নাগরিক কথা

কেন এসব শিখাচ্ছেন আপনার সন্তানকে?

কেন এসব শিখাচ্ছেন আপনার সন্তানকে?

তিন বছর আগের কথা, ক্লাশ থ্রি তে নিউ স্টুডেন্ট এ্যাডমিশন চলছে। প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম, আমি আর কয়েকজন টিচার বসে আছি ক্ষুদে শিক্ষার্থিদের ইন্টারভিউ নিতে। রিটেন পরীক্ষায় কোয়ালিফাই করার পর আজ তাদের ভাইভা চলছে। এক এক করে বাচ্চারা আসছে তাদের প্যারেন্টসদের সাথে আর ইন্টারভিউ ফেস করে বের হয়ে যাচ্ছে। এমনই এক পর্যায়ে একটি বাচ্চার প্রবেশ তার বাবা মা সহ। শরীরে বেশ বাড়ন্ত এবং স্থুলকায় বাচ্চাটি প্রথম থেকেই ভ্রু কুচকে বসে রইল। যেন জগতের তাবৎ বিষয়ের প্রতি তার চরম বিরক্তি। সব প্রশ্নের উত্তরই অত্যন্ত বিরক্তি সহকারে দিচ্ছিল। ইন্টারভিউ এর এক পর্যায়ে তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল সে যে পুরাতন স্কুল থেকে নতুন স্কুলে আসছে এতে তার মন খারাপ হচ্ছে কি না। এক মুহুর্ত দেরি না করেই সে যা উত্তর দিল এবং যে ভাবে দিল তাতে আমরা একটু হোঁচটই খেলাম। ক্রোধে ফেটে পরতে পরতে সে বলে উঠল, “ ই জাস্ট হেইট দেম”। পুরাতন স্কুল কে জাস্ট ঘৃনা করে এবং সেই সাথে তার বন্ধুদেরও কারণ প্রতিনিয়ত তার বন্ধুরা তাকে ফ্যাটি বলে খেপায়, তার সাথে কেউ মিশতে চায় না এবং সব সময় তার স্বাস্থ্য এবং তার খাওয়া নিয়ে হাসাহাসি করে। কাজেই সে আর কিছুতেই ঐ স্কুলে ফিরে যাবেনা। বাচ্চার এহেন রিএ্যাকশন দেখে তার বাবা মা যথেস্ট বিব্রত বোধ করে ব্যাপারটি কে হাল্কা করার জন্য আমাদের বুঝিয়ে বললেন যে আগের স্কুলে তার সন্তানটির সাথে তার বন্ধুরা কি ধরনের আচরন করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। বুঝলাম কি ধরণের মানসিক যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে এই বাচ্চাটি তার বিগত স্কুল সময়টি অতিবাহিত করেছে এবং যার ফলে পুরো স্কুল সম্পর্কেই তার একটি বিদ্বেষ জন্মে গেছে। আমরা বাচ্চাটির অবস্থা ফিল করতে পারলাম ভাল ভাবেই কিন্তু অবাক হলাম না মোটেই কারণ, শিক্ষক হিসেবে এমন পরিস্থিতি তো প্রতিনিয়ত দেখেই আসছি। একটি বাচ্চা যদি তার বয়স অনুপাতে অতিরিক্ত বেড়ে যায় কিংবা না বেড়ে ছোটই থেকে যায় এই ক্ষেত্রে সে সবচেয়ে বেশি যে স্থানটি থেকে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় সে স্থানটি আর কোথাও নয়, স্কুলে তার সহপাঠিদের কাছ থেকে।

এখন একটু ভাবুন তো এর পেছনে কারণটি কি? কি এমন কারণ এই ছোট ছোট শিশুদের তার সহপাঠিদের প্রতি এমন অমানবিক আচরন করতে উৎসাহিত করছে?

কারণ, শিক্ষাদিক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞান, কৃস্টি কালচার ইত্যাদি যত দিক থেকেই আমরা নিজেদের এগিয়ে আছি বলে ভাবিনা কেন এখনো যে জিনিসটি আমরা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধারণ করি তা হল রেসিজম। সবার ওপর দৈহিক সৌন্দর্য্য তাহার ওপর নাই। কি খুব বেশি বলে ফেললাম? একটু চিন্তা করুন গভীর ভাবে আপনিই এর উত্তর পেয়ে যাবেন। ধরুন আপনি একটি মুভি দেখছেন, মুভির কমেডিয়ানের কান্ড কারখানায় আপনি হেসে কুটি কুটি কিন্তু খেয়াল করে দেখেছেন কি  কমেডিয়ান হিসেবে যাকে পর্দায় উপস্থিত করা হয়েছে তার দৈহিক গড়ন? হয় সে দৈহিকভাবে খুব স্থুলকায় অথবা অতিমাত্রায় শীর্ণকায়। অথবা ভীষন রকম কৃষ্ণবর্ন। যে কোন কমেডি দৃশ্যতেই নায়ক নায়িকার পাশাপাশি মোটা গড়নের কোন তরুন বা তরুনী কে রাখা হয়েছে শুধুমাত্র কোন রম্য বিবাহের দৃশ্য চিত্রায়নের জন্য। কিছুদিন আগে একটি মোবাইল কোম্পানির এ্যাড এও একজন স্থুলকায় তরুনী কে ইউজ করা হয়েছিল যার প্রধান কাজ নায়কের পিছে পিছে দৌড়ে বেড়নো আর তাকে দেখে নায়ক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন কান্ডকারখনা দেখে হাসিতে ফেটে পরছি আমরা। আর এ থেকে একটি বাচ্চা এটাই শিখে বড় হচ্ছে যে স্বাভাবিকের চেয়ে মোটা বা শুকনা যে কেউ মানেই হাসির পাত্র। তারা প্রত্যেকেই একেকটি কমেডিয়ান তাই তাদের নিয়ে ফান করাই যায়। এছাড়া টিভি খুললেই রং ফরসাকারী ক্রিমের চটকদার বিজ্ঞাপন তো আছেই। জগতের তাবত রমনীর ই একটি ভাল বিবাহ অথবা নিজের কনফিডেন্স গ্রো করার জন্য সবার আগে যে জিনিসটি জরুরী তা হল একটি ফর্সা স্কিন। কাল চামড়া নিয়ে কনফিডেন্ট হওয়া যেন ভীষনভাবে মানা। আর তার ফলাফল হল ক্লাশের কৃষ্ণবর্ণের সহপাঠিটি যেন অন্য গ্রহের কেউ। তার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে তাই দ্বিধা অনেক।

আমরা বই এর ভাষায় যতই বলিনা কেন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মানুষ যতক্ষন পর্যন্ত না তা কাজে দেখিয়ে দিচ্ছি তার ফলাফল জিরো। তাই নিজেদের স্বার্থেই বিশেষ করে পরবর্তী প্রজন্ম কে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সংবেদনশীল হিসেবে গড়ে তুলতে নিজেদের অন্যর প্রতি ব্যবহা্রে সতর্ক হোন। আপনার রেসিস্ট মনোভাব কিংবা অন্যকে নিয়ে ফান করার প্রবণতা আপনার সন্তানটিকে  অন্যর দৈহিক অবস্থা কে কটাক্ষ করা শেখাচ্ছে না তো? আপনার সন্তান কে সকল বর্ন, ধর্ম, গঠনের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশিল হতে শেখান। সবার উপর মানুষ সত্য টাইপের কঠিন কবিতা শুধু শুধু না বুঝে মুখস্ত না করিয়ে বরং আপনার নিজের সর্বগঠনের মানুষের প্রতি স্বাভাবিক ব্যবহার তার সামনে উধাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করুন।  একটু ভাবু্ন তো একটি ছোট্ট শিশু যে প্রতিনিয়ত ক্লাশে তার দৈহিক গড়নের জন্য ব্যাঙ্গ বিদ্রুপের শিকার হতে হচ্ছে কি পরিমাণ মানসিক ডিপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে সে যাচ্ছে। সে যে হীনমন্যতা নিয়ে বড় হচ্ছে তার প্রভাব তাকে সারাজীবন বহন করতে হবে।  অন্য কিছু নয় শুধু এই শিশুটির কথা চিন্তা করেই আপনাদের ব্যবহারে সংযত হোন আর সেই সাথে মিডিয়াতেও সর্ব ধরনের রেসিস্ট আচরনের প্রতিবাদ করুন। কমেডিয়ান মানেই স্থুলাকৃতি বা খর্বাকৃতি নয়, লোক হাসানোর জন্য দরকার পারফেক্ট সেন্স অফ হিউমার। মাননীয় মিডিয়া ব্যাক্তিত্বগণ এই ব্যাপারগুলি একটু মাথায় রাখুন। অনেক তো হল ফেয়ার এ্যান্ড লাভলীর দৌরাত্ব, আর কত? কৃষ্ণকলিদের কনফিডেন্স এর দিপ্তি যে আপনাদের ফেয়ার এ্যান্ড লাভলীর চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল এ ব্যাপারটি এবার একটু বুঝুন আপনারা।এখন সময় এসেছে দায়িত্বশিল আচরণ করার। কারণ, আপনাদের কান্ডজ্ঞানহীন আচরনের সুদুরপ্রসারি প্রভাবে আপনার নিজের সন্তান ই যে তার ক্লাশে বৈরি পরিস্থিতির শিকার হবেনা তাই বা কে বলতে পারে?

Most Popular

To Top