ইতিহাস

যেভাবে মুক্তি পেলেন বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব

এদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে আপনি যদি বিশেষ কিছু চরিত্র নিয়ে আলোচনায় যান তবে সর্ব প্রথম ও সর্বাগ্রে নাম আসবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের। সেটা আপনি যে আঙ্গিক থেকেই আলোচনা করুন না কেন। তাঁর জেল জীবনের স্পেসিফিক সময়টা চার হাজার ছয়শত বিরাশি দিন।

এই দীর্ঘ পরিক্রমায় তাঁর কাছে সর্বদাই একজন নারী চরিত্রের উপস্থিতি ছিল। তিনি আর কেউ নন, তিনি বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। শেখ মুজিবের বিশাল ব্যক্তিত্বের কারনে যিনি অনেক সময়ই আড়ালে থেকে গেছেন।

আজ এই নারীকে নিয়ে কিছু লিখব। অর্থাৎ বিজয়ের এই দিনে শেখ ফজিলাতুন্নেসা কি অবস্থায় ছিলেন অথবা তাঁকে তাঁর পরিবারসহ কিভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল সেই বিষয় নিয়ে লিখব।

চলুন ঘুরে আসি আজ থেকে ছেচল্লিশ বছর আগে। ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের ২৬ নম্বর বাড়ী থেকে।

*
১২ ই মে ১৯৭১ জেনারেল ওমরের নির্দেশে মেজর হোসেন গ্রেফতার করে নিয়ে যায় শেখ ফজিলাতুন্নেসা, শেখ হাসিনা, এ ওয়াজেদ মিয়া, মমিনুল হক খোকা, শেখ জামাল সহ পরিবারের আরো কয়েকজন সদস্যকে এবং তাঁদের অন্তরীণ করে রাখা হয় ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের ২৬ নম্বর বাড়িতে (বর্তমান রোড ৯/এ)। তখন শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধের ফ্রন্টে। মুজিব পরিবার তখন লুকিয়ে ছিলেন মগবাজারের কোন এক ভদ্রমহিলার বাড়ীতে এবং সেই বাড়ীটা ছিল ২৫ শে মার্চের পর বদল করা তাদের ৮ম অথবা ৯ম বাড়ী। এই গ্রেফতারের পেছনে একটি পরিবারের ভুমিকা লক্ষণীয়। ইতিহাস ঘাটলে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পরিবারের ভুমিকা দেখা যায়। আমরা এই ভুমিকাকে পজিটিভ/নেগেটিভ দুভাবেই নিতে পারি।

*
মমিনুল হক খোকা, বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই। তিনি অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী কারন তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না কিন্তু শেখ মুজিবের সহচর ছিলেন সেই যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের আগ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। চলুন দেখি তিনি কি বলেন…

“পাকিস্তানী বাহিনী আত্নসমর্পন করেছে কিন্তু আমাদের বাসার প্রহরীরা নির্বিকার। অস্ত্রধারী প্রহরীরা বাইরের আন্দোলনে আরো হিংস্র হয়ে ওঠে। এমনকি বাসার সামনে পথচারীদের প্রতি গুলি চালাতেও তাদের দ্বিধা নেই (পাঠকের জন্য বলে রাখি: এই বাড়ীর খোঁজ নিতে আসা ছাত্রলীগের দুজন কর্মীকে প্রহরীরা গুলি করে মেরে ফেলেছিল ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে, আমরা সেই দু’জন ছাত্রের নাম আজো জানতে পারিনি)। প্রায় দু’দিন পর শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের মুক্ত করতে ভারতীয় কোম্পানি কমান্ডার মেজর তারা আসেন ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে। লাউড স্পীকারে পাকিস্তানী সৈন্যদের বোঝাতে শুরু করেন যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। তারা যদি এখনও অস্ত্রসমর্পন না করে তাহলে তাদের পরিনতি হবে ভয়াবহ। মেজর তারার এই বক্তব্যে পাক সেনাদের চৈতন্যোদয় হলো।

পাক সুবেদার মেজর তখন তারার কাছে এক ঘন্টা সময় চাইলো। মেজর তারা যখন রাজি হয়ে ফিরে যাবে, আমি তাঁকে ডেকে বললাম, ‘প্লিজ আপনি যাবেন না, এক ঘন্টা সময় পেলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে’! মেজর তারা তখন পাক সুবেদারকে নিরস্ত্র হতে বললেন। পাকিস্তানী সেনাদলের স্থান ত্যাগ নিশ্চিত করে মেজর তারা বাসার সবার সঙ্গে দেখা করলেন।

১৯ শে ডিসেম্বর সামরিক পোশাকে সজ্জিত কামাল ও জামাল বিজয়ীর বেশে ফিরে এল।”

শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার সাথে মমিনুল হক খোকা

[একাত্তরে সপরিবারে যুদ্ধবন্দী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কিভাবে সামলেছেন পুরো সংসার, আর সে সময়ই অন্তঃসত্তা শেখ হাসিনা’র কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন সজীব ওয়াজেদ জয়, তার বিস্তারিত পড়ুন- “বঙ্গমাতার সংগ্রাম ও একাত্তরের জয়”]

*
মরহুম এ. ওয়াজেদ মিয়া, শেখ মুজিবের জামাতা। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী। তিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন মুজিব পরিবারের অবস্থা। চলুন তাঁর মুখ থেকেই শুনে আসি…

“১৬ই ডিসেম্বর ভোর ছয়টায় পি. জি. হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক নূরুল ইসলাম আমার কেবিনে এসে গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘ড. ওয়াজেদ, ভারতীয় বিমান বাহিনী আজ নয়টার পর ক্যান্টনমেন্টের উপর কার্পেট বোম্বিং করলে পি. জি. হাসপাতালও আক্রান্ত হতে পারে। অতএব আমার পরিবার সহ আপনি আপনার দাদা-শ্বশুর, দাদী-শাশুড়ী ও ফুফুকে নিয়ে বাসায় যান। যদিও এম্বুলেন্সে পর্যাপ্ত জ্বালানী নেই, তবুও এর জন্য চেষ্টা করে ব্যবস্থা একটা নিতে হবে’। আমি ১৬ই ডিসেম্বর সকাল আটটায় হাসপাতাল ত্যাগ করি।

১৬ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় লোক মারফত খবর নিয়ে জানতে পারি যে, তখনও ১৮ নম্বর রোডস্থ ২৬ নম্বর বাড়ীটিতে পাকিস্তানী আর্মির সৈন্যরা প্রহরারত রয়েছে। কিন্তু শ্বাশুড়ী, হাসিনা, রাসেল, জয় ও অন্যরা কি অবস্থায় রয়েছে সে সম্পর্কে কেউই সঠিক তথ্য দিতে পারলো না।

পরদিন অর্থাৎ ১৭ই ডিসেম্বর সকাল ৮ টার দিকে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডস্থ বাড়ীর পশ্চিম পাশের বাসার (শারায়ে খাম) ডা. এ সামাদ খান চৌধুরী, তাঁর মেঝো ছেলে, এ আহাদ খান চৌধুরী এবং এ কে এম মোশাররফ হোসেন সহ আমি একটি গাড়ীতে করে ধানমন্ডি বালিকা বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের ২০ নম্বর রাস্তা হয়ে ১৮ নম্বর রাস্তায় প্রবেশ করে ধীরে ধীরে ঐ বাড়ীটির দিকে অগ্রসর হই। বাড়ীটির পাশে পৌঁছানো মাত্রই সেখানকার একজন সৈন্য গাড়ীটির দিকে বন্দুক তাক করে আমাদেরকে থামতে আদেশ করে। তখন বিপদের ঝুঁকি সত্ত্বেও আমি গাড়ী থেকে নেমে দু’হাত উঁচু করে দাঁড়ালে – হয়তো আমাকে চিনতে পারে- সে আমাদের গাড়ীকে বাড়ীটির গেইটের কাছে নিয়ে যেতে বলে। সেখানে পৌঁছে ভেতরে কোন লোকজনের সাড়াশব্দ না পেয়ে সেখানে অবস্থানরত দু’জন সৈন্যকে “একটু পর আবার আসবো” বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করি। এরপর আমি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে গিয়ে সেখানে অবস্থিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাকে আমার পরিচয় দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে অবহিত করি।

১৮ই ডিসেম্বর সকাল আটটার দিকে আমি হাঁটতে হাঁটতে ঐ রাস্তার পশ্চিমের রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে ১৮ নম্বর রাস্তার দিকে পৌছালে সেখানে বঙ্গবন্ধুর সেই সহকর্মী ও সহকারী (পার্সোনাল এইড) গোলাম মোরশেদ সাহেবকে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন অবস্থায় বাড়ীটির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখতে পাই। তিনি দীর্ঘ ন’মাস কারারুদ্ধ (পাঠকদের জন্য : একই সাথে শেখ মুজিব এবং এই গোলাম মোরশেদ সাহেবকে গ্রেফতার করা হয় ২৫শে মার্চ রাতেই ৩২ নম্বর থেকে। এবং ভয়ংকর নির্যাতন করা হয় তাঁকে। তিনি মুক্ত হন ২৫শে নভেম্বর ১৯৭১। তিনি বর্তমানে মোহাম্মদপুরে বসবাস করছেন) থাকার পর মাত্র কয়েকদিন আগে মুক্তি পেয়েছেন, আমাকে একথা ক’টি জানিয়েই বললেন, “একটু সাবধানে থাকুন। ঐ বাড়ীতে ভারতীয় বাহিনীর এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে মেজর তারা সেখানে অবস্থানরত পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে আত্নসমর্পনের চেষ্টা করছেন”।

প্রায় আধাঘণ্টা ধরে পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্নসমর্পনে রাজি করিয়ে দু’টো গাড়ীতে তাদের দ্রুত নেয়ার মুহুর্তে আমরা দু’জন সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। ততক্ষনে অনেক লোকজন সেখানে পাকিস্তানী সৈন্যদের অপদস্ত করা শুরু করে। মেজর তারার অনুরোধে জনতা কিছুটা শান্ত হয়। যে দুজন পাকিস্তানী সৈন্যের সহায়তায় শেখ জামাল ঐ বাড়ী থেকে আগস্ট মাসে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল তাদের যেন কোন শাস্তি দেয়া না হয় তার জন্য আমার শাশুড়ি মেজর তারাকে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করেন।

১৯শে ডিসেম্বর কামাল ও জামাল যুদ্ধফ্রন্ট থেকে ঐ বাসায় ফিরে আসে। তাদের পরনে ছিল সামরিক পোশাক। শেখ কামাল মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানী’র এ. ডি. সি নিযুক্ত হয়েছিলো। শেখ জামাল  মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।”

বঙ্গবন্ধুর জামাতা এ ওয়াজেদ মিয়ার বই থেকে পাওয়া শেখ পরিবারের ছবি।

*
বঙ্গবন্ধুর পার্সোনাল এইড হাজী গোলাম মোরশেদের সাক্ষাতকারের কিছু অংশ শুনে আসি চলুন(সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন তাজউদ্দিন কন্যা শারমিন আহমদ, তারিখ: ৬.৭.২০১২)

“১৭ই ডিসেম্বর সকালে নামাজ পড়ে আমার মামাতো ভাই আবুল ইলিয়াস মজিদ। ওনার গাড়ী করে ভাবী (বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব) যেখানে বন্দি আছে সেটা খুঁজে খুঁজে সেখানে গেলাম। ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডে। তো আমার মাথায় টুপি দাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে গেটের কাছে যেতেই আর্মি গার্ড বলে ‘মাত আও’!

তো আমি ভয়ে পিছিয়ে আসলাম। খানিক দূরে আসলে দেখি এম. ই চৌধুরী সি এস পি আর হাতেম আলী খান চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওনারা হেঁটে যাচ্ছেন মর্নিং ওয়াক করে। ওনাদের দু’জনকে আমি চিনতাম। আমাকে দেখে বলেন ‘করছেন কি, কাল বিকালে এখানে দু’জনকে গুলি করে মেরেছে’। তখন আমি চলে আসলাম। ভাইকে সাথে করে সার্কিট হাউজে ঢুকলাম। সেখানে দেখলাম একজন মেজর জেনারেল গনজালভেস। ওনাকে বললাম ‘মুজিব ভাইয়ের Family in serious condition- army may kill her at any time’ তখন উনি শিখ জেনারেলের সাথে কথা বলেন। Two star না three star জেনারেল মনে নেই। তিনি মেজর রাজাকে (হতে পারে মেজর রাজার অন্যনাম মেজর অশোক তারা) আমার সাথে পাঠালেন। আরেক ভদ্রলোক ওনাকে গাড়ী অফার করলো। দুই গাড়ীতে আমরা আসলাম।

ওনার (মেজর অশোক তারা) কোমরে একটা মাত্র গ্রেনেড, হাতে কোন অস্ত্র নেই। ওনার সেপাইদের হাতে অস্ত্র আছে। সেপাইদের পেছনের বাড়ীতে রাখলেন। উনি একাই হেঁটে গেটের কাছে গেলেন। ওদের সাথে কথা বললেন। তখন ওরা টার্ম দিল যে, ‘আমাদের আর্মস- অ্যামুনেশন নিয়ে যদি চলে যেতে দাও। তাহলে আমরা কিছুই করবো না। না হলে সব ম্যাসাকার করে দিয়ে যাব’। ওদের কাছে মাইক্রোবাস ছিল- মেজর রাজা(আসলে তারা হবে) বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমরা আর্মস-অ্যামুনেশন নিয়ে চলে যাও’। তখন ওরা সবকিছু নিয়ে ৫/৭ জন ছিল, চলে গেল।

ভেতরে ঢুকে দেখলাম সবাই বসে আছে। হাসু বসে আছে, রেহানা বসে আছে, তারপর রাসেল বসে আছে। খোকা ভাই আছেন। আমি ভাবিকে সালাম করলাম- এরপর সম্ভবত শমসের মুবিন চৌধুরীর মা বাড়িতে ঢুকলেন। তিনি দেখা করে চলে গেলেন- আমি চলে আসলাম।”

লেখক গোলাম মোরশেদের বই থেকে সংগৃহিত।

*
পর্দার পেছনের ঘটনা গুলো আমাদের অনেক ইতিহাসের সাক্ষী দেয়। প্রত্যেকটি ইতিহাসের কার্যকারণ আছে, আছে তার পরবর্তী ঘটনাবলীর যোগসূত্র। বেরিয়ে আসুক ইতিহাস, বেরিয়ে আসুক সত্য।

গ্রন্থ সহায়তা:

* অস্তরাগে স্মৃতি সমুজ্জল: বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও আমি – মমিনুল হক খোকা।
* বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ- এ.ওয়াজেদ মিয়া
* তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা- শারমিন আহমদ

লেখকঃ নাজমুল হুদা

Most Popular

To Top