ইতিহাস

ম্যানচেস্টার ডার্বির ইতিহাস

“On derby day in Manchester, the city is cut in two. The Blues and the Reds invade the streets and if your team wins, that means city belongs to you”Eric Cantona

এরিক কান্টোনার এই উক্তিই সম্ভবত জানিয়ে দেয় ম্যানচেস্টার ডার্বির উত্তাপ।

ডার্বির গল্পটার হাতেখড়ি ১৮৮১ সালে। মূলত আশির দশকে শুরু হয় ওয়েস্ট গর্ডন এবং নিউটন হিথ এর দ্বৈরথ। কি ভাবছেন? কোথা থেকে আসলো এরা? আসলে, এই দুই টিমেরই পরিনত অবস্থা ম্যানচেস্টারের দুই ক্লাব। ম্যান ইউনাইটেড পরিচিত ছিল নিউটন হিথ নামে আর সিটি পরিচিত ছিল ওয়েস্ট গর্ডন নামে।

হিস্টোরি অব ম্যানচেস্টার ডার্বি- Neon Aloy

১৯৬৯ সালের একটি ম্যানচেস্টার ডার্বির একটি ছবি

লাল নাকি নীল! ম্যানচেস্টারে প্রশ্নটি প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সবার গলার কাঁটা। রবিবারের ডার্বি ম্যাচ যেন শহরটা কার তারই প্রশ্নত্তর পর্ব। সমর্থকরা যেন যুদ্ধেই নামেন এইদিনে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার,আতশবাজি, নিজটিমের চিয়ারিং সং সবই যেন বুঝিয়ে দেয় “Its more than just a game”।

১৮৮১ সালে যখন দুইদলের প্রথম দেখা হয় তখন উভয় দলই কেবল নিজেদের শহরের লীগ ফুটবল ঠিকঠাক করতে ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু ১৮৯০ এর দিকে তারা ম্যানচেস্টার শহরে নিজেদের রাজত্ব শুরু করে। প্রথম ডার্বি ম্যাচ নিউটন হিট জিতে ৩-০ গোলে। এরপর টানা ৬ বছর ম্যানচেস্টার কাপে নিজেরা শিরোপা ভাগাভাগি করে। কিন্তু ডিভিশন ভিত্তিক ফুটবলে তারা কিছুতেই যোগ দিতে পারছিলনা। অবশেষে প্রচেস্টা সফল হয়। ১৮৯২ তে ইউনাইটেড ১ম ডিভিশনে এবং সিটি ২য় ডিভিশনে যোগ দেয়।

ফুটবল লীগে প্রথম বারের দেখায় তৎকালীন নিউটন হিথ (ইউনাইটেড) ৫-২ গোলে হারায় আডউইক (সিটি) কে। কিন্তু ইংলিশ লীগের সর্বোচ্চ স্টেজে দুই দলের প্রথম দেখা হয় ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে। সেখানে ইউনাইটেডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে চমকে দেয় সিটিজেনরা। কিন্তু ঐ সময় সিটির ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম কেলেঙ্কারির সৃষ্টি হয়। অর্থ কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় সিটির তাদের ১৭ জন খেলোয়ার নিজ ক্লাবের হয়ে খেলা আজীবন নিষিদ্ধ হয়। ব্যাপারটির সুবিধা নেয় ম্যান ইউনাইটেড। সাইন করায় সিটির তৎকালীন নিষিদ্ধ চার খেলোয়াড়কে। তার মধ্যে দুই বড় তারকা বিলি মেরেডিথ এবং স্যান্ডি ট্রানবুল ছিলেন। তাদের অন্তর্ভুক্তিতে ইউনাইটেড তাদের প্রথম লীগ টাইটেল জেতে ১৯০৮ সালে। প্রতিদ্বন্দ্বীতা কমে গেলে তখন ডার্বির আকর্ষণ একটু ফ্যাকাশে হয়ে যায়।

হিস্টোরি অব ম্যানচেস্টার ডার্বি- Neon Aloy

১৯০৬-০৭ সালের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

ম্যানচেস্টার এর ইতিহাসে মোট ৫ জন খেলোয়ার ছিলেন যারা উভয় ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। তারা হলেনঃ
স্যান্ডি ট্রানবুল, বিলি মেরেডিথ, হারবার্ট বুরগেস, জিমি ব্যানিস্টার এবং কার্লোস তেভেজ। একমাত্র ম্যানেজার হিসেবে উভয় ক্লাবের কোচ হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আর্নেস্ট ম্যাংনালের।

হিস্টোরি অব ম্যানচেস্টার ডার্বি- Neon Aloy

আর্নেস্ট ম্যাংনাল

ডার্বির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ম্যাচ খেলেছেন ম্যান ইউ লিজেন্ড রায়ান গিগস(৩৬)। সবচেয়ে বেশী গোল দেওয়ার কৃতিত্ব আছে ওই ক্লাবেরই ওয়েইন রুনির(১১)।

এ পর্যন্ত দুদলের মুখোমুখি লড়াই হয়েছে ১৭৪টি। যেখানে সিটির ৫২ জয়ের বিপরীতে ইউনাইটেড জিতেছে ৭২টি এবং ড্র ৫২টি। লীগে দুদলের ১৫৬ বারের দেখায় সিটি জিতেছে ৪৪টি,ইউনাইটেড ৬১টি এবং ড্র ৫১টি। এফ এ কাপে দুদল মুখোমুখি মোট ৯ বার। এএ দেখায় সিটি জিতেছে ৩টি এবং ইউনাইটেড ৬টি। লীগ কাপে ৭বারের দেখায় উভয় দল ৩টি করে জিতেছে এবং বাকীটা ড্র হয়েছে। কমিউনিটি শিল্ডে দুইদলের ২ বারের দেখায় দুই ম্যাচেই জয় পায় ইউনাইটেড।

১৯৭০ এর দিকে ম্যানচেস্টার ডার্বি আবার তার পুরনো ছন্দ ফিরে পায়। ৮০ দশক পর্যন্ত ডার্বি ম্যাচ উত্তেজনা জমালেও ৯০ দশকে এর উত্তাপ একটু কমেই যায়। এর কারণ তখনকার ইউনাইটেডের একচ্ছত্র আধিপত্য। ৯০ এর পুরোটা দশক সিটি যেন কোন পাত্তাই পায়নি ইউনাইটেডের কাছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ম্যানচেস্টার এর মানুষেরা উভয় দলকে সমান সাপোর্ট দিত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুদলের মাঝে উত্তেজনা যেন ফেটে পড়ে । তখন বিশ্ব কেবল নতুন করে ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত। একারণে তাদের সমর্থকগোষ্ঠীও আলাদা হতে থাকে। ডার্বি পরিনত হয় একই শহরের বিশ্বযুদ্ধে।

ম্যানচেস্টার ডার্বিতে উত্তেজনা ভিন্ন মাত্রা নিয়ে এসেছিলো কিছু ব্যাক্তিগত দ্বৈরথ। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলো ইউনাইটেড লিজেন্ড জর্জ বেস্ট আর সিটির তারকা খেলোয়ার গ্লিন প্যারড এর দ্বৈরথ। ১৯৭০ সালের কথা। ডার্বির ম্যাচে আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বেস্টকে “ওভাররেটেড”প্লেয়ার বলেন পারেডো। কিন্তু কে জানত শোধটা এভাবে তুলবেন বেস্ট? ম্যাচের দিন বেস্টের মারাত্নক ট্যাকলের শিকার হন পারডো। ট্যাকলের ফলে পায়ে গুরুতর চোট পান পারডো। ম্যাচ তো খেলতেই পারেন নি এবং পরবর্তীতে এর জন্য নিজের পা টাকেই হারাতে হয় তাকে! ২০০০ সালের দিকে তেমনি একটা নতুন দ্বৈরথ শুরু হয় দুদলের খেলোয়ার রয় কিন এবং আলফ-ইঞ্জে হালান্ড এর মাঝে। তাদের মাঝে প্রথম সংঘর্ষ শুরু হয় ১৯৯৮ এর দিকে যখন হালান্ড লিডস এর হয়ে খেলতেন (ঐ সময় লিডসকে ইউনাইটেডের আর্চ রাইভাল মানা হত)। সেই ম্যাচে হালান্ড কিনকে ট্যাকলের কারণে লাল কার্ড দেখেন। পরে হালান্ড কিনকে “ভন্ড অভিনেতা ” বলে মন্তব্য করেন। ২০০১ সালের এপ্রিলে তখন ম্যানচেস্টার ডার্বিতে তাদের ফিউড নতুন মাত্রা যোগ করে। হালান্ড সিটিতে যোগ দিয়েছিলেন। ঐ ম্যাচে আরেকটি নাটকীয়তার সৃষ্টি হবে তা হয়ত সবাই একটু আচ করতে পেরেছিল। এবার রয় কিনের ট্যাকলের শিকার হন হালান্ড এবং কিন উলটো এই ম্যাচে রেড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন।

হিস্টোরি অব ম্যানচেস্টার ডার্বি

আজ রবিবার, ওল্ড ট্রাফোর্ড স্টেডিয়ামে আরেকবার ডার্বি ম্যাচে মুখোমুখি হবে এই দুই দল। একদিকে আনবিটেন উড়তে থাকা পেপের ম্যানচেস্টার সিটি অন্যদিকে লীগ শিরোপার আশায় তার ঠিক পিছনেই থাকা মরিনহোর ম্যান ইউ। বর্তমান সময়ের এই দুই সেরা কোচের রাইভেলারি যেন নতুন মাত্রা যোগাচ্ছে ডার্বিতে।
“When u walk on the street of Manchester, Everyone and every single thing is screaming about Manchester Derby”- লুইস ভ্যান গাল।

রবিবারে যা ই হোক না কেন তা হতে, চলেছে শ্বাসরুদ্ধকর,উত্তেজনাপূর্ন এবং নাটকীয় । সেই প্রশ্নত্তর খোজার সময় চলে এসেছে আরেকটিবার। ম্যানচেস্টার তুমি কি সত্যিই লাল নাকি নীল? সাজবে কি রঙে এবার তুমি!

রণ সাজে সজ্জিত দুই দল। অপেক্ষায় অগনিত ফুটবল ভক্তরা।

Most Popular

To Top