টুকিটাকি

মুহাম্মদ: দ্য ম্যাসেঞ্জার অফ গড – রাসূলের বাল্যকাল নিয়ে বিতর্কিত ইরানি চলচ্চিত্র

মুহাম্মদ: দ্য ম্যাসেঞ্জার অফ গড - রাসূলের বাল্যকাল নিয়ে বিতর্কিত ইরানি চলচ্চিত্র

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জীবনীর উপর ভিত্তি করে প্রথমআন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে।‘দ্য ম্যাসেজ’ নামে ঐ চলচ্চিত্রটির নির্মাণের পেছনের কাহিনী নিয়ে আমার একটি লেখা আছেএই লিংকে। ক্লাসিক হিসেবে মর্যাদা প্রাপ্ত ঐ চলচ্চিত্রটি নির্মাণের প্রায় চার দশক পর বিশ্ববাসী আবারও একটি চলচ্চিত্র উপহার পেল রাসূলের (সা) জীবনী নিয়ে। ২০১৫ সালে নির্মিত এবারের চলচ্চিত্রটির নাম ‘মুহাম্মাদ: দ্য ম্যাসেঞ্জার অফ গড’। বিষয়বস্তু একই হলেও এবারের চলচ্চিত্রটি প্রায় সবদিক থেকেই ভিন্ন এবং একই সাথে কিছুটা বিতর্কিত।

নির্মাণের পেছনের কথা
‘মুহাম্মদ: দ্য ম্যাসেঞ্জার অফ’ গড চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন প্রখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্রকার মজিদ মাজিদি, যিনি চিলড্রেন অফ হ্যাভেন, কালার অফ প্যারাডাইস, বারান প্রভৃতি চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে আন্তার্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার চিলড্রেন অফ হ্যাভেন চলচ্চিত্রটি সর্বপ্রথম ইরানি এবং ইসলামি বিশ্বের চলচ্চিত্র, যেটি শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল।


মজিদ মাজিদী মহানবী হয়রত মুহাম্মদ (সা) কে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন ২০০৬ সালে। সে সময় তার ‘দ্য উইলো ট্রি’ চলচ্চিত্রটি ডেনমার্কের একটি চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানোর কথা ছিল। কিন্তু ডেনমার্কের একটি পত্রিকার রাসূল (সা) এর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হওয়ার প্রতিবাদে তিনি তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বাতিল করেন। প্রদর্শনীর আয়োজকদেরকে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, যে দেশে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের অপমানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, সে দেশের কোন উৎসবে যোগ দেওয়ার তার পক্ষে সম্ভব না।


সে সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, ইসলাম এবং এর রাসূল সম্পর্কে মিডিয়াতে যে ভ্রান্ত ধারনা প্রচলিত আছে, তা দূর করার জন্য শুধু প্রতিবাদের উপর ভরসা না রেখে তিনি নিজেই একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। ২০০৭ সালে কাহিনী লেখা শুরুর মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পূর্ব প্রস্তুতি শুরু হয়। এবং দীর্ঘ ৭ বছর পর ২০১৪ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়।
ইরান সরকারের আংশিক অর্থায়নে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি মূলত তিনটি পরিকল্পিত চলচ্চিত্রত্রয়ীর প্রথমটি। এটিতে শুধুমাত্র রাসূলের জীবনের বাল্যকাল, অর্থাৎ ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তুলে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুায়ী দ্বিতীয়টিতে নবুওয়্যাত প্রাপ্তি অথবা হিজরত পর্যন্ত এবং তৃতীয়টিতে ইন্তেকাল পর্যন্ত তুলে ধরা হবে।

কাহিনী সংক্ষেপ
চলচ্চিত্রটি শুরু হয় নবুওয়্যতের পর রাসূল এবং সাহাবীদের মক্কার অবরোধ জীবনের একটি দৃশ্য দেখানোর মধ্য দিয়ে। কিন্তু এরপরই ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে কাহিনী চলে যায় রাসূল (সা) এর জন্মের পূর্বে সংঘটিত আবরাহার হস্তীবাহিনীর মক্কা আক্রমণের ঘটনায়। পুরো সিনেমাটি মূলত রাসূলের চাচা আবু তালেবের স্মৃতিচারণ এবং তার বর্ণনার মাধ্যমে দেখানো হয়। সিনেমায় মূলত রাসূলের শিশুকাল তুলে ধরা হয়।


আবরাহার আক্রমণ এবং পরাজয় ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে উঠে আসে রাসূলের জন্ম, মা হালিমার কাছে রাসূলের দায়িত্ব অর্পণ, মক্কায় প্রত্যাবর্তন, মদিনায় ভ্রমণ, মা আমিনার ইন্তেকাল, দাদা আব্দুল মোত্তালেবের ইন্তেকাল প্রভৃতি। সিনেমা শেষ হয় চাচা আবু তালেবের সাথে বালক মুহাম্মদ (স) এর সিরিয়া ভ্রমণের ঘটনা দেখানোর মধ্য দিয়ে।

কাহিনী এবং চিত্রায়ন নিয়ে বিতর্ক
নির্মাণকালীন সময় থেকেই চলচ্চিত্রটি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কারণ ‘দ্য ম্যাসেজ’ সহ অন্যান্য ইসলামি চলচ্চিত্র এবং ধারাবাহিকে যেরকম রাসূলের নিকটাত্মীয়দেরকে না দেখানোর প্রথা প্রচলিত আছে, সেটি ভঙ্গ করে এই চলচ্চিত্রে রাসূলের মা আমিনা, দুধ-মা হালিমা, চাচা আবু তালেব সহ ঘনিষ্ঠ প্রায় সবাইকেই দেখানো হয়েছে। এমনকি, বালক রাসূলেরও শুধুমাত্র চেহারা ছাড়া পুরো অবয়ব দেখানো হয়েছে।


বেশিরভাগ সময়ই তাকে পেছন দিক থেকে হাঁটতে এবং দৌড়াতে দেখানো হয়, যেখানে তার লম্বা চুল, হাত এবং পা দৃশ্যমান থাকে। সিনেমাতে রাসূলের বিভিন্ন বয়সের চরিত্রে তিনজন অভিনেতাকে দিয়ে অভিনয় করানো হয়েছে এবং তাদের কন্ঠস্বরও সিনেমাতে ব্যবহার করা হয়েছে। অবশ্য নবুওয়্যাত প্রাপ্তির পরের যে দুটো দৃশ্য সিনেমাতে আছে, সেখানে রাসূলের কন্ঠস্বর ব্যবহার না করে, দ্য ম্যাসেজ সিনেমার মতো তার বক্তব্য আবু তালেবের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
সিনেমাটির কাহিনী নবীজির বাল্যকালেই শেষ হয়ে যাওয়ায় এতে শিয়া-সুন্নীদের মধ্যে যেসব ব্যাপারে অধিকাংশ মতবিরোধ রয়েছে, সেগুলো উঠে আসেনি। তারপরেও সিনেমাটিতে প্রদর্শিত কাহিনী বিভিন্ন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাসূলের বাল্যকালের জীবনী সম্পর্কে বিভিন্ন ইতিহাসবিদের যত রকম বর্ণনা পাওয়া যায়, কাহিনীকার সেগুলোর মধ্য থেকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বর্ণনাগুলো না গ্রহণ না করে সম্ভবত যেগুলো সবচেয়ে অলৌকিক এবং নাটকীয়তাপূর্ণ, ভিত্তি দুর্বল হলেও সেগুলোই ব্যবহার করেছেন।


উদাহরণস্বরুপ, সিনেমাতে দেখানো হয়, হালিমার উট দড়ি ছিঁড়ে মক্কার হাট-বাজারের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আমিনার ঘরের সামনে গিয়ে হাজির হয়। উটটিকে ধরার জন্য পিছু পিছু হালিমাও সেখানে উপস্থিত হলে তাদের পরিচয় হয় এবং মা হালিমা শিশু নবীজিকে দেখতে পেয়ে তাকে আদর করে কোলে নিতে গেলে নবীজি দুধ পান করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ইবনে হিশাম, রাহিকুল মাখতুম সহ সর্বজনগ্রাহ্য রাসূলের জীবনী গ্রন্থগুলোতে এ ধরনের কোন অলৌকিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় না।
আবার, জীবনীগ্রন্থগুলোতে এ ধরনের বর্ণনা এসেছে যে, নবীজির জন্মের পরপরই ইহুদিরা বুঝতে পেরেছিল যে, প্রতিশ্রুত শেষ নবী জন্মগ্রহণ করেছেন। এবং তারা এটিও বুঝতে পেরেছিল যে, এই নবী কোনো ইহুদি ধর্মাবলম্বীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেননি। তাই তারা তখন থেকেই শেষ নবীর সন্ধান করছিল।
এমনকি, তাদের মধ্যে এরকম আলোচনাও হয়েছিল যে, এই নবীর সন্ধান পেলে তাকে হত্যা করা উচিত। কিন্তু বাস্তবেই ইহুদিরা বালক মুহাম্মদকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল কি না, এরকম বর্ণনা প্রসিদ্ধ কোন সীরাত গ্রন্থে নেই। অথচ সিনেমাতে দেখানো হয়েছে, স্যামুয়েল নামে এক ইহুদির নেতৃত্বে ইহুদিদের একটি দল মদীনা থেকে ফেরার পথে রাসুলকে হত্যা করার জন্য তাদের কাফেলার উপর আক্রমণ করে, কিন্তু রাসূলের চাচা হামজা সহ অন্যান্যরা যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাজিত করেন।
সিনেমাটির কাহিনী এরকম বিতর্কিত হওয়ায় এটি অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রেই প্রদর্শনের অনুমতি পায়নি। মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি, সৌদি আরবের মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ কর্তৃপক্ষ সিনেমাটির কঠোর সমালোচনা করেছে এবং সিনেমাটিকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইরান ছাড়া কেবলতুরস্কএবং আরো দুই-একটি রাষ্ট্র সিনেমাটি প্রচার করেছে, যদিও তুরস্ক বালক মুহাম্মদ (সা) এর কন্ঠস্বরগুলো কেটে দিয়ে তার পরিবর্তে সাবটাইটেলের মাধ্যমে বক্তব্যগুলো প্রকাশ করেছে।

চলচ্চিত্র হিসেবে প্রশংসা ও সমালোচনা
সিনেমাটির সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক এর মিউজিক। অস্কারজয়ী ভারতীয় সঙ্গীত পরিচালক এ. আর. রহমানের তৈরি করাআরবীয় মিউজিক বিভিন্ন দৃশ্যের সাথে চমৎকারভাবে মানিয়ে গেছে। কিছু কিছু দৃশ্যের সাথে ব্যবহৃত মিউজক দর্শককে মুগ্ধ করতে বাধ্য। এছাড়াও আমিনা, হালিমা, আব্দুল মোত্তালেব চরিত্রগুলোর অভিনয়ও বেশ ভালো হয়েছে।
মজিদ মাজিদী এর আগেও আবেগঘন মুহূর্তগুলো ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে তার অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এই সিনেমাতেও শিশু মুহাম্মদ যখন দুই দিন তৃষ্ণার্ত থাকার পর অবশেষে মা হালিমার স্তন পান করতে রাজি হয়, সে দৃশ্যটি এবং মা আমিনার কাছ থেকে শিশু রাসূলকে নিয়ে হালিমার চলে যাওয়ার দৃশ্যটি পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মানবিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।


এই মুভির সিনেমাটোগ্রাফিও বেশ প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে বালক মুহাম্মদের ‘পয়েন্ট অফ ভিউ’থেকে ‘লো অ্যাঙ্গেলে’দেখানো দৃশ্যগুলো, তাকে অনুসরণ করে তার সাথে সাথে ছুটে চলা ক্যামেরা থেকে ধারণ করা দৃশ্যগুলোও এই সিনেমার প্রশংসনীয় দিকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
তবে প্রশংসার পাশাপাশি সিনেমাটি কারিগরি দিক থেকেও প্রচুর ঋণাত্মক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। সিনেমার সচেয়ে দুর্বল দিকগুলোর একটি হল এর ভিজুয়াল ইফেক্ট। ভ্যারাইটি পত্রিকার মতে, এই কৃত্রিম স্পেশাল ইফেক্টগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের, এবং এগুলো দেখতে ‘সেকেন্ড-রেট’ওয়েস্টার্ন সিনেমার নকল বলে মনে হয়।
কাহিনীর গতিশীলতা নিয়েও সমালোচকরা খুশি হতে পারেননি। হলিউড রিপোর্টার পত্রিকার মতে, আন্তর্জাতিক দর্শকরা, যাদের ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা নেই, তার তিন ঘন্টার এই সিনেমাটি দেখতে গিয়ে বড় একটা সময় নষ্ট করবে এর চরিত্রগুলোর কোনটি কে, কার সাথে কার কী সম্পর্ক, এগুলো বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে। সিনেমার বাজে এডিটিংয়ের মাধ্যমে খাপছাড়া দৃশ্যগুলোও এক্ষেত্রে দর্শকের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

সিনেমাটির অর্জন এবং ভবিষ্যত
‘মুহাম্মদ: দ্য ম্যাসেঞ্জার অফ গড’ নির্মাণে ইরানের খরচ হয়েছে ৪০ মিলিয়ন ডলার, যা ইরানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সিনেমাটি ইরানে বেশ রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা করতে পারলেও আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি দিতে না পারায় মোটের উপর এটি লগ্নিকৃত টাকা তুলে আনতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। চলচ্চিত্রটিকে ইরানের পক্ষ থেকে অস্কারের জন্য পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু এটি সেখানেও মনোনয়ন অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অন্যান্য চলচ্চিত্র উৎসবেও সিনেমাটি উল্লেখযোগ্য কোন পুরস্কার অর্জন করতে পারেনি।
১৯৭৬ সালে মুস্তফা আক্কাদ নির্মিত দ্য ম্যাসেজ সিনেমাটি মুক্তির পর সৌদি আরব সহ অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রের বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও কালক্রমে সেসব নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় এবং পরবর্তীতে সেটি মুসলিম বিশ্বে ক্লাসিকের মর্যাদা পায়। কিন্তু ইরান নির্মিত ‘মুহাম্মদ: দ্য ম্যাসেঞ্জার অফ গড’ সিনেমাটির কাহিনী এবং চিত্রায়ন পদ্ধতি অনেক বেশি বিতর্কিত হওয়ায় এর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা এতো সহজে নাও উঠতে পারে।
তবে ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তির এই যুগে কোনো সৃষ্টিকর্ম নিষিদ্ধ করে রাখা আসলে কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। শুধু সমালোচনা এবং নিষিদ্ধ করা তাই হয়তো কোনো সমাধান না। সুন্নী রাষ্ট্রগুলোর উচিত নিজেরাই হযরত মুহাম্মদ (সা) এর এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্র এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসা, যেন কোন ভ্রান্ত ধারনা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে না পারে।

Most Popular

To Top