গল্প-সল্প

অন্ধকার সন্ধ্যায় লাল কৃষ্ণচূড়া

অন্ধকার সন্ধ্যায় লাল কৃষ্ণচূড়া- Neon Aloy

কিছু কিছু জায়গা থাকে যে জায়গাটা মানুষের খুব পছন্দের যেখানে গেলে অদ্ভুত ভাবেই মনটা ভালো হয়ে যায়। এই পাড়ায় তেমন একটা জায়গা হল এক তলা বাসার ছাদ। ছাদটা ছোট কিন্তু ঝুলে পড়া কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়া এসে পরে, ফেব্রুয়ারি মাসে যখন কৃষ্ণচূড়া ফুলে গাছটা ভরে যায় তখন সামান্য বাতাসে ফুলের পাপড়ি এসেগাল ছুঁয়ে দেয়, আর কোকিলের গানে চারিদিক মোহিত হয়ে পরে। তখন নিজেকে অন্যান্য সাধারন আর দশটা মেয়ের মতই মনে হয়, মনে হয় আমিও খুব সাধারন একটা মেয়ে মনে হয় জীবনের খুব বড় কোন বিষাদ আমাকে ছুঁয়ে যায় নি। মনে হয় আমি এই পল্লীর কেউ নই! মনে হয় যা যা ঘটে গেছে সব দুঃস্বপ্ন ছিল যা ঘুম কেটে ওঠার পর অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে।

বেশি দিন না ২ বছর আগের কথা। কলেজ পাশ করে ঢাকায় আসি নরসিংদী থেকে। বাবা-মা মরা এতিম কোন মেয়েকে মামা মামি ইন্টার পর্যন্ত পড়িয়েছেন এই বা কম কি? চাকরির কথা যে বলে নিয়ে এসেছিল সে নিত্তাতন্তই একজন খারাপ মানুষ ছিল। আমাকে নিয়ে আসে এক অজানা জায়গায় মাত্র ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।

আমার নামের আগে যুক্ত হয় এক পদবি যার নাম পতিতা!

আমি ভুলে যেতে থাকি আমার নাম, আমার পরিচয়, আমার সব অস্তিত্ব! যে লোকটা আমাকে বেঁচে দিয়েছিল সেও কিন্তু আমাকে ছাড়ে নি! আমাকে বিক্রি করার আরেকটা শর্ত ছিল আমাকে ভোগ করা। ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম, একটা জীবনের যেখানে কোন বিষাদ থাকবে না  কিন্তু ঐ রাতে আমার সব স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিলো। আমি আমার জীবনের কঠিন মুহূর্ত পার করছিলাম,  চিৎকার দিচ্ছিলাম কারো কানে হয়ত সেই চিৎকার পৌঁছায়নি। আমার কান্নার সাক্ষী হয়েছিল এই এক তলা বাড়ির দেয়াল।

সময় যেতে লাগলো, নিজের দুর্ভাগ্য মেনে নিতে চেষ্টা করতে চাইলাম তবু কেন যেন মেনে নিতে পারছিলাম না। এই পাড়ার সর্দার ছিল আঙ্গুরি নামক এক মহিলা। আমি আমার জীবনে এত খারাপ মানুষ দেখিনি। সে আমার উপর দিনের পর দিন নির্যাতন চালিয়েছে। এক বারের বলায় কাস্টমারের কাছে যেতে না চাইলে বেত দিয়ে মারত, শিক গরম করে ছ্যাঁক দিতো পিঠে, আর থাকতো খাবার বন্ধ। এতটাই খারাপ ছিল যে মাঝে মাঝে পানি পর্যন্ত বন্ধ করে দিত! এটা শুধু আমার কাহিনী না, এই পাড়ার প্রায় প্রত্যেকটা মেয়ের সাথে চলত এই একই কাহিনী। কেউ এই লাইনে সহজ ভাবে আসে নি।

এক একটা মেয়ের গল্প এক এক রকম। কিন্তু এরা সবাই এক, সমাজ শুধু যাদের খারাপ দিকটা দেখে কিন্তু কেউ এদের জীবনের গল্পটা জানতে চায় না। কেউ চায় না এদের মুক্তি দিতে, সমাজের ভালো মুখোশ ধারী পুরুষেরা নিজের পরিবারের আড়ালে এদের কাছে না আসলে কি এদের ব্যবসা চলত? এই সব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। সব দোষ গিয়ে পরে মেয়ে গুলোর উপর।

দিন যেতে লাগলো এক সময় আমিও অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম। প্রত্যেকটা রাত কাটতে লাগলো ঘোরের মধ্যে। এক একটা রাতকে দুঃস্বপ্নের জায়গায় বসাতাম ভাবতাম আর তো অল্প কিছু সময় একটু পর সকাল হবে দুঃস্বপ্ন কেটে যাবে, নতুন সূর্য নতুন কিছু স্বপ্ন নিয়ে আসবে। কিন্তু দুঃস্বপ্ন শেষ হত না, আমার যখন মনে হতে লাগলো আমার দুঃস্বপ্ন হয়তো মৃত্যু অবধি চলতে থাকবে।

ঠিক তখন আমি আমার মধ্যে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেলাম। বুঝতে পারলাম কেউ একজন আমার ভেতর বেড়ে উঠছে, বুঝতে পারলাম আমার হৃদস্পন্দনের সাথে আর একটা ছোট্ট মানুষের হৃদস্পন্দিত হচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম কেউ একজন চাচ্ছে আমার জীবন বদলে দিতে। আমি আবার স্বপ্ন দেখবো তাকে নিয়ে, তাকে ঘিরে সাজাবো নতুন জীবন বেড়িয়ে আসব এই দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক জীবন থেকে।

আমি জানতাম না এই ছোট্ট শিশুটির বাবা কে? জানার কথাও ছিল না জানি। জানার প্রয়োজনও মনে করিনি। কারন কি হবে পরিচয় জেনে? যে পুরুষ এই শিশুটির পিতা সে কি ভালো মানুষ? এই শিশুটি আমার অংশ, আর কারো না। কাউকে দরকার নেই তার, আমি তার মা! যখন মনে হল আমি তার মা, তখনই একটা শঙ্কা কাজ করতে থাকলো নিজের ভেতর। আমি বাঁচাতে পারবো তো তাকে? আমার শেষ অবলম্বনটাকে? কি জানি? আমি স্বপ্ন দেখতে থাকলাম, স্বপ্ন গুলো ডাল পালা গজাতে শুরু করলো। নতুন নতুন দিন নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসতে শুরু করলো। আমি অনুভব করতাম আমার ভেতর কেউ একজন তার আলতো হাতের ইশারায় আমাকে ডাকছে! আমি ধীরে ধীরে আমার অস্তিত্বটাকে তার মধ্যে বিলীন করতে শুরু করলাম। আমার আবারও দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম কিন্তু সেই দুঃস্বপ্ন গুলো ঘুম ভাঙ্গার পর আমাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিত।

আমি দেখতাম একটা ছোট্ট শিশু খেলতে খেলতে পড়ে যাচ্ছে। আমি দৌড়ে শিশুটির কাছে যেতেই সে আমাকে বলে উঠত মা আমি ব্যথা পাই নি তো! তার আধো আধো কথা শুনে আমার মুখের হাসি আমি স্পষ্ট বুঝতে পারতাম। আমি দেখতাম একটা বাচ্চা আমার চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর আমি ভাতের বাটি হাতে তার পেছন পেছন ছুটছি আর বলছি, “বাবাই এই তো শেষ আর মাত্র একটা…” কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমার সকাল গুলো নতুন জীবন এনে দিত।

আমি চাইতাম আমার বাচ্চাটা বেড়ে উঠুক এই পৃথিবীর বুকে এবং গর্ব করে বলুক তুমি আমার… তুমি আমার মা।

মাঝে মাঝেই নানা ধরনের বাহানা বানিয়ে নিজেকে আড়াল করতাম আঙ্গুরি নামক খারাপ মহিলার কাছ থেকে। হটাৎ বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা নামলো। গোধূলির রাঙা আলো বিলীন হতে লাগলো , সন্ধ্যার কালো ছায়া আমার উপর পড়লো। ঠিক কিছুক্ষণ পর আমার ডাক পড়লো কাস্টমারের কাছে। বেশ কিছুদিন যাবত এই সেই বাহানা ধরেছি, আঙ্গুরি আপাকে বলেছি মেয়েলি সমস্যা। কিন্তু এই ভাবে কত দিন? এক দিন না এক দিন তো টের পেয়েই যাবে। অনেক সাহস করে আজও গেলাম তার কাছে। আমি ভালো ভাবে বুঝতে পারলাম তার আমার কথা বিশ্বাস হয় নি। সে আমাকে টেনে নিয়ে গেলো বাথরুমে। তারপর যা হবার তাই হল, অনেক গুলো থাপ্পড় খেলাম।

আমাকে জোড় করে পাঠানো হল কাস্টমারের কাছে । আমি যেতে চাচ্ছিলাম না চিৎকার করছিলাম, “আমাকে নিয়ে যেও না আমার বাচ্চাটাকে মেরো না তোমরা…”। ওরা আমাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে গেলো। কেউ আমার কোন কথা শুনলো না। ঐ লোকটা আমার সাথে জোড়াজুড়ি করতে শুরু করলো। আমি মাথা ঘুরে পরে গেলাম, আমার শেষ মুহূর্তে মনে হল একটা ছোট্ট শিশু আমার দিকে এগিয়ে আসছে ছোট্ট ছোট্ট পা দিয়ে, আমি দু হাত প্রশস্থ করে বসে আছি আর বলছি, ‘’বাবাই বলতো আমি তোমার কে ?

সে তার আধো আধো কণ্ঠে বলে উঠলো, “তুমি আমার …তুমি আমার মা…।”

লেখিকাঃ ফাহমিদা ফাম্মী

Most Popular

To Top