বিশেষ

এবার না ফেরার দেশে চলে গেলেন শশী কাপুর…

এবার না ফেরার দেশে চলে গেলেন শশী কাপুর......

এই বছরটা যেন বড় বিষাদের বছর, সারা বছর জুড়ে ছিল অনেকেরই মৃত্যুসংবাদ। নভেম্বর মাসের শেষের দিকে মারা গেলেন আমাদের প্রিয় আনিসুল হক, তার মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই চার ডিসেম্বরে খোদাই হয়ে গেল বিখ্যাত অভিনেতা শশী কাপুরের মৃত্যু সংবাদ।

বলবীর রাজ কাপুর ,যিনি সিনেমা জগতে শশী কাপুর বলেই পরিচিত ছিলেন। সুপরিচিত অভিনেতা পৃথ্বীরাজ কাপুরের সন্তান এবং হিন্দি সিনেমার লিজেন্ড রাজ কাপুরের ছোট ভাই হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেওয়া হয়তোবা অনেকের কাছে একটা আরাধ্য বিষয় হলেও যারা এমন বিখ্যাত মানুষদের আত্মীয় হন তারা অনেকেই নিজেদের ক্যারিয়ারে তেমন সফল হতে পারেন না। কিন্তু শশী কাপুর ছিলেন তার ব্যতিক্রম, নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি সফল পিতা এবং সফল বড় ভাইয়ের ছায়াকে সরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় শশী কাপুর। টকটকে ফর্সা গায়ের রঙ এবং নীল চোখের অধিকারী এই অভিনেতাকে দেখলে অনেকেই বিদেশি বংশোদ্ভূত বলে মনে করতেন। তখনকার সময়ে ধরমেন্দ্র কিংবা অমিতাভ বচ্চন “এংগ্রি ইয়ংম্যান” ইমেজ নিয়ে সিনেমা করতেন আর রাজেশ খান্নার মত অভিনেতারা পরিচিত ছিলেন “রোমান্টিক” ক্যাটাগরির নায়ক হিসেবে। কিন্তু শশী কাপুর ছিলেন তাদের সকলের চেয়ে আলাদা। তিনি নিজেকে কোনো ক্যটাগরিতে সীমাবদ্ধ করে না রেখে কখনো রোমান্টিক নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন, আবার কখনো সৎ পুলিশ অফিসার হিসেবে একাই পিটিয়ে ঠান্ডা করেছেন এক ডজন গুন্ডাকে।

১৯৩৮ সালের ১৮ই মার্চ কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা ছিলেন পৃথ্বীরাজ কাপুরের তৃতীয় সন্তান। ছোটবেলা থেকেই বাবার পৃথ্বী থিয়েটারে তিনি খেলতে যেতেন এবং সেখানে বিভিন্ন নাটকে শিশুর ভুমিকায় অভিনয় করতেন। পরে ৬বছর বয়সে তিনি বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় শুরু করেন এবং বড় ভাই রাজকাপুরসহ অশোক কুমার এর বাল্যকালের চরিত্রে অভিনয় করেন।


এরপরে মাত্র বিশ বছর বয়সে সুনীল দত্তের প্রথম সিনেমা পোস্টবক্স ৯৯৯ তে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ আরম্ভ করে দেন এবং পরবর্তীতে বড় ভাই রাজকাপুরের কয়েকটি সিনেমাতেও এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের কাজ করেন। সহকারী পরিচালক হিসেবে সিনেমায় হাত পাকিয়ে ১৯৬১ সালে ‘ধর্মপুত্র’ নামক সিনেমায় প্রথম প্রধান নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন।

সিনেমার ক্যারিয়ারে প্রায় একশ ষোলটি সিনেমায় অভিনয় করা শশী কাপুর কাভি কাভি, জুনুন, কলিজুগের মত অসাধারণ সব সিনেমাসহ ৬১টি সিনেমাতেই তিনি প্রধান নায়ক হিসেবে ছিলেন। চরিত্রের প্রয়োজনে কখনোবা তিনি যুবরাজ হিসেবে এসেছেন পর্দায়, আবার কখনোবা সৎ পুলিশ অফিসার হিসেবে কড়া গলায় অপরাধী বড়লোক ভাই অমিতাভ বচ্চনের অর্থের অহংকারের জবাবে বলেছেন “আমার কাছে মা আছে”। তবে সবখানেই তাকে মনে হয়েছে যে এই লোকটিই মানানসই ছিল এই চরিত্রে। একপাশের বাঁকা দাঁতের পাগল করা হাসি, প্রায় ঘাড় ছোঁয়া লম্বা জুলফির চুল কিংবা ব্যক্তিত্বময় শরীরী ভাষা এসবই তরুণীদের মন কেড়ে নিয়েছিল। তখনকার সময়ে পারিশ্রমিকের দিক দিয়ে বলিউডে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এই নায়ক এমন প্রফেশনাল ছিলেন যে এই গুণে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন সুপারহিট নায়িকা নন্দা শশী কাপুরের সাথে একবারে ছয়টি ছবিতে সাইন করে ফেলেছিলেন।

হিন্দী সিনেমার নায়কদের মধ্যে সর্ব প্রথম শশী কাপুর হলিউডি সিনেমায় অভিনয় করতে যান এবং পিয়ারস ব্রসনানের মত গুণী অভিনেতার সাথেও তিনি ছবি করেন, এছাড়া টেলিভিশনে হিন্দি ফেলুদার সিরিয়ালে তিনি নামভূমিকাতেও অভিনয় করেছিলেন। আর ভারত, বাংলাদেশ এবং কানাডার যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত সিনেমায় শরমিলা ঠাকুরের সাথে তার গান “যেওনা সাথী” এখনো সেকালের সিনেমাপ্রেমীদের নস্টালজিক করে তোলে। শংকর দাদা সিনেমায় তার মেয়ে সেজে গাওয়া গানটি দেখলে কেইবা তাকে পুরুষ বলে চিনতে পারবে বলুন?


লাখো তরুণীর স্বপ্নের পুরুষ হলেও শশী কাপুরের মন জুড়ে সবসময়ছিলেন জেনিফার কেন্ডেল। সিনেমায় চুটিয়ে অভিনয় করলেও থিয়েটারের নেশা ছিল তার রক্তে। তাই সময় পেলেই বাবার পৃথ্বী থিয়েটারে গিয়ে হাজির হতেন। সেখানে তিনি সহকারী স্টেজ ম্যানেজার এবং অভিনেতা হিসবে কাজ করতেন বাবার সাথে। একবার সে থিয়েটারে বিখ্যাত নাট্যকার জিওফ্রে কেন্ডালের নাট্যদলের শো ছিল। তার সাথে মেয়ে জেনিফার কেন্ডেলো অভিনেত্রী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। জেনিফারকে দেখে শশীর ভালো লেগে যায় এবং তারা পরস্পর প্রেমে পড়ে যান। কেন্ডেলের পরিবার এই সম্পর্কে প্রথমদিকে রাজি না হলেও শশীর ভাবি গীতা বালীর প্রচেষ্টায় তাদের বিয়ে ঠিক হয়। এই দম্পতি বিয়ের পরে অনেক নাটকে অভিনয় করেন এবং তাদের মধ্যে প্রেমের কোনোদিন কমতি ছিলোনা। দুজনে মিলে ১৯৭৮ সালের পাঁচ নভেম্বর নতুন করে পৃথ্বী থিয়েটারকে ঢেলে সাজান এবং অনেক নাটক সেখানে মঞ্চস্থ হয়। করন, সঞ্জনা এবং কুনাল নামে তিন সন্তানের পিতা-মাতা হন তারা। ১৯৮৪ সালে স্ত্রী কেন্ডেলের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আকস্মিক মৃত্যু তাকে অনেক আঘাত দেয় এবং তখন থেকেই তিনি বিষণ্ণতায় ভোগা শুরু করেন। সিনেমার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে সিনেমাতে আবার ফিরে আসলেও তার ছন্দ হারিয়ে যায় এবং মুটিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি অনিয়মিত হয়ে পড়েন।


সমসাময়িক অভিনেতাদের সাথে বন্ধুর মত করে মেশা শশী কাপুর ছিলেন হাতখোলা মানুষ, অন্যের সাহায্যে যিনি নিজের অর্থটুকু অকাতরে বিলিয়ে দিতে কখনো পিছপা হতেন না। যখন সিনেমার পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তখন তাঁর সেটে সবাই ভয়ে ভয়ে থাকত, কারন কখন যে রেগে গিয়ে ধমক দিয়ে বসেন তার ঠিক নেই। শোনা যায় যে উনি নাকি সেটে হাতে ছড়ি নিয়ে ঘুরতেন ভয় দেখানোর জন্য, কিন্তু শট সুন্দরভাবে মনের মত করে দেওয়া হলেই আবার তারমত খুশি কেউই হতনা।

জীবনের শেষের দিকে এসে বার্ধক্য জনিত নানা অসুখে ভুগলেও সবসময় ছিলেন চিরতরুনের মত। ভাই রাজ কাপুরকে নিজের প্রিয় অভিনেতা বলে মানতেন আর তাকে সম্মান করতেন সবসময়। সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে বানানো তাঁর প্রযোজিত “জুনুন” সিনেমার জন্য জাতীয় পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া ২০১১ সালে পদ্ম ভূষণ এবং ২০১৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে তাকে ভূষিত করা হয়। তিনবার বিভিন্ন শাখায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেতা ২০১০ সালে হিন্দী সিনেমায় বিশেষ অবদানের জন্য লাভ করেন আজীবন সম্মাননা।

এই গুনী অভিনেতা তিন ডিসেম্বর ২০১৭ সালে মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন হাসপাতালে বুকের প্রদাহ নিয়ে ভর্তি হন এবং পরদিন চার ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। এই লেখার মাধ্যমে শশী কাপুরের প্রতি এবং তার অভিনয়ের প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তথ্যসূত্রঃ
Shashi Kapoor
Shashi Kapoor, Bollywood legend, dies at 79

Most Popular

To Top