নাগরিক কথা

উচ্চশিক্ষায় বিদেশগামী প্রবণতা; কতটুকু যৌক্তিক আর কতটুকু ঝোঁক?

উচ্চশিক্ষায় বিদেশগামী প্রবণতা; কতটুকু যৌক্তিক আর কতুটুকু ঝোঁক?- Neon Aloy

“বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেয়ে বিদেশের যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ভাল, তাই না ভাইয়া?” উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া ছাত্রের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে একটু থমকে গেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমার এমন মনে হওয়ার কারণ কী?” সে বলল, “বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং- এ ২০০০ এর মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই”। প্রতিউত্তরে আমি তাকে জানালাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং প্রধানত গবেষণার প্রতি গুরুত্ব এবং এ বিষয়ে কী পরিমাণ খরচ হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে। বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত্ব উপস্থাপনের মাধ্যমে তাকে আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করলাম যে, বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষত বেশ কয়েকটি বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার উপর গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুযোগ-সুবিধা এবং শিক্ষাদানের পদ্ধতি ও মান অনেক উন্নত। কিন্তু বিদেশের ‘যেকোন’ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত থেকে তাকে একচুলও নড়াতে পেরেছি বলে মনে হয় না।

শুধু একজন নয়, প্রতিবছর এমন হাজারো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কেউ কেউ যাচ্ছে যৌক্তিক কারণে, আবার অনেকে যাচ্ছে অযৌক্তিক কারণে।

যৌক্তিক-অযৌক্তিক কারণগুলো লেখাটির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছি।

১) সার্থকভাবে পড়াশোনা শেষ করা একজন শিক্ষার্থী হয়তো নিজেকে একজন সার্থক গবেষক হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে অবস্থা তাতে বিদেশের উন্নত গবেষণা সুযোগ তাকে টানবেই।

২) ছাত্ররাজনীতি ক্যাম্পাসগুলোতে যে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তা কারও কাম্য নয়। সামর্থ্যবানদের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিরুৎসাহিতকরণের পেছনে এটি একটি বড় কারণ।

৩) রাজনৈতিক বিবেচনা শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। ফলে শিক্ষার মানকে কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে অনেকে পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে।

৪) বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক বৈচিত্র্যতার মিলনস্থল। এসব স্থানে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা গৌরবের ব্যাপার।

৫) অনেকে নিজের স্বপ্ন পূরণে ছুটে চলেছে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। অর্থাৎ সে ভবিষ্যতে নিজেকে যে স্থানে দেখতে চায়, সেসব ক্ষেত্র হয়তো বাংলাদেশে সংকুচিত। ফলে বাধ্য হচ্ছে বিদেশে যেতে।

মোটামুটি যৌক্তক কারণগুলো আমরা দেখে ফেললাম। মুদ্রার উল্টো পিঠটা এবার দেখে আসিঃ

১) ধনী শ্রেণির মানুষের চিন্তা-চেতনা। সন্তান বিদেশে পড়াশুনা করলে সমাজে মান-সম্মান বৃদ্ধি পাবে বা অন্যদের নিকট থেকে আলাদা কদর পাওয়া যাবে। ফলে যেকোন শর্তে সন্তানকে বিদেশে পড়তে পাঠানোকে তারা ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

২) প্রকৃতপক্ষে সবাই বিদেশে পড়তে যায় না। কেউ কেউ কাজের উদ্দেশ্যে ‘স্টুডেন্ট ভিসা’কে কাজে লাগায় মাত্র।

৩) অনেকেই ভাবেন একবার বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে যেকোন উপায়ে সেদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে।

৪) অনেকে আছেন যারা এদেশে জন্মেছেন, এদেশের আলো-বাতাসে বড় হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশকে দেশই মনে করেন না। বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা তাদের রক্তে প্রথিত।

৫) উন্নত জীবনের আশা বাংলাদেশের মানুষকে সবসময় টানছেই।

যোগ্যতা বলে ও প্রয়োজনের খাতিরে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে অবশ্যই যেতে হবে। তবে যদি ‘যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশেই পড়তে হবে’ প্রবণতা এমন হয়, তাহলে তা ভয়ংকর। মৌলিক চেতনাকে পাশ কাটিয়ে বাহ্যিক বিষয়বস্তু নিয়ে চলা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে মূল উদ্দেশ্যসাধনও ব্যহত হয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ এবং শিক্ষাগত মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। অভিভাবকদের ভূমিকাও কম নয়।

উচ্চশিক্ষায় বিদেশগামীতায় যারা ফ্যান্টাসিতে ভুগছেন তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক- এই প্রত্যাশা করি।

Most Popular

To Top