ইতিহাস

কেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?

কেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?- Neon Aloy

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করলে জার্মানির প্রতি তোষণ নীতি ত্যাগ করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। তারা জার্মানির বিরুদ্ধে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩রা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা করে। এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। বিশ্বের তাবৎ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি এক এক পক্ষ নিয়ে এই যুদ্ধে যোগদান করে।

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ একটানা ছয় বছর ধরে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশগুলিতে এই ভয়ংকর যুদ্ধ চলে। যুদ্ধের একটা পর্যায়ে জাপান এবং ইতালি এসে যোগ দেয় জার্মানির সাথে। অপর দিকে প্রথম দিকে সরাসরি যুদ্ধে যোগ না দিলেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী দেশ আমেরিকা পরোক্ষভাবে রসদ, যুদ্ধসামগ্রী, বিমান এবং সৈনিক দিয়ে সাহায্য করছিল ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সকে। আমেরিকার জনগণও ছিল যুদ্ধের বিপক্ষে। কিন্তু সবকিছু পাল্টে যায় ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকালে। জাপান যখন ওইদিন আমেরিকার পার্ল হারবারে আক্রমণ করে, তারপরই আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেয়। যার ফলশ্রুতিতে যুদ্ধ শেষ হয় জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে আমেরিকার পারমানবিক বোমা হামলার মাধ্যমে। এখন প্রশ্ন হল আমেরিকা কেন ২য় বিশ্বযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল? পার্ল হারবারে জাপানের আক্রমণই কি আসল কারণ নাকি এইটা কেবল বাহানা? জাপানের এমন একটি কাজের জন্যেই অপেক্ষা করছিল আমেরিকা- এমনটা দাবী করলে কি খুব ভুল হবে?

১৯২০-এর দশক থেকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান উভয় দেশই এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিল। কিন্তু, ১৯৩১ সালে এশিয়ার প্রবল পরাশক্তি হিসেবে জাপানের আগ্রাসী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। দখলের নেশায় মত্ত হয়ে পড়ে জাপান। শুরু হয় মঞ্চুরিয়া অধিগ্রহণ দিয়ে। পরবর্তীতে দেশের সীমারেখা অতিক্রম করে চীনের ভূমি দখল করার পাশাপাশি দেশটির সামরিক শক্তি খর্ব করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে থাকে। একে একে অনেকগুলা যুদ্ধের পর ১৯৪১ সালে এসে জাপান আমেরিকার ওয়াহো’র দূর্গ ধ্বংসের লক্ষ্যে আক্রমণ করে পার্ল হারবারে।

পার্ল হারবার আক্রমণটিতে অনেকগুলো প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জড়িত করেছিল জাপান। ওয়াহো দ্বীপের পার্ল হারবারে ১৯০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নৌ-ঘাঁটি স্থাপন করে। জাপানের নৌবাহিনীর চোখে তখন থেকেই এটি ভীতির অনেক বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পার্ল হারবার নৌ-ঘাঁটি অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। যা ওয়াহো’র দূর্গ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যুদ্ধজাহাজগুলিতে বন্দুকের গুলি, বোমাবর্ষণ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। সেখানে কোন খালি জায়গা না থাকায় প্রতিপক্ষের নৌবাহিনীর গোলাবর্ষণ ও পরবর্তীতে অবতরণ করে তা দখল করা সম্ভব না। কৌশল প্রয়োগ করে জাপানের সামরিক বাহিনী ঐ ঘাঁটিতে অনেক নির্মাণ শ্রমিককে গুপ্তচর হিসেবে প্রেরণ করে। ফলে, জাপান কর্তৃপক্ষ তাদের মাধ্যমে নৌ-ঘাঁটির বিস্তারিত বিবরণ জানতে সক্ষম হয়। জাপানের আক্রমণের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল আমেরিকা যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগেই তার নৌবাহিনীকে পঙ্গু করে দেওয়া।

১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর থেকে জাপান কর্তৃক সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা যেমন: ইউএসএস প্যানে’র উপর আক্রমণ এবং নানকিং গণহত্যার (২ লক্ষাধিক বাছবিচারহীন হত্যাকান্ড) ঘটনায় পশ্চিমের দেশগুলোয় প্রকাশ্যে জাপান বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়া শুরু করে। জাপানের অন্য দেশে আক্রমণ ও অধিগ্রহণে আশেপাশের রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে একটা আতঙ্কের সৃষ্টি করে। চীনের অনুরোধে ও যুদ্ধের জন্য ঋণ সহায়তার চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স একত্রিত হয়। জাপানের এই অবন্ধুত্বসূলভ আচরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উড়োজাহাজ ও মেশিনের যন্ত্রাংশ, তেল ইত্যাদি জাপানে প্রেরণ স্থগিত করে দেয়। লোহা ও স্টীলের পাত রপ্তানীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ঘোষণা দেয়া হলে জাপানের রাষ্ট্রদূত হোরিনাউচি ৮ অক্টোবর, ১৯৪০ সালে আমেরিকার সেক্রেটারী হালের কাছে তীব্রভাবে প্রতিবাদ ব্যক্ত করেন এবং অবন্ধুত্বসূলভ আচরণের হুমকিও দিয়ে যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানে তৈল রপ্তানী বন্ধ করতে পারেনি। ঐ সময়ে ওয়াশিংটন মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তৈল রপ্তানী বন্ধ করার মতো চরম পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। এছাড়াও আমেরিকা হতে তেল আমদানীর উপর জাপান বহুলাংশেই নির্ভরশীল ছিল। ১৯৪১ সালের প্রথমদিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি. রুজভেল্ট স্যান ডিয়েগো থেকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে রণতরী স্থানান্তর করেন। এছাড়াও তিনি জাপানকে দমিয়ে রাখতে ফিলিপাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করার নির্দেশ দেন। কারণ জাপানের হাইকমান্ড যদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে আক্রমণ করে তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হতেই হবে। এত বাধা বিপত্তি দেখে অবশেষে জাপান আমেরিকায় আক্রমণ করাটাই শ্রেয় মনে করল।

আর এই আক্রমণের জবাবেই জাপানসহ অক্ষশক্তির দেশগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ম্যান্ডেট পেয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে পার্ল হারবারে আক্রমণ না হলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে জড়াতো না যেহেতু যুদ্ধে জড়ানোর পক্ষে জনমত গড়ে ওঠেনি তখনো। তাই মার্কিন কংগ্রেসেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য বিল পাশ করা দুরুহ ছিল। তবে পার্ল হারবারের এই আক্রমণ কি প্রতিহত করা যেত না? সে প্রশ্নের উত্তর মিলবে আক্রমণের বিস্তারিত বিবরণে- “মার্কিন নৌবাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া পার্ল হারবার আক্রমণ“।

[পরের পর্বঃ মার্কিন নৌবাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া পার্ল হারবার আক্রমণ]

Most Popular

To Top