টিভ মুগ্ধ হয়ে যান এবং সেখান থেকে ফিরে তিনি প্রধান প্রোগামারকে জেরক্সের মত ইন্টারফেস বানাতে কয়দিন লাগবে তা জানতে চান। এর থেকেই চলে আসে এপলের ইউজার ইন্টারফেসের আইডিয়া।

পরবর্তীতে এপল ঐ গ্রাফিক ইউজার ইন্টারফেসের অনেক উন্নতি করলেও অন্যের কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে তাদের উদ্ভাবনের মৌলিক বিষয়গুলোকে ব্যবহার করা তো একরকম চুরিই বলা চলে তাই না?

চোরের উপর বাটপাড়ি
জেরক্সের কাছ থেকে মেরে দেওয়া গ্রাফিক ইউজার ইন্টারফেসই ম্যাকিনটশকে অন্য কোম্পানির থেকে আলাদা করে তুলেছিল। তাই এপল এই ইন্টারফেসটাকে আরো উন্নত করার কাজে প্রাণ লাগিয়ে দেয়। তখন চুক্তিভিত্তিক কাজগুলোতে অনেক সময় এপলের চাইতে মাইক্রোসফটের কর্মীরা বেশি কাজ করত, তাই তারা এবং বিল গেটস সহজেই ঐ ইউজার ইন্টারফেস সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যায় এবং নিজেরা তেমন একটা সফটওয়্যার বানানোর চেষ্টা চালাতে থাকে। পরে ১৯৮৩ সালে মাইক্রোসফট যখন এপলের আগেই “উইন্ডোস” নামে ইউজার ইন্টারফেসকে বাজারে নিয়ে আসতে যায়, তখনই এপলের টনক নড়ে। স্টভ বিল গেটসকে ডেকে চোর বলে যখন গালিগালাজ করেন তখন ঠান্ডা মাথার বিল গেটস স্টিভকে যে উত্তর দেন তা এখনো অবিস্মরণীয় হয়ে আছে,

“দেখো স্টিভ,তুমি সম্পূর্ণ ঘটনাটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা কর। মনে কর যে, আমাদের দুজনেরই জেরক্স নামে এক ধনী প্রতিবেশী আছে। আমি তার বাসায় টেলিভিশন চুরি করার জন্য যদি গিয়ে দেখি যে তার আগেই তুমি এসে সেটি চুরি করে নিয়ে গেছ তবে আমি যদি সেই বাসার রেডিও সেটটা চুরি করে নিয়ে আসি তাতে কি কোনো অন্যায় হবে আমার?”

এপলের মাইক্রোসফটের নামে মামলা
ম্যাকিনটশ সর্বপ্রথম মাউস ব্যবহার করা কম্পিউটার হিসেবে এসেছিল এবং সাথে আইকন সম্বলিত কম্পিউটার হলেও ধীরগতির কারণে এটি তেমন বাজার পায়নি। কিন্তু উইন্ডোজ সবার মাঝখানে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে যায় যে চল্লিশ পেরোনোর আগেই বিল গেটস পেয়ে যান শ্রেষ্ঠ ধনীদের একজন হওয়ার খেতাব। আর মুদ্রার উল্টোপিঠে স্টিভ জবসকে তার নিজের কোম্পানি থেকেই বের হয়ে যেতে হয়। ১৯৮৮ সালে এপল কোম্পানি মাইক্রোসফটের নামে যে মামলা করে তা এখনো ল্যান্ডমার্ক হিসেবে রয়ে গিয়েছে। তারা মাইক্রোসফটের নামে এপলের নিজস্ব ম্যাকিনটশ অপারেটিং সিস্টেমের গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস নকল করে বাজারে ছাড়ার কথা বলে। টাইটেল বার, রিসাইজ অপশন ছাড়াও এপলের প্রায় দুইশটা গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসিং সিস্টেমের অংশ নকল করার অভিযোগ উঠে এপলের কাছ থেকে। এপলের উকিলরা এটাও দাবি করেন যে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ সিস্টেমের প্রথম ভার্শনের জন্যই শুধু মাইক্রোসফটকে এপলের ঐ গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেসের কিছু অংশের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মাইক্রোসফট সে নিয়ম না মেনে নিত্যনতুন ভার্সন বানিয়ে বাজারে বিক্রি করছে। প্রায় পাঁচবছরব্যাপী চলা এই মামলায় মাইক্রোসফটের পক্ষে রায় দেওয়া হয় এবং এপলের সব অভিযোগ আদালত বাতিল করে দেয়। কিন্তু এই ঘটনার পরেও এখনো অনেক লোকই বিশ্বাস করে যে মাইক্রোসফট আসলেই এপলের ইন্টারফেসকে নকল করেছিল আর বিল গেটস একজন আইডিয়া চোর।

স্টিভ জবসের মনোভাব
পরবর্তীতে স্টিভ জবস আবার এপলে প্রধান হিসেবে যোগ দিলেও তিনি মাইক্রোসফটকে কখনোই মন থেকে ক্ষমা করেননি। যখন এপলের নির্বাহী কমিটি জবসকে আবার সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছিল তখন বিল গেটস তাদেরকে জবসকে পুনরায় নিয়োগ দিতে মানা করেন এবং স্টিভকে “টেকনোলজির জ্ঞানবিহীন একজন সেলসম্যান” নামে অভিহিত করেন। স্টিভের চিন্তা-ভাবনাগুলো অর্থহীন বলে উল্ল্যেখ করে তিনি এই “স্টুপিড” সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্যেও নির্বাহী কমিটিকে মানা করে দেন। এইসব কথা বার্তার প্রতিশোধ হিসেবেই মনে হয় ১৯৯৭ সালে এপলে তার প্রথম বক্তৃতায় স্টিভ ঘোষণা দেন যে, তিনি আসার আগে এপল কোম্পানিতে মাইক্রোসফটের বিনিয়োগের যে প্রস্তাবটি এখনো চুড়ান্ত হয়নি সেটিকে অনুমোদন দিয়ে দিয়েছেন।

মাইক্রোসফটের একমাত্র সমস্যা হচ্ছে যে তাদের কোনো রুচিবোধ নেই। তাদের সাফল্য নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু আমার সমস্যা হচ্ছে তাদের নিম্নমানের পণ্য নিয়ে, তারা নিজেরা কিছু বানাতে পারেনা কিন্তু অন্যের আইডিয়া কপি করতে তারা ওস্তাদ “

-একটি লাইভ অনুষ্ঠানে মাইক্রোসফটকে নিয়ে এমন ব্যঙ্গউক্তিই করেছিলেন স্টিভ।

এছাড়া সফটওয়্যার ব্যাবসায় বিল গেটসের মাইক্রোসফট কোম্পানির নামে বিভিন্ন অভিযোগের ফলে বিলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিল গেটস যখন মাইক্রোসফটের দায়িত্ব ছেড়ে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের দিকে মনোযোগ দেওয়া আরম্ভ করেন তখনো স্টিভ বলেন যে, “বিল আসলে কল্পনাশক্তিবিহীন নির্বোধ একজন লোক,তাই আমার মনে হয় প্রযুক্তির জগত ছেড়ে তার বরং এসব আধ্যাত্মিক কাজ নিয়েই সময় কাটানো উচিত”।

স্টিভ জবসঃ একজন জিনিয়াস উদ্ভাবক নাকি স্বার্থপর এক ব্যক্তি?

বিল গেটস স্টিভ সম্পর্কে এমন সমালোচনা না করলেও তার প্রতি স্টিভের যেসব অভিযোগ সেগুলো খন্ডানোরও চেষ্টা করেননি তিনি। তবে স্টিভের মৃত্যুর পরে এক অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থাপকের এক প্রশ্নের উত্তরে যখন, “আমি আর স্টিভ মিলে ম্যাকিনটশ বানানোর জন্য কাজ করেছিলাম, আমাদের মাইক্রোসফটের লোকই সেই প্রজেক্টে বেশি কাজ করেছিল, তাই এক অর্থে আমরাই (মাইক্রোসফট) এটি বানিয়েছিলাম” এই কথাগুলো বলেন তখন জীবিত থাকলে এসব কথা শুনলে স্টিভ জবস যে কি করতেন তা সত্যিই কল্পনা করতে মন চায়।

Most Popular

To Top