ইতিহাস

মার্কিন নৌবাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া পার্ল হারবার আক্রমণ

মার্কিন নৌবাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া পার্ল হারবার আক্রমণ- Neon Aloy

[আগের পর্বঃ কেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র?]

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর এডমিরাল ইয়ামামোটোর পরিকল্পনায় এবং ভাইস এডমিরাল নাগুমুর নেতৃত্বে জাপানিরা ওয়াহো’র দূর্গ পার্ল হারবারের ওপর চালায় এক অতর্কিত বিমান আক্রমণ। মূল অপারেশন পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কমান্ডার গেন্ডা ও সামুরাই বংশের কমান্ডার ফুচিদা। এই আক্রমণের সংকেত ছিল টোরা, টোরা, টোরা। জাপানি ভাষায় টোরা শব্দের অর্থ হলো বাঘ। মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌ-বহরের উপর এই হামলার ব্যাপ্তি ছিল হাওয়াইয়ের স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৯টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত।

৭ ডিসেম্বর দিনটা ছিল রোববার। পার্ল হারবারের কর্মরত সামরিক অফিসার, সৈন্য  এবং অন্যরা ছিলেন বেশ রিলাক্সড। এখনো অনেকেই ঘুম থেকে উঠেন নি। ৭টা বেজে ২মিনিটে ওপানা রাডার স্টেশনের দুই অফিসার জর্জ এবং জোসেফের চোখ আটকে গেল রাডারের পর্দায়। তারা দেখছেন ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান উড়ে আসছে পার্ল হারবারের দিকে। সাথে সাথে তারা বিষয়টি রিপোর্ট করলেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানালেন, “ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কয়েক স্কোয়াড্রন আমেরিকান বিমান পার্ল হারবারে আসার কথা। সেগুলোই ওই বিমানগুলো। চিন্তার কোন কারণ নেই”। যা ওই তিনজন অফিসার জানতো না এবং পুরো ওহায়োবাসীও জানতো না তা হচ্ছে, ঠিক ভোর ছয়টার সময় পার্ল হারবার থেকে ২৩০ মাইল দূরের এক জাপানিজ ফ্লিট থেকে ওই ফাইটারগুলো টেক অফ করেছে এবং দ্রুতবেগে এগিয়ে আসছে পার্ল হারবারের দিকে। উদ্দেশ্য একটাই পার্ল হারবার ধ্বংস করা। সকাল ৭টা বেজে ৫৫ মিনিট। ১৮৩টি জাপানি জঙ্গি বিমান ঘিরে ফেলেছে পার্ল হারবারের ভোরের আকাশ। শুরু হয়ে গেলো একতরফা ধ্বংসযজ্ঞ। চলল ঘন্টাখানেক।

দ্বিতীয় দফায় আরো ১৬৭টি জঙ্গি বিমান উড়ে এলো পার্ল হারবারের আকাশে। চলল অবর্ণনীয় ধ্বংসলীলা। টর্পেডো বোমারু বিমান, সাধারণ বোমারু ও জঙ্গি বিমান মিলিয়ে জাপান তৈরি করেছিল তাদের এই যুদ্ধের রণকৌশল। ওই সময় আমেরিকার ব্যাটলশিপ, বিমানবাহী জাহাজ, ক্রুজার, ডেস্ট্রয়ার, মাইনলেয়ার মিলে মার্কিন নৌ-বাহিনীর একটি বৃহৎ অংশ পার্ল হারবারে অবস্থান করছিল। জাপানি বিমান বহরের প্রতিটি বিমান সুনির্দিষ্টভাবে কোন ব্যাটলশিপ বা অন্য কোন যুদ্ধ জাহাজের উপর আক্রমণ চালাবে তা আগেই ঠিক করা হয়েছিল।

7th December 1941: Aerial view of the US Hawaiian Air Base at Wheeler Airfield burning after the Japanese attack on Pearl Harbor, Honolulu, Hawaii. Photograph taken by a Japanese bomber during the attack. (Photo by Hulton Archive/Getty Images)

প্রথমেই তিন হাজার ফুট উপর থেকে শক্তিশালী বোমা বর্ষণ করা হয় ব্যাটলশিপ আরিজোনায়। বোমাটি প্রথমেই আঘাত হানে অস্ত্রাগারের উপর। এর পর পরই জাহাজের সামনের অংশে টর্পেডো আঘাত হানে। এটি পুরনো ধাঁচের কাঠের জাহাজ হওয়ায় এটি পরিণত হয়েছিল বিশাল এক আগুনের কুন্ডলিতে। সমগ্র পার্ল হারবারের নিহত মার্কিন সৈন্যদের প্রায় অর্ধেকই নিহত হয়েছিল এই একটি জাহাজেই। এরপর একে একে ডুবে যেতে থাকে ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াসহ মোট ৭টি ব্যাটলশিপ। এর মধ্যে নেভাডা নামের একটি ব্যাটলশিপ অবশ্য প্রথম দফা আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। এই সুযোগে এটি তখন পার্ল হারবার থেকে সরে পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দ্বিতীয় দফা হামলার সময় এটি জাপানিদের চোখে পড়ে যায়। মোট ২০টি বড় আকৃতির যুদ্ধ জাহাজ এই আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়। একই অবস্থা হয় বিমান ঘাঁটিগুলোরও। সেখানে একতরফা হামলায় প্রায় আড়াইশরও বেশি বিমান ধ্বংস হয়।

দু’ঘণ্টার এই আকাশ আক্রমণে আমেরিকার ২১টি যুদ্ধজাহাজ ডুবে গেল। নিহত হলো ২ হাজার সৈন্য, আহত হলো আরো আড়াই হাজার সৈন্য। তবে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী জাহাজ এই হামলা থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। মহড়ার কাজে মূল ঘাঁটি থেকে বাইরে থাকায় এগুলো রক্ষা পায়। যা পরবর্তীকালে জাপানিদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। জাপান সৈন্যদলের সামরিক সরঞ্জাম লোকসান ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ছিল খুবই হালকা প্রকৃতির। তাদের ২৯টি যুদ্ধ বিমান ভূ-পাতিত হয় এবং ৫টি খর্বাকৃতি সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ তলিয়ে যায়।

হামলাকারীদের মধ্য থেকে ৬৫ জন নিহত কিংবা আহত হয়। ‘কাজু সাকামাকি’ নামীয় এক জাপানি নাবিককে আটক করা হয়। অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন পার্ল হারবারে হামলার পর পরই হাওয়াই দ্বীপ দখল করে নেয়া উচিত ছিল জাপানের। এর ফলে মার্কিন মূল ভূখন্ড যেমন কোণঠাসা হয়ে থাকতো, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চাপের মুখে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হতো। কিন্তু জাপান তো এরপর আর আগায়নি।

পার্ল হারবার নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক অনেক বই, তৈরি করা হয়েছে কয়েক ডজনখানেক ছবি। এই মুহূর্তে তিনটি ছবির কথা আমার মনে পড়ছে। প্রথমটি হল ‘ফ্রম হিয়ার টু ইন্টারনিটি’। ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা ও ডোনা রিড অভিনীত এই ছবিটি শ্রেষ্ঠ ছবি, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর ক্যাটাগরিতে অস্কার পেয়েছিল। দ্বিতীয় ছবিটি হল ‘টোরা, টোরা, টোরা’, এবং তৃতীয় ‘পার্ল হারবার’। একবার অন্তত সিনেমাগুলো দেখার আহ্বান করছি। কারণ এমন ট্র্যাজিক একটি ঘটনা পরিচালকরা কেমনে এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন তা কল্পনাতীত।

পার্ল হারবারে এমন আক্রমণের পর এবার আমেরিকা আঁটসাট বেঁধে নামে যুদ্ধে। অনেকেই মনে করেন আমেরিকার উর্ধতন কর্মকর্তারা জাপানের এহেন আক্রমণের কথা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল। কিন্তু তাও তারা প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেননি। কারণ আমেরিকা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল যুদ্ধ যোগদান করার। এবং জাপানের এই আক্রমণ তাদের এই সুযোগটা খুব ভালো ভাবেই এনে দেয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শাসকগোষ্টীরা কি এতটাই নির্দয়? এত এত মানুষ মারা গেল, এত এত জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেল, এত বড় ক্ষতি! তারা চুপচাপ বসে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখল? এখন পাঠক আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন আসল ঘটনা কি? তবে তার আগে অনুরোধ করবো এই একটি আর্টিকেল পড়েই উপসংহারে না পৌঁছুনোর। কেননা এত বড় একটি হামলা, যা একরকম ঘুরিয়ে দিয়েছে আধুনিক সভ্যতার ইতিহাস-সেটার বিষয়ে হাজার-দু’হাজার শব্দের সংক্ষিপ্ত আর্টিকেল পড়ে কিছুই বুঝা সম্ভব না। এখানে শুধুমাত্র পটভূমি এবং আক্রমণের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উঠে এসেছে মাত্র। পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে পাঠককে স্বতস্ফূর্তভাবে পড়াশোনা করতে হবে দেশ-বিদেশের নানান সোর্সের তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ। সেই অভ্যাসটা পাঠকের মাঝে গড়ে উঠুক, সে কামনায় লেখাটি শেষ করছি।

Most Popular

To Top