টুকিটাকি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক জটিলতার সূত্রপাত কোথায়?

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আলোচিত ঘটনাগুলো মধ্যে অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অবরুদ্ধ হওয়া ও আন্দোলনকারীদের উপর ছাত্রলীগের হামলা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক এখনও উত্তপ্ত। পাশাপাশি পাল্টাপাল্টি বিবৃতি ও আন্দোলন এখনও চলমান।

এই সংঘর্ষের পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায় ঘটনাটির শুরু ২০১৭ সালে রাজধানীর সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির পর থেকে। ২০১৪ সালে বড় বড় কলেজগুলোকে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর চাপ কমানোই এমন সিদ্ধান্তের কারণ। পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ পায় ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে। সেদিন রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়। তবে এটা নতুন কোন ঘটনা নয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়ার আগে এ কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই ছিলো।

প্রথমদিকে সাত কলেজের শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা এই অধিভুক্তিতে খুশি হয়েছিলো। এর ফলে সময়মতো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়া, ফল প্রকাশ ও সেশনজট কমবে বলে বিশ্বাস ছিলো তাদের।

ঝামেলাটা দেখা দেয় ২০১৭ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক ১ম থেকে শেষ বর্ষ ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফল প্রকাশ করলেও আটকে যায় এই সাত কলেজের পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ। এতে করে কয়েকধাপ পিছিয়ে পড়ে কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা। ৩৮ তম বিসিএসেও আবেদন করতে পারেনি তারা। এ নিয়ে আন্দোলনে নামে সংশ্লিষ্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন প্রথমদিকে নিজ নিজ কলেজে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ছোট ছোট কর্মসূচী দেয়া শুরু করে। তাতেও আশানূরূপ ফল না পাওয়ায় বড় কর্মসূচির ঘোষণা দেয় তারা। গত বছরের ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেয়াসহ শাহবাগে সমাবেশের কর্মসূচী রাখে শিক্ষার্থীরা। এই কর্মসূচী চলাকালীন আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। আন্দোলনকারী ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় কাঁদানে গ্যাসের আঘাতে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর হারায় তার দৃষ্টিশক্তি। সে আন্দোলন এখন অনেকটাই স্মিত।

২০১৭ সালের শেষদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় সাধারণ শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন শুরু করে। সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবি জানায় তারা। তাদের দাবি, এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ও এর অপব্যবহার করছে। এ বাতিলের দাবিতে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে মানব বন্ধন করে তারা। এতে আন্দোলনকারীদের উপর ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের চড়াও হওয়া ও নারী শিক্ষার্থীদের নিপীড়নের অভিযোগ উঠে।

এরপর ১৭ জানুয়ারি নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ ব্যানারে প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানীর কার্যালয় ঘেরাও করে আন্দোলনকারীরা। এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাম সংগঠনকে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়। নিপীড়নকারী অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের বহিষ্কারের দাবি জানায় তারা। প্রক্টর কার্যালয় ঘেরাও এর এক পর্যায়ে তালাবদ্ধ ফটক ভাংচুর করে শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে প্রক্টর শিক্ষার্থীদের সামনে ঘটনাটি তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলেন। এরপর ফটক ভাংচুরের ভিডিও এবং স্থির চিত্র প্রকাশসহ অজ্ঞাতনামা ৫০/৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এ আন্দোলন রীতিমত সংঘর্ষে রূপ নেয় ২৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার। সাধারণ শিক্ষার্থী ব্যানারে একদফা আন্দোলন রূপ নেয় চারদফা আন্দোলনে। সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল, নিপীড়নকারী ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের বহিষ্কার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা অজ্ঞাতনামা মামলা প্রত্যাহার ও প্রক্টরের অপসারণের দাবি জানায় তারা। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। এসময় কার্যালয়ের কর্মীরা ফটকগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দিলে তিনটি ফটকের তালা ভেঙ্গে কার্যালয়ের করিডোরে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা।

উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান তিন ঘন্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সিনেট ভবনে বোর্ড অব এডভান্স স্টাডিজের এক সভায় যোগ দিতে কার্যালয়ের পেছেনে ফটক দিয়ে বের হন। এসময় আন্দোলনকারীরা তার পথ রোধ করে। তারা তাদের দাবিগুলো পূরণে ঘোষণা দিতে উপাচার্যের উপর চাপ প্রয়োগ করে। উপাচার্য ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী নিয়ম মেনে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও আন্দোলনকারীরা মামলা প্রত্যাহার ও প্রক্টরের অপসারণের ঘোষণা তাৎক্ষণিক দেয়ার দাবি জানায়।
এ সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের নেতৃত্বে একটি দল উপাচার্যকে আন্দোলনকারীদের ঘেরাও থেকে মুক্ত করে কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তারপর আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনকারী ছাত্রীদের হেনস্তা ও রড, লাঠি দিয়ে ছাত্রদের মরধরের অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে।

আন্দোলনকারীদের উপর ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের হামলা ও মারধরের ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে। ২৪ জন ছাত্রকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কতিপয় সহিংস শিক্ষার্থী ও বহিরাগত যুবক রড, লোহার পাইপ, ইট, পাথর নিয়ে উপাচার্য ভবনের তিনটি ফটকের তালা ভেঙে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে অশালীন বক্তব্য দিচ্ছিল। তাদের একটি প্রতিনিধি দলকে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে বলা হলেও তারা শোনেনি। উপাচার্য বোর্ড অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ সভায় যাওয়ার জন্য বের হলে ‘উদ্ধত, উত্তেজিত ও উচ্ছৃঙ্খল আন্দোলনকারীরা’ তার পথ রোধ করে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এতে বলা হয়, উপাচার্য তদন্ত সাপেক্ষে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে অশালীন বক্তব্য দিতে থাকে।

“এক পর্যায়ে উপাচার্যের প্রতি বলপ্রয়োগ ও আক্রমণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য ও শিক্ষার্থীরা মানব বলয় তৈরি করে উপাচার্য মহোদয়কে তার কার্যালয়ে ফিরিয়ে আনে।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রলীগের মারধরের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

মঙ্গলবারের এ ঘটনায় এখনও পাল্টাপাল্টি মানব বন্ধন অব্যাহত আছে।
ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে সমালোচনার মুখে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বৈঠকে বসে ছাত্রলীগ ও আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল নেতারা। বৈঠক শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃংখলা বজায় রাখতে ছাত্রলীগকে নির্দেশ দেয়া হয়।
আলোচিত এ ঘটনা নিয়ে নিয়ন আলোয়- এর পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছে। সবাইকে তদন্ত কমিটিকে সহযোগিতা করতে অনুরোধ জানান তিনি। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ন আলোচনায় বসতে চাইলে তিনি যেকোন সময় বসতে রাজী বলে জানান, প্রক্টর।

পাশাপাশি যারা শিক্ষার্থী তাদের প্রতি অনুরোধ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষার্থে দায়িত্বশীল আচরণ করার।

নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলনের সমন্বয়ে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক হিস্ট্রি এন্ড কালচার বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিব মোহাম্মদ আশিক। নিয়ন আলোকে তিনি বলেন, ‘আমাদের উপর যে হামলা হয়েছে তাতে আহতরা এখনো সেরে উঠেনি, তারা সেরে উঠুক। দাবি আদায়ে আমরা পিছপা হব না। ২৩ তারিখ আমাদের উপর যে ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে আমরা মনে করি উপাচার্যের নির্দেশেই এটা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে আমরা নাকি সহিংস আন্দোলনকারী, কিন্তু এটা মিথ্যাচার। আমরা কোন সহিংসতা চালাইনি, আমরা শুধু উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে আমাদের দাবির কথাই জানাচ্ছিলাম’।

আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে ২৯ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটের কথা জানান তিনি। পরবর্তী কর্মসূচী সেদিন ঘোষণা দেয়া হবে বলে জানান হাসিব মোহাম্মদ আশিক।

Most Popular

To Top