গল্প-সল্প

রিলেশন, ব্রেকাপ… অতঃপর

রিলেশন, ব্রেকাপ... অতঃপর

আমি তখন ক্লাস সেভেন কিংবা এইটে পড়ি। এক বড় ভাইকে দেখলাম উনার প্রেমিকার জন্য এক বসাতেই ১২ টা চিঠি লিখছেন। জিজ্ঞেস করলাম, এক বসাতে এরকম ১২ টা চিঠি লেখার কারণ কি? বড়ভাই জানালেন, উনার প্রেমিকা ভার্সিটি থেকে একটা সামার ক্যাম্পে যাচ্ছেন ১২ দিনের জন্য। সেই ক্যাম্পে যাবার সময় প্রেমিকা যে ১২ টি ড্রেস নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি প্রেমিকা থেকে সেই ড্রেসগুলো নিয়ে আগেভাগে লন্ড্রিতে দিয়ে এসেছেন আয়রন করার জন্য এবং প্রেমিকাকে সেই ড্রেস ফেরত দেয়ার সময় প্রতিটা ড্রেসে একটা করে চিঠি ঢুকিয়ে রাখবেন। যাতে প্রেমিকা একেকদিন একেক ড্রেসের ভেতর একটা করে চিঠি পায়।

সেই কিশোর বয়সে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মুগ্ধতার সীমা, ভাবা যায়! কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, তার এই প্রেমিকা তার সাথে ৭ বছর প্রেম করার পর খুব সিলি একটা কারণ দেখিয়ে ব্রেকআপ করে এক মাসের মধ্যেই অন্য একটি সেটেলড টাইপ ছেলে খুঁজে বিয়ে করে ফেললো।

দোষ মেয়েদের নয়, ছেলেদেরও নয়।
আমি চিটাগাং মেডিক্যালের এমন একজন ডাক্তারকে চিনি। যিনি প্রেমিক তাঁকে বিয়ে না করার অভিমানে কখনো বিয়ে’ই করেন নি। অপূর্ব রূপবতী সেই ডাক্তার এখন তাঁর সেই প্রেমিকের চেয়েও অনেক বেশি ভালো অবস্থানে আছেন। মানুষের অন্তরে, দোয়ায় ঠাঁই করে নিয়েছেন।

চারপাশে মানুষ এক্সাইটমেন্ট খুঁজে বেড়াচ্ছে হন্যে হয়ে। বোরিং মানুষ আর কারো পছন্দ নয়। ঝিকমিক করতে থাকা মরিচ বাতির মতো এক্সাইটমেন্ট চাই। আটপৌরে ভালোবেসে যাওয়া, সাদা ভাতে আলুর খোসার মতো মানুষগুলো একেবারেই হুট করে মূল্যহীন হয়ে গেলো। প্রতিদিন নিয়ম করে, “তুমি ভালো আছো তো?” জিজ্ঞেস করা মানুষগুলোকে বড্ড ম্যাড়ম্যাড়ে মনে হয় আজকাল।

আমি স্বপ্ন দেখি। একদিন সকাল বেলা হুট করে আমাদের সবার মোবাইল স্ক্রীনগুলো ঝাপসা হয়ে যাবে। কাজ করবে না ল্যাপটপের কোন কী। সেদিন থেকে আবার প্রযত্ন ঠিকানায় লিখতে হবে হলুদ খামের চিঠি। ডাক-টিকেটের আঠা আর্দ্র করতে হবে ঠোঁটের কোমল ছোঁয়ায়। সেদিন কবিতারা আবার পথ খুঁজে পাবে হৃদয়ের গালিচায় গালিচায়। হেলাল হাফিজের লেখাটা আবার ফিরে পাবে আবেদন।

“এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো৷
এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালী তাল পাখাটা
খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো৷”

অনেকদিন পর ড্রয়ার খুলে কেউ দলছুটের ‘হৃদয়পুর’ এলবামটা বের করুক। ফিতার ক্যাসেট বাজতে দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বিষন্ন মনে শুনতে থাকুক সঞ্জীবের কন্ঠে,

“আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ
আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছিল চাঁদ
আমার চোখ গেল ধরেছে সুন্দর।।”

একদিন আমরা আবার সত্য হয়ে যাই। এই মিথ্যে কথার শহর থেকে পালিয়ে বাঁচি। যেখানে কথা দিয়ে মানুষ গুলো থেকে যায়। নাছোড়বান্দা মানুষগুলো ভালোবাসার বাড়াবাড়িতে বিরক্ত হয় না, যেখানে অসংখ্য চিঠি, অসংখ্য বিনিদ্র রাত্রিযাপনের পর দেখা হবার সিদ্বান্ত হবে। মাস তিনেক পরপর। সেদিন সকালে হুট করে মুঠোফোনের একটা ক্ষুদ্র বার্তায় মানা করে প্ল্যান ভেস্তে দেওয়া যাবে না। মানুষটা কষ্ট করে এসে দাঁড়িয়ে থেকে না পাবার যন্ত্রণা নিয়ে ফিরে যাবে। এই ভেবে অন্য প্রান্তের মানুষটাকে ছুটে আসতেই হবে সেই দিন।

Most Popular

To Top