ইতিহাস

একজন ইরানি যুবকের চোখে বঙ্গবন্ধু…

একজন ইরানি যুবকের চোখে বঙ্গবন্ধু...

সবাইকে বিজয়ের শুভেচ্ছা।

বিজয় দিবসের এই ক্ষণে একটি ছোট অভিজ্ঞতার কথা লিখতে মন চাইছে। (ইরানের কালচারে অতিথিদের বাড়িতে দাওয়াত করাটা একটি রেওয়াজ। আপনি দাওয়াত না রাখলে ওরা খুব অপমানিত বোধ করে। সেই কারণেই আমার স্টুডেন্টের বাসায় তার আমন্ত্রণে যাওয়া। কিন্তু সেখানে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে তা কখন স্বপ্নেও ভাবিনি!)

তাঁর বয়স আনুমানিক ৬৫ হবে। পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত। ইরানের ইস্পাহান শহরে থাকেন। আমার পাশে এসে বসলেন। খুব স্পষ্ট করে বললেন, আমার মেয়ের আমন্ত্রণে আপনি আমার বাসায় এসেছেন এতে আমি খুব খুশি হয়েছি। আমার মেয়ে আপনার ছাত্রী, সেই জন্য না। আপনি এমন এক দেশে জন্মেছেন যে দেশে শেখ মুজিবুর রহমান জন্মেছিলেন।

মুখে প্রশান্তির এক আলোকিত হাসি রেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তো শেখ মুজিবুর রহমানকে চিনেন। চিনেন তো? আপনার যে বয়স সে বয়সে তাঁকে আপনার দেখার কথা না। যিনি একাই আপনার দেশকে স্বাধীনতা অন্দোলনের জন্য তৈরী করেছিলেন। আপনি তাঁর সম্বন্ধে পড়েছেন তো?

আমি বললাম আমার জন্মের তিন বছর আগেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

বললেন, হ্যাঁ আমি জানি। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এমন একজন মানুষ, যিনি ওয়েস্ট পাকিস্তানের সকল অনাচারের বিরুদ্ধে একা একা লড়ে একটি দেশকে স্বধীনতার জন্য তৈরী করেছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে, যার আঙ্গুলের ইশারার সারা দেশের মানুষ উঠত বসত সেই মানুষটিকে সেই দেশেরই কিছু আর্মি অফিসার হত্যা করেছে। পত্রিকায় পড়েছি। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। খুব!

কথোপকথনের এই পর্যায়ে এসে তাঁর চোখে মুখে বিষাদের এক ছায়া দেখলাম।

(আমাদের দেশে কী হয়? একদল বঙ্গবন্ধুর পক্ষে, আরেকদল বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে। ইস্পাহান শহরের নিভৃতে বসবাস কারী পার্কিনসন ডিজিসে আক্রান্ত এই ভদ্রলোক স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতির প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা অপকটে বলে দিলেন। নিশ্চয়ই তাঁর চিন্তায় কখনও আসেনি যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাংলাদেশে পক্ষ বিপক্ষ আছে। আসলে পৃথিবীর কোন দেশের মানুষেই তাদের স্বাধীন ভূখন্ড এনে দেওয়া নেতাকে নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ করে না!)

আমি কথা বলতে পারছিলাম না। শুধু এই অসুস্থ কিন্তু প্রচন্ড সাহসী মানুষটির চোখ মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম।

এই পর্যায়ে আমার ছাত্রী বিষয়টিকে হালকা করতে গিয়ে আমার মনে ও মগজে আরও গভীর কিছু একটি বিষয় এনে দিল। বলল, সিদ্দিকী, আমরা যখন টিনএজার সে সময়ে আমার বাবা আমাদের কথায় কথায় শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আসতেন। ইরানের সমাজ ব্যবস্থায় অনেক কঠিন কিছু নিয়ম আছে – সেসব আমাদের মেনে চলতে হয়। যেমন ধরো – টিনএজারদের যেটি হয়। সব সময় নিয়ম ভাঙার একটি প্রবণতা থাকে। আমরা যদি কোন নিয়ম ভাঙার কাজ করতাম তখন তিনি প্রায়ই বলতেন – তুমি কী শেখ মুজিবুর রহমান? যদি শেখ মুজিবুর রহমান না হয়ে থাক তাহলে তা যা প্রচলিত আছে তাই মেনে নাও। তার মানে হলো – শেখ মুজিবুর রহমান কোনটি ন্যায় কোনটি অন্যায়, কোনটি সৎ কোনটি অসৎ তা ভালো করেই বুঝতে পারতেন। তিনি অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে, অসত্যকে সত্য বানিয়ে যারাই কোন কিছু করতে চেয়েছে সেখানেই তিনি প্রতিবাদি হয়েছেন। আমার বাবা মনে করতেন যেহেতু আমাদের সেই সাহস, বুদ্ধিমত্তা এবং নেতৃত্বের গুণ নেই, আমাদের পেছনে লাখ লাখ সাধারণ মানুষও নেই সুতরাং আমাদের উচিত যা প্রচলিত আছে তাই মেনে চলা।

আমি কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। শুধু তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম – শেখ মুজিব সম্বন্ধে এমন ধারণা ইরানে কী খুব প্রচলিত? যা বুঝলাম – এখন আর তেমনটি না হলেও সেই ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে ইরানের অনেক যুবকের আদর্শ ছিলেন আমাদের শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু।

Most Popular

To Top