লাইফস্টাইল

চিকিৎসা গ্রহন সহজ এবং কার্যকর  করবেন যেভাবে

চিকিৎসা গ্রহন সহজ এবং কার্যকর  করবেন যেভাবে- নিয়ন আলোয়

কোনো বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে অনেক বেশি ভিড় থাকে। তাই সকালে আগে আগে উপস্থিত হয়ে টিকিট কিনে আগে সিরিয়াল নিতে চেষ্টা করুন। এতে করে আপনি সেই দিনটাকে ভালো করে কাজে লাগাতে পারবেন। হাসপাতাল ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকে। তবে ছুটির দিনে শিথিলতা থাকে। যেমন শুক্রবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে বহির্বিভাগ বন্ধ থাকে। তবে সেক্ষেত্রে আগত রোগীদেরকে জরুরী বিভাগের মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া হয়। সে কারনে জরুরী না হলে সাধারন স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য ছুটির দিনে হাসপাতালে না যাওয়াই ভালো। কেননা সেক্ষেত্রে আপনার ওইসব দিনগুলি ১০০% কাজে লাগাতে পারবেন না। শনিবার সরকারি হাসপাতাল পুরোদমে খোলা থাকে।

চিকিৎসা সংক্রান্ত আগের সব কাগজ পত্র সাথে আনবেন। এমনকি সম্ভব হলে যেই পাতা থেকে ট্যাবলেট/ ক্যাপসুল খেয়েছেন সেই পাতা বা বোতল সাথে নিয়ে আসবেন। সব দলিল সাথে না আনলে আপনি নিজেই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বহির্বিভাগে ডাক্তারেরা অল্প সময়ে অধিক রোগী দেখেন। কেননা দেশে ডাক্তারপ্রতি জনসংখ্যা আড়াই হাজার, যেখানে অনেক উন্নত দেশে ডাক্তারপ্রতি জনসঙ্খ্যা ২৫০-৫০০ জন। অর্থাৎ পাঁচ – দশ গুন। তাই ডাক্তারেরা আপনাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে সময় অনেক কম পান। তাই সময় বাঁচানোর জন্য টেস্টের রিপোর্টগুলো আগেই খাম থেকে বের করে সাজিয়ে নিন। অন্যথা ডাক্তারের সামনে গিয়ে চেয়ারে বসে সেগুলো খুলতে এক মিনিটের বেশি সময় এমনিতেই ব্যয় হয়ে যাবে। তাছাড়া দীর্ঘদিনের অনেক টেস্টের কাগজ জমা হলে সেগুলো তারিখ অনুযায়ী সাজিয়ে নিন। শেষ দিকে করা টেস্টগুলোর রিপোর্টের কাগজগুলো সবার উপরে রাখুন। তাছাড়া আপনার মূল সমস্যাগুলো মনে মনে সাজিয়ে নিন, যেন ডাক্তারের সামনে গিয়ে অল্প সময়ে পট পট করে আসল সমস্যাগুলো বলে নিতে পারেন। এগুলোর সুবিধা আপনিই ভোগ করবেন।

হাসপাতালের বহির্বিভাগে সিরিয়াল দেয়ার ক্ষেত্রে বা ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রে হাসপাতালে উপস্থিত কোনো সেবা আদায় করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডবয় বা পিওন যদি নিজে থেকে বা কোনো এক বা একাধিক ডাক্তারের নাম দিয়ে টাকা দাবি করে , তাহলে সেটা তাৎক্ষনিকভাবে সেই ডাক্তারকে জানান বা পরিচালকের কার্যালয়ে অভিযোগ করুন।

বহির্বিভাগ বা জরুরী বিভাগ থেকে রোগীকে ভর্তি দেয়া হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে উপস্থিত হয়ে প্রথমে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কক্ষে উপস্থিত হোন। তারা নার্সকে পরামর্শ দিবেন রোগীকে গ্রহন করার জন্য। নার্স রোগীর ফাইল তৈরি করে দিবেন। তারপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এসে রোগীকে পরীক্ষা করবেন , প্রথমবারের মতো রোগীর ফাইলে চিকিৎসা লিখবেন, প্রয়জনীয় টেস্ট করার জন্য কাগজ লিখে দিবেন, হাসপাতালে রোগীর প্রয়োজনীয় যেসব ওষুধ সরকারি সরবরাহ নাই সেগুলি কিনে আনার জন্য আলাদা কাগজে লিখে দিবেন।

ভর্তির পর ওয়ার্ডে গিয়ে যদি বিছানা না পান, তাহলে ডাক্তারের বা নার্সের পরামর্শক্রমে মেঝেতে অবস্থান নিন। পরে অন্যান্য রোগীদের যখন ছুটি হবে , তখন পর্যায়ক্রমে পরবর্তিতে ভর্তিকৃত রোগীরা শয্যা বরাদ্দ পাবেন। আপনি সামর্থবান হলে পেয়িং বেড বা কেবিন খালি আছে কিনা তা নার্সের কাছে জেনে নিন। শয্যার অপর্যাপ্ততা সংক্রান্ত নার্স বা ডাক্তারের বক্তব্য বিশ্বাস করতে যদি আপনার কষ্ট হয়, তাহলে ডাক্তার বা নার্সের সাথে তর্ক বা খারাপ আচরন না করে আপনার সন্দেহের কথা পরিচালকের কার্যালয়ে জানান।

কোনো একটি ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল দিনে কয়বার কয়টা করে খেতে হবে সেটা ডাক্তারের কাছে নয় বরং কর্তব্যরত নার্সকে জিজ্ঞাসা করুন। এটা মূলত তাদের কাজ।

কর্তব্যরত ডাক্তারের থেকে আপনি নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনে নিতে পারেনঃ
(১) এই রোগের নাম কী?
(২) রোগটির প্রকৃতি কেমন? খারাপ নাকি সাধারন?
(৩) কি কি বিকল্প চিকিৎসা আছে? (উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, কিডনি প্রতিস্থাপন বনাম ডায়ালাইসিস)। প্রত্যেকটির সুবিধা / অসুবিধা কী?
(৪) কোনো একটি নির্দিষ্ট অপারেশন (ধরা যাক, লিভার বায়পসি বা কিডনী বায়পসি) করা আবশ্যক কেন? সেটা না করলে রোগী সম্ভাব্য কী কী ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে? এই অপারেশনটি না করে অন্যভাবে কি চিকিৎসা দেয়া যায় না? এই অপারেশনটি করলে কি কি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে? ইত্যাদি।

ডাক্তারকে এসব প্রশ্ন করার পবিত্র অধিকার রোগী এবং তার স্বজনের আছে। তবে এই বিষয়গুলো সাধারনত ডাক্তার নিজেই রোগীকে বা রোগীর স্বজনকে বলে থাকেন। কখনোই বলবেন না, “আমার রোগী বাঁচবে কি না?” কেননা একজন সুস্থ্য মানুষেরও পরবর্তি সেকেন্ডে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। তবে এই তথ্যগুলো রোগীর একজন সুবোধ/ জ্ঞানী স্বজন একবারেই ভালো করে জেনে নিবেন , যাতে করে তিনিই পরবর্তিতে রোগীর অন্যান্য স্বজনকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে পারেন। পরের দিন নতুন কেউ একজন দর্শনার্থী এসে সেই বিষয়গুলো আবার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করবেন না। কেননা এই বিষয়গুলো একবার বুঝিয়ে বলতে অনেক সময় লাগে। এমনিতেই সরকারি হাসপাতালে অল্পসংখ্যক চিকিৎসক অনেক কষ্ট করে ক্লান্ত হয়ে অধিক সংখ্যক রোগিকে চিকিৎসা দেন। তার মধ্যে এ ধরনের আচরন অন্যায় এবং দুঃখজনক।

রোগীর স্বজন হয়ে আপনি যদি নিজের রক্তচাপ পরীক্ষা করাতে চান, তাহলে বহির্বিভাগে বা জরুরী বিভাগে গিয়ে টিকিট নিয়ে সেখান থেকে পরামর্শ নিন। হাসপাতালে নির্দিষ্ট স্থানে রশিদ ছাড়া যেমন কাউকে টাকা দিবেন না, তেমনি যথাযথ টিকিট ছাড়া এবং যথাস্থানে উপস্থিত না হয়ে কেউ যখন তখন, যেখানে সেখানে ডাক্তারের কাছে প্রেশার মাপার আবদার করবেন না।

ভর্তি রোগীর নতুন করে বা হঠাৎ করে কোনো সমস্যা হলে ডাক্তারের দৃষ্টি আকর্ষন করে সমস্যাটি তুলে ধরুন। ডাক্তারকে কখনোই আদেশের সুরে বলবেন না , “রোগীর প্রেশারটা মাপেনতো”। এটা নেতিবাচক আচরন এবং দুঃখজনক। বরং এভাবে বলা যেতে পারে, “ডাক্তার , আমি আশঙ্কা করতেছি যে আমার প্রেশার হয়তো অনেক বেশি হয়ে গেছে , যে কারনে আমার এমন এমন খারাপ লাগতেছে।” যে রোগীর বারবার প্রেশার দেখা দরকার সেটা ডাক্তারেরা নিজেরাই চিকিৎসার অংশ হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে থাকেন এবং সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডাক্তারদের দায়িত্ব হস্তান্তর খাতায় লেখা থাকে।

অনেক সময় রোগীকে বলতে শুনা যায়, “স্যার, বাড়িতে গিয়ে কি খাবো সেটা একটা কাগজে লিখে দিলে ভালো হতো”। বাস্তবতা হচ্ছে, রোগীকে যখন হাসপাতাল থেকে ছুটি দেয়া হয়। তখন তাকে একটি ছাড়পত্র দেয়া হয়। এই ছাড়পত্রে যা লেখা থাকে সেগুলো হচ্ছেঃ
(১) রোগী কী সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হয়েছে।
(২) প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করে ডাক্তার রোগীর শরীরে কি অবস্থা পেয়েছেন।
(৩) কী কী টেস্ট করানো হয়েছে এবং সেগুলোর ফলাফল কি ছিল।
(৪) কী চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
(৫) রোগীর নাম ঠিকানা, কত তারিখ থেকে কত তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিল।
(৬) সিজার বা স্বাভাবিক প্রসব হলে সেক্ষেত্রে বাচ্চার জন্ম তারিখ, ওজন , লিঙ্গ এবং স্বাস্থ্য কেমন ছিল সেটা লেখা থাকে।
(৭) যেকোনো অপারেশন হলে সেটার সংক্ষিপ্ত বর্ননা বা ছোট অপারেশনের ক্ষেত্রে অপারেশনের নাম লেখা থাকে।
(৮) রোগী পরবর্তী সময়ে বাড়ি গিয়ে কতদিন কি কি ওষুধ সেবন করবেন, কোনো বিশেষ খাবারের বা অভ্যাসের প্রতি নিষেধাজ্ঞা , কিছু নিয়মকানুন পালনের উপদেশ ইত্যাদি লেখা থাকে।

তাই ছাড়পত্রটি ভালো করে পড়ুন। সেখানে প্রয়োজনবোধে আরো লেখা থাকেঃ কতদিন পর, কী কী পরীক্ষা করে, সপ্তাহের কী বারে, কোন ভবনের কত তলায়, কোন কক্ষে কোন সময়ে উপস্থিত হবেন। নমুনা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়ঃ ছাড়পত্রে লেখা আছে, “১৫ দিন পর CBC পরীক্ষা করে বুধবার অত্র হাসপাতালের পুরান ভবনের নিচতলায় বহির্বিভাগে ৪ নং কক্ষে বেলা আট ঘটিকায় উপস্থিত হবেন”। ধরা যাক, আপনি লিভারের রোগী । CBC পরীক্ষা করে বুধবার আসতে বলা হয়েছে আপনাকে। কেননা, সপ্তাহের প্রতি বুধবার বহির্বিভাগে লিভার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন ৪ নং কক্ষে রোগী দেখেন। এক্ষেত্রে আপনি সোমবার উপস্থিত হলে অবস্থাটা কি হবে, সেটা নিজেই বুঝতে চেস্টা করুন। তাছাড়া দেখা গেল আপনি বুধবার এসেছেন , কিন্তু এসে দেখলেন বহির্বিভাগ বন্ধ! সেদিন সরকারি ছুটি! তাই বাড়ি থেকে রওনা দেয়ার আগে জেনে নিন সেদিন সরকারি ছুটি আছে কি না। অনেক দূর থেকে বাস রেলগাড়িতে করে হাসপাতালে এসে যখন দেখবেন এ অবস্থা, তখন আপনি কতটা কষ্ট পাবেন, ভেবে দেখুন। সেই দিনটাই আপনার নষ্ট ! তাই ছাড়পত্রটি ভালো করে পড়ুন। এমনকি অন্য কোনো হাসপাতালে বা কোনো প্রাইভেট চেম্বারে বা উপযুক্ত কারনে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলেও এ ছাড়পত্র আপনার জন্য অনেক বড় দলীল হিসেবে কাজ করবে। তাই এ ছাড়পত্র সব সময় যত্ন করে রাখবেন এবং পরবর্তিতে চিকিৎসাসেবার জন্য কোথাও গেলে অবশ্যই সাথে নিবেন। ছাড়পত্রে অনেক সময় রোগীকে পরবর্তি উচ্চতর চিকিৎসার জন্য উচ্চতর কেন্দ্রে রেফার করার কথা লেখা থাকে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় অনেক রোগী রেফারেলকে গুরুত্ব দেয় না। তারা মনে করে , “আমিতো ভালোই আছি।” পরে সময় পার হয়ে গেলে উদ্ভূত সমস্যার জন্য সংশ্লিষ্ট ডাক্তারকে দায়ী করার চেষ্টা করে! তবে অনেক সময় চিকিৎসক স্বল্পতার কারনে উদ্ভূত সময় স্বল্পতার কারনে ছাড়পত্রে সবগুলি তথ্য যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয় না।

ওয়ার্ডে রাউন্ডের সময় রোগীর স্বজনেরা কক্ষ থেকে সরে গিয়ে বাইরে দাঁড়ান। অনেকে মনে করেন , ডাক্তারেরা দলবেধে রোগী দেখতে আসলে স্বজনেরা যদি কক্ষ থেকে সরে যেতে হয়, তাহলে ডাক্তারের কাছে রোগীর সমস্যাগুলো তুলে ধরবে কে? বাস্তবে একজন রোগীর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্ধারিত চিকিৎসকই এই কাজটি করবেন। কেননা তিনি রোগীর সমস্যাগুলো আগেই রোগীর থেকে বা রোগীর স্বজনের থেকে জেনে নিয়েছেন। আপনার যত কথা আছে সব উক্ত রোগীর জন্য কর্তব্যরত ডাক্তারকে বলবেন। চিকিৎসকের উপস্থিতিতে যেকোনো মুহুর্তে মোবাইল ফোন নীরব বা কম্পন মুডে রাখুন। অনেক সময় দেখা যায় , চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসায় ব্যস্ত আছেন; এমন অবস্থায় রোগীর স্বজনের হাতে ফোনে খুব জোরে রিংটোন বাজতেছে অথচ তিনি সেটা গ্রহন বা বন্ধ করতেছেন না! এটা খুবই অনাখাঙ্খিত এবং চিকিৎসার পরিবেশ নষ্ট করে।

বিভিন্ন পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তারেরা যখন রোগীকে লিখিত ফরমাশ দেন , তখন তারা বয়স্ক রোগীদের নামের আগে ইংরেজিতে ‘মিস্টার/ মিসেস/ মিস’ এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ‘মাস্টার’ লেখেন। কেননা প্রত্যেকের নিজ অবস্থানের একটা সম্মান আছে। আদালতে গিয়ে আইনজীবীকে মুহুরী সাহেব , আর মুহুরীকে এডভোকেট সাহেব বলে সম্বোধন করলে বেচারা আইনজীবীর কেমন অনুভুতি হওয়ার কথা? মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে কেরানী সাহেব , আর কেরানীকে মাস্টার সাব বলে সম্বোধন করলে প্রধান শিক্ষকের কাছে কেমন লাগবে? হাসপাতালের অন্তবিভাগে অনেকেই দায়িত্বরত থাকেন। নার্সদের ভিন্ন ধরনের পোষাক থাকে। মহিলা নার্সদের মাথায় শক্ত কাগজের এক ধরনের ক্যাপ থাকে যা অন্য কারো থাকে না। মহিলা এবং পুরুষ নার্সদেরকে হাসপাতালে যথাক্রমে ‘সিস্টার’ এবং ‘ব্রাদার’ বলে সম্বোধন করা হয়। অন্যদিকে ডাক্তারদের গলায় অধিকাংশ সময়ই একটি স্টেথোস্কোপ ঝুলানো থাকে। অনেক সময় পরিচয়পত্রও ঝুলানো থাকে। তাছাড়া কাজে কর্মেও একজন ডাক্তারকে শনাক্ত করতে একজন সুবোধ লোকের অসুবিধা হওয়ার কথা না। অনেক সময় রোগী এবং তার স্বজন ডাক্তারকে ‘সিস্টার/ ব্রাদার’ আর নার্সকে ‘স্যার/ ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করে! হাসপাতালের পরিবেশে এ বিষয়টি খুব বেশিই আপত্তিকর! অনেকে হয়তো ডাক্তারকে ‘ভাই/আপা’ বলতে গিয়ে ইংরেজিতে ‘ব্রাদার/সিস্টার’ বলে সম্বোধন করতে চান। কিন্তু সবাইকে বুঝতে হবে যে, হাসপাতালের পরিবেশে ডাক্তারকে ‘ব্রাদার/ সিস্টার’ বলে সম্বোধন করা , ডাক্তারকে মারাত্মক অপমান করার সমান। তার চাইতে বরং মাতৃভাষা ব্যবহার করে ‘ভাই/আপা’ বলে সম্বোধন করা অনেক সুন্দর এবং আন্তরিক। মনে রাখতে হবে, চিকিৎসাজগতে ‘ব্রাদার/ সিস্টার’ শব্দ নার্সদের জন্য নির্ধারিত এবং তাদের জন্য সম্মানজনক। যশমিন দেশে যদাচার। আপনি নিজে যদি আজ ডাক্তার থাকতেন, তাহলে চিকিৎসা অঙ্গনে কেউ আপনাকে ‘ব্রাদার/সিস্টার’ বলে সম্বোধন করলে বুঝতেন , আপনার কেমন লাগে!

ডাক্তারেরা অনেক সময় রোগীর পায়ে হাত দিয়ে পরীক্ষা করেন। তখন মাঝে মধ্যে দেখা যায় কোনো কোনো রোগী ডাক্তারের কাছে ক্ষমা চান। এখানে মূলত ক্ষমা চাওয়ার কিছুই নেই। এটা ডাক্তারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার অংশ।

রোগী দেখার জন্য দর্শনার্থীরা যখন হাসপাতালে যাবেন, সেখানে রোগীর কাছে বেশিক্ষন অবস্থান করবেন না। রোগীর থেকে দর্শনার্থিরা জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন। তাছাড়া অনেক সংখ্যক দর্শনার্থী অনেক সময় ধরে একটি কক্ষে অবস্থান করলে সেটা চিকিৎসার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে। একসাথে কয়েকজন ব্যক্তি রোগীর বিছানায় বসবেন না।

রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনেরা তুলকালাম না করে শান্ত থাকুন। তুলকালাম করলে উপস্থিত অন্য রোগীদের অনেক বেশি কষ্ট হয়। অন্য রোগীর স্বজনেরা তামাশা দেখার জন্য মৃত ব্যক্তির বিছানার কাছে গিয়ে হা করে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। বরং নিজ রোগীর পাশে থাকুন। নিজের আখের গোছান। অন্যথা হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট হয়।

বড় বড় সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার , কর্মচারি এবং রোগীদের জন্য আলাদা লিফট থাকে। লিফট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ভীড়ের সময় রোগীর সুস্থ্য সবল স্বজনেরা চতুর্থ তলা , পঞ্চম তলা পর্যন্ত উঠার ক্ষেত্রে সহজেই পায়ে হেটে উঠতে পারেন। আর নামার সময় এমনকি ১০ তলা থেকেও সহজেই পায়ে হেটে ধীরে সুস্থ্যে নামতে পারেন। ডাক্তারেরা অনেকেই অনেক সময় চতুর্থ তলায় , পঞ্চম তলায় উঠার সময় নিজেদের জন্য নির্ধারিত লিফটের অপেক্ষা না করে পায়ে হেটে উঠেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক সময় দেখা যায় রোগীর সুস্থ্য সবল স্বজন ২৫-৩০ বছর বয়সী যুবক এমনকি ভীড়ের সময়েও দোতলায় বা তৃতীয় তলায় উঠার জন্য অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়! কেননা তারা মনে করে এটা সরকারি লিফট! অন্যরা ব্যবহার করতেছে, তিনি ব্যবহার না করে থাকবেন কেন? এক্ষেত্রে তার দোতলায় বা তৃতীয় বা চতুর্থ তলায় উঠার চাইতে ‘সরকারি লিফট ব্যবহার করা’র ব্যাপারটা বেশি প্রাধান্য পায়! সরকারি মাল, দরিয়া মে ঢাল! এ ধরনের আচরন কখনোই সভ্যতা বা দায়িত্বশীলতা বা দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ নয়।

ডাক্তারসহ হাসপাতাল কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য নির্ধারিত লিফটে রোগীর স্বজনেরা উঠবেন না। ডাক্তারদেরকে তাদের গতিপথে অবাধে চলাফেরা করতে দিন। তাদের গতি রুদ্ধ করলে ফলাফলে আপনাদেরই গতি রুদ্ধ হবে। ইতিবাচক চিন্তা করুন। দেখা যায় ভীড়ের সময় রোগীর স্বজনেরা ডাক্তারদের লিফটে উঠার জন্য আগেভাগে জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে থাকে! লিফট নেমে আসলে তারা সবার আগে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে! ডাক্তারেরা দাঁড়িয়ে থাকে! সেখানে লেখা আছে , “এই লিফট শুধু ডাক্তার-কর্মচারীদের জন্য”। লেখা দেখে বুঝেও তারা না বুঝার ভান করে! নিষেধ করলেও তারা বিদ্রোহের ভঙ্গিতে সেটা অমান্য করে ঠায় দাড়িয়ে থাকে! তারা বেপরোয়া আচরন করতে পারে, এমন মানহানীর আশংকায় অনেক সময়েই ডাক্তারদের অনেকে তাদেরকে কিছু বলে না! এটাই কি হওয়া উচিত? রোগীদের জন্যতো আলাদা অনেকগুলো লিফট আছে!

চিকিৎসকেরা সরকারি হাসপাতালে স্বল্প সুযোগ সুবিধার মধ্যে জোড়া তালি দিয়ে আপনাদেরকে চিকিৎসা দেয়। সরকারি হাসপাতালের ঘিঞ্জি পরিবেশে তারা অনেক সময় হাটু গেঁড়ে বসে মেঝেতে থাকা রোগীকে চিকিৎসা দেয়। চিকিৎসককে কখনোই লুকায়িত হুমকির সুরে বলবেন না, “আমি অমুকের লোক”। সাধারন ভঙ্গিতে বলতে পারেন। হুমকির ভঙ্গিতে বললে সংশ্লিষ্ট রোগীর ব্যাপারে ডাক্তারের আন্তরিকতার সমাপ্তি ঘটার সম্ভাবনা প্রকট। মনে রাখবেন, ‘অন্তর’ অনেক বড় এবং স্পর্শকাতর জিনিস! বুদ্ধিমান লোকেরা কখনোই ডাক্তারের সাথে এমন আচরন করে না। সে কারনে বখাটে বা বেয়াদব বা দুর্বৃত্ত প্রকৃতির কাউকে রোগীরা তাদের স্বজন হিসেবে সাথে আনবেন না বা পাঠাবেন না।

লেখকঃ ডাঃ মোঃ মাকসুদ উল্যাহ;
চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।

Most Popular

To Top