ক্ষমতা

২০১৭ঃ বিশ্বরাজনীতির হিসাব উল্টে দেওয়া বছর!

২০১৭ঃ বিশ্বরাজনীতির হিসাব উল্টে দেওয়া বছর!- নিয়ন আলোয়

২০১৬ সালের শেষের দিকে সবাইকে চমকে দিয়ে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হলেন তখনই মনে হয় অনেকে বুঝতে পেরেছিলেন যে ২০১৭ সালটা কোনোমতেই রাজনৈতিক দিকদিয়ে বোরিং হবেনা। এই বছরটাতে ট্রাম্প সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও এর পাশাপাশি ঘটেছে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রকেই বদলে দিয়েছে।

“আমেরিকা ফার্স্ট!”

 

এই স্লোগান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছিলেন এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্সির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার, ট্রান্স-প্যাসিফিক চুক্তি বাতিল করে দেওয়াসহ নানারকম শক্তিশালী রাজনৈতিক সংকটে আমেরিকার নিরবতা কিংবা নিরপেক্ষতা নিয়ে বিশ্বরাজনীতি অবাক হয়ে আছে। এমনকি ট্রাম্পের নিজের দলের লকদের মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে ট্রাম্প আদৌ “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি মেনে চলছেন নাকি বিশ্বরাজনীতির উচ্চতর অবস্থান থেকে আমেরিকার অধিকারকে খর্ব করে “আমেরিকা লাস্ট” বানাচ্ছেন?

শি জিন পিং; বিশ্বরাজনীতিতে নতুন শক্তির আবির্ভাব

আমেরিকা যতই বিশ্বরাজনীতির মুরব্বীর পদ থেকে নিজেকে আসতে আসতে গুটিয়ে নিচ্ছে,ততই শি জিন পিং সেই স্থান দখলের জন্য পাল্লা দিয়ে যাচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে। “ওয়ান বেল্ট” নীতির মাধ্যমে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনের অন্যান্য দেশগুলোরা সাথে সংযোগ স্থাপন, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের শি জিন পিংকে “কিং অফ চিন” নামে সম্বোধন এবং প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে চীনের প্রতিশ্রুতির চেয়ে আরো বেশি অনুদান প্রদান করা এসব ঘটনা শি জিন পিংকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

তবে তার নেতৃত্ব আরো বেশি সুনিশ্চিত হয়েছে অক্টোবরে সংঘটিত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নবম সম্মেলনে পুনরায় পাঁচ বছরের জন্য “জেনারেল সেক্রেটারি” নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে।সেই সম্মেলনে তাকে “কোর লিডার” নামে অভিহিত করা হয় এবং পাঠ্যবইয়ে মাও সে তুং এর দর্শনের পাশাপাশি “শি জিন পিং এর দর্শন” নামেও নতুন অধ্যায় যোগ করা হয়েছে।

কিম জং উন; লিটল রকেট ম্যান

উত্তর কোরিয়া এবং তার শাসকদের নিয়ে বিশ্ব এবং সর্বোপরি আমেরিকার মাথাব্যথা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আমেরিকার পূর্বতন প্রেসিডেন্টরা উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র বানানো থেকে বিরত রাখতে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছাড়াও সামরিক পদক্ষেপের ভয় দেখিয়ে আসছে কয়েক দশক ধরে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া কারো নিষেধাজ্ঞায় কান না দিয়ে নিজের পারমাণবিক ভান্ডারকে শক্তিশালী করে তুলছে। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে এটি দুরপাল্লার ব্যলিস্টিক মিসাইলের টেস্ট করেছে এবং তা দেখে মনে হচ্ছে উত্তর কোরিয়া এখন আমেরিকার যেকোনো শহরে আক্রমণ করতে সক্ষম।এর পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে কিম জং উনকে “ছোট্ট রকেট মানব” নামে উল্ল্যেখ করায় এবং সামরিক পদক্ষেপই একমাত্র উপায় লিখে টুইট করার পরে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলেও এখন একটু শান্ত হয়ে আছে রণাঙ্গন। জাতিসংঘ থেকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং উত্তর কোরিয়ার পুরনো মিত্র চীনকে সম্পর্কছেদ করতে বলা হয়েছে।

তবে আমেরিকা, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া সহ পুরো বিশ্ব এখনো চিন্তিত আছে উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে।

মসুলের পতনের সাথে সাথে আইএস-এর পতন

২০১৪ সালে আইএস যখন ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখল করে নিয়ে সেখানে খেলাফতের রাজধানী বানানোর ঘোষণা দেয় তখন সারা বিশ্ব চমকে উঠেছিল। এরপরে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইরাক এবং ইরান সম্মিলিতভাবে আইএস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং তিনবছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরে মসুল সহ আরো কয়েকটি এলাকা আইএস মুক্ত করা হয়। তবে এই দীর্ঘসময়ব্যাপী চলা যুদ্ধে মারা যান অর্ধলক্ষ বেসামরিক ব্যক্তি এবং উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ। কিন্তু এর পরেও ইরাকে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি ইরাকি কুর্দি যোদ্ধা এবং ইরাকি সেনাবাহিনীর মধ্যে স্বাধীনতা নিয়ে সংঘর্ষের কারণে। আর বিশ্লেষকদের মতে আইএস যোদ্ধারা সাময়িকভাবে একটু নিস্তেজ হলেও নতুন করে শক্তিসঞ্চয়ের পরে তাদের পুনরাবির্ভাব ঘটতে পারে।

জেরুজালেম কার?

ইজরায়েল এবং ফিলিস্তিন ইস্যুটি অনেক পুরনো হলেও মুসলিম রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যেকার বিভক্তির ফলে এর সমাধান হচ্ছেনা এবং ইজরায়েল ক্রমান্বয়ে আরো দখল নিয়ে নিচ্ছে ফিলিস্তিনি ভুখন্ডের। এত কিছুর মাঝখানে নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠে যখন ইজরায়েল জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানী বলে ঘোষণা করে এবং আমেরিকা সেই প্রস্তাবের সমর্থন করে সবার আগে। এতদিন ফিলিস্তিন এবং ইজরায়েল উভয় দেশের সাথে ভারসাম্য রেখে চলা আমেরিকার এই আচরণ অনেককেই হতবাক করেছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র শহর জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘে একটি সাধারণ ভোটের আয়োজন করা হয় এবং ট্রাম্পের খোলামেলা হুমকি সত্ত্বেও অধিকাংশ দেশই ইজরায়েলের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এখন দেখার বিষয় যে জেরুজালেম ইস্যুতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আবার একত্রিত হতে পারে কিনা,নাকি তাদের মধ্যেকার বিভেদের সুযোগ নিয়ে ইজরায়েল আগের মতই নির্বিবাদে দখল নিয়ে নেয়।

রোহিঙ্গা ইস্যু

বিশ্বের কথা বাদ দিয়ে আমরা যদি আমাদের বাংলাদেশের সালতামামি করতে যাই তবে সেখানে নিঃসন্দেহে সবার উপরে আসবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা। প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে জাতিগত নিধনের স্বীকার হয়ে এদেশে পাড়ি জমিয়েছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা, আবার পথিমধ্যে নৌকা বা ভেলায় সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অনেকেই। মানবিক কারণে রোহিংগাদেরকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে এদেশে এবং টেকনাফের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে তাদেরকে রাখা হয়েছে। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা এবং সমর্থন দিলেও “প্রতিবেশী বড়ভাই সুলভ রাষ্ট্র” চীন এবং ভারতের সমর্থনের অভাবে বাংলাদেশ মায়ানমারের সাথে পূর্ণশক্তি দিয়ে “ডিপ্লোম্যাটিক নেগোশিয়েশন” করতে পারছেনা। তারপরেও জাতিসংঘ এবং অন্যান্য দেশগুলোর চাপে মায়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আংশিকভাবে সম্মত হয়েছে, কিন্তু তা কতটুকু সফল হবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আর এতসব ঘটনার মধ্যে আলোচনায় আসে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সৌদি আরবের মত প্রভাবশালী মুসলিম দেশের নিষ্ক্রিয়তা এবং তার চেয়ে আরো আলোচিত হয়েছে মায়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি’র মিথ্যাচার।

রবার্ট মুগাবে যুগের অবসান

রবার্ট মুগাবে,নেলসন ম্যান্ডেলার মত তিনিও হতে পারতেন কৃষ্ণাঙ্গদের স্বাধীনতার ইতিহাসের আরেকজন স্মরণীয় ব্যক্তি কিংবা জিম্বাবুয়ের মহান নেতা। নেলসন ম্যান্ডেলার মত রবার্ট মুগাবেও জীবনের অনেকটা সময় জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটীয়েছেন দেশ থেকে অত্যাচারী বিদেশি শ্বেতাঙ্গ শাসকদের উৎখাত করতে। নেলসন ম্যান্ডেলার মত করে তিনিও জিম্বাবুয়েকে স্বাধীন করতে সফল হলেও ম্যান্ডেলার মত ক্ষমতার লোভ ছেড়ে নিভৃত জীবনযাপন করতে চাননি। একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু করে সাইত্রিশ বছর ধরে দেশকে শাসন করেছেন শক্ত হাতে, দেশের উন্নয়নের চেয়ে নিজের সম্পদের উন্নয়নের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এমনকি দেশ যখন অর্থনৈতিক ধস এবং দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হয়ে আছে তখনো এসবের দিকে মনোযোগ না দিয়ে তার একাধিক স্ত্রীর সাথে প্রমোদভবন জনরোষের সৃষ্টি করেছে।

ভিতরে ভিতরে জ্বলতে থাকা বিদ্রোহের সলতে বিস্ফোরণে রূপ নেয় যখন নভেম্বর মাসে স্ত্রীর প্ররোচনায় নিজের দল জানুপি-এফ এর সহকারী নেতা এমারসন নাগাগুয়াকে তিনি সরাতে যান, পরে তাকে জোর করে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়।

স্পেনের অক্টোবর স্বাধীনতা

বছরের মধ্যভাগে ইউরোপে হঠাত করে অস্থীতিশীলতা শুরু হয় কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে। এমনিতেই অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত স্পেন কিভাবে মন্দা কাটিয়ে উঠবে তা নিয়ে কূল পাচ্ছেনা,এরমধ্যে স্পেনের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী অঞ্চল কাতালোনিয়া স্বাধীনতার ডাক দেওয়ায় স্পেন দিশেহারা হয়ে পরে।স্বাধীনতার ভোটে প্রায় আড়াই মিলিয়ন মানুষ অংশগ্রহণ করে এবং তাতে নব্বই শতাংশ ভোট স্বাধীনতার পক্ষে আসে। এই আন্দোলনের একপর্যায়ে আন্দোলনরত মানুষের উপর রাবার বুলেটসহ জলকামান ব্যবহারের ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। আপাতদৃষ্টিতে এই আন্দোলন শান্ত হয়েছে বলে মনে হলেও আবার নতুন করে শুরু হতে পারে কয়েকমাস পরেই, কারণ স্বাধীনতার নেশা যাদের রক্তে মিশেছে তারা এত সহজে হার মানবেনা।

কাতারের উপর নিষেধাজ্ঞা

হঠাৎ করে সন্ত্রাসবাদে উস্কানি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্টের দায়ে কাতারের উপর অন্যান্য আরব দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সত্যিই অদ্ভুত এক ঘটনা। জুন মাসে আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ আরো চৌদ্দটি দেশ এই নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করলেও এর পিছনে যে সৌদি আরবেরই প্রধান ভুমিকা রয়েছে তা কারো কাছে অজানা নয়। তবে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী দেশ কাতার পাশে পেয়েছে তুরস্ক এবং ইরানের মত শক্তিশালী দেশগুলেওকে। এখন দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়।

সৌদি আরবের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন

 

কয়েকবছর আগে ঘটা “আরব বসন্ত” এর সময় সৌদি আরবের রাজপরিবার অনেক কষ্টে তার নাগরিকদেরকে এসব থেকে বিরত রেখে নিজেদের গদি সামলিয়েছে,কিন্তু সৌদি আরবের রাজনীতি এবছর সত্যিকারের অস্থিতিশীলতার মধ্যে যাচ্ছে।জুন মাসে সৌদি বাদশাহ সালমান তার পূর্বনির্বাচিত রাজউত্তরাধিকার ভাতিজা মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে উত্তরাধিকার নির্বাচিত করার মাধ্যমে এই ঝামেলার সূত্রপাত। বত্রিশ বছর বয়স্ক মোহাম্মদ বিন সালমান নতুন পদ পেয়েই তার “ভিশন ২০৩০” বাস্তবায়নে কাজ করা শুরু করেন,যেখানে তিনি আরব সাম্রাজ্যের তেলের উপর নির্ভরতা কমানো এবং সামাজিক আধুনিকায়নের কথা উল্ল্যেখ করেন। এরপর সৌদি আরবে ঘটে গিয়েছে বেশ কিছু পরিবর্তন; নারীদের ড্রাইভিং এর অনুমতি দেওয়া, বিদেশী কনসার্টের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে ফেলা, সোফিয়া নামক রোবট তৈরি করে তাকে দেশের নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া এসব কাজের মাধ্যমে অনেকেই মনে করছেন যে মোহাম্মদ বিন সালমান এর হাত ধরেই সৌদি আরবের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তবে নিজের ক্ষমতার পথকে প্রশস্ত করার জন্য মোহাম্মদ বিন সালমানের নিজের সম্পদশালী আত্মীয়দের কোনো নোটিশ ছাড়াই একটা ফাইভ স্টার হোটেলে বন্দী করে রাখা এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা নিয়ে অনেকেই তাকে “মাথা গরম ছোকরা” বলে অভিহিত করছেন।

এসব ঘটনাগুলো ২০১৭ সালের বিশ্বরাজনীতিকে উত্তপ্ত করে রাখলেও এদের রেশ কিন্তু রয়ে যাবে ২০১৮ সাল কিংবা তার পরবর্তী বছরগুলোতেও। তবে এসব সংঘাতময় রাজনীতির কুটিল হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে আমাদের আশা রইল শান্তিপূর্ণ এবং যুদ্ধমুক্ত এক নতুন বছরের।

 

তথ্যসুত্রঃ

Most Popular

To Top