শিল্প ও সংস্কৃতি

নোলানের ডানকার্ক মিশন

ইনভেশন অফ নরম্যান্ডি, অপারেশন অভারলর্ড,ব্যাটেল অফ দ্যা বুল্গ, Battle of IWO Jima, ব্যাটেল অফ মিডওয়ে, ব্যাটেল অফ ব্রিটেইন, ব্যাটেল অফ বার্লিন, অপারেশন বারবারোসা,ব্যাটেল অফ ডানকার্ক, এটাক অন পার্ল হার্বার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ইভেন্টের মধ্যে আমি মনে করি ‘ডানকার্ক’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। যদিও এটা ওইরকম যুদ্ধের ইভেন্টে পড়ে না। এটা ছিল জাস্ট একধরনের বৃহৎ উদ্ধারকাজ এল্যাইড ফোর্সের জন্য।

তবুও এটার গুরুত্ব অনেক বেশি। যদি এই উদ্ধার কাজই সম্পন্ন না হত, তাহলে উপরের কয়েকটা ইভেন্টও সৃষ্টি হত না। তাতে মিত্রবাহিনীর জয় হয়ে যেত আরো কষ্টসাধ্য!

১৯৩৯ সালে যখন জার্মানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে তখন তারা আস্তে আস্তে তাদের পাশের দেশ বেলজিয়াম, পোল্যান্ড,ডেনমার্ক, নরওয়ে দখল করে ফেলে। ধীরে ধীরে তারা ফ্রান্সের দিকে আসা শুরু করে। তখন ই ব্রিটিশ ও ফ্রান্স সরকার জার্মানির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ এবং যুদ্ধ ঘোষণা করে।

ব্রিটিশ সরকার British Expeditionary Force (BEF) পাঠায় ফ্রান্সে জার্মানিকে মোকাবিলা করার জন্য। যার প্রধান ছিলেন Lord Gort। এই ডানকার্ক যুদ্ধে এক পক্ষে ছিল ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড, বেলজিয়াম। অপরপক্ষে ছিল জার্মানি নাৎসি বাহিনী। শুরু হয়েছিল ২৬ মে ১৯৪০ আর শেষ হয়েছিল ৪ জুন ১৯৪০ সালে।

হয়তো অনেকে ভাবছেন আমেরিকা কোথায়? ৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান দ্বারা পার্ল হার্বার আক্রমণের পরই ফাইনালি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়ে শক্তিশালী মিত্রবাহিনী গড়ে তোলে আমেরিকা।

এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় ইংল্যান্ডের Lord Gort, ফ্রান্সের Maxim Weygand, George Blanched, J.m Abrial-সহ অনেকে ঊর্ধ্বতন সেনারা। নাৎসি বাহিনী থেকে নেতৃত্ব দেয় Ged Von Rundstedt, Ewald Von Kleist- এর মত কুখ্যাত নাৎসি সেনারা।

এল্যাইড বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ। এর মধ্যে আহত,নিহত এবং আটক হয়েছিল প্রায় ৬৮,১১১ জন। ৬৩৮৭৯ ট্যাংক,মোটরসাইকেল এবং বিভিন্ন যানবাহন ধ্বংস হয়েছিল। ২৪৮২ ফিল্ড, ৬ ডেস্ট্রয়ার, ২০০ মেরিন ভেসেল এবং ১০০ এয়ারক্রাফট ধ্বংস হয়েছিল।

ফ্রান্স সৈন্যের মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও ৪৮০০০ সৈন্য ধরা পড়ে। অপরপক্ষে ৮ লাখ নাৎসি সেনার মধ্যে ২০ হাজার নিহত এবং আহত হয়। নাৎসিবাহিনীর ১০০ ট্যাংক, ১৪৬ এয়ারক্রাফট ধ্বংস হয়। এই যুদ্ধে প্রায় ১ হাজার বেসামরিক লোক মারা যায় !

যেহেতু ডানকার্ক যুদ্ধটা ছিল এল্যাইড বাহিনীর জন্য জাস্ট ডিফেন্ড করে এই সৈকত ত্যাগ করা। সেক্ষেত্রে তারা ছিল সফল। ৩,৩৮,২২৬ জন উদ্ধার সহ প্রায় ১৩৯,৯৯৭ ফ্রেন্স, পোলিশ, বেলজীয় উদ্ধার করা হয়। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সবচেয়ে বড় উদ্ধারকালীন ঘটনা।

এল্যাইডদের এই জয়ে সবচেয়ে বড় ভুমিকা ছিল স্বয়ং ‘হিটলার’ এবং তার ‘হল্ট অর্ডার’। যেটাকে বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সবচেয়ে বড় ভুল। যদিও অনেক ইতিহাসবিদ বারবার এই ‘হল্ট অর্ডার’-কে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

হল্ট অর্ডার হচ্ছে , জার্মানরা যখন প্রায় এল্যাইড বাহিনীকে ডানকার্কে নাস্তানাবুদ করে ফেলে। তখন হিটলারের ইচ্ছাতেই ২৪ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত নাৎসি বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে না এগিয়ে তিনদিন তারা যুদ্ধ বন্ধ রাখে। যেটা এল্যাইড বাহিনীকে প্রচুর সময় দেয়। তারা এরই মধ্যে অনেক মানুষ উদ্ধারসহ অনেকক্ষেত্রেই এগিয়ে যায়।

এল্যাইড বাহিনীর এই যুদ্ধ ও উদ্ধার কাজকে বলা বলা হয় ‘অপারেশন ডায়নামো’ বা ‘মিরাকল অফ ডানকার্ক’। যদিও প্রথমদিকে এই অপারেশনের কথা ফ্রান্সও জানতো না।

কিছু কথা না বললেই নয়। আসলে ‘হল্ট অর্ডার’ নিয়ে অনেক গুজব আছে। যেখানে নাৎসি বাহিনী প্রায় মিত্রবাহিনীকে শেষ করে দিচ্ছিল। সেখানে হিটলারের এই আচমকা সিদ্ধান্ত কেন?

অনেকে বলেন এটা নাকি হিটলারের একটা খেলো সিদ্ধান্ত ছিল। মানে নিজ শিকার-কে খাঁচায় পুড়ে একটু ইতরামো করা।

অনেক ইতিহাসবিদের মতে, হিটলার তার এই আদেশের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, যেকোন ক্ষেত্রেই,যেকোন মুহূর্তে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আবার অনেকে মনে করেন, হিটলার এদের আটক করে চেয়েছিলেন আলোচনায় বসতে। এক কথায় ব্রিটেন-কে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করার ছোট প্রয়াস।

অন্য এক মতবাদে বলা হয়েছে, হিটলার ভয়ে ছিল।তিনি ভেবেছেন এটা একটা ফাঁদ। তাই তিনি মিশন স্থগিত করেন।

দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধ কালীন এই বৃহৎ ইভেন্টকে নিয়ে তৈরি বিখ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের মুভি ‘ডানকার্ক’। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই বছরের ‘মোস্ট এওয়েটেড মুভি’ ডানকার্ক-এর আদ্যোপান্ত।

নোলানের ডানকার্ক মিশন- Neon Aloy

Directed by Christopher Nolan

Produced by: Emma Thomas,Christopher Nolan

Written by: Christopher Nolan

Starring: Fionn Whitehead, Tom Glynn-Carney, Jack Lowden, Harry Styles, Kenneth Branagh, Cillian Murphy And Tom Hardy.

Music by: Hans Zimmer

Cinematography: Hoyte van Hoytema

Edited by: Lee Smith

Release date: 21 July, 2017

Running time: 106 minutes

Budget 100 million

Box office 525 million

লেখক ছিলেন পরিচালক নিজেই। প্রযোজনা করেছেন নোলানের স্ত্রী ‘এমা থমাস’।

প্রায় সবসময়ের মত ‘হ্যান্স জিমার’ ছিলেন মিউজিক ডিরেক্টর। মনে হচ্ছিল মনোমুগ্ধকর এই মিউজিক মুভি চলাকালীন ‘সাসপেন্স’ জিনিসটাকে উস্কে দিচ্ছে।

সমালোচকদের বাহবা পাওয়া এই মুভি দেখতে গিয়েছিলাম স্টার সিনেপ্লেক্সে। বাংলাদেশে রিলিজের দিনই। ভেবেছিলাম 3D হবে হয়তো! কিন্তু না 2D দেখতে হল। যাই হোক আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যাবো না, সাধারণ নোলানের মুভি যেমন হয় প্রথম দেখায় তো আর বুঝা যায় না তাই। তারপরেও গেলাম। প্রিয় পরিচালকের মুভি বলে কথা। আর যাওয়াটা পুরোটাই স্বার্থক।

আমি যদি একজন সাধারণ দর্শক হয়ে বিবেচনা করি। তাহলে বলতে হবে আমার সাথে থাকা অনেকেই এই মুভি দেখে একটু হতাশ হয়েছেন। কারণ তাদের ধারণা ছিল ধুন্ধুমার মারকাট থাকবে মুভিতে। কিন্তু সেইরকম একশন না থাকলেও এই মুভি ছিল সাসপেন্সে ভরপুর এক উপভোগ্য সিনেমা।

যারা ভাবেন নোলানের মুভি প্রথম দেখাতে বোঝা যায় না এই মুভি তাদের জন্য। যারা মনে করেন নোলান থ্রিল ছাড়া কিছু বানাতে পারে না এই মুভি তাদের জন্য। আপনাকে ধৈর্য্য ধরে দেখে যেতে হবে।

সাধারণত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে মুভিগুলো একশনে ভরপুর থাকে। যেহেতু এটা বাস্তব ঘটনা থেকে নির্মিত, সেহেতু এখানে দেখানো হয়েছে কিছু বীরের বীরত্ব। মনে হচ্ছিল ওই লোকটাই যুদ্ধে একা লড়ে যাচ্ছেন। মুভির কেন্দ্রবিন্দুতে সেই ছিল। কথা বলছি ‘টম হার্ডি’-কে নিয়ে। নোলানের প্রায় মুভিতে দেখা যায়। তার অভিনয় অসাধারণ তাই সে নোলানের পছন্দেরও একজন। তবে টম হার্ডির প্রায় প্রত্যেক মুভিতে মাস্ক পড়ে। এখানেও তার থেকে ব্যাতিক্রম না।

নোলানের ডানকার্ক মিশন- নিয়ন আলোয়

টম হার্ডি

সিনেমাটোগ্রাফি ছিল অসাধারণ। মুভির সবচেয়ে ভালো দিক ছিল গ্রাফিক্স, ভিএফএক্সের অযাচিত ব্যবহার না করা। মনে হচ্ছিলল সবকিছুই বাস্তব।

মুভিতে এয়ার ফাইটিংটা অস্থিরের উপর লেভেলের ছিল মনে করি।

একজন নাৎসিকেও দেখানো হয়নি মুভিতে। আপনি মুভিটা দেখবেন নোলানের আরেকটা কাজের জন্য সেটা হল তার 7o MM এর শট। 7o MM টা হল সাধারণ 35 MM থেকে বড়, হাই-রেজুলেশন ফিল্ম এবং সাথে হাই-রেজুলেশন মোশন পিকচার ফটোগ্রাফি। এইরকম ফিল্মের সূচনা হয়েছিল প্রায় ৫০-৬০ দশকের সময়। আর ফার্স্ট স্পেশাল ব্যবহার হয় ‘লরেন্স অফ আরাবিয়া’ মুভিতে। আর এটার মিডিয়াম সাইজ ব্যবহার করেন ১৫ সালের প্রিয় ডিরেক্টর ‘কোয়েন্টিন টারান্টিনো’ তার ‘হেইটফুল এইট’ মুভিতে। আর এখন নোলান ডানকার্কে ব্যবহার করেছেন। নোলান যে একালের ‘বেস্ট ডিরেক্টর’-দের একজন তা কিছু কথা বললেই বুঝবেন।

নোলান ‘ডানকার্ক’ মুভিটি শুটিং করেছেন সত্যিকারের ডানকার্ক ইভেন্ট ঘটে যাওয়া জায়গাটিতে। যেন দর্শক মুভি দেখার সময় যুদ্ধের সত্যিকারের অনুভূতি পান। মুভিতে প্রায় ৬২টি জাহাজের ব্যবহার হয়! যার মধ্যে প্রায় ১২টি সত্যিকারের ডানকার্কে ব্যবহৃত হওয়া জাহাজ।

নোলান মুভিকে বাস্তবিকভাবে পর্দায় উপস্থাপনের চেষ্টা সবসময় করেন এবং সফলও হোন; তার উদাহরণঃ

তিনি সত্যিকারের ডানকার্ক অভিযানের কয়েকজন যোদ্ধাকে ‘ডানকার্ক’ মুভির প্রিমিয়ারে আমন্ত্রণ জানান। সিনেমা শেষে অশ্রুসজল চেখে স্টার্ডি বললেন, ‘ডানকার্ক’ নিছক বিনোদন নয়; এটি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেইসব ভয়াল দিনে, যখন নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে হাজার হাজার সৈন্যকে বাঁচাতে নিরন্তর লড়াই করছিলেন তারা। স্টার্ডি হচ্ছেন ৯৭ বছর বয়সী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন যোদ্ধা।

এই হচ্ছেন নোলান। যার ‘মেমেন্টো’ দিয়ে ইতিহাস শুরু। ডার্ক নাইট, প্রেস্টিজ, ইনসেপশন, ইন্টারসটেলার-সহ এই ডানকার্কেও তার জাদু দেখিয়ে চলছেন।

সময়ের সেরা নির্মাতা হওয়া সত্ত্বেও, এখন পর্যন্ত কোন অস্কার তার ভাগ্যে জোটেনি। তবে এবার যে কয়েক ক্যাটাগরিতে অস্কার ‘নোলান’ এবং ‘ডানকার্ক’-ময় হবে তা এখনি বোঝা যাচ্ছে। যদিও এর আগে মেমেন্টো (২০০১) এর জন্য সেরা অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে এবং ইনসেপশন (২০১০) এর জন্য সেরা অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে ও সেরা ছবির মোট তিনটা একাডেমী অ্যাওয়ার্ড মনোয়ন পান নোলান।

হ্যারি স্টাইল আর সবার থেকে একটু বেশিই স্ক্রিনে ছিলেন। তাও আবার পুরোপুরি ভিন্নভাবে। হ্যারি স্টাইল-কে চিনলেন তো? হ্যাঁ ঠিক ই ধরেছেন ‘ওয়ান ডিরেকশন’-এর হ্যারি স্টাইল।

মুভিতে ডায়ালগ ছিল খুব কম। শুধু উদ্ধারের ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিচালক গল্প এগিয়ে নিয়েছেন।

দর্শক জনপ্রিয়তা পাওয়া এই মুভি-কে আইএমডিবি-তে ২,৩৯,১৬৩ জন রেটিং দেন। যার গড় রেটিং দাঁড়ায় ৮.৩ । তাছাড়াও রটেন টম্যাটোসে ৯২% ও মেটাক্রিটিকে ৯৪% স্কোর ডানকার্কের!

শেষমুহুর্তে এসে বলবো, এই মুভি দেখার শেষমুহুর্তে অবশ্যই আপনাকে হাত তালি দিতে হবে কোন এক মানুষকে অভিবাদন জানানোর জন্য।

Most Popular

To Top