টেক

২০১৭ এর যত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার!

২০১৭ এর যত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার!- Neon Aloy

জ্ঞানবিজ্ঞানে মানুষের দিন দিন উন্নতি সাধন হচ্ছে,প্রতিদিনই বিশ্বের কোনো না কোনো প্রান্তে গবেষণা হচ্ছে নতুন নতুন বিষয় নিয়ে। এদের মধ্যে কোনোটা নিষ্ফল হচ্ছে আবার কোনোটা নিয়ে আসছে অভাবনীয় সাফল্য। বছরজুড়ে এমন অনেক আবিষ্কার হলেও উল্ল্যেখযোগ্য কয়েকটি আবিষ্কার নিয়েই আজকের এই লেখা।

কৃত্রিম গর্ভে ভেড়ার বাচ্চার ইনকিউবেশন

সায়েন্স ফিকশনের বাস্তবায়ন হয়েছে এই ভেড়ার বাচ্চাদের ইনকিউবেশনের মাধ্যমে। চার সপ্তাহ ধরে ভেড়ার বাচ্চাগুলোকে বিশেষ তরলযুক্ত একরকম প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থের মধ্যে রাখা হয়েছে এবং সেখানে তাদের শারীরিক বিভিন্ন ক্রিয়া ও বৃদ্ধিকে লক্ষ্য করা হয়েছে। এমন গবেষণা ইতিপূর্বে আরো একবার করা হলেও এবারের গবেষণাটা একটু অন্যরকম, কারণ এখানে ভেড়ার শাবকের হৃৎপিণ্ডের দ্বারাই থলেগুলোতে শক্তি সরবরাহ করা হয়েছে। শাবকগুলোর নাভিরজ্জু দিয়ে শরীরের রক্তসঞ্চালিত হয়ে বিশেষভাবে বানানো একটি অক্সিজেনেশন মেশিনে যেত এবং আবার পরিশোধিত হয়ে ফিরে আসত। গবেষণাকৃত শাবকগুলোর মধ্যে একটি এপ্রিল মাস পর্যন্ত ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে এই প্রক্রিয়াটিকে আরো ভালোভাবে সম্পন্ন করা গেলে “প্রিম্যাচিউর বাচ্চা”দেরকে বাঁচিয়ে রাখা আরো সহজ হবে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য এই পদ্ধতি এখনো নিরাপদ নয়, কারণ মানব এবং ভেড়ার শরীরের গঠন একই নয়। তবে অদূর ভবিষ্যতে মানশিশুর জন্যেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

টারডিগ্রেডস নামক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী

দেখতে ভাল্লুকের মতো হওয়ায় পানির ভাল্লুক বলে ডাকা হচ্ছে এই প্রাণীটিকে, মিলেনসিয়াম টারডিগেরাম বৈজ্ঞানিক নামের এই প্রাণীটি উঞ্চতা, শৈত্য কিংবা বায়ুশূন্য গহ্বরেও দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে এবং এ বছর প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে পৃথিবীতে যদি গামা রশ্মির বিকিরণ ঘটে কিংবা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয় তারপরেও এই টারডিগ্রেডটি বেঁচে থাকবে বহাল তবিয়তেই। তার এই অভিযোজিত হওয়ার ক্ষমতাকে বিশ্লেষণ করে মানব উন্নয়নে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে বিজ্ঞানীরা।

ডায়াবেটিসের ওষুধ আবিষ্কারে নতুন সাফল্য

মানদেহের অগ্ন্যাশয় যদি ঠিকমতো কাজ না করে তবে ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা দেয় শরীরে, অনেকসময় অগ্ন্যাশয় নিজে ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারেনা কিংবা ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারলেও তা কাজ করুতে পারেনা। তবে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন অগ্ন্যাশয়ের মধ্যে “ভার্জিন বিটা সেল”এর যা বিজ্ঞানীদের “টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস”কে চিকিৎসা করতে সাহায্য করবে।

মানব ভ্রুণ এ সংস্কার সাধন

এবছর আমেরিকার পোর্টল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা জিন-টেকনোলজিতে এক অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। CRISP-R নামক প্রযুক্তির মাধ্যমে জন্মানোর আগেই মানব ভ্রূণের হৃদরোগের জন্য পরবর্তীকালে যে জিনটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে সেটিকে “ডিলিট” করে দিতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কারের ফলে আশা করা যাচ্ছে যে থ্যালাসেমিয়া, সিকল সেল এনিমিয়ার মত অনেক জন্মগত জেনেটিক ত্রুটিগুলোকে কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে সহজেই। তবে এই আবিষ্কার মানবজাতীর ভারসাম্য রক্ষায় এবং বিবর্তনসহ বিভিন্ন “এথিকাল ইস্যু”গুলোতে কি ভুমিকা রাখবে সেটা নিয়েও নানা বিতর্ক হচ্ছে।

সমুদ্রতলে অষ্টম মহাদেশ

নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণপূর্ব সামুদ্রিক অঞ্চলে একটি নতুন মহাদেশের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সাম্প্রতিকসময়ে। “জিল্যান্ডিয়া” নামে অভিহিত করা এই দ্বীপটির প্রায় চুরানব্বই শতাংশই সমুদ্রতলে হওয়ার পরেও বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার মত সব শর্তই এই জিল্যান্ডিয়া পূরণ করেছে।

বয়স নিয়ন্ত্রণকারী উপাদানের পরীক্ষা

মানুষের বয়স যত বাড়তে থাকে ততই তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষয়কারী কোষগুলো বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং এর ফলে বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগ এবং উপসর্গ দেখা দেয় মানবদেহে। নেদারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা এমন একটি পরমাণু তৈরি করেছেন যেটি এই ক্ষয়কারী কোষগুলোর কাজে বাধা প্রদান করে ফলে শরীরে বার্ধক্যজনিত লক্ষণগুলো আর দেখা যায়না। তারা একদল বয়স্ক ইঁদুরের উপরে এই পরীক্ষাটা করে দেখেছেন যে এর ফলে ইঁদুরগুলোর শরীরে আবার নতুন করে লোম গজিয়েছে, তাদের কিডনির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় কাজগুলোও উন্নত হয়েছে। হয়তোবা এই আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের অমরত্বের দিকে একধাপ অর্জন হয়েছে।

স্ট্রোকের চিকিৎসায় মাকড়সার বিষের ব্যবহার

স্ট্রোকের ফলে মানুষের মস্তিষ্কের কোষগুলোতে যে ক্ষয়ের সৃষ্টি হয় তার চিকিৎসা করতে অস্ট্রেলিয়ান ফানেল-ওয়েব মাকড়সার বিষের ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। এই মাকড়শার বিষ এতই ক্ষতিকর যে সঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে কামড় খাওয়ার পনের মিনিটের মধ্যেই আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যেতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে এই বিষে থাকা একপ্রকার পেপটাইড স্ট্রোকের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্কের কোষগুলোকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

ক্যান্সার কোষ মারার জীবন্ত ওষুধ

“ক্যান্সার হ্যাজ নো এন্সার”,মানবদেহের প্রাণঘাতী রোগ ক্যান্সার নিয়ে মানুষের গবেষণার সীমা নেই। কি কারণে যে শরীরের বিভিন্ন স্থানের কোষগুলোর মধ্যে এমন পাগলের মত অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা দেয় তা এখনো সম্পূর্ণরূপে জানা হয়নি বিজ্ঞানীদের। ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপিসহ বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করা হলেও সেগুলো একাধারে যেমন ব্যয়বহুল তেমনি কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ রয়ে যায়। তবে সম্প্রতি আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী এমন একটি “ইম্যুনোথেরাপিউটিক ড্রাগ” এর ব্যবহার জানতে পেরেছেন যা মানুষের রক্তে মিশে গিয়ে রক্তকণিকাগুলোকে ক্যান্সারকে হত্যাকারী অস্ত্রে রূপান্তরিত করে। আমেরিকার এফডিএ এর অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই প্রজেক্টটি সফল হলে ক্যান্সার চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বস্তুর চতুর্থ অবস্থা

বিজ্ঞানের বইয়ে আমরা অহরহ পড়ে এসেছি যে বস্তুর সাধারণত তিনটি অবস্থা আছে; কঠিন ,তরল এবং বায়বীয়। তবে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা পদার্থের আরেকটি নতুন অবস্থা আবিষ্কার করেছেন যাকে “সময় স্ফটিক” বলে অভিহিত করা হচ্ছে। এই স্ফটিকের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য এমন অদ্ভুত যে এটি কোনোরকম শক্তিক্ষয় ছাড়াই শুধু স্থানে নয় বরং সময়ের মাঝেও অবস্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম।শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও এই চতুর্থ অবস্থান কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তথ্য সংরক্ষণ এবং আদানপ্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে।

মানুষ এবং শুকরের হাইব্রিড

আমরা সাইন্স ফিকশন সিনেমা বা গল্পের বইগুলোতে প্রায়ই পড়ি অর্ধেক মানব ভ্রূণ আর অর্ধেক অন্য প্রানীর ভ্রুণ নিয়ে জন্ম নেওয়া কোনো মানুষের গল্প। সাইন্স ফিকশনের কল্পকাহিনীকে বাস্তবে রূপ দিতে সম্ভব হয়েছেন বিজ্ঞানীরা, ল্যাবরেটরিতে তৈরি করেছেন অর্ধেক মানুষের কোষ এবং অর্ধেক শুকরের কোষ যুক্ত একটি ভ্রুণ। এই কাজে সফল হয়ে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে অদূরভবিষ্যতে এই ভ্রুণের বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে মানবদেহে প্রতিস্থাপনের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করা সম্ভব। তবে মানুষের ভ্রূণের এমন ব্যবহার করা বিজ্ঞানের “এথিকস” এর বাইরে হওয়ায় এই প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ইতিমধ্যেই।

পৃথিবীর আকৃতির সাতটি নতুন গ্রহ

দিন দিন পৃথিবীতে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে,কয়েকদিন পড়ে আর দম ফেলার জায়গা থাকবেনা। অধিক জনসংখ্যা মানুষের জীবনযাত্রা সহ সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তাই বিজ্ঞানীদের মাথায় চিন্তার শেষ নেই কিভাবে মানুষের বসবাসযোগ্য অন্য গ্রহের হদিস পাওয়া যায়। মঙ্গলগ্রহ সহ অন্যান্য গ্রহগুলোতে অনেক চেষ্টা করেও মনুষ্যবসতি স্থাপনের জন্য উপযুক্ত অনুকূল পরিবেশ স্থাপন করা যাচ্ছেনা। তবে বিজ্ঞানীদের চিন্তার দিন মনে হয় শেষ হয়েছে,প্রায় চল্লিশ আলোকবর্ষ দূরে পৃথিবীর আকৃতির সাতটি নতুন গ্রহ আবিষ্কার করা হয়েছে যাদেরকে বসবাসযোগ্য অঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

অঙ্গ প্রতিস্থাপন

অঙ্গ প্রতিস্থাপন বর্তমানে তেমন নতুন কোনো বিষয় না,হরহামেশাই কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিস্থাপিত করা হচ্ছে মানবদেহে। তবে এবছর এই অঙ্গ প্রতিস্থাপনে আরেকটি নতুন মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে মস্তিষ্কের প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। ভ্যালেরি স্পিরিদিনভ নামের একজন রাশিয়ান ব্যক্তি যিনি ওয়ারডিং হফম্যান নামক রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের মাংসপেশীগুলোর কার্যকারিতা হারাচ্ছেন তাকে দিয়ে এই পদ্ধতিটি প্রথম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া থ্রিডি বা ফোরডি বায়োপ্রিন্টারের সাহায্যে মানুষের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করা যায় কিনা তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তথ্যসুত্রঃ

Most Popular

To Top