নাগরিক কথা

পাঁচে নয়, ওয়ারফেজকে তুলে আনবো এক নাম্বারে!

জীবন নিয়ে খুব হতাশায় ছিলাম, কোন লক্ষ্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমনকি ফ্যানে দড়ি বেঁধে ঝুলার আগে শেষ সেলফ ডিফেন্স হিসাবে অল্টারব্রিজ ব্যান্ডের গান শুনা শুরু করে দিয়েছিলাম, কিন্তু এবার সেটাও কাজে দিচ্ছিলো না। ঝুলে যাওয়াটা মনে হচ্ছিলো স্রেফ সময়ের ব্যাপার! কিন্তু আর নয় সময়, উদ্দেশ্যহীন মিছিলে। ভরাবো মন অন্তহীন রঙিন এক উৎসবে! জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছি মাইরি!

আমার জীবন বাঁচানোর সম্পূর্ণ ক্রেডিট সেইসব মিডিয়ার, যারা রিপোর্ট করেছে ওয়ারফেজ সারা বিশ্বের সব হার্ডরক ব্যান্ডের মধ্যে ৫ম স্থান দখল করার গৌরব অর্জন করেছে। আর এই রিপোর্টগুলো পড়ামাত্রই আমি খুঁজে পেলাম জীবনের উদ্দেশ্য। পাঁচে নয়, ওয়ারফেজকে তুলে আনতে হবে একদম এক নাম্বারে! নাইলে কি আর দেশের সম্মান থাকে নাকি ভায়া?

তো কিভাবে সম্পন্ন হবে এই মহাযজ্ঞ, তা নিয়েই লিখতে বসলাম।

প্রথমে, আজকে রাতেই ঢুকবো দাটপটেনস ডটকম সাইটে। যারা জানেন না, তাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে যাই, এই ওয়েবসাইটের লিস্টিং দেখেই রিপোর্ট করেছে সাংবাদিকরা, আর সেগুলোই শত শত শেয়ার হচ্ছে। তো যাই হোক, সাইটে গিয়ে যেই লিস্টে ওয়ারফেজ ৫ নাম্বারে আছে ওইটার ইউআরএল (লিংক/ওয়েব অ্যাড্রেস)কপি করবো। করে এরপর সেই ইউআরএল একের পর এক ইনকগনিটো ট্যাবে খুলে ভরিয়ে ফেলবো ব্রাউজার, যতক্ষণ না পিসি’র ভিতর থেকে স্মোক মেশিনের মত ধোঁয়া বের না হয়। এরপর একটার পর একটা ট্যাবে ঢুকবো আর ওয়ারফেজকে একটা করে ভোট দিয়ে আসবো।

কসম খেয়ে বলছি, সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মামলা। ওয়ারফেজকে যদি এক সপ্তাহের মধ্যে এক নাম্বারে আনতে না পারি তাহলে নিজের নাম পাল্টে চাংকু মাংকু রাখবো।

তো এখন কথা হচ্ছে, এই যে এক সপ্তাহ ক্লিকবাজি করে দেশের নাম উজ্জ্বল করবো, এটার তো একটা দাম আছে, তাই না! মানে বিষয়টা এমন না যে আমি পছন্দের ব্যান্ড এবং সেইসাথে দেশের নাম উজ্জ্বল করার বিনিময়ে টাকাপয়সা চাচ্ছি। ছি ছি, কি লজ্জার কথা! তার উপর এই কাজের জন্য টাকাপয়সা চাইলে তো মানুষজন আমাকে “প্রফেশনাল ক্লিকবাজ” ডাকা শুরু করবে! এই নাম নিয়ে সমাজে মুখ দেখাবো কি করে?

তবে তারপরেও দেশের সম্মান আগে। দেশের এবং প্রিয় ব্যান্ডের নাম উজ্জ্বল করতে যদি নিজের নাম খারাপ হয় তবে হোক! ভাল কাজে নামলে পিছনে বাজে কথা শুনানোর লোকের অভাব হয় না। তো এখন টাকাপয়সা নিবো কার কাছ থেকে?

ওয়ারফেজের কাছে যাওয়া যাবে না। কারণ তারা জানে যে দা টপ টেনস এর এই র‍্যাংকিং এর কোন দামই নাই, বরং এই র‍্যাংকিং নিয়ে লাফানো মানে প্রকারান্তরে ওয়ারফেজকে অপমান করা। তাহলে উপায়? কোন কর্পোরেট হাউজকে ধরবো? কিন্তু কর্পোরেট হাউজগুলো তো নিজেদের ফায়দা না থাকলে কোন স্পন্সর করবে না। তাহলে ওয়ারফেজ এক নাম্বারে উঠলে লাভ কাদের?

হিসাব করে দেখলাম অনলাইন নিউজগুলোর কাছে স্পন্সর চাওয়া যায়। কেননা ওয়ারফেজ পাঁচে উঠেছে এই খবরেই তাদের যে কাটতি হয়েছে, এক নাম্বারে উঠলে তো পুরো দেশ কাঁপবে! লক্ষাধিক ক্লিক পড়বে প্রতি ঘন্টায়, লাইক-কমেন্ট-শেয়ার হবে হাজারে-হাজারে। তো সেখান থেকে এই অধমকে দু’টো পয়সা দিলে কি এমন ক্ষতি? বরং আজকে হার্ড রক ব্যান্ডের লিস্টে এক নাম্বারে ওয়ারফেজকে নিতে পারলে পরবর্তী এক মাসের মধ্যে অল্টারনেটিভ ব্যান্ডের লিস্টে নেমেসিস/আর্বোভাইরাসকে তুলে দিলাম, এমনকি যদি প্রয়োজন পড়লে বিশ্বসেরা র‍্যাপার এর তালিকায় আমাদের দেশী ভাই ALI GSTER কে তুলে আনলাম। এরপর বিশ্বসেরা নায়কের লিস্টে শাকিব খান/ অনন্ত জলিল সাহেবকে তুলার প্রজেক্টও মাঠে নামানো যায়। একটা করে লিস্ট বিজয় মানেই একটা করে ভাইরাল নিউজ। প্রতি সপ্তাহে লক্ষ-কোটি ওয়েবসাইট ট্রাফিক! ভাবতেই শরীরের প্রতিটি পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে পুলকে!

এখন অনেকে ভাবতে পারেন, ওয়ারফেজের সাথে আমার সমস্যা কি, ওয়ারফেজের এই আনন্দের খবর আমি ব্যাঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করছি কেন? প্রথমত, ওয়ারফেজের ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সমস্যা নেই, তারা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের টপ ব্যান্ডগুলোর একটি এবং নিজেদের সামর্থ্য-মেধা-মনন-ডেডিকেশন এর বিনিময়েই তারা দশকের পর দশক ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেছে। বরং আমার সমস্যা এই ধরণের সাংবাদিকতায়। দা টপ টেনস খারাপ ওয়েবসাইট না, কিন্তু এই ওয়েবসাইটের র‍্যাংকিং নিয়ে রিপোর্ট করা পুরোপুরি ভাবে হাস্যকর। এগুলো পাবলিক পোলিং সাইট, একজন চাইলেই হাজার-হাজার ভোট রেজিস্টার করতে পারে এই সাইটে একজন প্রার্থীর নামে। আর সে কারণেই এই সাইটের ভোটে র‍্যাংকিং বিচার করা, আর ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের পরীক্ষায় হাজার-হাজার “আই অ্যাম জিপিএ-ফাইভ” এর মূল্য প্রায় একই সমান।

আপনি যদি এই সাইটের অন্যান্য লিস্টে ঢুকেন, তাহলে এর নমুনা বেশ ভালভাবেই দেখতে পারবেন। উদাহরণ দেই, বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ নেতার তালিকায় এই ওয়েবসাইটে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা এবং ইংলাক সিনাওয়াত্রা। তাদের পিছনে তৃতীয় স্থানে আছে অ্যাডলফ হিটলার! বিদেশের হিসাব বাদ দেই, দেশের হিসাবে আসলে আপনি একটা লিস্ট পাবেন “Best Prime Ministers of Bangladesh” নামে। এখানে ঢুকলে দেখবেন এক নাম্বারে আছেন বেগম খালেদা জিয়া, দুই-এ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, তিনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, চারে কাজী জাফর আহমেদ, পাঁচে ফখরুদ্দিন আহমদ, ছয়ে তাজউদ্দিন আহমেদ! এখানে খেয়াল করুন, এই ছয়জন প্রধানমন্ত্রীর ছোট্ট লিস্টে দুইজন কখনো প্রধানমন্ত্রী-ই ছিলেন না! হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ছিলেন রাষ্ট্রপতি, ফখরুদ্দিন আহমদ ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এখন আমি যদি এই ভিত্তিহীন তালিকা দেখে একটা ফিচার ছেপে দেই পত্রিকায়, তাহলে তার মূল্য কি লক্ষ-লক্ষ মানুষের মাঝে ভুল তথ্য ছড়ানো বাদে?

সুতরাং, সময় থাকতে ভাল হোন। যেকোন নিউজ দেখলেই সেটি বিশ্বাস করে বসার অভ্যাস ত্যাগ করুন। আপনি-আমি এরকম ভিত্তিহীন সংবাদ পড়তে পছন্দ করি বলেই এই অনলাইন পোর্টালগুলো এসব সংবাদ প্রকাশ করে। বাজারে যেটার ডিমান্ড বেশি, সাপ্লাইও তো সেটারই বেশি থাকবে, না? তাই প্রশ্ন করুন সংবাদের প্রতিটি তথ্যকে, যাচাই করে দেখুন প্রতিটি রেফারেন্স। যদি রেফারেন্স না থাকে, একেবারেই ত্যাগ করুন সেই সংবাদ। অযথা ভুয়া তথ্য শেয়ার করে নিজের গ্রহণযোগ্যতা না কমানোই কি ভাল না?

যাওয়ার আগে শেষ কথাঃ আমার পাগলামীর জন্য বসে নেই মানুষজন। গতকাল এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হবার ২৪ ঘন্টা পার হবার আগেই এরই মধ্যে ওয়ারফেজ লিস্টের চতুর্থ পজিশনে উঠে এসেছে। এক-এ উঠতে দুই-তিনদিনের বেশি লাগার কথা না। সুতরাং সাম্প্রতিক সময়ে “সর্বকালের সর্বসেরা ব্যান্ড বাংলাদেশের ওয়ারফেজ” শিরোনামে কোন খবর নিউজফীডে ভেসে আসলে সেটিতে ক্লিক করে মূল্যবান মেগাবাইট খরচ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে!

Most Popular

To Top