টুকিটাকি

দুর্বোধ্য স্ট্রিং থিওরি’র সহজতম পাঠ!

দুর্বোধ্য স্ট্রিং থিওরি'র সহজতম পাঠ!- Neon Aloy

একজন আধবুড়ো পাগলাটে ধরনের ভদ্রলোক তার অফিসরুমে বসে খাতায় আঁকিবুঁকি করছেন। তার টেবিলের উপর মোটা মোটা বই খাতার স্তুপ, পেছনে ব্ল্যাকবোর্ডে বিদঘুটে ধরণের গাণিতিক সমীকরণ। তিনি অত্যন্ত হতাশ, অনেকদিন যাবত তিনি একটা বিষয় সমাধানের চেষ্টা করছেন, বিষয়টা কিছুতেই আয়ত্ত্বে আসছে না। এই “অনেকদিন” শেষতক ত্রিশ বছরে গিয়ে ঠেকে, ভদ্রলোক এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান ভিন্ন এক সমীকরণের পৃথিবীতে- কিন্তু বিষয়টার সমাধান হয় না।

ভদ্রলোকের নাম আপনারা শুনেছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন, থিওরি অফ রিলেটিভিটির জনক। অসম্ভব প্রতিভাবান এই বিজ্ঞানী তার আজীবন প্রচেষ্টায় যে বিষয়টার সমাধান করতে পারেননি তার গালভরা নাম হল United Field Theory বা সমন্বিত ক্ষেত্র তত্ত্ব। সহজে ও সংক্ষেপে ব্যাপারটা হল, পদার্থবিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত এমন কোন স্ট্যান্ডার্ড থিওরি আবিষ্কৃত হয়নি যার দ্বারা মহাবিশ্বের অনাদিকালের সকল ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করা যায়, সকল “কী” এবং “কেন” এবং “কীভাবে”র বর্ণনা দেয়া যায়। সবকিছু ব্যাখ্যা করা যায় এমন একটা “কমন” তত্ত্ব খুঁজে পাওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, ফলাফল খুব একটা আশাপ্রদ নয়, তবে নেই নেই করেও এর মাঝে আনন্দের একটা সংবাদ আছে- “স্ট্রিং থিওরি”।

এই স্ট্রিং থিওরি নিয়েই আজকে আমাদের গল্প। তবে গল্প শুরুর আগে কেন এই থিওরির গোড়াপত্তনের প্রয়োজন হল সে সম্পর্কে আরেকটু আলোচনা করে নেই, তাহলে ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে সুবিধা হবে।

আমরা জানি, বল (Force) চার ধরনের। মহাকর্ষ বল, তড়িৎ চৌম্বকীয় বল, সবল নিউক্লিয়ার বল, দুর্বল নিউক্লিয়ার বল। পৃথিবীর প্রত্যেকটি বল ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। একসময় তারা দেখল তড়িৎ বল থেকে চৌম্বকীয় বল উৎপন্ন করা যাচ্ছে। এরও পরে আবিষ্কৃত হল এই দুইটি বলের সমন্বয়ে তৈরী হচ্ছে তড়িৎ চৌম্বকীয় বল। মানুষ বুঝতে শুরু করল ভিন্ন ভিন্ন বল আসলে একই বলের ভিন্ন ভিন্ন রুপ। কোয়ান্টাম থিওরীর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেখা গেল উপরের সবগুলো বল এই কোয়ান্টাম থিওরী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে, কেবল মহাকর্ষ বল ছাড়া। মহাকর্ষ বল আবার ব্যাখ্যা করা যায় আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি দিয়ে। খুবই অল্প কথায় বোঝানোর চেষ্টা করে দেখি। পুরো মহাবিশ্বের স্পেস বা স্থানকে আমরা একটা পর্দার মত চিন্তা করি। একটা পর্দা বিছিয়ে দিয়ে তার উপর একটা ভারী বল আর একটা হাল্কা বল রাখলে কি হবে? ভারী বলটা যেখানে রাখা হয়েছে সেদিকটা বেশি ঝুলে পড়বে, আর হালকা বলটা ধীরে ধীরে সেই ঝুলে যাওয়া দিকে অর্থাৎ ভারী বলটার দিকে গড়িয়ে পড়তে থাকবে। জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী মহাকর্ষ বলের ব্যাপারটা মোটামুটি এইভাবেই কাজ করে- যাকে বলে Space-Time Bending বা স্থান-কাল বক্রতা।

তাহলে ভালোই হল, সবগুলো বলেরই ব্যাখ্যা পাচ্ছি আমরা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো এত অল্পে সন্তুষ্ট নন! তারা এবার কোয়ান্টাম থিওরি দিয়ে মহাকর্ষ এবং জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি দিয়ে বাকী তিনটা বল ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে লাগলেন এবং ব্যর্থ হলেন।তারা দেখলেন, প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে কখনও কোয়ান্টাম তত্ত্ব খাটে, কখনও আপেক্ষিক তত্ত্ব। প্রথমটা চলে পারমাণবিক কণাদের জন্য, পরেরটা অপেক্ষাকৃত বড় অর্থাৎ আমাদের দৃশ্যমান পদার্থগুলোর জন্য।কিন্তু দুটো একসাথে কখনই খাটে না।বিজ্ঞানীরা অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। দুটোই আলাদাভাবে নির্ভুল এবং গাণিতিকভাবে প্রমাণিত, কিন্তু কিছুতেই একটা দিয়ে আরেকটার কাজ হচ্ছে না। আবার, ব্ল্যাকহোল বা বিগ ব্যাং এর মত ঘটনার ব্যাখ্যার জন্য এই দুটি থিওরির একটা সমন্বয় দরকার, কিন্তু সেটাও সম্ভব। হচ্ছে না। অর্থাৎ দুটো থিওরির একত্রে প্রয়োগ কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না, একটা সঠিক হলে আরেকটা ভুল দেখাচ্ছে।তাছাড়া, জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী মহাবিশ্ব একটি নিরবিচ্ছিন্ন বস্তুর মত, যেখানে কোয়ান্টাম থিওরি বলে বিশ্ব অসংখ্য বিচ্ছিন্ন কণার সমষ্টি (কোয়ান্টাম শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হচ্ছে “বিচ্ছিন্ন পরিমাণ”)। দুটো মহাবিশ্বকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করছে। তাহলে?

বিজ্ঞানীদের অগাধ কৌতুহলের কারণেই জন্ম নিল স্ট্রিং থিওরি। ব্যাপারটা শুরু হল এভাবে- ১৯৭০ সালে কয়েকজন বিজ্ঞানী পর্যবেক্ষণ করলেন, দুইটি পারমাণবিক কণা যদি বিন্দু হিসেবে না থেকে String (তার) হিসেবে থাকে তবে তাদের মধ্যে শক্তির আদান-প্রদান অয়লারের বিটা ফাংশান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় (অয়লারের বিটা ফাংশান কী সেটা আমি সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাচ্ছি!)।এই নিয়ে আরও কিছু কাজ হল, তবে বিজ্ঞানীমহলে একে তেমন একটা পাত্তা দেয়া হল না, কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে গাণিতিক অসামঞ্জস্যতা ছিল। জন শোয়ার্জ নামে একজন গবেষক এর পিছু লেগে রইলেন, তার সাথে একসময় যোগ দিলেন মাইকেল গ্রীন।দুজন মিলে অসামঞ্জস্যতাগুলো দূর করার চেষ্টা করতে থাকলেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তারা ১৯৮৪ সালে একটি থিওরি প্রতিষ্ঠা করলেন যা কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে বিবেচনা করলে গাণিতিকভাবে গ্রহণযোগ্য- সেটাই আমাদের স্ট্রিং থিওরি!

দুজন বিজ্ঞানীর (এবং আগে পরে আরও অনেক বিজ্ঞানীর) প্রায় দশ বছরের কাজ এই অল্প পরিসরে (এবং অল্পজ্ঞানে!) ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করাও বোকামী, তাই গাণিতিক দিকটা উহ্য রাখছি। তবে মূল কথাটুকু মোটামুটিভাবে বলার চেষ্টা করা যায়।

আমাদের পরিচিত পদার্থগুলো কী দিয়ে তৈরী? ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন। ইলেকট্রনকে আর ভাঙ্গা যায় না। প্রোটন এবং নিউট্রনকে ভাঙলে পাওয়া যায় কোয়ার্ক নামে এক বস্তু। এই কোয়ার্ককে বলা হয় মৌলিক কণা, একেও ভাঙলেও আর কিছু পাওয়া যায় না। কোয়ার্ক আবার দুই ধরনের- আপ কোয়ার্ক এবং ডাউন কোয়ার্ক। ভিন্ন ধরনের পদার্থ সৃষ্টি হয় এই মৌলিক কণাগুলোর সংখ্যা, স্পিন নাম্বার, চার্জ ইত্যাদির ভিন্নতার জন্য। তাই তো আমরা জানি?

আমাদের এই চিরায়ত জ্ঞানে ধাক্কা দিতে চাইল স্ট্রিং থিওরি বা “তার তত্ত্ব”। এই তত্ত্ব বলে, আমরা ইলেকট্রন বা কোয়ার্কের মত মৌলিক কণাগুলোকে যেমন বিন্দুর মত মাত্রাহীন একটি অস্তিত্ব ভাবি, সেগুলো আসলে তেমন নয়। একটি কোয়ার্ককে যদি বহু-বহুগুণে বিবর্ধিত করে দেখা যায় (যতটা আসলে এখনকার প্রযুক্তি দিয়ে স্ভব নয়), তাহলে বোঝা যাবে এগুলো আসলে একটা প্যাঁচানো তার বা সূতার তৈরী বস্তু, যার দৈর্ঘ্য মাত্র ১০^-৩৩ সেন্টিমিটার! এবং, আমরা যেমন বলি, “মানুষটা দৌঁড়ের উপর আছে”, ঠিক তেমনি বলা যায় “সূতাটা কাঁপাকাঁপির উপর আছে”! সূতাগুলো সবসময়ই একটা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে কাঁপছে। এখানে কম্পাঙ্কের ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্ট্রিং থিওরি অনুযায়ী কেবল কম্পাঙ্কের ভিন্নতার ফলেই পদার্থ এবং শক্তির ভিন্নতার সৃষ্টি হয়। ইলেক্ট্রন বা কোয়ার্ক যাই বল না কেন, সকলের জন্য একই ধরনের তার বরাদ্দ, কেবল তাদের কম্পাঙ্ক আলাদা। স্ট্রিং থিওরি বোঝাতে গিটারের উদাহরণটা সবচেয়ে জনপ্রিয়- গিটারে যেমন তারের ভিন্ন ভিন্ন কম্পনের ফলে ভিন্ন ভিন্ন নোট বা সুর তৈরী হয়, তেমনি স্ট্রিং এর ভিন্ন ভিন্ন কম্পনের ফলে ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি, ভর, চার্জ, শক্তি ইত্যাদি তৈরী হয়।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে যে সব বল ব্যাখ্যা করা যায়, স্ট্রিং থিওরি দিয়েও তা করা যায়। উপরন্তু, এই থিওরি দিয়ে মহাকর্ষ বলও ব্যাখা করা যায়। জন শোয়ার্জ এবং মাইকেল গ্রীন আবিষ্কার করেন, স্ট্রিং থিওরি থেকে এমন এক কণার ধারণা পাওয়া যায়, যার স্পিন নাম্বার হবে ২ এবং ভর হবে শুন্য, যা মহাকর্ষ বলের বাহক হওয়ার জন্য আদর্শ কণা। ঠিক যাকে আমরা বলি “খাপে খাপ”! এই হাইপোথেটিকাল কণাকে বলা হয় গ্র্যাভিটন।

মোদ্দা কথা, আমি আপনি এই তাবৎ পৃথিবী আর মহাবিশ্ব একই মৌলিক পদার্থের তৈরী, একটুকরো সূতা! কেবল কম্পাঙ্কের ভিন্নতার জন্য কেউ বড় কেউ ছোট, কেউ রাজা কেউ প্রজা।ক্ষুদ্র পারমাণবিক কণা থেকে শুরু করে ব্ল্যাকহোল পর্যন্ত সবকিছুকেই ব্যাখ্যা করা যায় এই থিওরি দিয়ে, তাই একে বলা হয় The Theory of Everything বা সবকিছুর তত্ত্ব।

মৌলিক কণা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ২ প্রকার- বোসন কণা(বস্তুর কণা) ও ফার্মিওন কণা (শক্তির কণা)। এতদিন কেবল স্ট্রিং থিওরির মাধ্যমে কেবল বোসন কণাকেই ব্যাখ্যা করা যেত। তবে কিছুদিন আগে বোসন ও ফার্মিওন কণার মধ্যে দারুণ এক সাদৃশ্য আবিষ্কৃত হয়, যার নাম দেয়া হয় “সুপারসিমেট্রি”, এরপর থেকে ফার্মিওন কণার জন্য স্ট্রিং থিওরির প্রতিপাদন সম্ভব হয়। স্ট্রিং থিওরিকে বলা হতে থাকে “সুপারস্ট্রিং” থিওরী।

স্ট্রিং থিওরি বা সুপারস্ট্রিং থিওরির এক অদ্ভুদ মজার বিষয় আছে। একে ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের পরিচিত চারটি মাত্রার বাইরেও (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, সময়) আরও অতিরিক্ত ৬ টি মাত্রার প্রয়োজন হচ্ছে। এই ৬ টি মাত্রা কী? তা এখনও আমাদের পক্ষে জানা বা বোঝা সম্ভব নয়, সুতরাং সেটার গভীরে যেতে হলে আপনাদের যার উপর নির্ভর করতে হবে তা হচ্ছে কল্পনাশক্তি!

তবে, এর একটা বড় সমস্যা হল, এই থিওরি ব্যাবহারিকভাবে পরীক্ষা করে প্রমাণ করা সম্ভব নয়, অন্তত এখন পর্যন্ত। এমনকি ধারণা করা হয় অদূর ভবিষ্যতেও এটা প্রমাণ করার সুযোগ আসার সম্ভাবনা কম। অনেক বিজ্ঞানীই এই স্ট্রিং থিওরিকে গ্রহণ করতে পারেননি, কারণ বিজ্ঞানচর্চার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে ব্যাবহারিক পরীক্ষা, সেটা যত সাধারণ ও সাদামাটা তত্ত্বই হোক না কেন।ফলত স্ট্রিং থিওরিকে কোন প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব বলা যায় না, বরং সেটা কেবল “একটি সম্ভাবনাপূর্ণ ধারণা”র মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

তাই বলে স্ট্রিং থিওরি নিয়ে গবেষণা থেমে নেই।গবেষকরা এখন চেষ্টা করছেন এর দ্বারা ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জির মত অতি রহস্যময় (নাম শুনেই রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন না?) ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করা যায় কি না। যদি যায়, তবে একে তো স্ট্রিং থিওরির পক্ষের যুক্তিগুলো শক্তিশালী হবে, তার উপর বিজ্ঞানীদের দুর্ভাবনায় ফেলে দেয়া রহস্যগুলোর কিছু একটা কূলকিনারা হবে।(“কিছু একটা” বলছি, কারণ স্ট্রিং থিওরীর বাস্তবিক শক্ত প্রমাণ পাওয়ার আগ পর্যন্ত এই থিওরি দিয়ে যা-ই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, সেটা হবে কেবল আরেকটি নতুন “থিওরি”।ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- আপনি যদি “কম মিষ্টি চিনি” দিয়ে চা বানান, তাহলে সেটা “কম মিষ্টি চা”-ই হবে।প্রমাণের অভাবকে আপনি কম মিষ্টি হিসেবে ধরে নিতে পারেন!)

মানুষ অজ্ঞানতাকে ভালোবাসেনি কখনই, প্রকৃতিতে রহস্যের গন্ধ পেলেই সে ভুরু কুঁচকে তা সমাধান করার জন্য বসে গেছে এবং সত্যি বলতে ঠিক এই আগ্রহ ও উদ্যমের কারণেই মানুষ আজকের “মানুষ”। এই স্ট্রিং থিওরিও আজ হোক, কাল হোক, একশত বা এক হাজার বছর পরেই হোক, মানুষ পুরোপুরি সমাধান করবে এই কথা নিশ্চিন্তে বলা যায়!

Most Popular

To Top