নাগরিক কথা

আমাদের অহংকারী অজ্ঞতাসমগ্র…

আমাদের অহংকারী অজ্ঞতাসমগ্র...

সায়েন্টিফিক রেভলিউশনের প্রধান আবিস্কার কি ছিলো? স্টিম ইঞ্জিন? না বোধহয়। প্রধান আবিস্কার ছিলো “অজ্ঞতা”। আমাদের জানাগুলো ভুল হতে পারে, আমাদের স্ক্রিপচারে যা লেখা আছে অথবা পোপের কথাই সর্বশেষ সত্য নয়। আমরা জানলাম যে আমরা জানিনা। এই কনফেশন, এই ব্যাপারটা আবিস্কার করা ছিলো প্রথম সায়েন্টিফিক রেভলিউশনের প্রধানতম আবিস্কার। ইউরোপিয়ানদের আঁকা ম্যাপের সাথে অ-ইউরোপীয় ম্যাপগুলোর প্রধান পার্থক্য ছিলো যে, ইউরোপীয়ানরা অনাবিষ্কৃত জায়গাগুলো ফাঁকা রাখতো, বাকিরা রাখতোনা। ইউরোপীয়দের ওয়ার্ল্ডভিউ বা বিশ্ববীক্ষা সম্পূর্ন ছিলো, তারা তৃপ্ত ছিলো তাদের জগৎ নিয়ে। ভারতীয়, চীনা কিংবা অটোম্যান সবার ক্ষেত্রেই এই কথা সত্য। ইউরোপিয়ানরা জানতো, তারা জানেনা। বাকিরা জানতোনা যে তারা জানেনা।

দ্বিতীয় সায়েন্টিফিক রেভলিউশন কিংবা যেটাকে আমরা ডিজিটাল রেভলিউশন বলি, তার প্রধানতম আবিস্কার হল আমরা ভাবি যে আমরা জানি। আমাদের কনফিডেন্স পুনরাবিষ্কার হলো এই রেভলিউশনের প্রধানতম আবিস্কার। মানবজাতি কখনোই এত কনফিডেন্ট ছিলোনা। আপনি কি কনফিডেন্ট যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই দাজ্জাল। নিশ্চিত থাকেন, আপনি অনেককেই পাবেন যারা এইটা ভাবে, রেফারেন্সসহ লেখাও পাবেন। আপনি কি বিশ্বাস করেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন ত্রানকর্তা? নিশ্চিত থাকেন যে অনেকেই এমন ভাবেন। আমাদের স্ব স্ব কনভিকশনকে রিইনফোর্স করার মত ইনফর্মেশন এই ডিজিটাল দুনিয়ায় সুলভ। ফেইসবুক যে ফিল্টার্ড বাবলের মাঝে আপনাকে রাখবে, তাতে আপনি স্বপ্রনোদিত না হলে আপনার কথা প্রতিধ্বনিত হয়ে আপনার কাছে ফিরে আসবে। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবেন ব্রেক্সিট হয়ে গেছে কিংবা ট্রাম্প জয়ী হয়েছে ইলেকশনে। যারা ব্রেক্সিট কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছিল তারা এতদিন কোথায় ছিল? তারা ঠিক আপনার বাবল এর বাইরে ছিল। ডিগ্রি অফ ফ্যামিলিয়ারিটি বা আপনি কতজনকে চিনবেন এইটা ফেইসবুক এল্গরিদম ডিসাইড করে। করে, কারন ফেইসবুক প্রতিষ্ঠার রেইজন দ্যা’তর ছিলো সোশালাইযিং। পলিটিক্যাল মুভমেন্টকে ফ্যাসিলিটেইট করার জন্য ফেইসবুক আসেনাই। সোশ্যাল মিডিয়া কথাটা একটা মিসনমার। এইটা ঠিক প্রথাগত মিডিয়ার মত না। এইটা ঠিক প্রথাগত আড্ডাবাজির জায়গাও না। এইটা তাহলে কি?

আমরা যখন আড্ডা দেই, আমরা কি মাইক ও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেই?

আমরা যখন টিভিতে নিউজ দেখি, আমরা কি এঙ্করকে সাথে সাথেই জিজ্ঞেস করি এইটা কেন বললেন কিংবা আপনার সাথে আমি একমত নই।

বাঙালীর নায়ক কারা? টেনিদা, ঘনাদা, ফেলুদা। এরা আড্ডাবাজ এবং একধরনের বড়ভাইসুলভ অথরিটি নিয়ে গল্প বলেন। আড্ডাবাজ এন্টি হিরো বাকের ভাই আমাদের সকলের প্রিয়। মফস্বল কিংবা প্রায় আরবান কালচারের আড্ডার সাথে ফেইসবুকের পার্থক্য হইলো এইখানে বড়ভাই নাই। একটা প্যানাথিয়ন অফ সেলেব্রিটি আছে, অনুগত গ্যাং আছে; কিন্তু ট্র্যাডিশনাল আড্ডার যে হায়ারার্কি, এইটা এইখানে নাই। আপনি একজন স্বনামধন্য লেখকের ওয়ালে গিয়ে বলে আসতে পারবেন, “এই লেখাটা ** হইছে।” এবং এই সেলিব্রেশন অফ পার্ভারশনকে ফ্রিডমও ভাবতে পারবেন। আমাদের আড্ডার জায়গাগুলো সঙ্কুচিত হয়ে ফেইসবুকে চলে এসেছে। এমনকি, অফলাইনের আড্ডাতেও অবধারিতভাবে অনলাইন চলে আসে। কে কি লিখলো, কেন লিখলো কিংবা কে শুধুই ফেইমস্লাট এইসব নিয়ে আলাপ। এইগুলোই কনভার্সেশন স্টার্টার।

অনলাইন সবকিছুকে গ্রাস করবে। এইটা টেকনোফিলিক মানব সভ্যতার স্বাভাবিক কনসিকোয়েন্স। মিডিয়াকে সে গিলেছে সবার আগে, কালচার, পলিটিক্স সবকিছুকেই পরিবর্তন করে দিয়েছে। পোস্ট ট্রুথ যুগে সত্য গুরুত্বপূর্ণ না, ক্লিকেবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ কি ক্লিক করবে নাকি এইটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি পলিটিশিয়ান হন, প্রতিটা মুহুর্তেই আপনি প্রশ্নের সম্মুখীন। কোন লংটার্ম ভিশন বপন করার মত সময় আপনার কাছে নাই। যখন সবাই মতামত দিচ্ছে সবসময়, তখন প্রথাগত বুরোক্র্যাটিক চালে একটা সমস্যার সমাধানের আগেই আরেকটা চলে আসবে। এইকারনে আইডিয়া থেকে প্রেজেন্টেশন গুরুত্বপূর্ণ, ভান গুরুত্বপূর্ণ।

বোরহেসের একটা গল্পের একজন ক্যারেক্টার আছে, যে কোনকিছুই ভুলতে পারেনা। সে কিন্তু মেমোরিবার্ডেন্ড না, ইনফরমেশন ওভারলোডের শিকার। ট্রিভিয়াল ইনফরমেশন মাথায় না রাখলে সেই ব্রেইন স্পেসে আপনি আরো ক্রিটিক্যাল কিছু রাখতে পারবেন। কিম কারদাশিয়ানের নিতম্ব আর টেইলর সুইফটের টোনড লেগ যতটুকু মনযোগ নেয়, চমস্কি ততটুকু মনযোগ নেয়। আইরনি হলো, সবগুলোই একই ক্যাটাগরিতে পড়ে। ইনফোটেইনমেন্ট। এইগুলো আপনাকে জানতে হবে। নাহলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন। লিবারেল ডেমোক্র্যাসির গড হলো কনজিউমার আর ভোটার। তারা যা খাবে, যাকে ভোট দিবে সেইটাই রাইট। এইখানে কোয়ালিটি একটা এলিটিস্ট শব্দ।

এইখানে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, এফিমেরাল। ভুলে যাওয়াই নর্ম। মানুষও মনে রাখেনা। আপনি আজকে একটা ভুল জিনিষ শেয়ার দেন, কালকে আপনি আসেন আবার কোন রিপেন্টেশন ছাড়া। নোবডি গিভস এ র‍্যাটস অ্যাস। আপনি আজকে ফেমাস, কালকে নাই মুমিনা মুহতেশামের মতন। ফেইম ইজ এফিমেরাল, আনলেস ইউ আর নট কারদাসিয়ান। আনলেস ইউ আর সেলিং ইউর লাইফ।

কন্টেম্পরালিটি, সাম্প্রতিক থাকা ডিজিটাল যুগের চাহিদা। আপনার সবসময় মনে হবে আপনি কি না কি মিস করছেন, সারাক্ষন তাই নিউজফিড ব্রাউস করছেন, মিডিয়া আপনাকে সারাক্ষন জানাবে এই এই বিষয়গুলো আপনার জানা দরকার, কিংবা কি কি না জানলে পিছিয়ে পড়বেন আপনি। প্রাক-আধুনিক যুগে সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষ পূজা-অর্চনা-নামাজ পড়তো, তেলাওয়াত করতো। আধুনিক যুগে মর্নিং রিচুয়ালের অংশ হলো নিউজপেপার, টয়লেটে নিউজপেপার নিয়ে না গেলে আধুনিক মানুষের কোষ্ঠ ক্লিয়ার হতোনা। এখন ফেইসবুক কিংবা টুইটার। সে সবজায়গাতেই থাকে, ফলে কোথাও থাকেনা। গতিময় থাকা, জাড্যতাকে বা অবসরকে রিলিজিয়াসলি ঘৃণা করা, আপ টু ডেইট থাকা এইসব তার বৈশিস্ট্য। কিচ্ছু না করার মতন অবসর নাই তার। অবসরও প্রোডাক্টিভ হতে হবে, ডকুমেন্টেড থাকতে হবে। আপনি যে পাতায়া গেলেন, এইটা আমি না জানলে আপনার আর গিয়ে কি লাভ হলো বলেন? এই নেটওয়ার্ক অফ ডিজায়ারে আপনার অবদান আর কি থাকলো?

নিউজপেপার থেকে নিউজফিডে উত্তরন কিংবা অবনমনে সমস্যা কোথায়?

ওই যে, গতিময়তা। রিটেন টেক্সট স্থির, নিদেনপক্ষে একদিন থাকে তার আয়ূ। আপনাকে সে এঙ্গেইজ করতে পারে, কোনকিছু পড়ার পরে আপনাকে কল্পনা করতে হয় সেইটা। ব্যায়াম হয়। ইমেইজ আপনাকে অলস করে। কল্পনা করতে দেয়না, আপনি প্যাসিভ থাকেন। টেক্সট যেই অথরিটি ইম্পোজ করেছিলো, ইমেইজ সেইটা কেড়ে নিয়েছে। গুটেনবার্গের ছাপাখানা থেইকা আজকের হোয়াটসএপ পর্যন্ত এই যাত্রা চিন্তা করেন। দুইহাজার বছরে ক্রিশ্চিয়ানিটি যতটুকু ছড়িয়েছে, সমানসংখ্যক কাস্টমার পেতে হোয়াটসএপের লাগছে দুইবছর। ইমেইজের সমস্যা একটাই, সে অতিদ্রুত রিপ্লেইসড হয়ে যায়। আমাদের ভিজুয়াল মেমরি খুব ছিনাল ধরনের, বেশীদিন বিশ্বস্ত থাকেনা। নতুন নতুন খোরাক লাগে তার। আইলান কুর্দির লাশ খুব দ্রুত ক্রুদ্ধ করে আমাদের, পরক্ষণেই আইসিসের আরেকটা বর্বরতা এসে ভুলিয়ে দেয় সেইটা। কোন সেটল্ড ট্রুথ নাই আমাদের। এই মিডিয়ামের ইনহেরেন্ট ক্যারেক্টারিস্টিক হলো যে এইখানে আমরা ফিকল মাইন্ডেড আচরন করবো, গোল্ডফিশ মেমরি নিয়ে থাকবো, বিস্মৃতিপরায়ণ হবো। আমরা রুশ গল্পকার চেখভের চরিত্রের মতন, হিস্টিরিক। আমাদের হাসি ও কান্না সবই মারাত্মক হবে এইখানে।

এইটা কি তবে আমাদের পাবলিক ডায়েরি?

সোশ্যাল এন্থ্রপলজিস্টরা বলেন যে ব্যাক্তি বুর্জোয়ার উদ্ভবের সময় থেকে মানুষ ডায়রী লেখা শুরু করে। পাবলিকস্ফিয়ার ও তার প্রাইভেট স্পেইসের পার্থক্য না চিহ্নিত করলে আধুনিক মানুষের জন্ম হয়না। ডায়েরীতে প্রাকাধুনিক মানুষ কি লিখতো? তার ইমোশন কিংবা একান্ত ব্যাক্তিগত ভাবনা যেইটা সে আর কারো সাথে শেয়ার করতে চায়না। পাবলিক ডায়েরির ক্ষেত্রে এই বাউন্ডারিটা নাই। লেখা যদি আপলোডই না করি, তাহলে আর লেখার মানে কি? আপলোড করা মানে কানেক্টেড থাকা, ইনফরমেশন হাইওয়েতে যুক্ত হওয়া। প্রাইভেসির ধারনা মাত্র কয়েকশত বছরের পুরানা। প্রাচীন গ্রীস কিংবা রোমের এলিটদের ঘরবাড়ি বাইরে থেকে দেখা যেতো, প্রাচুর্য দেখানোর লোভ তাদের কাছে প্রাইভেসির চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। চার্চের রিফর্মেশনের পরে যখন কনফেশন নেওয়ার কালচার শুরু হলো, বইপত্র যখন ছাপাখানার বদৌলতে সুলভ হওয়া শুরু হইলো, সাইলেন্ট রিডিং এর প্রচলন হইলো, তখন থেকে ধরতে পারেন প্রাইভেসির শুরু। আমেরিকান সিভিল ওয়ারের সময় সরকার সকল টেলিগ্রাম পড়ার অধিকার সংরক্ষণ করতো। অর্থাৎ তখনো প্রাইভেসিকে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভাবেনাই। গত একশ বছর থেকে তারা এইটাকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে। কিন্তু এই দেড়শ বছর পরে আইসা এই ডাটা ড্রিভেন দুনিয়ায় তার সকল ইনফর্মেশনই পাবলিক। কসিন্সকি নামের এক ভদ্রলোক যার ব্রেইন চাইল্ড “ক্যাম্ব্রিজ এনালাইটিকা” ট্রাম্প ও ব্রেক্সিট দুই ক্যাম্পেইনের মাস্টার মাইন্ড, তিনি বলছিলেন যে আপনার মাত্র দেড়শ লাইক দেখে তিনি আপনাকে এভিডেন্টলি আপনার লাইফ পার্টনার থেকে বেশী প্রেডিক্ট করতে পারবেন। আমরা বিগ ডাটার সমুদ্রে বসবাস করি। আমরা কি সার্চ করি, কোন পেইজে কতক্ষণ থাকি এইসবই ইনফরমেশন এবং এই ইনফর্মেশন হইলো এই শতাব্দীর তেল। ডাটা ইজ দ্যা নিউ পেট্রলিয়াম। এবং আজকের তরুণ এই ডাটা শেয়ারে আগ্রহী, তার কোন ব্যাক্তিগততা নাই। তার বিষাদ, উল্লাস সবই এক্সিবিট করতে সে আগ্রহী। হি কঞ্জিউমস, দেয়ারফোর হি ইজ। হি আপলোডস, দেয়ারফোর হি ইজ।

অন্টালজিক্যাল ডিজাইন বলে একটা কথা আছে। মানে হলো যখন ডিজাইনার নিজেই ডিজাইনড। সাব্জেক্ট যখন অব্জেক্ট হয়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এইটা ঘটে। আই সি এন্ড আই এম বিয়িং সিন। আই জাজ এন্ড আই এম বিয়িং জাজড। একটা প্যানোপটিকন যেইখানে আমি নিজেই নিজের জেলার। আপনার লাইক আমার এক্সিস্টেন্সকে ভ্যালিডেইট করে, মিনিং দেয়, আমারটা আপনাকে। আপনি আপনার যেই ইমেইজ বানিয়েছেন সেইটাকে আপনিই ফলো করেন। আপনার যে ব্র্যান্ড ইমেইজ আপনি বানান, তা ডিক্যাফেইনেটেড সেলফ, সমস্ত বিষাক্ততা বিবর্জিত একজন আধুনিক সেইন্ট। মুখ ও মুখোশের বাউন্ডারি ক্রমশ ব্লার হইতেছে এইখানে। ইউ আর বিকামিং এ প্রসথেটিক গড।

যেকোন মুভিং জিনিস যেইটা শব্দ করে, যেইটাতে আলো জ্বলে সেইটাই বাচ্চাদের আকর্ষন করে। খুব ছোট ছোট ফিচার কিন্তু আমাদের এঙ্গেইজ রাখে। একটা টিং সাউন্ড একধরনের পজিটিভ ফিডব্যাকের মতন। আমাদের লুপে ফেলে। লাইককে বলা হয় ডিজিটাল ড্রাগ, কারন এইটা আপনার ডোপামিন সিক্রেশন বাড়ায়, আপনি এন্ডোর্সড হওয়ার সুখ পান। গ্যাম্বলিঙের মজা হলো আনসার্টেনিটিতে, লাইকের সংখ্যা বাড়া কমার চার্ম আপনার পরবর্তী পোস্ট দেয়ার ক্ষুধা আরেকটু বাড়িয়ে তুলে। ড্রাগ রিহ্যাবিলিটিশন সেন্টারের মতন অনলাইন থেকে বের হওয়ার জন্যও মানুষ রিহ্যাব করবে একসময়। ভুল বললাম; অনলাইন থেকে না, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে। অনলাইন আর অফলাইনের এক্সটেনশন না, এইটা একটা প্যরালাল ইউনিভার্স এখন। আপনার কোন এক বেটার ভার্শন অথবা আপনার কোন এক মাল্টি যে আপনার ডার্ক ফ্যান্টাসিগুলো নাড়াচাড়া করে।

স্টিম ইঞ্জিন, ইলেকট্রিসিটি, রেডিও কিংবা টিভি এই আবিস্কারগুলো প্রত্যেকটাই আমাদের যোগাযোগের অভ্যাসকে বিবর্তিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়াও করছে। আমরা এখনো এর শিশু অবস্থা দেখছি, আমাদের পুরনো ভ্যালুজ দিয়ে জাজ করছি। একারনে এই জাজমেন্টগুলো নিরপেক্ষ না। “লডাইট” বা টেকনোলজি কঞ্জার্ভেটিভরা একধরনের রিয়েক্ট করবে, এনথুজিয়াস্টরা আরেকভাবে করবে। টেকনোলজি ফুয়েল্ড রেভলিউশনগুলো যেভাবে আরব বিশ্ব কিংবা ব্রাজিল কিংবা টার্কিকে নাড়ালো, তারপরে এইসব নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছিলো।

“নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটিজ” বলে একটা টার্ম ছিলো ইংরেজ কবি শেলীর। এই কথাটা সোশ্যাল মিডিয়া উতসারিত বিপ্লবগুলোর জন্য পারফেক্ট মনে হয় আমার। একদল এংরি মিসফিটকে মোবিলাইয করতে পারে সোশ্যাল মিডিয়া কিন্তু বড় কোন পরিবর্তনের জন্য তাদের তৈরি করতে পারেনা। এই মুভমেন্টগুলো ইনিশিয়ালি সফল ছিলো কারন এইখানে কোন হায়ারার্কি ছিলোনা, সংগঠন ছিলোনা, নেতা ছিলোনা। এই মুভমেন্টগুলো শেষ পর্যন্ত যেতে পারেনা কারন এইগুলোতে কোন হায়ারার্কি থাকেনা, সংগঠন থাকেনা, নেতা থাকেনা। টেলিভাইযড রেভলিউশন উতসারিত সাউন্ড বাইট, ইমেজ ক্ষণস্থায়ী, যদিনা বহুদিনের প্রস্তুতি থাকে। মানুষকে মবিলাইয করার প্রতুন নতুন নতুন টুল আসছে, কিন্তু রাজনীতি ব্যাপারটা এখনো ওল্ড স্কুল, সেই গ্ল্যামারলেস গ্রাউন্ড ওয়ার্ক ছাড়া হয়না। দোষারোপ করার জন্য সবসময়ই কোন না কোন স্কেপগোট হাজির এইখানে, আপনার যেই আইডেন্টিটি আপনি এইখানে ফর্ম করলেন, সেই অনুসারে রেজিস্টার করলেন জাতীয়তাবাদী, ইসলামিস্ট, লিবারেল, এইথিস্ট কোন স্কুলে। তারপর ওই স্কুলের হাই প্রীস্টের ফতোয়া অনুযায়ী নায়কের পাশের সাইড নায়কের মতন ইয়ে ইয়ে করতে করতে এক গোষ্ঠীর উপর দোষ চাপাইলেন। সোশ্যাল মিডিয়ার এই গোত্রবাদী পলিটিক্স শুধুই রিয়েক্টিভ, প্রতিক্রিয়াশীল। এইখানে তাই অল্ট রাইটের উত্থানটাই স্বাভাবিক, সেইটা ভারত আমেরিকা জার্মানি ব্রিটেন বাংলাদেশ সব জায়গায়। সব দেশেই সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ কাইজ্জা করে, বাংলাদেশ কেন ব্যাতিক্রম হবে? আপনি জাতীয়তাবাদী হ্যাডম দেখাবেন, তার প্রতিক্রিয়ায় একসময় আরেক অপরচুনিস্ট আসবেন হ্যাডম দেখাইতে। ভার্বাল ভায়োলেন্সের চর্চা করবেন, রিপার্কেশন হবে। এইটাই অনলাইন ইকোলজি। ইয়াহা লোগ মুততে কম, হিলাতে জিয়াদা। আপনার চারপাশের পাখি পশু পিয়াল পিনাকি আইজুদ্দিন বাঁশের কেল্লা নিয়েই তো আপনার পরিবেশ, তাই না? মাঝামাঝি কিছু হবেনা। হলেই “শালা সুশীল”। এইটা কিন্তু মজার, আমার পক্ষে কেউ কিছু আমার অবোধ্য ভাষায় প্যাঁচায় লিখলে “সহমত সহমত, ভালো বিশ্লেষন, আর খাড়ায়া স্যালুট”, বিপক্ষে কেউ প্যাঁচায় লিখলেই “হালায় সুশীল”। মূলত আমার ইন্টেলেকচুয়াল এন্টেনায় না আটাকালেই আমি আপনাকে ট্যাগ দিবো। ব্রেক্সিট ক্যাম্পেইনের সময় একটা কথা উঠছিলো যে “ উই হ্যাভ হ্যাড এনাফ অফ দ্যা এক্সপার্টস”। এন্টি ইন্টেলেকচুয়ালিজম গ্লোবাল সোস্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে কমন সিগনেচার। কালচার যখন এন্টারটেইন্মেন্ট হওয়া শুরু হয়েছে, ডাম্বিং ডাউন তখন থেকেই নর্ম। এইটা অবশ্য পুরাপুরি খারাপ না। এই যে ধরেন আমি একজন একাউন্টেন্ট হয়েও আমার এক্সপার্টিজের বাইরের বিষয় নিয়ে এতকিছু লিখে ফেলতে পারলাম, এই সাহস তো এইসব থেকেই পাই।

আমরা একটা কমিউনিটির অংশ, কিন্তু আমরা নেটওয়ার্কের অংশ না, আমাদের নিজস্ব তৈয়ার নেটওয়ার্ক। জিগ্ম্যান্ট বাউম্যান ভাবেন, এইকারনে সোশ্যাল মিডিয়া একটা ট্র্যাপ। অনেকে ভিন্নভাবে ভাবেন যে, না, এইটা নতুন মিডিয়াম, ফলে এইখানে গ্রামার ও ডিফারেন্ট হবে। দি মিডিয়াম ইজ দি মেসেজ। টিভির ল্যাঙ্গুয়েজ কিংবা ম্যাস মিডিয়ার ল্যাঙ্গুয়েজ ও ফেইসবুকের ল্যাঙ্গুয়েজ ও আলাদা হবে। নর্ম কিংবা ভ্যালুজ ও আলাদা হবে। মাতাল না হলে যার কথাকে আপনি গুরুত্ব দেন না, তারও এইখানে সমান স্পেস। এইটা ডিজিটাল ইকুয়ালিটি। এই কথাটাও অবশ্য আরেকটা মিসনমার। সিলিকন ভ্যালির ফোক হিরোরা যেই গল্প বলে সেইটা পুরাপুরি সত্য না। আইডিয়াস এলোন ক্যান নট চেইঞ্জ দ্যা ওয়ার্ল্ড। ক্যালিফোর্নিয়ার কোন কিশোর আর আপনার আইডিয়া যদি একও হয়, আপনারটা পাশ করাতে হইলে আপনাকে প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কোন নেতাকে ম্যানেজ করতে হবে, ক্যালিফোর্নিয়ার কিশোরের সেই প্রব্লেম নাই। জিওগ্রাফি, ইনফাস্ট্রাকচার, গভর্নেন্সও গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাডনেসের পিছনে মেথড থাকে, আমাদের চোখে ওইটা পড়েনা।

আমাদের সায়েন্সের প্রতি এপ্রিসিয়েশন নাই কিন্তু টেকনোলজির প্রতি রয়ে গেছে বিস্তর লালসা, ম্যাজিসিয়ানের প্রতি বালকের মুগ্ধতার মতন। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিয়ে চালকের আসনে বসে পরেছি খচ্চরেরা। সকলেই সত্য বিক্রেতা, সকলেই গুজবের ক্রেতা। সোশ্যাল মিডিয়া একটা বাজার, এইখানে ধর্মযাজক, বিপ্লবী ও রুপোপজীবিনীদের মজমা বসে। এইখানে তাই প্রিচিংও হবে, পার্ভারশনও থাকবে। মাঝে মাঝে রজতরেখার মত ঝিলিক দেবে দুরারোগ্য প্রেম। তোমার টাইমলাইন তোমার কনফেশন বাক্স, তার টাইমলাইন তার। ক্লান্ত ক্লাউন আমরা এই বিগ ডাটা সার্কাসের, পলায়নের স্বপ্ন ছাড়া আমাদের আর কোন পলায়ন নাই।

আমাদের আছে ভান। ইউ আর হোয়াট ইউ প্রিটেন্ড টু বি। প্রিটেন্ড হোয়াট ইউ ওয়ান্ট টু বি। আইসো, ভানটা ঠিকমতন করি।

লিখেছেনঃ A.t.m Golam Kibria

Most Popular

To Top