ফ্লাডলাইট

বিসিবি কি নিরাপদ পথে হাঁটছে?

বিসিবি কি নিরাপদ পথে হাঁটছে?- Neon Aloy

রিচার্ড পাইবাসের পরিকল্পনা এবং উপস্থাপনায় বিসিবি নাকি মুগ্ধ হয়েছিলো, কোচ হবার দৌড়ে বেশ এগিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু গতকালই সেই সম্ভাবনা অনেকটা নাকচ হয়ে গিয়েছে। কারন তিন অধিনায়ক চান না পাইবাস কোচ হোক। পাইবাসকে না চাইবার এবং তাকে কোচ না পেছনে যুক্তিযুক্ত অনেক কারন আছে। তার ইতিহাস “কালো” তাই ভালো নজরে আসবেনা এখন। নিল ম্যাকেঞ্জি, সাউথ আফ্রিকার এই ব্যাটিং কোচের সাথে বিসিবির কথা হচ্ছিলো ব্যাটিং কোচ হিসেবে। সেটাতেও তিন অধিনায়ক একমত না বিসিবির সাথে। তাই এই বিষয়টাও শেষ বলা যায়।

আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিলো প্লেয়ার এবং কোচের ভেতর দূরত্ব চলছে। সিরিজ চলাকালীন হাথুরুসিংহে জানিয়ে দেন তার পদত্যাগের ইচ্ছার কথা। বোর্ড জানতো, কিন্তু বোর্ডের একটা দ্বায়িত্ববান ব্যক্তি সাউথ আফ্রিকা যাননি। বিষয়টা বোঝার বা সমঝোতা করার চেষ্টা করেনি। পাপন সাহেব নির্বাচন নিয়ে এতো ব্যস্ত ছিলেন যে বিষয়টা নিয়ে কারো সাথে কথাই বলার সময় পাননি। “যা হচ্ছে হতে দাও” ধরনের আচরন করেছে অনেকটা।

গতকাল তিন অধিনায়কের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে তারা কোচ না আসলে শ্রীলংকা সিরিজ এবং ট্রাই নেশনের জন্য নিজেরাই পরিকল্পনা করে দ্বায়িত্ব চালিয়ে নিতে পারবে কিনা।

এবার পয়েন্টে আসি, বিসিবি খুবই নিরাপদ রাস্তায় হাঁটা শুরু করেছে যার ফলাফল হতে পারে খুব খারাপ।

কোচ নিয়োগে অধিনায়কের মতামত প্রচ্ছন্নভাবে থাকতেই পারে, কিন্তু সেটা আগে বোর্ড একটা সিদ্ধান্ত নেয় তারপর কোচের সাথে কেমন কি শর্ত থাকতে পারে অথবা চুক্তিতে তার কাজের তালিকায় কি কি রাখা উচিৎ এসব। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিভাবে রাখা যাবে এসব। কিন্তু ঘটা করে, মিডিয়ায় জানিয়ে এসব করার কি মানে?

একটা বোর্ড কেন তার কোচ নিয়োগে প্লেয়ারদের উপর এতো নির্ভর করবে? কিছুদিন আগে সাউথ আফ্রিকার কোচ নিয়োগ হয়েছে। অধিনায়ক বা সিনিয়র প্লেয়ারদের সাথে বোর্ড কোন আলোচনাই করেনি। প্লেয়ারদের কাজ কোচের অধীনে খেলা, শিক্ষা নেয়া। আর বোর্ডের কাজ কোচ নিয়োগ দেয়া। সাউথ আফ্রিকা বোর্ড নিয়োগ দিয়েছে ইংল্যান্ডের সাবেক বোলিং কোচকে, যেটা প্লেয়ারদের অবাক করেছে মিডিয়ায় এসেছে। বোর্ড মনে করে তাদের এখন বোলিং নিয়ে সামনে বেশি কাজ করা উচিৎ আর এমন একজনকে দরকার যার পরিকল্পনা করার ক্ষমতা, পরিচালনা করার ক্ষমতা বেশি।

আমরা যতই বলি শ্রীলংকার কোচ হবার জন্য হাথুরুসিংহে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে, পুরা ক্রিকেট বিশ্ব কিন্তু জানে সিনিয়র প্লেয়ারদের সাথে বনিবনা না হওয়া এবং প্লেয়ারদের মানসিকতা পছন্দ না হাওয়ায় তিনি অনুকূল পরিবেশ না পেয়ে চলে গিয়েছেন। এর সাথে নতুন কোচ নিয়োগে তিন অধিনায়কের ভূমিকা যোগ করেন।

নতুন যে কোচ হবেন সে যদি এই দুটি মিলিয়ে দলের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিয়ে তিন অধিনায়ক আর সিনিয়রদের খুশি করে চলাকেই বেশি জরুরী মনে করেন? তখন নতুন কোচ কি ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে বিসিবির উক্ত বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলবেন?

যখন কোচ জানবেন তার থাকা না থাক এবং নিয়োগে প্লেয়ারদের ভূমিকা এতো জোরালো তখন তার দল নির্বাচন কি নিজের মত হবে নাকি অধিনায়ক/সিনিয়র প্লেয়ারদের পছন্দ অনুযায়ী? সিনিয়র প্লেয়াররা সবাই কোন না কোন ফ্রাঞ্চাইজি, ক্লাবের অধিনায়ক। সেই দলের প্লেয়ারদের কিছুটা ফেভার পাবার সম্ভাবনা নাকচ করে দেই কিভাবে?

সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে কোন কারনে যদি ওই কোচের সাথে সমস্যা হয় কিছু নিয়ে তাহলে পাপন সাহেব মিডিয়ায় হাসতে হাসতে বলবেন “ওরা যাকে চেয়েছে তাকেই-তো দিয়েছি, বোর্ডের তো কিছু করার ছিলোনা”। অর্থাৎ বোর্ড দ্বায়িত্ব প্লেয়ারদের উপর চাপিয়ে দেবে। হাথুরুসিংহের বিষয়ে যেসব ব্লেম বোর্ডের উপর আসে তখন এমন কিছু হলে বিসিবি এক কথায় বলে দিবে প্লেয়ারদের চয়েজ ছিলো। অনেক ছাড় দিয়ে হলেও প্লেয়ারদের পছন্দে তাকে আনতে হয়েছিলো।

হেড কোচ না থাকলে, মধ্যবর্তী সময়ে অন্য কাউকে দ্বায়িত্ব দেয়া হয়। কেউ না থাকলে ফিল্ডিং কোচকেও দ্বায়িত্ব দিতে দেখেছি। এর কারন প্লেয়াররা যাতে প্রেসার ফ্রি ক্রিকেট খেলতে পারে, খেলার বাইরে কিছু ভাবতে না হয়।

বিসিবি তিন অধিনায়কের উপর সামনের সিরিজের দ্বায়িত্ব দিতে পারে। আর ফলাফল কি হবে সেটা নিয়ে চাপটা তো প্লেয়ারদের উপরই পড়ছে তাহলে? ঘরের মাঠে শ্রীলংকার সাথে টেস্ট আর শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়ের সাথে ওয়ানডে হারলে (আশাকরি হারবে না) আমাদের আমজনতা প্রতিটা সিদ্ধান্ত আর ম্যাচ হারার জন্য তিন অধিনায়কের দিকেই আঙুল তুলবে কিন্তু!

যেই আবেগী জনতা এখন সিনিয়র প্লেয়ারদের পক্ষে তাদেরই বিপক্ষে যেতে এক সিরিজই যথেষ্ঠ।

পাইবাসকে প্লেয়াররা চাইবেন না এটাই স্বাভাবিক, পাইবাসের সাথে তাদের কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তিনি ক্ষেত্রবিশেষে হাথুরুসিংহের চেয়েও বেশি কড়া। কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

এখন সম্ভাবনা ফিল সিমন্সের। যার বেশিরভাগ সময় আয়ারল্যান্ডের সাথে কেটেছে যেখানে এতো রাজনীতি ছিলোনা, প্রত্যাশা ছিলোনা জাতীয় দলের উপর। সিমন্স খারাপ কোচ না অবশ্যই কিন্তু তার সময়ে উইন্ডিজ কি করেছে? আর বোর্ডের বাড়াবাড়ি ক্যারিবিয়ান সেরা ক্রিকেটারদের দলের বাইরে রেখেছে লম্বা সময় তখন স্বদেশি হয়েও বোর্ডের সাথে প্লেয়ারদের সম্পর্ক উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখতে পারেননি। সিমন্সের ম্যানেজমেন্ট সক্ষমতা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।

দৃশ্যত কোন উন্নতি না আনার কারনে কোর্টনি ওয়ালশের জায়গায় জাতীয় দলের বোলিং এর দ্বায়িত্ব দিতে চেয়েছিলো বোর্ড চাম্পাকা রামানায়েকের উপর। সেটা হয়নি কারন প্লেয়াররা সবাই ওয়ালশের পক্ষে ছিলো। ওয়ালশের উপর তারা মুগ্ধ। আর খালেদ মাহমুদ সুজন বলেছিলেন আমাদের পেসাররা নিয়মিত রুটিন ৪/৫ ওভার বোলিং ছাড়া অতিরিক্ত কিছুই করেনা, বিশেষ কিছু চেষ্টা করেনা। ওয়ালশ এসব নিয়ে কিছুই বলেনা, হয়তো সে কারনেই প্লেয়াররা তার উপর সন্তুষ্ট। আমাদের প্লেয়ারদের চাই এমন কোচ।

এদেশের ক্রিকেটে কি চলে, প্লেয়াররা কিভাবে একজোট হতে পারে আর আমরা কতখানি ইমোশনাল সেটা বিদেশি কোচদের জানা আছে, এজন্য কিছুটা অতিরিক্ত ক্ষমতা, বেতন, সুবিধা না দিলে তারা আসতে রাজি হয়না। সেদিন একজন পরিচালক বলেছেন নাম না প্রকাশ করার শর্তে মিডিয়াতে, “হাথুরুসিংহকে কেউ ফোন করার সাহস পেতনা, কিন্তু অতীতে অন্য কোচদের ফোন দিয়ে সব পরিচালক লবিং করতেন। এরে নেন, ওকে নিলেন না কেন এসব। আর এসব না রাখলে তখন কোচের বিরুদ্ধে জট পাকানো শুরু হয়ে যেত। এতোটাই যে জেমি সিডন্স যখন স্টুয়ার্ট ‘ল যাবার পর অন্তত ব্যাটিং কোচ হিসেবেও ফিরতে চাইলেন তখনো অনেক পরিচালক রাজি হননি।”

আর একটা কথা, মতামত নিলে সিনিয়র সবারই নেয়া উচিৎ। তামিম, রিয়াদের মতামতও। কারন আমাদের দল যতটা অধিনায়ক নির্ভর তারচেয়ে বেশি এই কয়জন সিনিয়র নির্ভর। যেকোন সময় অধিনায়ক বদল হতে পারে, বা অন্য সমস্যায় কেউ বাদ যেতে পারে। ফলে সাম্ভাব্য বাকি দুইজনকেই আলোচনার অংশ করা উচিৎ। তবে একটা শক্ত শেকড়ের প্রফেশনাল বোর্ড নিজেই সিদ্ধান্ত নিবে এমনটাই দেখে এসেছি আগে। প্লেয়ারদের কাজ খেলা, শিখতে চেষ্টা করা, কোচ নিয়োগ বা জট পাকানো তাদের কাজ না। তাদের হয়ে সরব হবার জন্য, আওয়াজ তোলার জন্য জনতা আছে, আছে মিডিয়া। অবশ্য আমাদের মিডিয়া খবর সংগ্রহ করার চেয়ে খবর বানাতে বেশি আগ্রহী থাকে।

হাথুরুসিংহের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়াটা ভুল ছিলো। এবার মনেহয় বিসিবি প্লেয়ারদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিচ্ছে, তাতে সিনিয়র সব প্লেয়ার, ফ্যানবেজ আর আমজনতা আপাতত খুশি হলেও ভবিষ্যতে ব্যাকফায়ার করতে পারে।

বেশ কয়েক বছর আগে এইরকম কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়েছিলো পাঁচজন প্লেয়ারের উপর। তামিম, সাকিব, মুশফিক, রিয়াদ আর রকিবুল হাসান (মাশরাফি ইনজুরিতে বাইরে ছিলেন)। সেসময় সব সিদ্ধান্ত এই পাঁচজন মিলে নিতেন। একটা সময় এদের সাথে জুনিয়র প্লেয়ারদের প্রচন্ড গ্যাপ তৈরী হয়, তাদের কোথাও কোন ভূমিকা নেই, মতামত নেই ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত সেই গ্যাপ এবং সেটা থেকে তৈরী জটিলতায় অধিনায়কত্ব ছাড়তে হয়েছিলো সাকিবকে। মনে আছে সাকিব সেসময় বলেছিলো, “এটা আমার দল না”। রকিবুলকে বাদ দেয়াটা সাকিব তখন ভালো ভাবে নেয়নি, আরো অনেক কারন ছিলো।

প্লেয়ারদের কেন বিসিবি এখন হুট করে গুরুত্ব দিচ্ছে সেটা পুরাটাই আমার ধারণা থেকে লেখা তবে আমার কেন জানি মনেহয় সিনিয়র প্লেয়ারদের ভবিষ্যতে জনতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে এই সিদ্ধান্ত এবং বিসিবিকে বিভিন্ন ইস্যু থেকে গা বাঁচানোর একটা রাস্তা করে দেবে।

Most Popular

To Top