টুকিটাকি

মিঞা শোভনের পাঠশালা

আজ আপনাদের এক পাগল কিসিমের মানুষের গল্প বলবো। একটা সময় এই লোকের লেখা দেখে খুবই বিরক্ত হতাম। কেমন যেন পাগলাটে স্বভাবের, আগামাথা নেই কোন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নানান প্রকৃতির পাগলেরা ঘুরে বেড়ায়, ভাবতাম এ হচ্ছে নতুন কোন এক এক পাগল। এখনো এই ভাবনার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু এই পাগলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলে গেছে।

আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে থাকলে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন গ্রুপের সাথে অ্যাড থাকলে অবশ্যই এই লোককে চিনবেন, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন পাবলিক গ্রুপে সর্বোচ্চ সংখ্যক পোস্ট করে এই লোক! তো সে কী পাগলামি করে? তার একটা অদ্ভূত ধরণের কর্মসূচী আছে- সে মানুষকে বই পড়িয়ে বেড়ায়। তবে এই বই পড়ানোর কাজটা সে ‘চ্যারিটি’ হিসেবে করেনা, করে ‘পেশা’ হিসেবে! এখানেই এই লোকটি অন্যদের থেকে আলাদা।

তার নাম মিঞা শোভন । আমরা কোন লাইব্রেরির নাম চিন্তা করতে গেলে একটু কাব্যিক কিছু ভাবতাম। সে এরকম কিছু করেনি, তার কর্মসূচীর নাম দিয়েছে ‘মিঞা শোভনের পাঠশালা’ বা সংক্ষেপে ‘মিশোপা’।সে ‘মিশোপা’কে পরিচয় দেয় ‘কোম্পানি’ হিসেবে। একটা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে তার ‘কোম্পানি’র সদস্য হতে হয়। এরপর তার বিরাট বইয়ের সংগ্রহ থেকে বই নিয়ে পড়তে পারে সদস্যরা। এছাড়াও সে বিভিন্ন পাঠচক্র আয়োজন করে, বইয়ের উপরে ‘বয়ান’ দেয়। আগামী ১০ ডিসেম্বর তার কোম্পানির এক বছর পূর্ণ হবে, তার টার্গেট হচ্ছে- এর মধ্যে কোম্পানির সদস্য সংখ্যা ১০০০ পূর্ণ করা! খুব সম্ভবত আর ১৫-২০ জন সদস্য হলেই এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে!

এনাকে উদ্ভট বলছি কারণ, আমরা যারা চ্যারিটি করি তারা সেটা করি শখের বসে।বাস্তবতা যখন আঘাত করে তখন ওসব ভুলে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই নিজেকে নিয়ে। কিন্তু এই লোকটি সত্যিকার অর্থে একটা ভালো কাজ সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে- এটাকে পেশা বানিয়ে। যে সময়টাতে আমরা বিসিএস-ব্যাংক কিংবা কর্পোরেট জবের জন্য অযৌক্তিক পরিশ্রম করছি, সে সময়টাতে এই পাগল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছে ‘মিশোপা’-ই হবে তার ক্যারিয়ার! আমি জানিনা এই ব্রত উনি কতদিন পালন করতে পারবেন কারণ, নাম মাত্র মেম্বারশিপ ফি আর সামান্য চাঁদা দিয়ে নতুন বই কেনা ও অন্যান্য কাজ সমাধা করার পর আদৌ কিছু অবশিষ্ট থাকে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে।

আরো একটা কারণে এই লোককে পাগলা ভাবতাম। এই লোক এত এত বই পড়েছে, তার লেখা দেখে সেটা বোঝার কোন উপায় নেই! সত্যি কথা বলতে, উনি আমাদের মত জ্ঞানী জ্ঞানী একটা ভাব ধরার চেষ্টা করেনি। দুটো বই পড়ে আমরা যেমন খুব একটা ভাব ধরি, উনি সেটা করেনা। উদ্ভট সব স্ট্যাটাস দেন! আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল এই নিয়ে। সে বললো, “এই লোকটারে আমি ঠিক বুঝিনা। এই লোক এত বই পড়ে, কিন্তু এর লেখা দেখে বুঝা যায়না। কোন ইস্যুতে কিছু বলেও না।”

তখন আমিও একমত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি- আসলে এর কোন দরকার নেই। এই লোকের সাথে বিশ্ব-সাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের একটা মিল আছে। ওনার দিকেও এই প্রশ্ন ওঠে- ‘উনি কেন অমুক ইস্যুতে কিছু বলেন না’। এই দুজনের মধ্যে মিল হল, এঁরা বই পড়ানোটাকে ব্রত হিসেবে নিয়েছে, কোন মতবাদ প্রচারকে নয়। তরুণদের কাছে সহজে বই পৌছে দেয়া, তাদের বই পড়তে উৎসাহিত করা- এটাই তাদের লক্ষ্য; কোন নির্দিষ্ট মতবাদ প্রচার করা নয়। আস্তিক-নাস্তিক-প্রগতিশীল- প্রতিক্রিয়াশীল- মৌলবাদী- আওয়ামিলীগ-জামাত- বাম-ডান যেই হোক না কেন, বই পড়ার এই মহাযজ্ঞে সকলেই আমন্ত্রিত। বই পড়ে নিজেকে বিকশিত করে সে কোন পথের পথিক হবে ,এটা একান্তই ঐ ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার।

এরপরেও মিঞা শোভনকে ভালো করে লক্ষ করে দেখেছি, সে আসলে সব কিছু নিয়েই ভাবে, চিন্তা করে, মাঝে মধ্যে লেখেও- কিন্তু নিজের ‘কোম্পানির’ কথা চিন্তা করেই হয়তো কোন নির্দিষ্ট মতবাদ প্রচারের দিকে যায়না। তার বইয়ের সংগ্রহ ও বাছাইকরণ দেখেও লক্ষ করেছি, সে বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের মাস্টারপিস গুলো বেশি প্রচার করছে। হুমায়ূন আহমেদের বই আমি খুব একটা দেখিনি সেখানে,কারণ তাঁর বই এমনিতেই সবাই পড়ে কমবেশি। এমন বই সে পাঠকদের সরবরাহ করছে যা পাঠককে আলোকিত করবে। এটাই তার লক্ষ্য, পাঠক কে কোন নির্দিষ্ট মতবাদে দীক্ষিত করা তার লক্ষ্য নয়।

এরকম পাগলাটে স্বভাবের মানুষ খুব বেশি দরকার হয়না। দু-একজন থাকলেই চলে। এই দু-একজনই ম্যাজিক ঘটিয়ে ফেলতে পারে। আমরা মিঞা শোভনের মত ঝুঁকি নিয়ে, এই পথে হাঁটতে পারবোনা, কিন্তু তার কাজটাকে এগিয়ে নিতে কিন্তু আমরা সাহায্য করতেই পারি। যারা সদস্য হননি, তারা ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সদস্য হয়ে যেতে পারেন। অল্প কিছু সদস্য চাঁদার বিনিময়ে অসাধারণ সব বইয়ের বিশাল কালেকশনে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করুন! এমন পাগল সব সময় সামনে আসেনা! আমি তাকে বলেছিলাম আমাকে ১০০০ তম সদস্য হওয়ার সুযোগ দিন। সে জানালো ইতিমধ্যে নাকি ৬ জন ১০০০ তম সদস্য হয়ে গেছে! তাদের নাকি ১০০০ক , ১০০০খ… ১০০০চ এভাবে নাম্বারিং করা হবে!

যেভাবে মিশোপা’র সদস্য হবেনঃ

জ্ঞানপ্রীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা সংগঠন “মিশোপা”র লাইব্রেরি কার্যক্রমের দুইটা ধরণ আছে।

মূল কার্যক্রম – “খেয়া” । খেয়া’তে প্রায় ১৩০০ বই আছে। প্রতিটি বই এর দাম ৩০০ টাকার মাঝে ।

তাই খেয়ার মেম্বার ফি ৩০০ টাকা। আর প্রতি বই ধার নেয়ার ফি ১০ টাকা।

কিশতি হচ্ছে বিশেষায়িত লাইব্রেরি কার্যক্রম। এখানে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মাঝে ১০০ বই থাকবে।

কিশতি’র মেম্বার ফি ৫০০। প্রতি বই ধার নেয়ার ফি ২০ টাকা।

মিঞা শোভন প্রতিদিন দশটা করে বই নিয়ে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সিড়ি তে বসেন। দুপুর ১২.৩০ থেকে ১.৩০ পর্যন্ত।

এই সময়ের মাঝে এসে সরাসরি মেম্বার হতে পারেন।

অথবা বিকাশে বা রকেটে মেম্বার ফি দিয়ে ও মেম্বার হতে পারেন।

মেম্বারশীপ আজীবনের জন্য দেয়া হয়।

তাই মেম্বার হয়ে থাকলে সুবিধাজনক যে কোন দিন ১২.৩০ থেকে ১.৩০ এর মাঝে এসে বই নিতে পারবেন।

ফোনঃ
01684076920 (বিকাশ))
019568288296(রকেট)

আশা করি, মিশোপা সত্যি সত্যিই একদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মত কিংবা এর থেকেও বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এই অন্ধকার সময়ে বইয়ের আলোতে আমাদের আলোকিত করবে, আমাদের বাতিঘর হিসেবে টিকে থাকবে বহুদিন।

মিঞা শোভন, আপনাকে এখনো পাগলই ভাবি। আপনার এই পাগলামির প্রতি শ্রদ্ধা ,ভালোবাসা এবং শুভ কামনা… এমনই পাগল থাকুন, মিশোপা নিয়েই থাকুন।

Most Popular

To Top