নাগরিক কথা

মোস্তাফা জব্বার সাহেবের মন্ত্রীত্ব, এবং…

০.
মোস্তাফা জব্বার সাহেবকে নিয়ে আমার প্রজন্মের তথ্যপ্রযুক্তিতে কাজ করা লোকজনদের মধ্যে ভয়ংকর রাগ আছে। আমার ধারণা এই রাগটার অন্তর্গত রুপটি হল – উনি গোলিয়াথ, আমরা ডেভিড। যেহেতু বাস্তব জীবনে ওনার মত প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কিছু আমরা করতে পারি না, নিজেরা নিজেরা ওনাকে পঁচাই। বাস্তবজীবনে প্রভাব পড়ে এরকম কাজ না করে সবসময় নিজেরা নিজেরা রাজা উজির মারলে কি হয়? যাকে আমরা পছন্দ করি না তিনিই উজির হয়ে যান।

১.
আমি বাংলা টাইপ করতে শিখেছিলাম অভ্র আসার আগে। কাজেই আমি একটাই কিবোর্ড জানি যেটি হল বিজয় কিবোর্ড। এর মধ্যে মুনির ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে ২০০৬ সাল থেকে লিনাক্স ছাড়া আর কোন কিছু আমি ব্যবহার করি না (এটি আমার রাজনৈতিক অবস্থান, বিস্তারিত আরেকদিন বলব)। এখন লিনাক্সে তো বিজয় নেই (লিখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম আসলে আছে, দাম বেশি না, মাত্র একশ টাকা), কিন্তু ইউনিজয় কাজ করে। কাজেই আমি সব বাংলা (এই লেখাটি সহ) ইউনিজয় দিয়ে লিখি। যেভাবে লিখি সেটি বলব না, কারণ তখন আবার কেউ মামলা করে সেই ওয়েবসাইট বন্ধ-টন্ধ করে দিতে পারে। তখন এই বুড়ো বয়সে জাভাস্ক্রিপ্ট দিয়ে একটি ইউনিজয় কিবোর্ড বানিয়ে চুপিসারে ব্যবহার করতে হবে। আইনী ঝামেলা এড়ানোর জন্য নতুন নামও দিতে হবে। দেখা যাক!

২.
মোস্তাফা জব্বার মন্ত্রী হবার সাথে সাথে আমার ফেসবুকের টাইমলাইনে ওনাকে নিয়ে ট্রলে ভর্তি হয়ে গেল। প্রশংসা খুব কম দেখেছি কারণ বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ইতিহাস মাথায় রাখলে আমি চ্যাংড়া প্রজন্মের মানুষ। যেহেতু একসময় তথ্যপ্রযুক্তিতে কাজ করেছি, তাই কেউ এখন পর্যন্ত শুনতে না চাইলেও আমি সবসময়ের মত আমার বিশেষজ্ঞ (!) মতামত দিচ্ছি।

৩.
আমার ওনাকে ভাল লাগে না। কেন? পত্রিকায় ওনার কলাম লেখার টোন আমার কাছে সবসময় ভীষণ উদ্ধত মনে হত। সবকিছু নিয়ে এত মাথা গরম করার কি আছে আমি কখনও বুঝতাম না। আমরা সবাই মাথা গরম করি। কিন্তু একটি জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ : সামাজিক বলয়ে মাথা গরম করার একমাত্র অধিকার ছোটদের। আমি যখন আমার চেয়ে বেশি বয়সী কাউকে পাবলিক স্পেসে মাথা গরম করতে দেখি আমার মাথায় প্রথম যে চিন্তাটি আসে সেটি হল ব্যাটা টেকনাফ বা তেঁতুলিয়ায় রিটায়ার না করে ঘ্যান ঘ্যান করছে কেন। আবার একই কথা যদি আমার চেয়ে কম বয়সী দেয় তাহলে আমি ভাবি মাথা গরম হলে কি হবে ছেলেটি বা মেয়েটি অনেক কিছু নিয়ে ভাবে, বয়স হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। মোস্তাফা জব্বারের লেখা পড়ে আমার প্রথম যে অনুভূতি হতো সেটি হল উনি এত রেগে আছেন কেন? কিন্তু এটি আসলে ওনার মন্ত্রী হওয়ার বিরোধিতা করার জন্য যথেষ্ট না।

৪.
বিটিভিতে ওনার অনুষ্ঠান আবার ভালই লাগতো। কারণ ওখানে উনি রাগ ঝাড়তেন বলে মনে পড়ে না।

৫.
আমি যদি ভুল না করে থাকি তাহলে কম্পিউটার কেনায় শুল্কহার শূন্যে নামানো হয়েছিল ওনার জোরাজুরিতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এতে উপকৃত হয়েছি।

৬.
প্রায়ই একটি অভিযোগ শোনা যায় সেটি হল “উনি মুনিরুল আবেদীন পাপ্পানার কোড মেরে দিয়ে বিজয় বানিয়েছেন।” এটির কোন ভিত্তি আমি পাই নি। ২০০১ সালে যেদিন আমি প্রথম বিজয় ইনস্টল করেছিলাম তখনই আমি খুঁজে দেখেছি। পাপ্পানা যে এই প্রজেক্টে কাজ করেছেন সেটি ওখানে লেখা ছিল।

৭.
আরেকটি অভিযোগ আমি দেখতে পাচ্ছি স্ক্রল করতে করতে যেটি হল উনি তথ্যপ্রযুক্তির কোন প্রশিক্ষণ বা ডিগ্রী ছাড়া কেন আমাদের লাইনে এত মাতবরি করছেন। এটি খুবই বোকার মত কথাবার্তা। প্রথমত: এটি হল অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠার সস্তা চেষ্টা। দ্বিতীয়ত: আমরা যারা বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিতে ডিগ্রী নিয়েছি তারা এমন কোন দুনিয়া উল্টাই নাই। বাংলাদেশ থেকে তথ্যপ্রযুক্তিতে কতটি আন্তর্জাতিক পেটেন্ট হয়েছে সেটির হিসেব নিলেই সবার দৌড় বোঝা যাবে!  বাংলাদেশে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ানো হচ্ছে কমপক্ষে ত্রিশ বছর ধরে। এখন পর্যন্ত আমাদের কোন ইন্ডাস্ট্রি গ্রেড মেশিন ট্রান্সলেটর নেই, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশনের কোন টুল নেই (ওসিআরের জন্য অপেক্ষা করতে করতে গত বছর বাচ্চার বাপ হয়ে গেলাম!)। আমাকে দয়া করে আইসিসিআইটির কোন পেপারের রেফারেন্স দিবেন না। আমি আন্ডারগ্র্যাডের বাচ্চাকাচ্চাদের প্রজেক্টের (এই প্রজেক্টগুলোর আবেগের জায়গাটি আমি বুঝি কারণ আমিও একসময় আন্ডারগ্র্যাড ছিলাম) কথা বলছি না, আমি পেটেন্টেড পণ্যের কথা বলছি যার সাথে আফটারসেল্স সার্ভিস, ইন্স্যুরেন্স এসব আসবে। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবসাটিতে কোন দুর্নীতি নেই, আমি বাংলা কিবোর্ডকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করাকে অনৈতিক মনে করি না। আমরা সৌভাগ্যবান যে মেহেদীর অন্য কোন আয়ের উৎস আছে বলে আমরা অভ্র ফ্রি পাই। কিন্তু সবাই এরকম হবে এটি আশা করাটা ছেলেমানুষি। ভাত সবাইকে কিনে খেতে হয়।

৮.
উনি যখন মেহেদীর প্রজেক্টের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন পুরো ব্যাপারটি কিছুটা কাছ থেকে (কোন পক্ষের সাথে না কিন্তু) দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমার খুব ইচ্ছা ছিল এটি আদালতে সুরাহা হোক। তাহলে ওনার পেটেন্টের (মনে আছে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে উনি ঘোষণা দিয়েছিলেন পেটেন্টের কথা) পুরো বিবৃতি আমার পাবলিক ডকুমেন্ট হিসেবে পড়ার সুযোগ হতো। কারণ আমি এখনও ঠিক নিশ্চিত নই এখানে ঠিক কোন বৈজ্ঞানিক বা কারিগরি উদ্ভাবনটি পেটেন্ট করা হয়েছে। তবে সেসময় একবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই/ইউএনডিপি এটি নিয়ে টিভিতে একটি অনুষ্ঠান করেছিল এবং সেখানে মেহেদীকে না ডাকলেও মোস্তাফা জব্বারকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল। এটি আমার কাছে বৈষম্য মনে হয়েছিল এবং তখন খুব রেগেমেগে ইউএনডিপিকে ইমেইল করেছিলাম। এখন পর্যন্ত এটাই ওনার ব্যাপারে আমার সর্বোচ্চ রাগ।

৯.
একবার দিনাজপুরে একটি অনুষ্ঠানে ওনার সাথে কথা হয়েছিল। তখন যেটি বুঝলাম বিজয় কিবোর্ডের কারণে উনি অনেক টাকা কামাচ্ছেন। এটি অবশ্যই কোন সমস্যা না, বরং ভাল কিছু। এখন দেখতে হবে পাবলিক অফিসে বসে উনি নিজের ব্যবসার সাথে দূরত্বটি কিভাবে বজায় রাখেন।

১০.
মোস্তাফা জব্বার মন্ত্রী হয়েছেন এটি নিয়ে গড়পড়তা সমালোচনাগুলো (আসলে সবাই স্কুলের বাচ্চাদের মত খালি ট্রল করছে, কোন দায়িত্বশীল সমালোচনা দেখিনি) আমার কাছে খুবই নিম্নমানের মনে হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অমুককে পছন্দ করি না এটি আসলে মন্ত্রীত্বের বিরোধিতার জন্য যথেষ্ট না। যেটি নিয়ে সমালোচনা করা উচিৎ ছিল তা হল:
ক. উনি সর্বোচ্চ ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মন্ত্রী থাকবেন। মাত্র এক বছরের জন্য একজন কে কেন মন্ত্রী বানানো হবে এবং তাতে আমাদের কি লাভ সেটি নিয়ে সরকারের কোন পরিষ্কার বার্তা না দেয়া।
খ. ওনার ট্যাক্স রিটার্ন প্রকাশ না করা। করলে ওনার একটা শক্ত নৈতিক অবস্থান থাকতো যে উনি মন্ত্রী হওয়ার পরও সরকারের বাজেটে ওনার পণ্য বা সেবা কিনছেন না।

বি.দ্র. দুটি তথ্য আমি ভুল লিখেছি যেগুলো পরে অন্যরা ঠিক করে দিয়েছে।
১) পাপ্পানা এটি দাবী করেননি যে ওনার কোড “মেরে দিয়েছে”। উনি দাবী করেছেন ওনাকে পারিশ্রমিক দেয়া হয়নি।
২) মেহেদীকে এটুআইয়ের পক্ষ থেকে টিভিতে ডাকা হয়েছিল। উনি আসতে পারেননি।

পুনশ্চঃ এটি মূলত ফেসবুক স্ট্যাটাস হিসেবে লেখা। উপ-সম্পাদকীয়ের মান অনুযায়ী না হয়ে থাকলে লেখক তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

লেখকঃ ওমর শেহাব

Most Popular

To Top