নাগরিক কথা

আমাদের ইন্ডিয়ানা জোনস!

আমাদের ইন্ডিয়ানা জোনস!

বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হয়েছে যার জন্যে, সেই মানুষটি আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
ইনি মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান। নরসিংদী জেলার বেলাব থানার অন্তর্গত একটি গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। গত ৮৪ বছর ধরে তার স্কুলশিক্ষক পিতা এবং তিনি মিলে বাংলাদেশের প্রাচীনতম প্রত্নস্থান ‘উয়ারী-বটেশ্বর’ নিয়ে অনুসন্ধান করে যাচ্ছেন। প্রত্নতত্ত্বে তাদের কোনরকম প্রাতিষ্ঠানিক হাতেখড়ি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচু ডিগ্রিওলা স্কলাররা অর্ধ শতাব্দী তাদের উপেক্ষা করে গেছেন নিজস্ব আভিজাত্যের সাথে। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় প্রত্নতাত্ত্বিক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে এক চমৎকার যুগলবন্দী গবেষণার মাধ্যমে প্রায় ২৫০০ বছরের পুরনো এই সভ্যতার অমূল্য সব নিদর্শন আবিষ্কার করেন তিনি।

পাথরখণ্ড হাতে হাবিবুল্লা পাঠান এবং পাশে হানিফ পাঠান

আজ থেকে ঠিক ৮৪ বছর আগে, ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বর মাসে উয়ারী গ্রামে মাটি খননকালে শ্রমিকেরা একটি মাটির পাত্রে সঞ্চিত কিছু রৌপ্যমুদ্রা পান। স্থানীয় শিক্ষক হানিফ পাঠান এই মুদ্রাগুলোর মাঝে কিছু সংগ্রহ করতে সমর্থ হন অনেক প্রচেষ্টার পর। মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় লিখে পাঠান তার আবিষ্কারের কথা। সেই থেকে শুরু এই গল্পের। হানিফ পাঠানের ধ্যানজ্ঞান জুড়ে ঘুরতে থাকে প্রাচীন এক সভ্যতার মোহজাগানিয়া গল্প । হারিয়ে যাওয়া এক প্রত্নশহরের গল্প। পরবর্তীতে, ক্লাস এইট পড়ুয়া হাবিবুল্লা পাঠান বাবার পরম সহচর হয়ে একের পর এক প্রত্ন নিদর্শন উদ্ধার করতে থাকেন। আড়াই হাজার বছরের পুরনো লৌহ কুঠার আবিষ্কার করে ফেলেন যেদিন, পিতাপুত্রের মুখে ফুটে ওঠে পরিতৃপ্তির অনাবিল হাসি, যার মূল্য এই প্রত্ননিদর্শনের চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না। ১৯৫৫ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সেই আবিষ্কারের সংবাদ ছাপা হয়। এই যে শুরু হলো এক নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক সফরের, সেই সফরের খেয়াল রাখলেন না কোন প্রতিষ্ঠিত প্রত্নতাত্ত্বিক। বরঞ্চ শহরের নাকওঁচা স্কলাররা হেসে উড়িয়ে দিলেন এই সব আবিষ্কার কে। গ্রামের দুই স্কুলমাস্টার এর দাবিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তাদের আভিজাত্যে আঘাত লেগে যায় যদি?

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে এই উয়ারী বটেশ্বরের এই প্রাচীন কীর্তি নিয়ে জনমানসে আগ্রহ বাড়তে থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক উৎখনন ও শুরু হয় । দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন প্রত্নতাত্বিক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে এই উৎখননে উঠে আসতে থাকে একের পর এক বিস্ময়কর সব প্রত্ননিদর্শন। উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্ন-বস্তু খননে প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন দুর্গ-নগর, বন্দর, রাস্তা, পার্শ্ব-রাস্তা, পোড়ামাটির ফলক, স্বল্প-মূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি, মুদ্রা-ভাণ্ডারসহ উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। খ্রিস্টের জন্মেরও পাঁচশত বছর আগে এইখানে ছিল এক সমৃদ্ধ দুর্গনগর, যার সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল ভূমধ্যসাগরীয় ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের। নানা তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে গবেশকগণ ধারণা করছেন, এই উয়ারী-বটেশ্বর গ্রামে পাওয়া দুর্গনগরটিই বোধহয় একসময়ে ছিল টলেমি বর্ণিত ‘সৌনাগড়া’ । মৌর্য সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত এই শহর থেকেই রপ্তানি হতো মসলিন। হেরোডোটাস বলেছিলেন, ভারতবর্ষের মসলিন দিয়েই মিশরের মমিগুলোকে মোড়ানো হতো । নানা প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে আন্দাজ করা যেতে পারে, হয়তো এই ‘সোনাগৌড়া’ থেকেই একসময় রপ্তানি হতো মসলিন।

গড়ুর

পিতার হাত থেকে মশাল নিয়েছিলেন পুত্র। সারা জীবন চোখে আবিষ্কারের আগুন নিয়ে হাবিবুল্লা পাঠান ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামে, প্রত্নবস্তুর সন্ধানে।

কারো সমালোচনা, কারো ভ্রুকুটিকে আমলে না নিয়ে, নিজের সর্বস্ব উজাড় করে ঢেলেছেন এই অভিযানে। স্বীকৃতি ও এসেছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ দিলীপকুমার চক্রবর্তীর রচিত ‘অক্সফোর্ড কমপ্যানিয়ন টু ইন্ডিয়ান আর্কিওলজি’ শীর্ষক রেফারেন্স গ্রন্থটিতে উয়ারী-বটেশ্বরের প্রাচীন দুর্গনগরের কথা আলোচিত হয়েছে। যেই স্কলাররা একসময় পাঠান পরিবারের এই আবিষ্কারকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন, তারা বাধ্য হয়েছেন নতুন করে বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে। ডঃ সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের মতো কীর্তিমান প্রত্নতাত্ত্বিকের হাত ধরে উয়ারী-বটেশ্বর এর প্রত্ননিদর্শনগুলো সারা পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে। তাদের আবিষ্কারগুলো নিয়ে হাবিবুল্লা পাঠান ও ডঃ সুফি মোস্তাফিজুর রচনা করেছেন ‘উয়ারী বটেশ্বর- শেকড়ের সন্ধানে’ নামের একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ, যেটি বাংলা ভাষায় প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়াদির উপর লেখা সবচেয়ে চমৎকার গ্রন্থগুলোর একটি। ডঃ সুফির একটি লেকচার শোনার সৌভাগ্য হয় জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠে, এরপর এই বইটি সংগ্রহ করি অনেক কষ্টে।

হাবিবুল্লা পাঠানের সাথে আমাদের দীর্ঘসময় আলাপ হয়। আমার ক্ষুদ্র জীবনে অসংখ্য জ্ঞানী মানুষের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, কিন্তু পাণ্ডিত্যের এমন ক্ষুরধার ফলা আমি আর কোথাও কারো বাক্যে টের পাইনি। উনি রীতিমতো একজন দার্শনিক, এত চমৎকার বাংলায় এত চমৎকার সব শব্দচয়ন করে নিজস্ব দর্শন বলে যান অবলীলায়! ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি সবকিছু নিয়ে তার রয়েছে আপন দর্শন, স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গী । তার কি বড় কোন ডিগ্রি আছে? নাই। হাজারো পিএইচডি করা অধ্যাপকের হাজারটা বক্তৃতায় আমি যতোকিছু শিখেছি, বেলাব থানার এই নিভৃতচারী স্কুলশিক্ষকের পাণ্ডিত্যের সাথে তুলনা করলে সেইসব রীতিমতো নিষ্প্রভ মনে হতে থাকে, অন্তঃসারহীন কোলাহল মনে হতে থাকে।

‘চাহিদা কে চাবুক মারতে হবে এই যন্ত্রসভ্যতার যুগে’ উচ্চারণ করেন হাবিবুল্লা পাঠান। আড়াই হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার কসম, এত চমৎকার বাক্য আমি দীর্ঘদিন শুনিনি।

শেষ করি তার চোখে মিলিয়ে যাওয়া হতাশার কথা বলে। ৮৪ বছর ধরে তিলে তিলে তার ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন ছিল, এই গ্রামে হবে এক বিশাল জাদুঘর, যেখানে এই প্রাচীন সভ্যতার আদ্যোপান্ত সংরক্ষিত থাকবে। গ্রামবাসীর ক্ষুদ্র স্বার্থে আঘাত লাগায় সেই জাদুঘরের কাজ আটকে আছে গত ৫ বছর ধরে, চলছে মামলা। শেষ বিকেলের নরম রোদে হাবিবুল্লা পাঠানের চোখের দ্যুতি ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে, ‘আমি সারাটা জীবন কামারের দোকানে বসে গেয়ে গেলাম উচ্চাঙ্গসঙ্গীত, ওরা কেউ বুঝলো না’ , আক্ষেপ খসে পড়ে তার বাক্যের নির্লিপ্ত উচ্চারণে।

লিখেছেনঃ শাঈখ আল মাহমুদ বনি

তথ্যসূত্রঃ
১) সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান,“উয়ারী-বটেশ্বর, শেকড়ের সন্ধানে”
২) আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, “বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ”
৩) Dilip K. Chakrabarti, “The Oxford Companion to Indian Archaeology: The Archaeological Foundations of Ancient India”
৪) ইমন জুবায়ের, “উয়ারী-বটেশ্বর কি প্রাচীন বাংলার গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্যের কেন্দ্র ছিল?”,
৫) উয়ারী-বটেশ্বর

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ
সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান,“উয়ারী-বটেশ্বর, শেকড়ের সন্ধানে”,

Most Popular

To Top