ইতিহাস

একজন জিনিয়াস উদ্ভাবক নাকি স্বার্থপর এক ব্যক্তি

স্টিভ জবস,যার নাম শুনে সব প্রযুক্তিবিদরা একনামে বলে উঠেন “প্রযুক্তির রাজপুত্র’। প্রযুক্তির ইতিহাসে সবসময় তার নাম লেখা থাকবে সবার উপরে স্বর্ণাক্ষরে। নতুন যে কোনো উদ্যোক্তার মনেই স্বপ্ন থাকে একদিন সে স্টিভ জবসের মত বিখ্যাত হবে এবং তার নামও উচ্চারিত হবে স্টিভ জবসের সাথে সাথে। স্টিভ জবসের উদ্ভাবনীশক্তি, ভবিষ্যতকে কল্পনা করার সামর্থ্য কিংবা নিরলস পরিশ্রম করার ক্ষমতা সত্যিই অনুসরণীয়।

অনেক আইটি স্টুডেন্টরা জীবনের লক্ষ্য হিসেবে স্টিভ জবসের সাথে এপল কোম্পানিতে কাজ করাকে বেছে নেয়। বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে কিংবা সমারম্ভ অনুষ্ঠানে স্টিভ জবসকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ডাকা হত এবং ইউটিউবে তার বক্তৃতার ভিডিও লক্ষ লক্ষবার শেয়ার হয়। কিন্তু স্টিভের এত খ্যাতি কিংবা মেধার জয়গানের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে তার স্বার্থপরতা, কর্মচারীদের সাথে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ব্যবহার কিংবা খোদ নিজের অভিভাবক কিংবা সন্তানকে অস্বীকার করার মত অন্ধকার দিকগুলো।

আমি শিকড়ছাড়া একজন হতে চাই

জানামতে স্টিভ জবস ছিলেন তার মা-বাবার বিবাহবহির্ভূত সন্তান, সিরিয়ান বাবা আমেরিকায় পড়তে গিয়ে স্টিভের মায়ের সাথে সম্পর্ক হয় এবং পরবর্তীতে স্টিভ আর তার বোনের জন্মের পরে মা-বাবা আলাদা হয়ে যান। এরপরে স্টিভকে দত্তক নেওয়া মা বাবারা তেমন সবচ্ছল না হলেও তারা স্টিভের পড়ালেখার জন্য এবং তার কলেজে ভর্তির জন্য অনেক কষ্ট করেছিলেন।

জবস এবং তার পরিবার

কিন্তু স্টিভ তাদের সাথে কোনোরকম সম্পর্ক রাখতে চাইতেন না এবং তাকে স্কুলে পৌছে দিলে তিনি কোনোদিন মা-বাবাকে সামান্য বিদায় সম্ভাষণটুকুও জানাতেন না। স্টিভ জবসকে নিয়ে আত্মজীবনীমূলক বই লেখা আইজাকসন তার বইয়ে এক সাক্ষাতকারে স্টিভের সাথে এই বিষয়ে কথা বলেছিলেন এবং তখন স্টিভ স্মৃতিচারণ করে বলেন যে

“এটি আমার জীবনের সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি তখন বেশি বুঝদার ছিলামনা এবং আমি তাদের মনে প্রায় কষ্ট দিতাম। তারা আমাকে কলেজে ভর্তি করানোর জন্য অনেক কষ্ট করলেও আমি তাদেরকে আমার আশেপাশেই সহ্য করতে পারতামনা, এটি করা আসলে আমার উচিত ছিলনা। আমি কাউকেই আমার মা-বাবার কথা জানাতে চাইতাম না। আমি সবসময় চাইতাম যে সবাই যেন আমাকে কোনো আত্মীয় পরিজন বিহীন পিছুটান ছাড়া একজন মনে করে যে কিনা ট্রেনে করে ভবঘুরের মত হঠাত করে এসে উপস্থিত হয়েছে।”

অফিসে গোয়েন্দাগিরি

স্টিভ জবস তার প্রতিষ্ঠান এপল এ কর্মচারীরা কতটুকু বিশ্বস্ত তা জানার জন্য একটি বিশ্বস্ততা খোঁজার টিম বা গোয়েন্দাগিরির টিম তৈরি করেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটির কাজ ছিল কোম্পানির সব কর্মচারীর উপর নজরদারি করা এবং এপল এর উদ্ধস্তনদের কাছেই একমাত্র তারা জবাবদিহি করত। এই টিমটির কথা অফিসের কর্মচারী কাউকেই জানানো হতনা এবং গোপনেই তাদের নামে রিপোর্ট বানানো হত। কোনো ব্রাঞ্চের কর্মচারীর প্রতি সন্দেহ হলে টিমের সদস্যরা সাধারণত হুট করে সকালবেলাতেই অফিসে গিয়ে হাজির হত এবং সেই ব্রাঞ্চের কর্মকর্তাদের নিজেদের পরিচয় দিয়ে তাদেরকে দরকারী তথ্য দিতে বাধ্য করত, অভিযুক্ত কর্মচারী আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনোরকম সুযোগই পেতনা। এভাবে বেআইনি গোপন নজরদারীর মাধ্যমে স্টিভ জবস তার অফিসের সবাইকে হাতের মুঠোয় রাখতেন।

এপল এর নামে কোনো নিউজ করা যাবেনা

আজকে যদি স্টিভ জবস বেঁচে থাকতেন এবং আমার এই লেখা কোনোভাবে তার কাছে পৌছাত, তবে আমাকে হয়তোবা জেলে যেতে হত। তার কোম্পানির বিরুদ্ধে অন্য যেকোনো নেতিবাচক সংবাদ ছাপালেই তিনি সেই সাংবাদিক বা সম্পাদকের নামে মামলা ঠুকে দিতেন। ২০০৫ সালে সিয়ারেলি নামে উনিশ বছর বয়সী “থিংক সিক্রেট” নামক একটি ব্লগের লেখক যখন এপল এর নতুন পণ্য “ম্যাকমিনি” বাজারে আসার আগেই এই পণ্যতে কি কি ফিচার থাকতে পারে সে সম্পর্কে প্রায় সঠিক রিপোর্ট লিখে ফেলে, তখন এপল কোম্পানি সিয়ারেলির নামে মামলা দিয়ে দেয়। মামলায় এপল দাবি করে যে সিয়ারেলি আর তার অনলাইন ওয়েবসাইটটির এসব পোস্টের মাধ্যমে এপলের বিভিন্ন পণ্য সম্পর্কে নানা ভিত্তিহীন গুজব সৃষ্টি হচ্ছে এবং এসব পোস্টের মাধ্যমে অন্যরাও এপলের প্রফেশনাল সিক্রেট প্রকাশ করতে উৎসাহী হবে। পরে বাধ্য হয়ে সিয়ারেলিকে মুচলেকা হিসেবে নিজের অনলাইন সাইটটিকেই বন্ধ করে ফেলতে হয়। ২০০৮ সালে জো নোসেরা নামের একজন কলামিস্ট স্টিভ জবসের নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে একটি কলাম জমা দেন, কিন্তু সেই কলামটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই স্টিভ জবস এর খবর পেয়ে যান এবং মধ্যরাত্রে নোসেরাকে ফোন করে গালিগালাজ শুরু করে দেন।

কোনোরকম দাতব্য কাজে অর্থসহায়তা দেওয়া হবেনা

বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট কিংবা এঞ্জেলিনা জোলির মত ধনবান তারকারা প্রায় সময়ই বিশ্বের নানাপ্রান্তে দুঃস্থ মানুষদের সহায়তায় অর্থ সাহায্য দিয়ে থাকেন এবং এটি তাদের একপ্রকার সামাজিক দায়িত্বও বটে। কিন্তু প্রায় সাত বিলিয়ন সম্পদের মালিক হয়েও কখনো কোনো দাতব্য সংস্থায় আর্থিক কিংবা অন্য কোনোরকম সাহায্য দিয়েছেন বলে জানা যায় নি।

শিশুশ্রম এবং মিষ্টিরদোকানের কাহিনী

সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়াতে বলতে গেলে আমাদের দেশে শ্রমিকের দাম অনেক কম এবং শিশুশ্রমও সহজলভ্য, কিন্তু বিদেশে যেমন শ্রমিকের দাম বেশি তেমনি সেখানে শিশুশ্রমও নিষিদ্ধ। তাই বিদেশি কোম্পানিরা অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তাদের পণ্য বানানোর জন্য বিভিন্ন দেশের স্থানীয় কোম্পানিদের সাথে চুক্তি করে এবং সস্তায় জিনিস বানিয়ে নিজের দেশে রপ্তানি করে। এপল তাদের প্রোডাক্টের জন্য তেমনিভাবে ফক্সকন নামের একটি চীনা কোম্পানিকে নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে একটি মানবাধিকার সংস্থা সেখানে অনুসন্ধান করে দেখে যে ফক্সকন কোম্পানিতে ভয়াবহ রকমের শ্রম আইন লঙ্ঘন হচ্ছে এবং শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশই কিশোর। এপল এর বৈশ্বিক চাহিদা মেটানোর জন্য ফক্সকন কোম্পানি কোনোরকম স্বাস্থ্য সুবিধা বা নিরাপত্তাবীমা না করে শ্রমিকদের কোনো সাপ্তাহিক বন্ধ ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য করছিল এবং চৌদ্দজন  শ্রমিকের আত্মহত্যার পরেও কর্তৃপক্ষ নিরবিকারভাবে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।

যখন ফক্সকনের শ্রমিক আইন লঙ্ঘনের এই রিপোর্টগুলো প্রকাশ্যে আসে তখন এপল একটি অদ্ভুত এবং হাস্যকর বিবৃতি দেয় ফক্সকন সম্পর্কে। তারা বলে যে, ফক্সকন হচ্ছে একটা মিষ্টির দোকান এবং এখানে শুধু এপল এর বিভিন্ন পণ্যের যন্ত্রাংশগুলো একত্রিত করা হয়। স্টিভ জবস আবার এর এককাঠি উপরে যান, তিনি বলেন যে এটি মিষ্টির দোকান না, তবে যেহেতু এখানে রেস্টুরেন্ট এবং সুইমিং পুল আছে, তাই এটি একটি খুবই ভালো কোম্পানি।

সে আমার সন্তান না

একজন মায়ের কাছে কিংবা সন্তানের কাছে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল সন্তানের পিতৃত্বের দাবী নিয়ে আবেদন করা। আমাদের প্রিয় ব্যক্তি স্টিভ জবস কিন্তু নিজের সন্তানকে অস্বীকার করার মত মহান কাজ করেছিলেন টানা দুইবছর ধরে। তেইশ বছর বয়সে এপল সহকর্মী ক্রিস্টেন ব্রেনানের সাথে স্টিভের প্রেমের সম্পর্ক হয় এবং তার ফলশ্রুতিতে বিবাহবহির্ভূতভাবে জন্ম নেয় সন্তান লিসা। যখন ক্রিস্টেন স্টিভকে তার মাতৃত্বের সুসংবাদ দেয় তখন স্টিভ রেগে যান এবং বলেন যে তিনি যেহেতু সন্তান জন্মদানে অক্ষম, তাই এটি কখনোই তার সন্তান হতে পারেনা। শুধু এটি বলেই স্টিভ ক্ষান্ত হননি বরং এই বাচ্চাটির ভরণপোষণে অস্বীকার করেন এবং ক্রিস্টেনকে এই বাচ্চাটিকে অনাথাশ্রমে দিয়ে দিতে বলেন। পরে ক্রিস্টেনের চাকরি ছেড়ে সামাজিক সহযোগিতা ফান্ডের সহায়তা নিতে হয় এবং তিনি টাকার জন্য মানুষের বাড়িতে পরিষ্কমকর্মী হিসেবে কাজ নেন। তবে অনেক বছর পরে স্টিভ তার ভুল বুঝতে পারেন এবং লিসাকে নিজের মেয়ের স্বীকৃতি দেন। তবে স্টিভ এবং তার আইনগত স্ত্রী লরেন্স পাওয়েল এর সংসারে তিনটি সন্তান কিভাবে হয়েছিল এবং স্টিভ কেন তাদের পিতৃত্ব নিয়ে সন্দেহ করেননি তা কখনো জানা যায়নি।

মেয়ের সাথে জবস

এসব ঘটনা ছাড়াও অফিসের অধস্তনদের সবার সামনে ছাঁটাই করা, সামান্য ভুলের জন্য অশ্লীল গালিগালাজ করা এবং চাকরি থেকে কোনো রকম অর্থনৈতিক সাহায্য ছাড়াই ছাঁটাই করে দেওয়া সহ নানারকম কাজের জন্য স্টিভ জবস নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের কাছে কোনোদিন ভালো ইমেজ তৈরি করতে পারেননি। এমনকি নিজের বন্ধু স্টিভ ওজনিয়াককে যৌথ কাজের অংশীদার করে কাজ করিয়ে নিয়েও লাভের টাকা মেরে দেওয়ার মত কাজও স্টিভ এর দ্বারা হয়েছে।

“তুমি একটা নির্লজ্জ চোর বিল গেটস”- স্টিভ জবস

একথা সত্যি যে স্টিভ জবস ব্যক্তিগতভাবে অনেক নেতিবাচক দিকসম্পন্ন মানুষ হলেও তার অনেক দোষগুলোই বরং স্টিভের অধীনস্ত কোম্পানিগুলোকে আকাশচুম্বী সাফল্য এনে দিয়েছে এবং সারা পৃথিবীতে আজ সেই কোম্পানিগুলো একটা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তারপরেও সবকিছুকে ছাপিয়ে একজন ভালো উদ্যোক্তা কিংবা একটি কোম্পানির বসের উচিত তার সহকর্মী কিংবা অধস্তনদের মানবিক দিকগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সর্বোপরি নিজের নৈতিকতা গুণ থাকা আবশ্যক। কারণ আজকে যে উদ্যোক্তার খাতায় নিজের প্রথম নাম লেখালো সেতো স্টিভকে ফলো করতে পারে এবং সাথে তাঁর নেতিবাচক দিকগুলোকেও।

তথ্যসূত্রঃ
১. 16 Examples Of Steve Jobs Being A Huge Jerk 

২. Steve Jobs Was A Jerk, You Shouldn’t Be

৩. Steve Jobs Was an *******, Here Are His Best Insults

৪. Steve Jobs: A genius but a bad, mean manager

 

Most Popular

To Top