নাগরিক কথা

আমাদের পতাকা, আমাদের দায়িত্ব!

ছোটবেলায় আমার একটা শখ ছিল। বিভিন্ন দিবসে কাগজ কেটে, রঙ, কালি দিয়ে পোস্টার বানিয়ে ঘরের দরজার উপরে টাঙ্গিয়ে দেয়া। যেমন ঈদের সময়ে ঈদ মোবারক, জানুয়ারিতে হ্যাপি নিউ ইয়ার, বৈশাখে শুভ নববর্ষ। জাতীয় দিবস গুলোতে অন্য আয়োজন থাকতো। ২১ ফেব্রুয়ারীতে এলাকার বন্ধুরা মিলে বাসার সামনে ইট, মাটি দিয়ে শহীদ মিনার তৈরী করতাম। ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরে তৈরী করতাম স্মৃতিসৌধ। অবশ্য এ উপলক্ষে বাপ চাচা ও এলাকাবাসীদের কাছ থেকে কিঞ্চিৎ চাঁদাবাজিও করেছি। তবে তারা বিরক্ত হত না, বরং উৎসাহই দিত। আশে পাশের এলাকার বন্ধুদের সাথে এ নিয়ে একটা প্রতিযোগীতাও ছিল।

একবারের ঘটনা, কবে তা মনে নেই। কোন এক জাতীয় দিবসে আমার উপর দায়িত্ব পড়েছে কাগজ কেটে একটা জাতীয় পতাকা বানানোর। এ তো খুবই সহজ কাজ। চারকোণা একটা সবুজ রঙের কাগজ কেটে মাঝখানে একটা লাল রঙের কাগজ বসিয়ে দিলাম। ব্যস, কাজ শেষ, আঠা শুকানো বাকি। এ সময়ে আব্বা এলেন। মেঝেতে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন কি করছি। আমি সদ্য প্রস্তুত পতাকাটা দেখিয়ে দিলাম।

আব্বা পতাকাটা দেখে খুব রাগ হলেন। বললেন বাংলা বইটা নিয়ে আয়। আমি খুবই বিরক্ত হলাম। আব্বা সাধারনত আমার পড়াশুনার ব্যাপারে খুব একটা বেশি মাথা ঘামান না। হঠাৎ তার কি হল যে এই ছুটির দিনে আমাকে পড়া ধরবেন! বইটা এনে আব্বার হাতে দিলাম। আব্বা বইয়ের প্রথম পাতাটা উল্টিয়ে আমাকে দেখিয়ে বললেন, “এতদিন থেকে এই বই পড়িস! আর বইয়ের প্রথম পাতাটা উল্টয়ে কোনদিন দেখিস নাই যে জাতীয় পতাকা কিভাবে আঁকতে হয়! এইটা পড়ে মুখস্থ কর। স্কেল দিয়ে ঠিক মত আঁক।”

এরপর থেকে আমার আর কোনদিন ভুল হয় নি।

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সঠিক অনুপাত

 

আমি জানি না এখনকার বইয়ের প্রথম পাতা উল্টালে জাতীয় পতাকা আঁকানোর সেই পাতাটা থাকে কি না। তবে থাকা উচিত।

আর একটা ঘটনা বলি। আমি ফুটবলে ব্রাজিলের ঘোর সমর্থক। পতাকার রঙ এ সাদৃশ্য থাকায় একবার বিশ্বকাপের সময়ে অর্ধেক ব্রাজিল আর অর্ধেক বাংলাদেশের পতাকা দিয়ে একটা প্রোফাইল পিকচার বানিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হেব্বি হিট হবে জিনিসটা। কিন্তু এটা নিয়ে ফেসবুকে আমাকে রীতিমত অপমানিত হতে হয়েছে। খুব কাছের যারা তারা দ্রুত সরিয়ে ফেলার জন্য বলে দিল।

এরপর থেকে আমি জাতীয় পতাকার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম জেনেছি। তবে জাতীয় পতাকার সঠিক রূপে ব্যবহার নিয়ে খুব একটা প্রচারনা রয়েছে বলে আমার জানা নেই। যাও রয়েছে, তার পাঠক ঐ বিসিএস-এর জন্য প্রস্তুতি গ্রহনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ইদানিং রাস্তাঘাটে, স্কুল কলেজে, খেলার মাঠে, রাজনৈতিক সমাবেশে, এমনকি বিভিন্ন সরকারী দপ্তরেও মাঝে মধ্যে বিকৃতভাবে যখন জাতীয় পতাকা দেখি, কিংবা জাতীয় পতাকার সঠিক ব্যবহার না জেনেই এর ব্যবহার দেখি, তখন আমার আব্বার কথা মনে পড়ে। এরাও নিশ্চই আমার মতই। যে বই পড়ে স্কুল পাশ করেছে, সে বইয়ের প্রথম পাতা উল্টিয়ে দেখেনি। কিংবা কখনো বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

[বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সঠিক মাপ এবং ব্যবহারবিধি দেখে নিন এই লিংকে]

স্কুলের প্রথম শিক্ষা হওয়া উচিত জাতীয় পতাকা আঁকানো শেখা। আর সরকারের উচিৎ জাতীয় পতাকার অপব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।

বিজয় দিবসের কার্ড, উপজেলা প্রশাসন, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা।

জাতীয় দিবসের কার্ডটা দেখে ছেলেবেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
বন্ধু এস. এম. গোলাাম  কিবরিয়াকে ধন্যবাদ। একজন ব্যক্তিও যদি এই কার্ড দেখে শুদ্ধ ভাবে পতাকা আঁকানো শেখে, তাহলে তুই সার্থক। সেই সাথে জাতীয় পতাকার সঠিকরূপে ব্যবহারটাও প্রচারের অনুরোধ থাকলো।

লেখকঃ মাহফুজ ইসলাম।

Most Popular

To Top