ফ্লাডলাইট

রবিনহোঃ ফুটবল সেন্সেশন থেকে একজন ধর্ষক!

একসময় “কিং ওফ ড্রিবল” নামে যার ছিল খ্যাতি, যার মাঝে কিনা লেজেন্ড পেলে নিজেকে খুজে পেয়েছিলেন! হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন রবিনহোর কথাই বলছি। যার হওয়ার কথা ছিল “Next big one” পথিমধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেল সে।

পুরো নাম রবসন ডি সওজা। জন্ম ১৯৮৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারী সাউ ভিসেন্তে,সাউ পাওলোতে। বাবা গিলভ্যান ডি সওজা ছিলেন পণ্য বিক্রেতা আর মা মেরিনা দা সিলভা ছিলেন হোটেলে কাচামাল খাদ্যদ্রব্য সরবরাহকারী। ছোটবেলা কাটে বস্তিতে মাথায় দরিদ্রতার বোঝা আর রাস্তায় ফুটবল খেলে।

শুরুটা করে সে ইনডোর ফুটবল দিয়ে। টিমের সেরা প্লেয়ার ছিলো সে। আশ্চর্যজনকভাবে এক সিজনে ৭৩ গোল করে তাক লাগিয়ে দেয় সবাইকে। দিন যেতে থাকে, প্রতিভা যেন ফুলে ফেঁপে বের হতে থাকে তার। চোখে পড়েন ব্রাজিলিয়ান লেজেন্ড পেলের। তাকে ভর্তি করে দেন সান্তোসের যুবদলে।

ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের সাথে রবিনহো

শুরু হয় যাদুকরের যাদু দেখানো। অচিরেই জায়গা করে নেন মূল দলে। জিতে “কম্পোনাতো ব্রাসিলিরেও” ট্রফি। ২০০৩ সালে সান্তোসকে কোপা লিবারতোকাস এর ফাইনালে উঠান কিন্তু বোকা জুনিওরস এর কাছে হেরে সে বছর ট্রফি খোয়াতে হয়। সালটি ছিল ২০০৪ শুরু হয় রবিনহো ঝড়। ৩৭ ম্যাচে ২৭ গোল করে সান্তোসকে জিতান আরেকটি ট্রফি। আর নজরে আসেন ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর। কিন্তু সেবছর সান্তোস কোন অফার কানেই তুলেনি।

রবিনহোঃ ফুটবল সেন্সেশন থেকে একজন ধর্ষক!- Neon Aloy

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সান্তোসের হয়ে মাঠ মাতান রবিনহো

২০০৫ সালটি হয়ত তার লাইফে একটু কালো দাগই হয়ে থাকবে। এলোমেলো খেলতে থাকে রবিনহো। কারনটি ছিল তার মায়ের কিডন্যাপ। ৬ নভেম্বর তার বাড়ি প্রাইরা গ্রান্দে থেকে তার মাকে নিয়ে যাওয়া হয় । ময়ের প্রতি যার অসীম ভালোবাসা, সে এরকম অবস্থায় কেমন করে মন লাগাতে পারে খেলা ধূলায়। ৬ সপ্তাহ পর ৮৬,০০০ ইউরো মুক্তিপন দিয়ে তার মাকে ছাড়িয়ে আনেন । রবিনহো আবার ফর্মে ফেরা শুরু করেন। করেন ১২ ম্যাচে ৯ গোল । এদিকে ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো মুখিয়ে আছে তাকে সাইন করাতে। সান্তোসও বুঝতে পারে আর হয়ত তাকে ধরে রাখা সম্ভব হবেনা । ফলে জুলাই এ ২৪মি ইউরোর বিনিময়ে যোগ দেন রিয়ালে।

রবিনহোঃ ফুটবল সেন্সেশন থেকে একজন ধর্ষক!- Neon Aloy

লুইস ফিগোর সেই ১০ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়ে রিয়েল মাদ্রিদের সাথে যুক্ত হন

তাকে দেওয়া হয় লিজেন্ড লুইস ফিগোর ১০ নম্বর জার্সি। জাদুকরের জাদু দেখানো শুরু হয় সেখানেও। রিয়াল কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলো তাকে সবস্টিটিউড হিসেবে খেলাতে থাকেন। যদিও এল ক্লাসিকোতে সে ম্যান অফ দা ম্যাচ হয়েছিল। তবে তার বিদায়ে এবং নতুন কোচের আগমনে সে মূল দলে নিয়মিত জায়গা পেতে থাকেন এবং যাদুকরী খেলায় রিয়ালকে ৩০তম লা লীগা শিরোপা জিতান। রিয়াল মাদ্রিদ বস সে বছরই কথা দিয়েছিল রবিনহোর সাথে চুক্তির মেয়াদ বাড়াবে কিন্তু কৌশলী ক্যালডেরন তার বদলে রোনলদোকে আনার পরিকল্পনা করছিল। তবে তা ব্যর্থ হয়। ফলে ব্যর্থ ক্যালডেরন রবিনহোকে নতুন কন্ট্রাক্ট অফার করলে সে রিজেক্ট করে এবং চেলসিতে যাবে বলে গুন্জন ওঠে।

তবে চমক দেখা যায় ট্রান্সফার উইন্ডোর শেষ দিনে। ৩২.৫ মি পাউন্ডের বিনিময়ে হুট করেই যোগ দেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। চেলসিতে তার যাওয়া পাকাপোক্ত ছিল। কিন্তু হুট করে সিটিতে যাওয়ায় অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল সংবাদ সম্মেলনে। রবিনহো এবং সাংবাদিকদের মাঝে কথোপকথন নিচে দেওয়া হল-

রবিনহোঃ চেলসি খুব ভালো প্রস্তাব দিয়েছিল এবং আমি তাদের প্রস্তাবে রাজি।
সাংবাদিকঃ আপনি কি ম্যানচেস্টার সিটি বুঝাতে চাচ্ছেন?
রবিনহোঃ হ্যাঁ দুঃখিত সিটি।

সিটিতে প্রথম সিজন দূর্দান্তই কেটেছিল। সে বছর সিটির টপ স্কোরার ছিলেন তিনি। কিন্তু ধস নামে পরের বছর। পড়েন ইন্জুরিতে। ইন্জুরি থেকে ফিরে ১২ ম্যাচে করেন ১ গোল। খারাপ সময়ে সিদ্ধান্ত নেন প্রিয়তমার সাথে এক হবেন। ১২ বছর প্রেমের পর ২০০৯ সালে একই সুতায় বাঁধেন ভিভিয়ান গলিমিনেত্তির সাথে। তার বিয়েতে এসেছিল বিশ্বের সকল নামি দামি প্লেয়াররা। সবাই ভেবেছিল এরপর হয়ত পুরোনো রবিনহোকে আবার ফিরে পাওয়া যাবে। কিন্তু তার পারফর্মেন্সে আরও ধস নামে। ওই পাওয়ার শট, ডিফেন্ডারদের ঘাম ঝরানো যেন একরকম ভুলেই বসেছিলেন তিনি।

রবিনহোঃ ফুটবল সেন্সেশন থেকে একজন ধর্ষক!- Neon Aloy

ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর প্রথম সিজনে ছবির মত উড়ন্ত পার্ফরমেন্স করলেও তা আর বেশি দিন স্থায়ী হয় নি

অবশেষে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সান্তোসে লোনে। সেখানে কিছুটা আশার আলো দেখালে আবার সিটিতে ডাক পান তিনি। তবে সিটি থেকে অন্য ক্লাবে যাওয়ার ইচ্ছা পোষন করলে সিটিও তার সাথে কন্ট্রাক্ট বাড়াতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে এবং সান্তোসও তাকে বিড করে আনতে ব্যর্থ হয়। ফলে একরকম ফ্রি এজেন্টই হয়ে পড়েন তিনি এই সুযোগ কাজে লাগায় আরেক সুদিন হারানো ক্লাব এসি মিলান। ১৮মি ইউরোতে যোগ দেন মিলানে। ২০১০-২০১১ সিজনে জিতেন ইতালীয়ান লীগ শিরোপা। ২০১১-২০১২ সিজন ভালোই শুরু করে মিলানে। রবিনহোর বদৌলতে ২য় পজিশনে থেকে শেষ করে বছর।

রবিনহোঃ ফুটবল সেন্সেশন থেকে একজন ধর্ষক!- Neon Aloy

২০১০-১২ সিজনে ছন্দহীন রবিনহোকে দলে ভেড়ায় ধুঁকতে থাকা ইতালীয়ান ক্লাব এসি মিলান

এরপর যেন আর কিছুই ঠিক যাচ্ছিলনা তার জন্য ১২-১৩ সিজনের শেষে আবার গুন্জন ওঠে সান্তোসে ফিরে যাওয়ার কিন্তু বেতনে বনিবনা না হওয়ায় আর যাওয়া হয়নি। পরে সে কম বেতনে আরেকটি কনট্রাক্ট করে এসি মিলানের সাথে। তবে তা শেষ না হতেই পাড়ি জমান সাউ পাউলোতে। সেখান থেকে ২০১৫ সালের ১৬ জুলাই গুয়ানজেইউ এভারগ্রান্দের হয়ে নাম লিখান। তার এই কনট্রাক্ট ১বছর পর শেষ হয়। ২০১৬ সালে ফ্রি এজেন্ট হয়ে পড়েন এবং বর্তমানে অ্যাথলেটিকো মিনেরোর সাথে ২ বছরের কন্ট্রাক্টে আছেন তিনি।

রবিনহোঃ ফুটবল সেন্সেশন থেকে একজন ধর্ষক!- Neon Aloy

বিশ্বের বড় বড় ক্লাবর হয়ে মাঠ কাঁপিয়ে আসা রবিনহোর বর্তমান ঠিকানা এখন অ্যাথলেটিকো মিনেরো

ঝুলিতে যা ছিল হতেই পারতেন বিশ্বের সেরাদের একজন। ক্যারিয়ারের শুরুতে “নতুন পেলে” ট্যাগ হয়ত একটু বেশিই ভারী হয়ে গিয়েছিল তার জন্য। শুরুটা রিয়ালেই হয়েছিল। রিয়ালে ফ্লপ খাওয়ার পর ব্যাগ প্যাক করে চলে গেলেন ইংল্যান্ডে। যেখানে সিটি তার যোগ্য পারিশ্রমিকের তুলনায় একটু বেশিই দিচ্ছিল। তার ক্যারিয়ার জুড়ে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনার অভাবই তাকে মূল লক্ষ্য থেকে দূরে নিয়ে গিয়েছিল। ১৫ বছর বয়সের পেলের সেই ঘোষনা আরও বড় হয়ে ওঠে যখন ম্যানসিটি তাকে বানিয়ে দেয় ইপিএলের সবচেয়ে দামী প্লেয়ার। পেলে যে মানুষটি তাকে তার উত্তরাধিকারী ঘোষনা করেছিল সেই মানুষটিই এক বার্তায় বলেন যে, “চেলসি ভাগ্যবান যে এমম একটি প্লেয়ার তাদের ক্লাবে যায়নি, যে ভালো মন্দ কিছু না বুঝেই কাজ করে”। এমনকি প্রাক্তন ক্লাব সান্তোসও বলেছিল তারা লজ্জিত এমন একটি প্লেয়ার তারা তৈরী করেছিল তারা।

ইংল্যান্ডে পদার্পন অবশ্যই তার জন্য হতাশাব্যন্জ্ঞক ছিল। কারন সে সেখানকার গোত্রের প্লেয়ার ছিলেন না। এমনকি ২০১০ এর অর্ধেক সিজন সে সান্তোসে লোনে কাটায় যা তাকে সাউথ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ব্রজিল জাতীয় দলের টিকিট দিয়েছিল।

তার প্রত্যাবর্তনের যে ক্ষীন রেখা দেখা গিয়েছিল তা ও তার এসি মিলানে ফেরার পর। ২০১০ সালের গ্রীষ্মের ট্রান্সফারে রবিনহো আর ইব্রাহিমোভিচকে একসাথে সাইন করায় তারা। প্রথম সিজন ভালই কাটে, ঘরে তুলেন প্রথম ইতালিয়ান লীগ শিরোপা। যে শেষ পৃষ্ঠায় নতুন করে নতুন বেঁচে ওঠার রেখা দেখা যাচ্ছিল রবিনহোর, আসলে তা মিথ্যা বলেই আবার প্রমানিত হল। চাম্পিয়ন্সলীগে খারাপ পারফর্মেন্সের পর সে যেন কোচ ম্যাসমিলানো অ্যালিগ্রির ওপর বিশ্বাসই হারিয়ে ফেলেছিল । অনিয়মিত খেলতে থাকেন মূল দলে। এর মধ্যে মিলান ইব্রা আর সিলভাকে পিএসজি র কাছে বিক্রি করে দেয়। ফলে মূল দলে অনিয়মিত থেকে নিয়মিত হওয়ার বিশাল সুযোগ ছিল তার কাছে। কিন্তু তখনই আবার সেই ইন্জুরির থাবা এবং বিশ্বাসের অভাব যেন রাস্তার কাঁটা হয়ে দাড়ালো। হবেই বা না কেন মিলানে পার্টি করা, রাতে বাহিরে থাকা নিজের অভ্যাসে পরিনত করে ফেলেছিলেন তিনি।

২০১৩ সলে নাইট ক্লাবে একজন মহিলাকে ধর্ষনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয় সে। এভাবে চলতে থাকে তার মিলান লাইফ। সেও বুঝতে পারে মিলানে সে নিজের শেষ দিনগুলো গুনছে। খুব শীঘ্রই তাকে ব্যাগ গুছিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সান্তোসে আবার আরেকবার জীবন ফিরে পাবার আশায়। কিন্তু এবার হয়ত বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছিল । ব্রাজিল টিমেও তখন নতুন ট্যালেন্ট নেইমার অস্কারদের আগমন, যারা ব্রাজিলকে আরও সামনে লিড করবে। তাই ব্রাজিল টিমেও তার জন্য দরজা বন্ধ করে দেয়। অথচ বয়স তখন মাত্র ৩০। যখন একজন প্লেয়ারের স্বর্নযুগ চলে, তখনই হয়ত ক্যারিয়ারের শেষে দাড়ি লাগাতে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন তিনি । এদিকে এরপর ধর্ষন মামলাতেও দোষী প্রমানিত হন তিনি। পান ৯ বছরের জেল এবং ভুক্তভোগীকে ৭১,০৯৭ ডলার ক্ষতিপূরন দেওয়ার সাজা।

রবিনহোর ক্যারিয়ার একটি দৃষ্টান্ত যে কেমন করে ট্যালেন্ট, স্কিল, আগুন থাকা সত্তেও আপনি যদি সঠিক দিক নির্দেশনা এবং মাঠে সবটুকু উৎসর্গ করার ইচ্ছা না থাকে তাহলে বেশিদূর যেতে পারবেন না।

একদা “পেলেজিনহো” নামধারী এবং পেলেই যাকে নিজের কর্নধার বলেছিল, আজ লোকজন তাকে দেখলে মুচকি হাসে। ফুটবলে নতুন ট্যালেন্টের আগমন ঘটলেই লোকমুখে একটি কথাই শুনা যায়,”সৃষ্টিকর্তা এ যেন পরবর্তী রবিনহো না হয়”। তবে বেঁচে থাকুক একসময় বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দোওয়া প্লেয়ারটি, সাজা কাটিয়ে ভালভাবে ফিরুক নিজ দেশে। অগনিত ফুটবল সমর্থকদের এই কামনা।

Most Popular

To Top