ক্ষমতা

চাঁদেও পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতে চেয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র!

চাঁদেও পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতে চেয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র!

শীতল যুদ্ধের মাঝামাঝি, ১৯৫০ এর শেষের দিকে, তখনো মানুষ চন্দ্রভিজানের কথা মাথায় আনেনি, মার্কিন বিমানবাহিনী প্রোজেক্ট ১১৯ নামে অত্যন্ত গোপনীয় এক প্রজেক্ট হাতে নেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল চাঁদে পারমাণু বোমার বিস্ফরণ ঘটানো।

দুইটা কারণ ছিল এর পিছে, চাঁদ ও মহাকাশের অজানা তথ্য জানা এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (যাদের সাথে আমেরিকার মহাকাশ অভিযানের প্রতিযোগিতা চলছিল) কাছে শক্তি প্রদর্শন করা।

সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন পৃথিবীর কক্ষপথে মানব ইতিহাসের প্রথম স্যাটেলাইট স্পূটনিকের সফল উৎক্ষেপণ করে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় রকমের ধাক্কা খায়। কেননা তারা এর আগে বেশ কয়েকবার স্যাটলাইট উৎক্ষেপণ করতে যেয়ে সফল্ভাবে ব্যর্থ হয় (!) মার্কিন গভর্নমেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় খেলায় একদম নতুন চাল দেবার। তারা স্মরণ করল তাদের পূর্ববর্তী শক্তি প্রদর্শনের ঘটনাঃ জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকিকে। এবার তারা এমন এক স্থানে পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটাবে যেটা যেন গোটা দুনিয়ার মানুষ তা দেখতে পারে। প্রথমিকভাবে তাদের বিশ্বাস ছিল এমন একটি ঘটনা মার্কিন জনগনের মনোবল আরো বাড়িয়ে দিবে যারা কি না তখনকার চলমান শীতল যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেবার ভয়ে ভীত।

এদিকে পত্র পত্রিকায় গুজব রটে যায় যে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের অক্টোবর রেভোল্যুশন উদযাপনের জন্য চাঁদে, চন্দ্রগ্রহন চলাকালীন হাইড্রোজেন বোমা ফাটাবে। উল্লেখ্য হাইড্রোজেন বোমা পরমাণু বোমার আরও উন্নত সংস্করণ। যে পদ্ধতিতে সূর্যের মত তারকারা শক্তি উৎপন্ন করে অকল্পনীয় তাপ আর আলো তৈরী করে সেই একই পদ্ধতিতে এই বোমা সব কিছু ধ্বংস করে।

ফলে আমেরিকা আরো রসদ এবং জনবল নিয়োগ করে। চাঁদে পারমাণবিক বোমা ফাটালে এর পরিণাম কী হতে পারে,পৃথিবী থেকে তা কি আদৌ দেখা যাবে কি না, কত বড় মাশরুম ক্লাউড বা ধুলাঝড় তৈরি হতে পারে, পৃথিবীতে এর কি প্রভাব হবে তা জানার জন্য নাসার কার্যনির্বাহক লিওনার্ড রিইফেলের নেতৃত্বে ১০ জনের একটা দল শিকাগোতে গবেষনা শুরু করে।

প্রথমে একটা হাইড্রোজেন বোমার প্রস্তাব করা হয়, কিন্তু মার্কিন বিমানবাহিনীতে এই প্রস্তাব পাশ হয়নি কারণ হাইড্রোজেন বোমা তুলনামূলক অনেক ভারী যা মহাশুন্যে উৎক্ষেপণ করার মত সরঞ্জাম তখনো তাদের কাছে নাই। শেষমেস  একটা ছোটখাট পরমাণু বোমা ব্যাবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেটায় ১.৭ কিলোটনের বিস্ফরক থাকবে উল্লেখ্য হিরোশিমায় ফাটানো বোমায় ছিল ১৮ কিলোটনের মত বি্স্ফোরক। একটা রকেট এই বোমা নিয়ে চাঁদের অন্ধকার সাইডে যাবে এবং ল্যান্ড করার সাথে সাথে বিস্ফোরন ঘটবে। অত্যন্ত নিখুতভাবে প্ল্যান করা হয়েছিল যাতে চন্দ্রগ্রহনের সময় সূর্য রশ্মি ঢেকে যাবার সাথে সাথে অন্ধকার সাইডে বিস্ফোরণ ঘটে যাতে করে গোটা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানূষ তা পরিষ্কারভাবে দেখতে পায়।

কিন্তু ১৯৫৯ সাথে মার্কিন সামরিক বাহিনী আমজনতার প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে সিদ্ধান্ত বদলায়। কোনো ভুল হলে এই বোমা চাঁদে না যেয়ে ঘুরে পৃথিবির বুকে পড়বে, ফলাফল হতে পারে অকল্পনীয় বিপর্যয়। তাছাড়াও গবেষকরা সাবধান করে যদি আমেরিকা সুদূর ভবিষ্যতে চাঁদে বসতি করতে চায় তাহলে এমন বিস্ফোরণের কারণে যে রেডিও এক্টিভ ধূলা তৈরী হবে সেটা ভয়ানক প্রভাব ফেলবে।

তাই আমেরিকার এই প্রোজেক্ট বাতিল হয়ে যায়। কয়েকদিন পর পর আবিষ্কৃত হয় যে সোভিয়েত ইউনিয়নও এমন একটা প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছিল এবং সেটিও সফল্ভাবে ব্যর্থ হয়। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ এর মধ্যে দুইটি চুক্তি হয় দুই পক্ষের মধ্যে ফলে চাঁদে যেকোনো ধরণের পারমানবিক বোমা পাঠানো থেকে বিরত হয় তারা। সেদিন আসলে যুগান্তকারী মহাকাশ চুক্তি হইছিল। এই চুক্তির আওতায় কোনো দেশ মহাকাশে পারমাণবিক বোমা পাঠাতে পারবে না।

গোপন এই এই প্রোজেক্টের কথা প্রথম জনসম্মুখে আসে ১৯৯০এর শেষের দিকে প্রোজেক্টে কাজ করা একজন গবেষক কার্ল সেগানের জীবনী নিয়ে গবেষণা করতে যেয়ে। সেগানের এই প্রোজেক্টের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ তার ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়াতে একাডেমিক স্কলারশিপে জন্য করা আবেদনপ্ত্রে উল্লেখ ছিল। যদিও আমেরিকান
গভর্নমেন্ট এখনো অস্বীকার করে এমন কোনো প্রোজেক্টের কথা।

বৃটিশ পরমাণু ইতিহাসবিদ ডাঃ ডেভিড লওরি মজা করে বলেন যে যদি এই প্রোজেক্ট বাস্তবায়ন হত তাইলে আমরা নেইল আরমস্ট্রংএর চাঁদে পা রাখা দেখতে পেতাম না।

Most Popular

To Top