নিসর্গ

আমার দেখা ইরান (দ্বিতীয় পর্ব)

আমার দেখা ইরান (দ্বিতীয় পর্ব)

আমাকে যে কনফারেনসে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তার নাম নাস্তারান ক্যানসার সিম্পোজিয়াম। যদিও একে সিম্পোজিয়াম বলা হয়েছে কিন্তু পার্টিসিপেন্টসের সংখ্যা হিসাবে একে অনায়াসে কংগ্রেস বলা যাবে। ৩৫৮ টি পোস্টার প্রেজেন্টেশান সহ সর্বমোট প্রায় ৪০০ টি পেপার প্রেজেন্ট করা হয়েছিল। পার্টিসিপেন্টস ছিল প্রায় এক হাজারের বেশি। আমি সহ ৮ জন ইন্টারন্যাশনাল স্পিকার গিয়েছিলাম।

শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কনফারেনস করার জন্য ফেরদৌসি ইউনিভার্সিটি ছয় তলা বিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক মানের কনফারেনস হল খুলে বসে আছে। যেখানে ১০০০ আসনের একটি অত্যাধুনিক থিয়েটার আছে। পোস্টার প্রেজেন্টেশান, ডেলিগেটদের খাওয়া দাওয়া সহ সব কিছুর জন্য আলাদা আলাদা হল আছে। আমি প্রায় শখানেক কনফারেনসে গিয়েছি, কোথায় এক সাথে, অল্প জায়গায় এমনটি দেখিনি। আমরা যারা বিদেশি স্পিকার ছিলাম তাদের খাওয়া দাওয়া সহ সব কিছুতেই আবার স্পেশাল ব্যবস্থা ছিল।
ইরানে যাওয়ার আগে কত কথা শুনেছি – পাবলিকলি কোন মেয়েদের সাথে কথা বলা যাবে না। কারও সাথে হ্যান্ডশেক করা যাবে না। ইরানের মেয়েরা নিজেদেরকে কালো বোরখায় আবৃত করে রাখে বা রাখতে হয়। কিন্তু মাসাদ এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করতে যারা এলো তাদের মধ্যে কয়েকজন মেয়ে ছিলেন। আমি হাত বাড়ানোর আগেই তারাই হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েরা কালো বোরখা পড়ে তা ঠিক আছে – কিন্তু তাও অনেক ফ্যাশনাবল। যেমনটি বলা হয় তেমন ভাবে পুরো মাথা ঢাকা না, বেশির ভাগের প্রায় অর্ধেক মাথা খোলা থাকা দেখেছি। কনফারেনসে যাদের সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে এদের বেশির ভাগেই খুব ভালো ইংরেজি জানে। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে এদের ইংরেজির লেভেল আমাদের বাংলাদেশি বা ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া এভারেজ ছেলেমেয়েদের চেয়ে অনেক ভালো বলেই মনে হয়েছে।

সাধারণ ইরানিরা খুবই অতিথিপরায়ণ। আমাকে প্রায় তিন চার জন তাদের বাসায় দাওয়াত করেছে। আমার কাছে এই অভিজ্ঞতা একেবারে নতুন। পৃথিবীর অনেক দেশে গিয়েছি কিন্তু কেউ কখনও তাদের বাসা বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেনি। কনফারেনসের ফাঁকে ফাঁকে চারদিনে মাসাদ শহরের ভালো ভালো বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়ার অভিজ্ঞতা হলো। জীবনে অনেক দেশে অনেকবার কাবাব খেয়েছি- কিন্তু ইরানের কাবাবের সাথে তুলনা করলে আগের সব কাবাবকে ইটের টুকরা বললেও কম বলা হবে। শিক কাবাব যে এত নরম এত সুস্বাদু হয় তা আমার সেদিন মাসাদে খাওয়ার আগ পর্যন্ত জানা ছিল না। লেম্ব দিয়ে, চিকেন দিয়ে এত এত আইটেম! আমি কখনই খাবারের পোকা না। কিন্তু নিয়মিত ভাত মাছ ডাল না খেলে তিন চার দিন পরেই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হয়! এইবার ইরানে যাওয়ার আগে সোমাকে বলেছিলাম – ওদের সিকিউরিটি টিকিউরিটি নিয়ে ভয় পাচ্ছি না – কিন্তু টানা ৯ দিন ভাত মাছ ছাড়া শুধু কাবাব খেয়ে থাকতে হবে এটা ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু মাসাদ শহরে প্রথম রাতেই মাজিদ আমাদের নিয়ে গেলো একটি স্পেশাল রেস্টুরেন্টে। সেদিনেই ইরানের কাবাব এবং সেফরন দেওয়া ভাতের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। কী স্বাদ! শুধু অনিয়ন, শুধু অলিভ এবং শুধু চিলি দিয়েও কিছু আইটেম খেয়েছি – স্বাদ এমন ছিলো যে হাপুস হুপুস করে খাচ্ছিলাম। খাওয়ার তোড়ে এসব আইটেমের নাম জিজ্ঞেস করতেও ভুলে গিয়েছি। আমার হাভাতের মত খাওয়া দেখে মাজিদ বার বার মনে করিয়ে দিয়েছিল – মেইট, স্লো ডাউন। মেইন ডিসেস আর স্টিল দেয়ার। মেইন ডিসেস আসার পরে ভাত রেখে শুধু শিক কাবাব, লেম্ব কাবাব, চিকেন কাবাব খাওয়া শুরু করলাম। এত নরম, এত সুস্বাদু খাবার আমি জীবনে খুব কম খেয়েছি। ওয়েটারের কাছ থেকে এই খাবার রান্নার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে যা জেনেছি তা শুনে মনে হয়েছে, ইয়েস এইভাবে এত যত্ন করে যা বানানো হয় তার স্বাদ এমন হবারেই কথা। টানা দুই তিন সপ্তাহ বিশেষ কিছু মসলা এবং ফলমূলের রস দিয়ে গোস্তকে মেরিনেড করা হয়। আরও হাবিজাবি অনেকগুলো স্টেপের শেষে রান্নাও হয় চার পাঁচ ঘন্টা ব্যাপি। তবে এত সুস্বাদু খাবারের দাম কিন্তু খুব আহামরি কিছু না। অস্ট্রেলিয়ার টাকায় প্রতি জনের ২০ থেকে ২৫ ডলারে হয়ে গিয়েছিলো।

পানীয় নিয়ে একটি মজার ঘটনা বলি। প্রতি রাতে আমরা মাসাদ শহরের খুব ঝমকালো কিছু কফি শপ এবং বারে পানীয়ের জন্য যেতাম। ইরানে এলকোহল নিষিদ্ধ (যদিও ইস্পাহান শহরের আর্মেনিয়ান চার্চের আশেপাশে নিউ ইয়ারের সময় এলকোহল খেতে দেওয়া হয় বলে জেনেছি)। কনফারেনসের দ্বিতীয় দিন ডিনারের পরে গেলাম পাহাড়ের পাদদেশের এক বারে। সেখানে গিয়ে আমি অন্য আরেক ইরানকে দেখতে পেলাম। ট্রেডিশন্যাল ইসলামি মিউজিকের পরিবর্তে উচ্চস্বরে জাস্টিন বিবারের গান বাজছে। এখানে বলে রাখা ভালো মাসাদ শহর একটি বড় পাহাড়ের ভ্যালিতে অবস্থিত। সেই রাতে এমনিতেই মাসাদের তাপমাত্র ছিলো প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, পাহাড়ের পাদদেশের তাপমাত্র ছিলো শূন্যের আরও অনেক নীচে। আমরা এই শীতেও বারের বেলকনিতেই বসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের সুবিধার্থে অনেকগুলো ইলেক্ট্রিক হিটার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। যখন পানীয়ের ওর্ডারের পালা আসলো আমরা মেন্যুতে দেখলাম কিউবান ট্রেডিশান্যাল ড্রিঙ্ক ‘মহিত’ লিস্টেড আছে। দেখেইতো আমাদের চোখ বড় হয়ে উঠোলো। বলে কী? তাহলে পাহাড়ের পাদদেশেই কী সব হালাল। এমন কী মহিত’ও? আমাদের বন্ধু ফ্রানসের জেপি থিয়েরী মাজিদকে জিজ্ঞেস করল, কাহিনী কী? এখানে মহিত কীভাবে এলো? সে যা বলল তা শুনে আমাদের সবার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবার জোগাড়। নাম মহিত ঠিকই আছে, ইনগ্রেডিয়েন্ট – সুগার, লাইম জুস, সোডা ওয়াটার, মিন্ট, এডেড লাইম সবই আছে – শুধু একটি জিনিষ থাকবে না। মাত্র ৫ মিলিলিটারের হোয়াইট রাম সাহেব অনুপস্থিত থাকবেন। মহিত খাচ্ছ মনে করে এটি খাও- দেখবা মহিত এর স্বাদ পেয়ে যাবা। এখানে সব নামকরা এলকোহলের নামে ড্রিঙ্ক চালু আছে। সেসবে শুধু এলকোহল বাবাজি ছাড়া বাকী সব ইনগ্রেডিনেন্ট থাকবে (কী ভালো ব্যাবসায়ী ফন্দী!)

Most Popular

To Top