ইতিহাস

ব্যাটেল অফ শিরোমণি

ব্যাটেল অফ শিরোমণি

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। স্বাধীনতা, ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাঙালিদের স্বাধীনতা। পুরো দেশ যখন আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছে ঠিক সেই সময় দেশের অপর প্রান্ত দক্ষিণে চলছে তুমুল যুদ্ধ। জেনারেল নিয়াজী যখন তার সৈন্যদের সাথে নিয়ে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনসম্মুখে অস্ত্র ফেলে দিল তখন সারা দেশ থেকে পালিয়ে বেড়ানো পাক হানাদার বাহিনীরা খুলনায় তাদের অবস্থানকে আরো শক্ত করে তুললো। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও শুধুমাত্র সাহায্য পাবার এক উড়ো খবরের বশে আত্মসমর্পণ না করে খুলনার বিভিন্ন স্থানে তারা গড়ে তুলেছিল শক্ত প্রতিরোধ। মুক্তিযোদ্ধারাও জয়ের নেশায় উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। উভয়ের কাছে এটি ছিল এক সম্মানের লড়াই। রুদ্ধশ্বাস করা এই লড়াইয়ের এক দিন পর ১৭ ডিসেম্বর খুলনাকে স্বাধীনতা এনে দিলো মুক্তি বাহিনী ও মিত্র শক্তি।

শিরোমণিতে অবস্থান নেওয়া ট্যাঙ্ক; Source: www.amarblog.com

এই যুদ্ধটি আর পাঁচটি সাধারণ যুদ্ধের মতো ছিল না। কেননা এই যুদ্ধে বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, পদাতিক বাহিনী, ট্যাঙ্ক এর সমন্বিত অংশগ্রহণ ছিল। তাছাড়া নিয়াজী যেহেতু অস্ত্র ফেলে দিয়েছিল সেহেতু খুলনাকে মুক্ত করা অপরিহার্য হয়ে পরেছিল। সে সময় খুলনার টুটপাড়া, গল্লামারী রেডিও স্টেশন (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা), খুলনা লায়ন্স স্কুল, শিপইয়ার্ড, পিএমজি কলোনি, সাত নম্বর জেটি, নিউ ফায়ার ব্রিগেড স্টেশন, ওয়াপদা ভবন, গোয়ালপাড়া, গোয়ালখালি, শিরোমণি, গিলাতলা, আটরা, তেলিগাতি, শোনাগাতিয়া সহ বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানিরা স্থান নেয়। তবে ইতিহাসের সেরা ট্যাঙ্ক যুদ্ধগুলোর মধ্যে একটি হয় এই শিরোমণিতে। এই যুদ্ধটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে এর কাহিনী, স্ট্রাটেজি, টেকনিক, ডেডিকেশন, লিডারশীপ এর কথা ভারত, ইউরোপ, পোলান্ডসহ বিশ্বের প্রায় ৩৫ টি দেশের ডিফেন্স কলেজগুলোতে পড়ানো হয়। এই যুদ্ধকে ঘিরে রয়েছে অনেক রোমাঞ্চকর গল্প-কাহিনী আছে মিথও। চলুন জেনে আশা যাক কি হয়েছিল সেদিন খুলনার শিরোমণিতে……

শুরুটা করা যাক ৬ ডিসেম্বর থেকে। সেদিন ভোরে হঠাৎ করেই কিছুটা রহস্যজনক ভাবে পাকিস্তানিরা যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছাড়তে শুরু করে। তাদের কাছে ক্যান্টনমেন্ট ছিল এক দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো। ক্রমাগত ২ দিন ধরে পিছু হটা শত্রুদের মধ্যে জেনারেল আনসারির নেতৃতে ৫৭ ব্রিগেড মাগুরার দিকে রওনা হয় এবং খুলনায় অবস্থানরত অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার মালিক হায়াত খান তার ১০৭ বিগ্রেডকে খুলনায় নিয়ে আসেন। এদের মধ্যে ছিল ৬ ও ১২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, ১৫ ও ২২ এফএফআর, ৫৫ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ভয়ঙ্কর এম-২৪ ট্যাঙ্ক, এবং সাথে ছিল রাজাকার ও আল-সামশ বাহিনী এছাড়া একটি ব্রিগেড সেখানেই অবস্থান করে। ক্যান্টনমেন্টের মত সুরক্ষিত জায়গা ছাড়বার দুটি কারণ হায়াত খানের আত্মসমর্পণের পর জানা যায়। প্রথমত সাহায্যের জন্য মার্কিন সপ্তম নৌবহর আগমনের খবরে খুলনা দিয়ে সমুদ্র পথে পালিয়ে বাঁচবার আশায় এবং দ্বিতীয়ত নিয়াজীর দুর্বল নেতৃত্ব ও ক্যান্টনমেন্টকে সুরক্ষিত না ভাবার কারণে। তাদের এই নতুন পদক্ষেপ এর কথা সর্বপ্রথম ওয়ারলেস এর মাধ্যমে ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ মঞ্জুর ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিংকে জানান। দলবীর সিং শুরুতে বিশ্বাস না করলেও পরে নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য থেকে নিশ্চিত হয়ে ৭ ডিসেম্বর খুলনার দিকে অগ্রসর হন। তাদের সাথে এই যুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলও নেতৃত্ব দেন।
এ দিকে ১০ ডিসেম্বর হায়াত খান তার দল নিয়ে খুলনার প্রবেশ মুখ ফুলতলা পৌঁছান। সেখান থেকে কিছুটা দূরে শিরোমণিতে তিনি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। সেখানে প্রায় ৪ কি.মি. জুড়ে তিনি শত্রুদের মোকাবেলায় শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি সেখানকার বিভিন্ন অবকাঠামোগুলোতে অস্থায়ী সদর দফতর, ব্যারাক, যোগাযোগ দফতর, ওয়ারলেস, টেলিফোন, হাঁসপাতাল স্থাপন করেন। এ যেন এক ছোট-খাট ক্যান্টনমেন্ট। সেখানে প্রায় ১৫-২০ গজ দূরত্বে বাঙ্কার খনন করা হয়, প্রচুর ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ৩২ টি ট্যাঙ্ক মোতায়েন করা হয়ে ছিল। এদিকে ১১ তারিখ মেজর এম এ মঞ্জুর কর্তৃক নিয়োজিত একটি দল দলবীর সিং-কে পথ দেখিয়ে যশোর থেকে খুলনা নিয়ে আসে সেখানে তাদের সাথে মিলিত হয় মুক্তিবাহিনীর একাশং ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন।

মেজর এম এ মঞ্জুর ; Source: www. somewhereinblog.net

এই অবস্থায় খুলনাকে পুরোপুরি শত্রু মুক্ত করতে দলে দলে মুক্তিযোদ্ধারা খুলনায় একত্রিত হতে থাকে। এদের মধ্যে ছিলেন মেজর জয়নাল আবেদিন খান, রহমত উল্লাহ দাদু, শেখ কামরুজ্জামান টুকু, মির্জা খায়বার হোসেন, লেফটেন্যান্ট আরেফিন, ইউনুস আলী ইনু, স ম বাবর আলীসহ মুজিব বাহিনীর এক শক্তিশালী দল। ১৪ তারিখ আরেকজন দুর্ধর্ষ নৌযোদ্ধা খিজির আলী তাদের সাথে মিলিত হন। এর মাঝে ১০ ডিসেম্বর লঞ্চে বসেই খুলনা আক্রমণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক ১৪ তারিখ খুলনার বিভিন্ন স্থানে একযোগে আক্রমণ শুরু হয়।
এদিকে ফুলতলায় অবস্থানরত পাকিস্তানিদের ওপর দলবীর সিং ভারতীয় বিমান বাহিনীকে জোরদার আক্রমণ চালান। সমগ্র খুলনার বিভিন্ন স্থানে মুক্ত যোদ্ধারা একযোগে আক্রমণ করে। এত এক পর্যায়ে পাকিস্তানিরা দিশেহারা হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধন শেষে ১২ তারিখ বিক্ষিপ্ত পাকিস্তানিরা শিরোমণিতে জড়ো হতে থাকে।
১৩ তারিখ মেজর মঞ্জুর ভারতীয় রাজপুত ডিভিশনের এক বিশাল বহর নিয়ে ফুলতলা আসেন। তার সাথে আরও যুক্ত হয় মুক্তিযোদ্ধা আলকাস কুদ্দুস, রেজোয়ান ও গণি । তারা ফুলতলার চৌদ্দ-মাইল এলাকায় অবস্থানরত শিখ বাহিনীর সাথে মিলিত হয়। পাকিস্তানিরা যাতে নদী পেরিয়া পালাতে না পারে সেজন্য তারা ইস্টার্ন জুট মিল এলাকা থেকে ভৈরব নদীর ওপারে ট্যাঙ্কসহ ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয়। এদিকে ১৩ তারিখ দুর্ভাগ্যজনকভাবে মেজর গণি ও মেজর মহেন্দ্র সিং সহ প্রায় তিনশতর অধিক যোদ্ধা শিরোমণিতে পাকিস্তানিদের ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষণে প্রাণ হারায়। এতে মুক্তি বাহিনীর জেদ আরও বেড়ে যায়।

১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১। যুদ্ধে জয়ী হবার পর খুলনা সার্কিট হাউজে সহযোদ্ধাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধা আলকাস কুদ্দুস সবার সামনে কালো শার্ট পরা হাস্যজ্জল স্টেন গান হাতে Source: bangla.thereport24.com

এসময় দৌলতপুর-শিরোমণিতে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় যা শেষ পর্যন্ত বেয়নেট ও হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এসময় ভারতীয় বিমান বাহিনী পাকিস্তানিদের ৪ টি ট্যাঙ্ক, ১ টি গোলাবারুদ বোঝাই ট্রাক, পোস্ট অফিসের মজুদ করে রাখা গোলাবারুদ, অস্থায়ী যোগাযোগ দফতর, রাজাকারদের বিমান ভূপতিত করবার ঘাটি সব কিছুই গোলাবর্ষণ এর দ্বারা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এসময় কোলাটেরাল ড্যামেজে কিছু সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান, বেশ কিছু আহত হন সেই সাথে ওই স্থানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।

১৪ তারিখও টানা যুদ্ধ চলে। কিন্তু তাদের গোলাবারুদ ও রসদ ফুরিয়ে আসতে শুরু করে। তাদের সকল রসদ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট করে দেওয়া হয়। তারা এক পর্যায়ে শিরোমণিতে কোণঠাসা হয়ে পরে। এমতাবস্থায় ১৫ তারিখ তারা যুদ্ধ বিরতিতে যেতে বাধ্য হয়।

যুদ্ধ বিরতির পর আশা করা হয়েছিল তারা আর হার মেনে নেবে কিন্তু সেই আশা মিথ্যা প্রমাণ করে ১৬ ডিসেম্বর রাত ৯ টা নাগাদ আবারও কেপে ওঠে শিরোমণির রণাঙ্গন। এসময় হায়াত খানও তীব্র আক্রমণ করে বশে। আক্রমণে যোগ দেয় মিত্র বাহিনীও। দুই পক্ষই তুমুল গোলাবর্ষণ করে চলেছিল, দুই পক্ষেরই তুমুল ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। সেসময় মুক্তি বাহিনীর ৩১ জন নিহত ও প্রায় ১২০ জন এর অধিক আহত হয় আর এদিকে ভারতীয় ১ অফিসারসহ ৭ জন নিহত ও প্রায় ৩০ জন আহত হয়। এমতাবস্থায় রাত ৩ টা ১০ মিনিটে মেজর মঞ্জুর এয়ার সাপোর্ট চেয়ে পাঠান মিত্র বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে। হেডকোয়ার্টার থেকে জানানো হয় বিমান দমদম এয়ারপোর্টে প্রস্তুত রয়েছে কিন্তু রাতের মধ্যে এই দূরত্ব পারি দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

যুদ্ধের এমন কঠিন সময়ে এসে মেজর মঞ্জুর যশোর ক্যান্টনমেন্টে ছুটে যান সঙ্গে ছিলেন মেজর হুদা। ভারতীয় কমান্ডারের সাথে প্রায় ১০ মিনিট আলোচনা শেষে যুদ্ধের স্ট্রাটেজিতে পরিবর্তন আনা হয়। এসময় ভারতীয় কমান্ডার ইতস্তত করলে মেজর মঞ্জুর তার কোমরের বেল্ট খুলে টেবিলে রাখেন যার অর্থ জয়ী না হয়ে ফিরবেন না। ভারতীয় কমান্ডার সেসময় ওয়ারলেসে দলবীর সিং এর সাথে কথা বলে সম্মিলিত বাহিনীর দায়িত্ব মেজর মঞ্জুরের হাতে তুলে দেন এবং বেরিয়ে যাবার সময় তাকে আলিঙ্গন করতে ও শুভকামনা জানাতে ভুললেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসার আগে নিশ্চিত মৃত্যু ধারণা করে এক সৈনিকের কাছে নিজের স্ত্রীর উদ্দেশ্যে শেষ বিদায় বাক্য লিখে যান মেজর মঞ্জুর।

এবার শুরু হল চূড়ান্ত যুদ্ধ। পরিকল্পনার নতুন ছক অনুযায়ী শিরোমণির ডানে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের কলামটিকে পেছনে সেকেন্ড ডিফেন্সে এনে মেজর হুদাকে এর দায়িত্ব দেন, ফ্রন্ট লাইনের সম্মিলিত বাহিনীকে ডান দিকে ডিফেন্সে পাঠিয়ে দেন, বাম দিকের ও পেছনের তিনটি কলামকে ফ্রন্ট লাইনের ডিফেন্সে নিয়ে আসেন, ডানে ও পেছনের ফাকা স্থান পূরণ করে সম্মিলিত বাহিনী। প্রধান সড়কের নিচে লুকিয়ে থাকা মিত্র বাহিনীর ট্যাঙ্কগুলোর ২ টিকে সংকেত অনুযায়ী শিরোমণি-খুলনার প্রধান সড়কে ও ৬ টিকে ডানদিকের নিচু বেত গাছের সারির পাশ দিয়ে পাক ডিফেন্সের পেছনে দ্রুত গতিতে পৌঁছে যাবার নির্দেশ দেন, প্রচুর ক্যাজুয়ালিটির আশঙ্কা থাকা স্বত্বেও। প্রতিটি ট্যাঙ্কের পেছনে থাকলেন ১২ জন করে সুইসাইড কমান্ডো। এর মাঝেই দুজন যোদ্ধা শহীদ হলেন, আহত হলেন আরও একজন মুক্তিযোদ্ধা ও একজন ভারতীয় সৈন্য।
ভোর পাঁচটার কিছু আগে আঘাত হানলেন মেজর মঞ্জুর। ২৫ টিরও বেশি ট্যাঙ্ক, দেড় শতাধিক কামান, কয়েক শত মর্টার নিয়ে সবার আগে এসএসআর হাতে নিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে শত্রুবূহ্যে ঢুকে পড়েন মেজর মঞ্জুর। পূর্বের নির্দেশ অনুসারে দুটি টি-১৬০ ট্যাঙ্ক শিরোমণির প্রধান সড়ক দিয়ে এবং পাঁচটি একই ট্যাঙ্ক ডান দিক থেকে এগিয়ে গেল দ্রুত গতিতে। এরপরই সব ঝাপসা, শিরোমণির সেই দুর্ভেদ্য দুর্গে সম্মিলিত বাহিনীর কি পরিণতি হলো তা তখন বোঝার আর কোন উপায় নেই।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে মেজর হুদা তার অধীনস্থ সেকেন্ড লাইনকে দ্রুত ফ্রন্ট-লাইনের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে বসিয়ে দিলেন। ডান দিক থেকে ছুটে আসছে মিত্র বাহিনীর ট্যাঙ্ক। প্রায় তিন মাইল এলাকা জুড়ে ট্যাঙ্ক-কামানের গোলাবর্ষণের চিহ্ন ছড়িয়ে পড়ে। আশেপাশের কোন কিছুই আর অক্ষত থাকে না। চারিদিকে শুধু বারুদের গন্ধ। গোলাবর্ষণে রাতের আকাশ পুরো ফর্সা হয়ে ওঠে। এর মাঝেই লড়াই চলছে ট্যাঙ্কের সাথে ট্যাঙ্কের, বেয়োনেটের সাথে বেয়োনেটের, সেই সাথ চলছে হাতাহাতি। এর মাঝে কেউ একজন চিৎকার করে বলে ওঠে “খানেরা পালিয়ে যাচ্ছে”। এর পর মুক্তি বাহিনীও আর ফিরে তাকায়নি। দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে চলে, ভেঙ্গে দিতে থাকে পাকিস্তানিদের প্রতিটি প্রতিরোধ। ভোর পৌনে ছয়টা নাগাদ চলে আসে ভারতীয় বিমান বহর। প্রচণ্ড গোলাবর্ষণে শেষ হয় ব্রিগেডিয়ার মালিক হায়াত খানের শেষ প্রতিরোধ। ১৫৭ টি মৃতদেহ ও প্রচুর আহত সৈনিকে ফেলে রেখে হায়াত খান প্রায় ৫ শতাধিক সৈন্যসহ মেজর মঞ্জুরের নিকট নিজের বেল্ট ও ব্যাজ রেখে আত্মসমর্পণ করেন। শ্বাসরুদ্ধকর এক যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে, ১৭ ডিসেম্বর শত্রু মুক্ত হয় খুলনা। তবে ২২ তারিখ পর্যন্ত খুলনা শিপইয়ার্ড, খালিশপুর ও লবণচোরা এলাকা থেকে বিক্ষিপ্ত পলাতক পাকসেনাদের আটক করা হয়েছিল। গোটা বাহিনীকে খুলনা সার্কিট হাউজের মাঠে আত্মসমর্পণ করানো হয়। যদিও ঢাকায় আত্মসমর্পণের পরেও যুদ্ধ চালিয়ে যাবার অপরাধে তাদের সকলের মৃত্যুদণ্ড পাবার কথা কিন্তু এত হতাহতের পর ও আন্তর্জাতিক জটিলতা বাধার আশঙ্কায় তাদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হয়। সমাপ্তি ঘটে মুক্তিযুদ্ধের শেষ অধ্যায়ের।

খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠ; Source: voiceofbangladesh24.news

শিরোমণির এই যুদ্ধকে ঘিরে রয়েছে অনেক গল্প ও কল্পকথা। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে আজও সেখানে যুদ্ধের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৮০-৮১ পর্যন্ত যুদ্ধের ভয়াবহতা দৃশ্যমান ছিল। শিরোমণি বাজার ও এর উল্টো দেকে বিসিক শিল্প নগরী ঘিরে কম বেশি চার কি.মি. এলাকার কোন ভবন বা গাছ প্রায় সবকিছুই ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। আর কথিত আছে, এদিন মিত্র বাহিনীর বিমান ভুল করে ফুলতলা থেকে অগ্রসরমান মিত্র সেনাদের পাকিস্তানি সৈন্য মনে করে তাদের উপর বোমা বর্ষণ করে। ফলে মিত্র বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। স্থানীয় লোকজন নাকি সেসময় ট্রাক ভরে ভারতীয় সেনাদের মৃত দেহ নিয়ে যেতে দেখে। আবার এমনও শোনা যায় যে, মেজর মঞ্জুর নাকি দুই হাতে এসএলআর নিয়ে গুলি করতে করতে একটি ট্যাঙ্কের মধ্যে ঢুকে পরেন এবং সবাই কে মেরে ট্যাঙ্কটি দখল করে নেন। তবে এমন কোন প্রমাণ পরবর্তীতে পাওয়া যায় নি। তবে সেই যুদ্ধের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ইউপিআই এর ফটোগ্রাফার ডেভিড কেনারলি যে প্রতিবেদন লিখেছেন তাতে কাছাকাছি অন্য একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতীয় এক সৈনিকের জবানিতে কেনারলি জানান- “একজন সৈনিক একটি বাঙ্কারে উঠে যায়। বাঙ্কারে থাকা এক পাকিস্তানি সৈন্যের হাত থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বাঙ্কার গুঁড়িয়ে দেয়” এই গল্পের নায়ক মেজর মঞ্জুরও হতে পারে। আবার এই গল্পটিই মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়ে ট্যাঙ্কে রূপ নিতে পারে, এতে অবাক হবার কিছুই নেই।

মুক্তিযুদ্ধ সম্মুখ সমর স্মৃতিস্তম্ভ; Source: www.subornobhumi.com

 

২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয় তবে এটি যেখানে মুল যুদ্ধ ও আত্মসমর্পণ হয়েছিল সেখানে তৈরি না করে সেনানিবাসের সামনে তৈরি করা হয়। তবে এত সব কিছুর মাঝে মেজর মঞ্জুর যুদ্ধে যে সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা অতুলনীয়। ১৯৪০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানার গুপিনাথপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া মেজর মঞ্জুর ১৯৫৭ সালে কাকুল সামরিক একাডেমিতে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। পরবর্তিতে সিএসপি অফিসার পদে নিযুক্ত ও কানাডা থেকে পিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন কিন্তু এসব কিছু ছেড়ে তিনি দেশের ডাকে সাড়া দেন। যুদ্ধে তার এই অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে “বীর উত্তম” উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের সরাসরি নির্দেশে প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যার অভিযোগে তাকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় যার বিচার আজও হয়নি। এই মহান যোদ্ধার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

লিখেছেন
মীর হাসিব
গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র:
(১) স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়- মেজর জেনারেল সুখওয়ান্ত সিং (মাসুদুল হক অনূদি।
(২) স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান- স ম বাবর আলী।
(৩) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ খুলনা জেলা- শেখ মোঃ গাউস মিয়া।
(৪) https://bn.wikipedia.org/s/9v8g
(৫) https://www.amarblog.com>pritomdas

Most Popular

To Top