নাগরিক কথা

আমাদের জাতীয় স্লোগান কোনটি?

ঘটনাটা এইতো গেলো মে মাসের। ভুল না করে থাকলে মে মাসের ৩০ তারিখের। বাংলাদেশ ভার্সেস ইন্ডিয়ার মধ্যকার ওয়ার্ম আপ ক্রিকেট দেখতে গিয়েছি। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শুরু হবার ঠিক একদিন আগের খেলা। যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশ ওইদিন ৮৭ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিলো। খুবই বাজে একটা দিন ছিলো আমাদের জন্য সন্দেহ নেই।

ওভাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামটা লন্ডনে। সুতরাং প্রচুর লোকের সমাগম হয়েছিলো ওয়ার্ম আপ ম্যাচ হবার পরেও। বাংলাদেশের চেয়ে ইন্ডিয়ার সমর্থক মাঠে বেশী ছিলো।

খেলা চলার সময় দেখতে পেলাম ভারতের সমর্থকেরা স্লোগান দিচ্ছেন “বন্দে মাতরম” কিংবা “ভারত মাতা কি জয়” এই জাতীয়। ওদের কেউ একবার এই দুইটা স্লোগান দিলে সবাই মিলে সমস্বরে একই স্লোগান দিচ্ছে। কোন বিভেদ নেই, কনফিউশন নেই।

কিন্তু আমাদের দর্শকরা? আমরা ঠিক কি করব বুঝতে পারছিলাম না। এক কোনা থেকে আমাদের কিছু দেশী ভাই স্লোগান দিতে না পেরে মৃদু স্বরে ইন্ডিয়ানদের খুব সম্ভবত গাল দিয়ে উঠলো “হালার পো হালা” বলে। অথচ গাল দেবার কিছু নেই। প্রতিটি দেশ তার নিজ দলের সমর্থন করবেই।

এক কোনা থেকে স্লোগান উঠলো, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। কেউ গলা মেলালো, কেউ মেলালো না।

আবার এক যায়গা থেকে ডাক উঠলো জয় বাংলা। এবারও কেউ মেলালো, কেউ মেলালো না।

আমি এবং পাশে বসে থাকা ব্যারিস্টার মঞ্জু ভাই আমরা খুব বিব্রত হয়ে তাকিয়ে আছি আর আফসোস করছি। কেন আমাদের একটি সমস্বরের স্লোগান নেই?

আমাদের ঠিক সামনে বসা এক ভদ্রলোক, মধ্য বয়ষ্ক। নাম জানা নেই। আমাদের কথা শুনে খুব আক্ষেপ করে যা বললেন তার সার কথা হচ্ছে-

“মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ বছর পরেও আমাদের দেশের রাজনীতির মত আমাদের স্লোগানও বিভক্ত হয়ে আমাদের আলাদা করে দিয়েছে। একটি দেশ, একটি পতাকা অথচ ক্রিকেট মাঠে গলা ফাটিয়ে আমরা “জয় বাংলা” বলতে বিব্রত বোধ করি”

ভদ্রলোক যা বলেছেন সেটিতে সেদিন আমাদের কোনো দ্বিমত ছিলোনা। বরং ভারাক্রান্ত বুকে সেদিন খুব গভীর করে বুঝেছিলাম এই দেশের দুই ভাগে নিরব বিভাজন হয়ে থাকার কষ্টের উপাখ্যান।

জয় বাংলা স্লোগানটি এত বেশী শক্তিশালী, এত বেশী তীব্র এবং এত বেশী জাতীয়তাবাদী আবেগময় যেটি একবার গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললেই বুঝতে পারা যায়।

গনজাগরণ মঞ্চের দিনগুলোতে এই স্লোগানটি আমাদের খুব কাছে এসে ধরা দিয়েছিলো। অথচ আওয়ামীলীগের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে এটি কেবল মাত্র আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক স্লোগান। কি ভয়াবহ একটা ভাবনা!!! ভাবা যায়?

ওভালে সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা আমাকে প্রতিটি দিন হন্ট করে গেছে। আজও করছে। বলা যায় সেই দুঃস্বপ্ন কাটাতেই আজকের এই লেখাটা। যদি বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করে দুঃখ কিছুটা ছড়িয়ে দেয়া যায়। মানুষ খুব সম্ভবত নিজের দুঃখ গুলোকে সবার সাথে ভাগ করে নিতে চায়। একা একা এইসব ব্যাপারগুলো আসলে বয়ে বেড়ানো বড় যন্ত্রণার।

একটি রাষ্ট্র কতভাবে বিভাজিত হয়ে রয়েছে। নেই সংস্কৃতিগতভাবে ঐক্য, নেই রাজনৈতিক একটা কমন ঐক্য, নেই চিন্তার একটা শৃংখল ধারা এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পর্যন্ত ইচ্ছেমত প্রতিদিন, প্রতিমাসে কাটাছেঁড়া করা হয়।

আমাদের ছেলেরা মাঠে ক্রিকেট খেলতে যায় লাল-সবুজের জার্সি পড়ে। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে সারা বিশ্বের মানুষের সামনে। আর আমরা তাঁদের অনুপ্রেরণা দিতে জোর গলায়, চিৎকার দিয়ে একটা স্লোগান দিতে পারিনা, গলা ফাটিয়ে জয় বাংলা বলতে পারিনা সবাই… আমাদের এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আমাদের ভেতরে ভেতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। চোখের সামনে এই পতন দেখতে পাই…

এমন দুঃখ রাখবার জায়গা কই?

Most Popular

To Top