টুকিটাকি

স্টকহোম সিন্ড্রোম কি মানসিক রোগ?

মানুষ খুব বিচিত্র একটা প্রাণি, তাকে নির্দিষ্ট একটা ছকে ফেলে যাচাই করাটা বেশ কষ্টসাধ্য। তার উপর মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যাতে মানুষের মন-মানসিকতার ঠাই পাওয়াটা বলতে গেলে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এমনই একটা ব্যাপার নিয়ে হালকা গল্প-গুজব করার ইচ্ছে আছে আজকে।

১৯৭৩ সাল আগস্ট মাসের শেষদিকে সুইডেনের স্টকহোম শহরে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটল। অলসন নামের এক জেল পালানো দাগী আসামী এক ব্যাংকে ঢুকে চার জন নিরীহ মানুষকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলল। ব্যাংকের বাইরে অসংখ্য সশস্ত্র পুলিশ, কিন্তু অ্যাকশন নেয়া যাচ্ছে না, কারণ ভেতরে কয়েকজন মানুষের জীবন বিপন্ন। ছয়দিন এই চারজন জিম্মিকে একটা ভল্টের ভেতর আটকে রাখল অলসন। ছয়দিন পর পুলিশ তাদের উদ্ধার এবং অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

সবকিছু যখন ঠিকঠাক, তখন আজব একটা ব্যাপারটা ঘটে গেল । পত্র-পত্রিকা ও খবরে ওই চারজনের সাক্ষাতকার নেয়া হচ্ছিল, সেই সাক্ষাতকার গুলোতে দেখা গেল তাদের সেই জিম্মিকারীর প্রতি কোন ক্ষোভ তো নেই বরং তার বদলে রয়েছে সহানুভূতি। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে অলসন কে যখন কোর্টে তোলা হয় তখন সেই চারজন তাকে আইনি লড়াইয়ের খরচ দেয়ার জন্য একটা ফান্ডও গঠন করল, তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া তো দূরে থাক!

ঘটনাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জিম্মিকারী আর জিম্মিদের মধ্যে কোন এক অজানা কারণে একটা সহানুভূতিশীল মানসিক সম্পর্ক তৈরী হয়ে গিয়েছিলো। এই মানসিক সম্পর্কটা ঠিক স্বাভাবিক না, একে সাধারনভাবে একটা মানসিক সমস্যা বলে বিবেচনা করা হয়। এমন ঘটনা এর আগে বা পরেও কয়েকবার ঘটেছে। তবে স্টকহোমের ঘটনাটার পর এই মানসিক সমস্যার নাম হয়ে যায় স্টকহোম সিনড্রোম( Stockholm Syndrome)। এর আগে এটা ক্যাপচার বন্ডিং সিনড্রোম বলে পরিচিত ছিল।

স্টকহোম সিনড্রোম ব্যাপারটা মোটামুটি এইরকম, একজন কিডন্যাপার আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে গোপন কোন এক জায়গায় আমাকে বন্দী করে রাখল। স্বাভাবিকভাবেই আমি প্রথমদিকে খুব ভয়ে-আতঙ্কের মধ্যে থাকবো। কিডন্যাপারকে যা মন চায় গালি দেব (অবশ্যই মনে মনে, জলে নেমে কুমিরের সাথে বিবাদ করার সাহস সবার থাকে না!) এবং একটা সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। কিন্তু কয়েকদিন যাওয়ার পর ধীরে ধীরে আমার মনোভাব পাল্টাতে শুরু করল। কেন যেন মনে হতে লাগল, কিডন্যাপার বেচারা মানুষ হিসেবে হয়তো অতটা খারাপ না। হয়তো দায়ে পরে কিডন্যাপিং করতে হয়েছে!, কিন্তু তার মনটা বেশ সুন্দর। একসময় লোকটাকে সমীহ করা শুরু করলাম, তার সান্নিধ্যও ভালো লাগতে শুরু করল। পরে একসময় যখন পুলিশ বা কেউ আমাকে উদ্ধার করল, তখন মনে হল, লোকটাকে কোনভাবেই জেলে যেতে দেয়া উচিৎ না। হাজার হোক লোকটা আমাকে এতদিন খাইয়েছে পরিয়েছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা প্রাণে তো মেরে ফেলেনি!

ঠিক এই ব্যাপারটাকে বলা হয় স্টকহোম সিনড্রোম। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অপহরণকারীদের থেকে সামান্য একটু ভালো ব্যবহার বা সহানুভূতি পেলে সেটা তাদের মনে গেঁথে যায়। এমনকি প্রাণে না মেরে নেহাৎ বাঁচিয়ে রাখাকেও তাদের কাছে অনেক বড় দয়া প্রদর্শন বলে মনে হয়। ফলে তাদের মনে জিম্মিকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রদ্ধা সহানুভূতি জন্ম নেয়।
আচ্ছা, “দ্য বিউটি এন্ড দ্যা বিস্ট” গল্পটা তো আমরা সবাই পড়েছি। ভেবে দেখুন তো, স্টকহোম সিনড্রোমের সাথে কোন মিল খুঁজে পান কিনা গল্পের?

আরেকটা ঘটনা বলি। ২০০২ সালে মস্কোর এক মুভি থিয়েটারে ৮০০ জন লোককে জিম্মি করে একদল সন্ত্রাসী। তাদের তিন দিন জিম্মি করে রাখা হয়, এবং তিন দিন ধরেই খাবার, পানি এবং ঔষধ দেয়া হয়। চারদিনের দিন একটা মিলিটারি অপারেশনের মাধ্যমে জিম্মিদের মুক্ত করা হয়, অপারেশনে সকল সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। এই ঘটনার কিছুদিন পর একে একে মোট ১১ জন জিম্মির সাক্ষাৎকার নেয়া হয়, দেখা যায় ১১ জনের ১০ জনই সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা কয়েকজন সন্ত্রাসীর প্রশংসা করে তাদের মৃত্যুতে দুঃখও প্রকাশ করেন!

তো, আশ্চর্যজনক এই সমস্যার কারণ কি হতে পারে?

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, স্টকহোম সিনড্রোম হচ্ছে ভিকটিমের অবচেতন মনের একরকম “সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি” বা “ডিফেন্স মেকানিজম”। ভিকটিম যখন মনে করে তার বেঁচে থাকা বা না থাকা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ওই অপরাধীর উপর। তার উদ্ধার পাওয়ার কোন আশা নেই তখন অবচেতনভাবে তার অনুভূতিতে এক ধরনের পরিবর্তন আসতে থাকে।অপহরণকারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের পরিবর্তে গড়ে ওঠে ইতিবাচক মনোভাব। তার মন অপরাধীর পক্ষ নেয়াটাকেই নিরাপদ মনে করতে থাকে। শক্তিশালী অপরাধী আর সে একই পক্ষের- এই চিন্তা তার প্রচন্ড মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। বলা বাহুল্য, পুরো ব্যাপারটাই ঘটে তার অবচেতন মনের জগতে।

অবশ্য, পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটু “যদি-কিন্তু” আছে। মনোবিজ্ঞান এই স্টকহোম সিনড্রোমকে আলাদাভাবে কোন মানসিক সমস্যা হিসেবে এখনও পুরোপুরি স্বীকৃতি দেয়নি। “আলাদাভাবে স্বীকৃতি” দেয়ার তাৎপর্যটা দুয়েক কথায় বলে দেই। এর জন্য এই মানসিক সমস্যার স্বতন্ত্র উপসর্গ এবং লক্ষণ নির্দিষ্ট করতে হবে, স্বতন্ত্র একটা চিকিৎসাব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন, স্টকহোম সিনড্রোমের লক্ষণগুলোর সাথে PTSD (Post Traumatic Stress Disorder) এর লক্ষণগুলো খাপে খাপ মিলে যায়, এর ফলে রোগ হিসেবে টেকনিক্যালি এদের আলাদা করা উচিৎ নয়। তাই এর জন্য আলাদা কোনও চিকিৎসা পদ্ধতিরও প্রয়োজন নেই। এই কারণেই সম্ভবত, DSM (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorder) বইটির সর্বশেষ সংস্করণেও মানসিক রোগ হিসেবে স্টকহোম সিনড্রোমের নাম আসেনি। ও আচ্ছা, বলতে ভুলে গেছি এটি হচ্ছে আমেরিকান সাইক্রিয়াটিস্ট এসোসিয়েশন থেকে প্রকাশিত মনোরোগের প্রকারভেদ সম্পর্কিত সবচেয়ে অথেনটিক বই, যা বিশ্বব্যাপী মনঃচিকিৎসকগণ অনুসরণ করেন। এই নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক এখনও চলছে।
এই প্রসঙ্গে ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট G Dwane Fusilier এর একটা উক্তি স্মরণ করি-

Although a recognized phenomenon, during the last 25 years, Stockholm Syndrome has been overemphasized, overanalyzed, overpsychologized, and overpublicized.

বোঝাই যাচ্ছে, স্টকহোম সিনড্রোম নিয়ে মাতামাতির ব্যাপারটা ফিউজিলিয়ার সাহেবের খুব একটা মনঃপূত হয়নি!

যাহোক, স্টকহোম সিনড্রোম স্বতন্ত্র কোন মানসিক রোগ কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে এটা যে খুবই বিদঘুটে আজব একটা ব্যাপার তা নিয়ে কারও সন্দেহ আছে বলে মনে হয় না!

 

Most Popular

To Top