বিশেষ

আধখানা ভালো ছেলে এবং আধা মাস্তান এক ছেলের গল্প

কষ্টগুলো শিকড় ছড়িয়ে, ঐ ভয়ানক একা চাঁদটার সাথে!
স্বপ্নের আলোতে যাবো বলে যখন চোখ ভিজে যায় রাতে।

বাংলাদেশের যেকোন যুবক বা যুবতী ছেলেমেয়েকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় এটি কার গান এবং কি নাম গানের, সবার কাছে যেই উত্তরটি পাওয়া যাবে সেটা হচ্ছে “অর্ণবের ভালোবাসা তারপর” গানের লাইন এটা। অর্ণব এতোটাই জনপ্রিয় এই দেশে। অবসর সময়ে রাতে একা ছাঁদে বসে গান শোনার অভ্যাস আমাদের সবারই কমবেশি আছে শহরের মানুষজনদের। আর জোছনা রাত হলে তো কথাই নেই। বেশিরভাগ সময়ই ডিভাইসে অর্ণবের গানের প্লে-লিস্ট সেট করা থাকে আমাদের।

শায়ান চৌধুরী অর্ণব (ফ্যান আর্ট)

পালা, যাত্রা, সূফী, লোকগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত এসবের জন্য তার গলার জুড়ি নেই। আমাদের বর্তমান সময়ের সবারই খুবই প্রিয় এবং খুবই জনপ্রিয় একজন গায়ক এবং সুরকার।

পুরো নাম শায়ান চৌধুরী অর্ণব। ১৯৭৯ সালের ২৭শে জানুয়ারি ঢাকার এক সাংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্ম নেয় অর্ণব। তার বাবা স্বপন চৌধুরী একটা সঙ্গীত দলের সাথে যুক্ত ছিলেন যারা ১৯৭১ সালে এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গান গাইতো। সেটা ১৯৯৫ সালে “মুক্তির গান” তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছিলো। তার চাচা তপন চৌধুরীও একজন মিউজিসিয়ান ছিলেন।

অর্ণবকে প্রথমে কাকরাইলের “উইলস লিটল ফ্লাওয়ার” স্কুলে ভর্তি করানো হয় কিন্তু পরে একটু বড় হলে তার বাবা-মা তাকে ভারতে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে পাঠিয়ে দেয় শিক্ষা-দীক্ষার জন্য। সেখানে ছাত্রদেরকে শিক্ষকরা গাছতলায় বসে শিক্ষাদীক্ষা দিতো। বর্ষাকালে বৃষ্টি হলেই ক্লাস বাদ যেতো সেদিন এবং এই উপলক্ষে অর্ণব তার কিছু বন্ধুদের নিয়ে গান লিখতো এবং সেগুলোতে সুর দিতো। সেই পাঠভবনে স্কুলের পাঠ শেষ করেন তিনি। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন সময়ে সে এস্রাজ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) শেখা শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সঙ্গীতের বিভিন্ন ধরন, বিশেষত ওয়েস্টার্ন মিউজিকের উপর জ্ঞান আহরণ করে এবং স্নাতক চলাকালীন গিটার এবং কিবোর্ড শেখা শুরু করে। শান্তিনিকেতনের বাউল গানের অনেক প্রভাব তার সঙ্গীতে আছে। অর্ণব যখনই বাড়ি আসতো ছুটিতে তখনই দেখতো তার বন্ধুবান্ধব হেভী মেটাল সহ আরো অনেক জনরার গান শুনে ব্যান্ড গঠন করা শুরু করছে, ১৯৯৩ সালে “মাইলস” ব্যান্ডের “প্রত্যাশা” এলব্যামটি যখন রিলিজড হয় তখন সে নিজেও ঠিক করে ব্যান্ড গঠন করার।

অর্ণব ১৯৯৭ সালে তার ভারতীয় কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে “বাংলা” নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেছিলো যেটা কলকাতায় পারফর্ম করতো। যেটিতে পরবর্তীতে “বুনো” এবং “আনুশেহ অনাদিল” এর সঙ্গীতশিল্পীও যোগ দেন এবং একসময় অবশেষে সে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলার উপর স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর উভয়ই শেষ করে দেশে ফেরত আসেন উনি। দেশে আসার পর তার ব্যান্ড “বাংলা” একটি বাংলাদেশি ব্যান্ড হিসেবে পরিচিত পায়। অর্ণবের আরো একটা “প্রেয়ার হল” নামের ব্যান্ডেরও সদস্য।

যদিও তিনি চারুকলার ছাত্র তারপরেও সে মিউজিক নিয়ে তার একটা গড়ে তুলেছেন এই দেশে ফেরত আসার পর। এই প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হচ্ছে,

আমার শিক্ষাগত পটভূমি আমার নান্দনিকবোধ বিকশিত করেছে, যেটা বর্তমানে আমি সঙ্গীত রচনা করছি!

তিনি ২০১০ সালে “আধখানা মিউজিক কোম্পানি” এর অধীনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন, যেখান থেকে তিনি বিভিন্ন ডকুমেন্টরি, মিউজিক ভিডিও, এডভারটাইজমেন্ট সহ বিভিন্ন কিছুর নির্দেশনা দেন। দেশে আসার পর থেকে এই পযন্ত মোট সাতটি একক এলব্যাম রিলিজ করেন তিনি। সেসব হলো,

১। চাইনা ভাবিস(২০০৫)
২। হোক কলরব(২০০৬)
৩। ডুব(২০০৮)
৪। রোদ বলেছে হবে(২০১০)
৫। আধেক ঘুম(২০১২)
৬। খুব ডুব(২০১৫)
৭। অন্ধ শহর(২০১৭)

এরমধ্য শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন তিনি এবং তার বন্ধুরা মিলে যেসব গান লিখেছিলো, সেগুলো নিয়ে তার দ্বিতীয় এলব্যামটি ২০০৬ সালে “হোক কলরব” রিলিজড হইয়েছিলো। ২০১৪ সালে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবীতে ছাত্র আন্দোলন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে “হোক কলরব” শব্দবন্ধটি খুব ব্যবহৃত হয়েছিলো। তার তৃতীয় এলব্যাম “ডুব” এর সবগুলো গানও তার শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন সময়ে রচিত। তার চতুর্থ এলব্যাম “রোদ বলেছে হবে” এর সবগুলো গানই অর্ণবের নিজের লেকাহ এবং সুর করা। তার ৫ম এলব্যাম “আধেক ঘুম” একটি রবীন্দ্রসংগীতধর্মী এলব্যাম যা তার ২০১০ সালে যোগদানকৃত “আধখানা মিউজিক কোম্পানি” এর অধীনে বের করা হয়। ২০১৫ সালে বের হওয়া “খুব ডুব” এলব্যামটি প্রধানত বান্দরবনে উপজাতীয় কিছু স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ছিলো যাদের স্কুল বুনো হাতির দল দ্বারা পদপিষ্ট হয়ে ভেঙ্গে যায়। তাদের স্কুলের পূর্ণবাসনের কাজের জন্য এই এলব্যামটি করা। অর্ণব তার নিজের হাতে এলব্যাম বিক্রি করেছে এলবামগুলো। সেই এলব্যামের কভারটির এলব্যাম আর্টটি ছিলো তার নিজের এবং সেসব স্কুলে পড়া বাচ্চাদের আঁকা! সে এলব্যামে রবী ঠাকুর, ডিজেন্ড্রলাল রায়, কিছু বাংলা ছড়া এবং তার নিজের কিছু কম্পোজিশন ছিলো। সে বাণিজ্যিকভাবে সেটি বাজারে ছাড়েননি, শুধুমাত্র ২৫০০ কপি বাজারজাত করেছিলেন এবং সেই আয়কৃত টাকা দিয়ে তাদের স্কুল পূর্ণবাসনের কাজ করেন।

এছাড়াও তিনি “সাহানা বাজপেয়ী” এর রবীন্দ্রসঙ্গীত এলব্যাম “নতুন করে পাবো বলে” এবং “কৃষ্ণকলি” এর এলব্যাম “সূর্যে বাসা বাঁধি” তেও তিনি সুর দেন!

এখন তিনি তার একটা ন্যামডের সাথে কাজ করছে যার নাম “অর্ণব এন্ড ফ্রেন্ডস” যেখানে পান্থ কানাই এর মতো ভালো ভালো কিছু মিউজিসিয়ানও আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে ব্যান্ডে সবাই অর্ণবের থেকে বয়সে বড় এবং অর্ণব হচ্ছে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ব্যান্ডের।

অর্ণবের নিজের ৭টি একক এলব্যাম ছাড়াও আরো অনেক যায়গায় তিনি গান গেয়েছেন, সুর দিয়েছেন এবং সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। সেসব হলো,

অন্যান্য শিল্পীদের সমন্ধিতঃ

১। নতুন করে পাবো বলে(সাহানা বাজপেয়ী)
২। কিংকর্তব্যবিমূঢ়(আনুশেহ অনাদিল)
৩। বুঝেছো(প্রেয়ার হল)
৪। সূর্যে বাঁধি বাসা(কৃষ্ণকলি ইসলাম)
৫। মাই সিটি(শ্রাবন্তী আলী)
৬। ঝালমুড়ি ১(বিভিন্ন শিল্পী)
৭। ঝালমুড়ি ২(বিভিন্ন শিল্পী))

চলচ্চিত্রে কন্ঠ দানঃ

১। কলকাতা কলিং
২। পদ্ম পাতার জল
৩। সোনার ময়না (মনপুরা)
৪। দূর ইশারায় (আহা)
৫। বোকা চাঁদ (আইসক্রিম)
৬। এ শহর আমার (আয়নাবাজি)

সঙ্গীত পরিচালনাঃ

১। মনপুরা(২০০৯)
২। জাগো(২০১০)

মিক্সড এলব্যামঃ খেয়াল(২০০৮)

অর্ণবের মতে তার গলা কখনোই তার প্রধান অঙ্গুলি সংকেত ছিলো না। সে একজন লিরিক্স লেখক বা ভোকালিস্টের চেয়ে বেশি একজন সুরকার হতে চেয়েছিলেন।  সেই জন্যই তার পিয়ানো, কিবোর্ড, গিটার, তবলা, ড্রামস, হারমোনিয়াম, হারমোনিকা, দোতারা, একতারা, বাঁশি, এস্রাজ, সেক্সোফোন, ভায়োলিন সহ আরো অনেক বাদ্যযন্ত্র শেখা হয়। তিনি বলেন, “শান্তিনিকেতনে রবী ঠাকুরের নান্দনিকতাটিকে অক্ষত রাখার একটি জিদ কাজ করতো, কিন্তু মিউজিক হচ্ছে নিজেকে রুপান্তরের জন্যও, পরিবর্তী সময়ের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানো সম্পর্কিত।”

তিনি আরো বলেন যে, “শান্তিনিকেতনে সেই ১৭ বছর আমাকে শ্রোতা কি শুনতে চায় এবং সস্তিবোধের সীমানা থেকে কতোটুকু আমি সরাতে পারবো তাদের সেটা বুঝার ক্ষমতায় দক্ষ হয়েছি। যখন আমি গিটার হাতে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে তবো দেখা পাই গাই, আমি ভাবছিলাম যে মানুষ কি আমাকে মেনে নিবে কিনা? কিন্তু তরুন প্রজন্ম আমাকে মেনে নিয়েছে যা আমাকে আশা দিয়েছে।”

সেটা সে আরো ভালো করে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে টের পেয়েছে যখন রাজিব আশরাফের লেখা “হোক কলোরব” যেটি তার দ্বিতীয় এলব্যামের টাইটেল ট্র্যাকও ছিলো সেটি কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবীতে ছাত্র আন্দোলন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে “হোক কলরব” শব্দবন্ধটি খুব ব্যাবহিত হয়।

রাজিব আশরাফ একটি ইন্টার্ভিউতে জানান, “হোক কলরবের লিরিক্স এর লাইনগুলো রবী ঠাকুরের “কাবুলীওয়ালা” তে কাবুলীওয়ালা এবং মিনুর কথোপকথন থেকে অনুপ্রেরিত হয়েছে। কাবুলীওয়ালা এবং মিনুর কথোপকথনে যেমন সরলতা ছিলো, গানের লাইনগুলোতেও তেমন সরলতা প্রকাশিত পেয়েছে।”

মিউজিক করার কারন জিজ্ঞেস করা হলে অর্ণবের উত্তরটি ছিলো, “মিউজিক করাটা পুরোটাই আত্বতৃপ্তির জন্য, সমাজ এবং সংস্কৃতির সাথে কিভাবে মধ্যস্থতা করা যায় সেটি শিখা, এটি ভালোবাসা এবং স্মৃতিবেদনার সম্পর্কিত, এটি সেসব অনুভূতি সম্পর্কিত যেসব আপনি আগে কখনো অনুভূত করেননি। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, এটি সেসব বাস্তব এবং আধ্যাত্মিক সফরের জন্য যেটির মধ্য দিয়ে আপনি পরিক্রম করেন।”

মিউজিক শিখাটা তার মায়েরও ইচ্ছে ছিলো বলেছেন উনি এক ইন্টার্ভিউতে, “আমার মায়ের নিজের ইচ্ছে ছিলো রবী ঠাকুরের বিশ্বভারতীতে পড়ার তাই তিনি আমাকে এবং আমার বড় বোনকে পাঠভবনে ভর্তি করিয়েছিলেন।তিনি দুই বছর পর ঢাকায় ফেরত আসলেও আমরা সেখানের থেকে আমাদের শিক্ষাদীক্ষা একেবারে শেষ করে এসেছি।”

তার প্রথম প্রামাণ্যচিত্র “ইন্ট্রোস্পেকসন” ছিলেন তার বাবা স্বপন চৌধুরীর একটা জলরঙের আঁকা ছবির প্রদর্শনীর উপর।

২০০১ সালে সাহানা বাজপেয়ীর সাথে অর্ণবের বিয়ে হইয়েছিলো, যার সাথে তার পরিচয় ঘটে প্রধানত শান্তিনিকেতন থাকাকালীন সময়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ যে বিয়ের ৭ বছর পর ২০০৮ সালে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে তাদের।

অর্ণব ও সাহানা

এসব ছাড়াও ব্যাক্তিগত জীবনে সে বাম পা দিয়ে ফুটবল খেলতে খুব পছন্দ করে। পোষা পশুপাখিও তার খুব প্রিয়। তার গুলশানের বাসস্থানে নিজের একটা পোষা কুকুর আছে “ডুবা” নামক এবং একটি বানর আছে “জুজু” নামে।

তার এ পযন্ত সর্বশেষ এলব্যাম “অন্ধ শহর” রিলিজের পর তাকে তার পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে সে রিপোর্টারদের বলেন যে, সামনে তিনি দেশের বাইরে যাবেন উচ্চ শিক্ষা নেয়ার জন্য। অর্ণব বলেন, “আমি নিজেকে এখন একজন পেইন্টার মনে করি। এ বছর শেষ দিকে পেইন্টের ওপর উচ্চতর পড়াশোনা করার জন্যই ইংল্যান্ডে যাব।”

তথ্যসূত্রঃ

১. Let there be dissent: Bangladeshi musician Shayan Chowdhury Arnob on his new album
২. ১৭টি গান নিয়ে অর্ণবের ‘অন্ধ শহর’
৩. Arnab Biography

 

Most Popular

To Top