লাইফস্টাইল

বাবু তোমার রোল কত?

বাবু তোমার রোল কত?- নিয়ন আলোয়

আমরা নানা সময় বেরাতে বা বিভিন্ন প্রয়োজনে আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত বা অপরিচিত মানুষের বাসায় যাই। সেখানে গিয়ে যদি কোন ছোট বাচ্চা দেখি তাকে ডেকে সবার প্রথমে যে প্রশ্নটা করি, “বাবু তোমার নাম কি?” এরপর যদি বাচ্চাটি স্কুলে পড়ার উপযুক্ত হয় তাহলে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি করি তা হলো- “কোন ক্লাসে পড়ো?” এবং সর্বশেষ ও সবচেয়ে প্রলয়ংকারী প্রশ্ন, “তোমার রোল নাম্বার কতো?”

ব্যাপারটা এমন যেন, বাচ্চাটির রোল নাম্বার ৫০ কিংবা ৬০ হলে তার সাথে আলাপচারিতার পর্ব দীর্ঘায়িত না করা সেখানেই সমাপ্তি টানা আর তার দিকে একটু তাচ্ছিল্য ভরে তাকানো। এই যে ছোটবেলা থেকেই সবাইকে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার ভেতর ফেলে দেয়া হচ্ছে এই প্রতিযোগিতার ভয়াবহ ও কুৎসিত ফলাফলটা চোখের সামনে আসবে বড় হবার পর।

আজ এই প্রতিযোগিতার জন্য ক্লাস টু’ এর প্রশ্ন ফাঁস হয়। যে বাচ্চাগুলো সেই প্রশ্নে পরীক্ষা দিবে,তারা এটা জেনে বড় হবে যে তাদের বাবা-মায়ের কাছে টাকা থাকলে সব পাওয়া সম্ভব।

ছোটবেলার এই প্রতিযোগিতার ফলাফল দেখা যায় রাস্তায় গাড়ি চালাতে গেলে। যদি কেউ নিয়ম মেনে নিরাপদ ও ভাবে গাড়ি চালায়, তবে পিছনের গাড়ির চেষ্টাই থাকে তাকে ওভারটেক করে সামনে চলে যাবার। ভাবটা এমন, যেন সে কয়েক সেকেন্ড সময় কম ব্যয় করে সমগ্র মানব জাতিকে বাঁচানোর যুদ্ধে যাবে। দূর্ঘটনা কখনো দুজনের ভুলে হয় না, হয় যেকোন একজনের ভুলে। এরকম গুটি কয়েক মানুষের ভুলে প্রায়ই অকারণে বহু নিরাপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়।
ছোটবেলার এই প্রতিযোগিতার রেশ দেখা গেছে ডিম কিনতে গিয়েও। ডিম কেনার লাইনে একে অন্যের আগে ডিম কিনতে গিয়ে মানুষ নিজের ডিম ফাটিয়ে ফেলেছে।

একজন মরহুম মানুষের মেজবানে গিয়ে পায়ে পিষ্ট হয়ে মানুষ মারা যাবার ঘটনা ঘটেছে একমাত্র আমাদের দেশেই। যে মানুষটা পড়ে গেছে তাকে হাত দিয়ে টেনে তোলা তো দূরে থাক, যারা তোলার চেষ্টা করেছে তাদেরকে পর্যন্ত পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে পিষ্ট করে মানুষ চলে গেলো। কারণ একটাই আর তা হলো আগে যেতে হবে, আগে পেতে হবে।

এদেশে অফারকে লোভনীয় করতে হলে ট্যাগ লাইন লিখে দিতে হয়, “আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে বুকিং চলছে!”

ছোটবেলায় পাশের বাসার ছেলেটা কিংবা মেয়েটাকে দেখিয়ে এমনকি কাজিনদের উদাহরণ দেখিয়ে বলা হয়- “ও অংকে ৯০ পেলো আর তুমি ৬০ পেয়েছো কেন? ওকে ভাত দেয় তোমাকে কি খেতে দেই না? ওর হাত পা কি ৮ টা? যাও, ওর পা ধোয়া পানি খাও গিয়ে!”

এটি এক প্রকার মানসিক মেন্টাল নির্যাতন। এই কারণে মনের ভেতর ক্ষুদ্রতার সৃষ্টি হয়। যার সাথে তুলনা দেয়া হচ্ছে তার প্রতি ক্ষোভ, ঘৃণার জন্ম হয়। কাজিনে কাজিনে ভালোবাসার বদলে সৃষ্টি হয় দূরত্বের। আমরা বুঝেও বুঝি না।

সবাই এক হয় না। কেউ ডানে যাবে, কেউবা বামে। রোল নাম্বার শব্দটা যেদিন উঠে যাবে,যেদিন ক্লাসের সমস্ত বাচ্চাকে এটেন্ডেন্স শুধুমাত্র নাম ডেকে নেয়া হবে, ৯৯ পাওয়া বাচ্চা এবং ৩৩ পেয়ে পাশ করা বাচ্চা দুজনকেই সমান চোখে দেখা হবে। সেদিন থেকে পুরো দেশ লাইনে চলে আসবে।

লিখে রাখুন।

Most Popular

To Top