নাগরিক কথা

“দালাল বুদ্ধিজীবী” এবং একজন বুদ্ধিমান ফরমান আলী!

Neon Aloy Magazine

রাও ফরমান আলী নিঃসন্দেহে একজন বুদ্ধিমান মানুষ ছিল। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা যে করতে পারে, তার বুদ্ধি এবং দূরদর্শীতা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। রাও ফরমান আলীর উদ্দেশ্য যে সফল সেটা বর্তমান বাংলাদেশের দিকে তাকালেই বোঝা যায়! অবশ্য পাকিস্তানী, তাও আবার একজন উর্দিধারী, তার মাথায় এত বুদ্ধি থাকাটা এক বিরাট বিস্ময়। খুব সম্ভবত এই বুদ্ধি পুরোপুরি তার ছিলনা। ছিলনা। স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন থেকে তার স্বহস্তে লিখিত ডায়েরী পাওয়া যায় যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নামের সাথে সাথে হেইট ও ডুসপিক নামে দুজন মার্কিন নাগরিকের কথা পাওয়া যায়। এরা ছিল সি.আই.এ এজেন্ট। খুব সম্ভবত, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের এই মাস্টার-প্ল্যান এই অতিশয় ধূর্তদের মাথা থেকে এসেছিল।

একটি জাতির প্রাণ তার সেনাবাহিনী কিংবা রাজনীতিতে নয়, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিতে। সেনাবাহিনী এবং রাজনীতি- দুদিকেই শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়ে, শেষ ছোবল হিসেবে পাকিস্তানীরা ঐ প্রাণটাই ধ্বংস করে দিয়ে গেল। বাংলাদেশের বর্তমানে যে বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্য এবং উল্টো পথে হাঁটার প্রবণতা- সেটা মূলত ঐ হত্যাকাণ্ডেরই ধারাবাহিকতা। ১৪ ডিসেম্বর সহ, সমগ্র মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে শিক্ষাবিদ ছিলেন ৯৯১ জন, সাংবাদিক ১৩ জন, চিকিৎসক ৪৯ জন, আইনজীবী ৪২ জন এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ১৬ জন। প্রতিটি মানুষের জীবনই অমূল্য। তবে ৩০ লক্ষ অমূল্যের মধ্যে এই মানুষ গুলো ছিলেন একটু বেশি রকমের মূল্যবান, যারা থাকলে নবগঠিত বাংলাদেশের পরবর্তী রাস্তাটা ‘হয়তো’ অন্য রকম হতে পারতো।

‘হয়তো’ বলছি কারণ মাঝেমধ্যেই আমার একটা বিষয়ে প্রশ্ন জাগে। ধরা যাক, ১৪ ডিসেম্বর ঘটেনি, সেদিন টার্গেট করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়নি। তাহলে কি স্বাধীন বাংলাদেশে তাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ দেয়া হত কিংবা তাঁরা কি সুযোগ পেতেন? যুদ্ধকালীন সময়ে অনেকে পেশাগত কাজ করেছেন বলে কি তাঁদের হেনস্তা করা হত? ভারতে পালিয়ে গিয়ে সরকারের অংশ হননি বলে কি তাঁদের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করা হত? ‘মুক্তিযুদ্ধে কেন অংশ নিল না’- এই প্রশ্ন তুলে কি তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার পথ রূদ্ধ করে দেয়া হত?

প্রশ্নগুলো কোন কাল্পনিক হাইপোথিটিকাল প্রশ্ন নয়, বা নয় কোন থট-এক্সপেরিমেন্ট। সত্যি বলতে, আসলেই অনেকে এই প্রশ্ন তুলেছেও পরবর্তীকালে। তার উপর এই বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই সরাসরি আওয়ামীলীগার ছিলেন না, অধিকাংশ ছিলেন বামপন্থী ভাবাদর্শে উজ্জীবিত। তাই মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আসলেই কি এঁরা কাজের সুযোগ পেতেন, নাকি চিহ্নিত হতেন সরকার-বিরোধী হিসেবে- এই প্রশ্ন জাগাটা, পরবর্তী ঘটনা-প্রবাহের প্রেক্ষিতে, অস্বাভাবিক নয়।

মরে গিয়ে যারা বীরের মর্যাদা পেয়েছেন, জীবিত থাকলে কি মূল্যায়িত হতেন সঠিক ভাবে? যে জামাত হত্যা করেছিল বুদ্ধিজীবীদের, তারাও এক সময় দেশে ‘বুদ্ধিজীবী দিবস’ পালন করেছে! তাদের ধারক ও বাহক বি.এন.পি এবং পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ- সকলেই ‘যথাযোগ্য মর্যাদায়’ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করে আসছে। মৃত বুদ্ধিজীবীরা পূজিত হতে পারে, কিন্তু জীবিত বুদ্ধিজীবী- সব রাজনৈতিক দলের জন্যই চিহ্নিত হয়- ‘বিপদ’ কিংবা ‘ঝামেলা’ হিসেবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কি এর ব্যতিক্রম হত?

যে সকল বুদ্ধিজীবীরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের কিছু সৃষ্টি আমরা পেয়েছি, আমাদের সৌভাগ্য। কিন্তু সেই অল্প খানিকটা সৃষ্টির স্বাদ নিয়েই বুঝতে পারি আমাদের দুর্ভাগ্যের পরিমাণটা কত বেশি, আমরা কাদের মেধার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। তাঁদের সেসব সৃষ্টি দেখে কী মনে হয়? তাঁরা কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন? সেই স্বপ্নের বাংলাদেশের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের মিল কতটুকু? অর্থনৈতিক উন্নতি একটি অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া, সরকারে টিকে থাকতে, বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটাতেই হবে। কিন্তু শুধু দেশীয় অর্থনৈতিক উন্নতি কি মুক্তিযুদ্ধ তথা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগের পেছনে মূল কারণ ছিল? এরশাদের আমলে অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছিল, কিন্তু এরশাদকে কেউ সে কারণে গ্রহণ করেনি। সে এখন রাজনীতির মাঠে ভাঁড় হিসেবে বিরাজ করছে। সৌদি আরব তেল বেঁচে অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থানে ছিল, কিন্তু সৌদি কারো রোল-মডেল নয়। একই ভাবে, বাংলাদেশ বলতে যে বিমূর্ত ধারণাটা আমরা অনুভব করি,সেটা শুধুই অর্থনৈতিক উন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলনা। যা ছিল- সেই পথ থেকে আমরা বিচ্যুত হয়েছি অনেক খানি।

মুক্তচিন্তার পথ এখানে রূদ্ধ। সরকারী ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে মৌলবাদী অপশক্তিগুলোকে। ৭১-এ আলবদর, আজ অন্য নামে ফিরে এসে মেধাবী মানুষ গুলোকে হত্যা করছে স্বাধীন দেশের রাজপথে। স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী গুলো এখানে নির্যাতিত। একাত্তরের পাক-আর্মিদের মত, স্বাধীন বাংলাদেশের আর্মি পাহাড়ীদের কাছে বিভীষিকা। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিলনা। মুক্তিযুদ্ধ তো এ কারণে হয়নি। বুদ্ধিজীবীরা তো এমন স্বপ্ন দেখেননি। এই বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী দিবস পালন তাই আমার কাছে রসিকতা বলে মনে হয়, শহীদদের রক্তের সাথে রসিকতা।

ধন্য রাও ফরমান আলী। ধন্য সি.আই.এ । ধন্য আল বদর। ধন্য পাক আর্মি। তারা ৭১-এ আমাদের যে শিকড়টা কেটে ফেলেছে, সে জমিতে আজ অবধি নতুন চারা জন্মায়নি। বরঞ্চ এখন আয়োজন করে সেই জমিকে বন্ধ্যা বানিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া চলমান। সেই জমিতে তাই অমন সোনার চারা ফলেনা, জন্ম নেয় বাংলা ভাই-আকায়েদ-নিবরাসের মত আগাছারা। বীজটা কি এখনো আছে? কোনদিন কি অঙ্কুরিত হবে ৭১-এর সেই বীজ?

Most Popular

To Top