নাগরিক কথা

এ কেমন ‘মানহুঁশ’!

এ কেমন 'মানহুঁশ'!- নিয়ন আলোয়

প্রেক্ষাপট একঃ

পুরান ঢাকা যাচ্ছিলাম। গন্তব্যস্থল ছিল বাংলাবাজার। সিটিং বাসে ভাড়া ৪৫ টাকাই দিলাম। কিন্তু গুলিস্তান যাওয়ার পর কন্ডাকটর বলে উঠল,”আর যাইতাম না মামারা, সবাই নামেন।” পড়েছি বিপাকে। এরা উঠানোর সময় ঠিকই বলে বাংলাবাজার পর্যন্তই যাবে, কিন্তু যেদিন রাস্তা একটু জ্যাম থাকে, তারা গুলিস্তান পর্যন্তই তাদের শেষ ঠিকানা বানিয়ে ফেলে। বলছি ‘সুপ্রভাত’ ছিটিং সার্ভিসের কথা। ওকে, যাবেন না ঠিক আছে। আমার ভাড়া ১০ টাকা দেন। না, সেটাও দিবে না। উনি নাকি আমার থেকে ৪০ টাকাই ভাড়া নিয়েছেন। কথা তো পাঁচ টাকা নিয়ে না। কথা সত্য আর মিথ্যে নিয়ে। উনার থেকে পাঁচ টাকা নিয়ে আমি ধনী হতে পারব না। উনিও আমার পাঁচ টাকা খেয়ে ধনী হতে পারবে না। সমস্যা তো টাকা নিয়ে না, সমস্যা আমাকে যে ‘মিথ্যেবাদী’ বানিয়ে দেওয়া হল!

প্রতিদিন রাস্তায় আমার মত অনেক মানুষ আছেন যারা এইরকম ঘটনার মুখোমুখি হোন। এখন সবাই ভাবতে পারেন মাত্র তো পাঁচ টাকা। এটা নিয়ে এত লেখা কেন? আরে ভাই, আমি না হয় মেনে নিলাম। আমি না হয় বুঝলাম বাস, লেগুনা চালানো ম্যাক্সিমাম মানুষগুলো এমন হয়। এদের সাথে ঝগড়া করে লাভ নেই। কিন্তু সবার বুঝার ক্ষমতা, মন-মানসিকতা তো এক না। এরকম দুপুরে সবাই কাজে যায় বা কাজ থেকে আসে। নানান চিন্তা মাথায় থাকে। সবাই এরকম মিথ্যে মেনে নিতে পারে না। না পারার কারণে হয় মারামারি, গালাগালি/ হৈচৈ।

আর তো বললামই এগুলো ‘সিটিং সার্ভিস’ না, এগুলো হচ্ছে ‘ছিটিং সার্ভিস’।

আমি শুধু যাত্রীদের পক্ষে সাফাই করতে আসিনি। কেনো আমরা প্রতিদিন তাদের সাথে এক, দুই, পাঁচ/দশ টাকার জন্য এরকম হৈচৈ বা মারামারি করি। কেনো? আমরা দুইপক্ষ কি এই দুই/পাঁচ টাকা ছেড়ে দিতে পারি না?
পরে উত্তর দিচ্ছি….

প্রেক্ষাপট দুইঃ

আজ সকালে হাউজবিল্ডিং থেকে লেগুনা দিয়ে খালপাড় আসছিলাম। লেগুনাতে এক সীটে ছয়জন করে বসা অসম্ভব। কিন্তু বসা লাগে কারণ তারা আইনপ্রণেতা, তারাই আইন ভঙ্গকারী। এখন আইন করেছে ছয়জন বসতে হবে। সুতরাং, বসতেই হবে।

দুই সীটের একপাশে আমি সহ আরো পাঁচজন বসলাম। আরেক পাশে কলেজের ছয়জন ছাত্র-ছাত্রী বসল। একটু দূরে আসতেই এক কলেজ ছাত্র লেগুনা থামিয়ে দিল। সে নিচে নেমেই ‘রাইদা’ বাস চালককে বকাঝকা শুরু করল। মারবে মারবে অবস্থা। রাইদা নাকি তাকে কিছুক্ষণ আগে ‘হাউজবিল্ডিং’-য়ে এক্সিডেন্ট করতে চেয়েছিল। কিন্তু ছেলেটা ভুল ছিল। এটা সে রাইদা না,এটা আরেকটা।
আবার উঠল লেগুনায়।

কিছুদূর আসার পর ছেলেটা আবার সে একই কান্ড করল। এবারও ভুল গাড়ি আটকিয়েছে। লেগুনাতে তার সাথে আছে তার সহপাঠী দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে। কিছুক্ষণ তার বকবক শুনার পর বুঝলাম সে নিজেকে কিছু একটা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। হয়তো বা তার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক শক্তিশালী। আবার হতেও পারে তার বাবা/ভাই কোন নেতা বা কোন বড় রাজনৈতিক পদে। এজন্যই তার এরকম দাপুটে চালচলন।

একটা জিনিস তখন ভাবলাম। সে যে দুইবার ‘রাইদা’ বাসটি থামাল। সে দুইবারের ছেলেটা একই গাড়ি থামিয়েছিল। রাইদার ড্রাইভারটা শুধু বলল,’মামা আপনার কই ভুল হইতাছে মনে হয়’। অতি ভদ্র ভাষায় তার এই আচরণ আমাদের অবাক করে। সে যদি আজ অভদ্র হত, তাহলে কিছু একটা হয়ে যেত তা নিশ্চিন্তে বলা যায়।

প্রতিদিন এরকম হাজার হাজার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আজকাল এগুলা খুব স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এসব মেনে নিচ্ছি প্রতিনিয়ত। এখন বলতেই হয় আব্দুল গফুরের সে বিখ্যাত ফেসবুকীয় মন্তব্য, ‘এটা তো সেম্পল, ভেতরে যে কতকিছু হচ্ছে।’

এই দুই ঘটনা শুধু উদাহরণ মাত্র। উপরোক্ত দুই প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করার মানে খুব পরিষ্কার। দুই ঘটনাতে মিল এক জায়গায়।
আমরা ‘মানুষজাতি’ হারিয়ে যাচ্ছি। মান আর হুঁশ মিলে নামকরণ হয়েছে ‘মানুষ’-এর।এখন আমাদের ‘মান’ কমে যাচ্ছে, ‘হুঁশ’ ও আজ উড়ে যাওয়ার পথে।

আমদের ধৈর্য্য ধারণ করার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে দিনেদিনে। কোনকিছুতেই আমরা সন্তুষ্ট না। লোভ গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের মানবিকতাকে। নিজস্বার্থে আমরা ‘যমুনা’ও সেচে ফেলতে প্রস্তুত। কে, কাকে, কিভাবে ধ্বংস করবে! কে, কাকে, কিভাবে অপমান/অপদস্থ /নিচে নামাতে পারবে সে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।আমাদের বুদ্ধি আছে,আমাদের শক্তি আছে, চাপাবাজির ক্ষমতা আছে তো যে তুলনামূলক কম বুদ্ধিমান, দুর্বল তাকে কিভাবে মিথ্যেবাদী, কিভাবে মেরে আরো দুর্বল করে দিতে পারি সে চেষ্টায় থাকি।

আমরা মরে গেছি, আমাদের মনুষ্যত্ব ডাইনোসরদের মত বিলুপ্তির পথে। চাওয়া-পাওয়ার হিসেব মিলেতে গিয়ে যখন দেখি অনেক কম তখন আমরা নৃশংস। আবার যখন এই হিসেবে আমরা লাভবান তখন আরো পেতে মরিয়া।

দুনিয়াটা হয়ে গেছে নিষ্ঠুর। কারো প্রতি কারো শ্রদ্ধাবোধ নেই। দুর্বলরা পড়ে যাচ্ছে। ধনী-গরীব দুইভাগে বিভক্ত। যারা গরীব-দের উঠানোর কথা তারা উল্টো ধনীর সাথে একসাথ হয়ে ধনীদের উপরেই উঠিয়ে নিচ্ছে এবং গরীবদের লাত্থি মেরে আরো নিচে পেলে দিচ্ছে।

বুঝতেছি না,হচ্ছেটা কি!
তাহলে কি মহাপ্রলয় সামনেই?
মানুষের অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে?
তুলার মত সবকিছু লণ্ডভণ্ড হওয়ার পথে?
প্রথম ঘটনার ‘কেনো’-এর উত্তর পেয়েছেন তো?

আমাদের দেওয়ার মত কিছুই নেই, আমিরা দিবটা কি! আমরা ভাবি এই দুই টাকা, পাঁচ টাকা ও আমার থেকে নিচ্ছে। এতে আমি পরাজিত হচ্ছি। আমাকে জিততে হবে। জয়ের নেশাটাই আসল সমস্যা।দুর্ভাগ্য জয়ের এই নেশাকে আমরা ভালো কোন কাজে লাগাতে পারছি না। এটাই আজ আমাদের ব্যর্থতা।

যেখানে মানুষ মণিমুক্তা চিনে না, সেখানে ক্যালিফোর্নিয়াম চিনার মানুষ পাওয়া তো দুষ্করই।

এই লেখার উদ্দেশ্য কি?
হায়রে মানুষ! এখনো উদ্দেশ্য খুঁজে পায় নি।

Most Popular

To Top