নাগরিক কথা

শামার গল্প…..

শামার গল্প.....

বৈদ্যুতিক বেলের ক্রিং ক্রিং শব্দে থার্ড পিরিয়ড শেষ হবার সংকেত পরতেই ক্লাস থেকে বের হয়ে এলাম। পর পর দুইটি ক্লাস নিয়ে বিচ্ছু বাহিনীদের সামলিয়ে যথেস্ট ক্লান্ত আমি কেবলই নিজ চেয়ারে এসে বসেছি এমন সময় অফিস রুমে তলব, প্যারেন্টস দেখা করতে চায়। ক্লাস আওয়ারে এমন আব্দার! বিরক্তি চেপে অফিসে প্রবেশ করতেই ইউনিফর্ম পরা অফিস স্টাফ এগিয়ে এসে ইশারায় ভেতরে দেখিয়ে দিয়ে বল্ল “মিস দেখেন কি করা যায়”। আমি জিজ্ঞাসু দৃস্টিতে তাকালাম ভেতরে। চেয়ারে কাচুমাচু ভঙ্গিতে হালকা পাতলা গড়নের বছর চল্লিশের এক ভদ্রলোক বসে আছেন। পোশাক আশাকে যথেস্ট মার্জিত,  হাতে বেশ বড় একটা প্যাকেট ধরে রেখেছেন। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলেন তিনি।

  “আপনি তো শামার ক্লাস টিচার, আমি শামার বাবা।”

আমি মৃদু হেসে বসতে বললাম তাকে। ক্লাস ফোরে পড়া শামা আমার স্টুডেন্ট। লক্ষি, মিস্টি আর ভীষণ মেধাবি মেয়েটি খুবই শান্ত প্রকৃতির। দুই বছর হল মেয়েটি এখানে পড়ছে কিন্তু কখনো ওর বাবাকে দেখিনি আমি। প্যারেন্টস ডে কিংবা অন্য কোন প্রয়োজনে ওর মাই যোগাযোগ করেন টিচারদের সাথে। সম্ভবত ভদ্রলোক ব্যস্ততার কারণে স্কুলে আসতে পারেন না। কিন্তু আজ ক্লাস আওয়ারে কি এমন দরকার পড়ল যে কাজ ফেলে উনি আমার কাছে। “জ্বী বলুন, কি করতে পারি আমি?” কন্ঠে আমার তাড়া, এর পরে আরো ক্লাস আছে যে আমার। “আজ শামার বার্থ ডে, আমি ওকে একটু দেখতে চাই আর এই গিফট আর চকোলেট গুলো দিতে চাই ওকে।” ধন্দে পরে যাই আমি, কি বলে এই ভদ্রলোক? আমার জিজ্ঞাসু দৃস্টি দেখে নিজেই ভেঙ্গে বললেন সব। কয়েক বছর হল ভদ্রলোকের বিচ্ছেদ হয়েছে স্ত্রীর সঙ্গে। স্ত্রী এবং কন্যার সঙ্গে বর্তমানে কোন যোগাযোগ নেই তার। স্ত্রীর কঠোর তদারকির কারণে কন্যার সাথে দেখা করার সুযোগ পাননা তিনি। কন্যা তার বাবা অন্ত প্রাণ, বাবা ছাড়া সে কিছুই বোঝেনা। আজ তাই সন্তানের জন্মদিনে বাধ্য হয়ে স্কুলে চলে এসেছেন তিনি। একটাই চাওয়া তার কন্যাকে একনজর দেখবেন এবং নিজে তার হাতে গিফটগুলো তুলে দেবেন। কি করব বুঝতে পারছিলাম না আমি। প্রথমত স্কুল আওয়ারে এমনটি  নিয়ম নেই, দ্বিতীয়ত এস্কর্ট কার্ড ছাড়া আমরা কোন বাচ্চাকেই কারো কাছে দিতে পারিনা। তাছাড়া বাবা মার এই সেপারেশনে বাচ্চাটি এমনিতেই মানসিক পীড়নে রয়েছে। এর মাঝে বাবার সাথে তার সাক্ষাৎ তার মনে কিরকম প্রভাব ফেলবে তা জানা নেই আমার। তবে প্রতিটি বাচ্চার প্যারেন্টস এর সন্তান সহ গ্রুপ ছবি আর তাদের সব ইনফরমেশনই থাকে আমাদের কাছে তাই উনি যে শামার বাবা এ ব্যাপারে সন্দেহ নাই কোন। ভদ্রলোকের অসহায়ত্ব নাড়াও দিচ্ছিল খুব। কিছুক্ষণ ভেবে বললাম, “আপনার অনুরোধ রক্ষা করা সম্পুর্ণ নির্ভর করছে শামার সিদ্ধান্তের ওপর। ও যদি আপনার সাথে দেখা করতে রাজী হয় তাহলে আমি দেখা করাতে পারি, আর ও যদি রাজি না হয় তাহলে আপনাকে ফেরত যেতে হবে।” উনি আমাকে অনুরোধ করলেন ওকে না জানিয়ে আনতে কারণ হয়ত ওনার মধ্যেও যথেস্ট আত্মবিশ্বাস ছিলনা কিন্তু আমি তাতে রাজি হলাম না।

শামার ক্লাসে এসে ওকে ডেকে নিলাম বাইরে। সবার অলক্ষ্যে ওকে বললাম “শামা তোমার কাছে একজন গেস্ট এসেছেন দেখা করতে, বলত কে হতে পারেন?” ও মাথা নিচু করে রইল, একটু পর বল্ল “আমার বাবা?” আমি বললাম “হুম, তুমি কি ওনার সাথে দেখা করতে চাও?” শামা নিরুত্ত্বর। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। আমি বললাম, “শামা সোনা, এটা সম্পুর্ণ তোমার ওপর, তোমার মন যা চাইবে তাই বলবে আমাকে। তুমি যদি দেখা করতে চাও তবেই আমি তোমার সাথে দেখা করাব তাকে। তোমার কাউকে ভয় করার কারণ নেই। আমি এ কথা কাউকে বলব না।” তবুও সে নিরুত্ত্বর। আমিও চুপ করে তাকিয়ে দেখছি তাকে। কয়েক মুহুর্ত পর  শামার উত্তর, “আমি দেখা করব না মিস, ওনাকে চলে যেতে বলেন” কন্ঠ কি একটু কাঁপল মেয়েটার? আমি বললাম, “তুমি কি কাউকে ভয় পাচ্ছ? উনি শুধু তোমাকে দেখতে এসেছেন, উনি শুধু তোমাকে উইশ করেই চলে যাবেন ,তুমি একটু দেখা করেই চলে আসবে, যাবে কি মা?” এবার চোখ তুলে চাইল সে, আর সে চোখ দেখে হতবাক আমি, অগ্নিস্ফুলিংগ কি একেই বলে? এমন জলভরা অগ্নিদৃস্টি আগে দেখেছি কি কখনো?? “না আমি যাবনা, কিছুতেই যাবনা, উনি একদিন আমাকে আর আমার মাকে রেখে চলে গিয়েছেন, আমাদের সবার কাছে ছোট করেছেন, আমার মা কে টর্চার করেছেন, আমি কিছুতেই দেখা করব না তার সাথে। ওকে চলে যেতে বলেন মিস।” বলেই হতভম্ব আমাকে পেছনে ফেলে রেখে সে ঠোট দিয়ে দাঁত কামড়ে চোখের পানি সামলাতে সামলাতে সে এক দৌড়ে চলে গেল ক্লাসে। বজ্রাহত ধীর পায়ে নেমে এলাম সিঁড়ি বেয়ে। এ যে দীর্ঘদিনের তীলে তীলে জমে উঠা অভিমান। সাধ্য কি আমার তা এক মুহুর্তে ভেঙ্গে দেয়া? ভাবছিলাম, দুই বছরে এমন মুর্তি কখনো দেখিনি শামার। পরিস্থিতি কিভাবে একটি ছোট্ট মেয়েকে বড় করে দেয়। ফিরে এসে ভদ্রলোক কে বললাম সব। ফিরিয়ে দিলাম সব গিফট আর চকলেট।  উনি ঝিম মেরে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। বললেন, “এগুলো আমি নিয়ে যেতে পারব না মিস, আপনি এগুলো দয়া করে ওর বন্ধুদের মাঝে বিলিয়ে দিবেন।” আমি ক্ষমা চেয়ে অপারগতা প্রকাশ করলাম। চাইতে পারছিলাম না ওনার চোখের দিকেও। জানিনা জীবনের সেই কোন জটিল ধাধার উত্তর মেলাতে পারেনি বলে এই লোকটি আজ এমন পরিস্থিতির দ্বারপ্রান্তে, শুধু জানি এই মুহুর্তে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগ্য পিতাটির সামনের দাঁড়িয়ে আছি।  ভদ্রলোকের কাছে বিদায় নিয়ে  ফিরে এলাম আমার নিত্য দিনের কাজে। বাকি সময়টা কোন কাজেই মন বসাতে পারলাম না। বার বার চোখের সামনে এক অসহায় পিতা আর একটি কস্ট চেপে পাথর হয়ে যাওয়া অভিমানি কন্যার মুখ ভেসে উঠতে লাগল।

ছুটির ঘন্টা কানে পরতেই দৌড় দিলাম গেটে, বাচ্চাদের হ্যান্ড ওভার করতে হবে প্যারেন্টসদের কাছে। আজ আমার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে শামা। মা চাকুরিজীবি বলে ওকে অন্য আর একটি বাচ্চার মা আনা নেওয়া করেন। তার হাতেই ওকে তুলে দিলাম। সবাইকে বিদায় দিয়ে  ফিরে আসছিলাম, আনমনে দেখছিলাম শামার ফিরে যাওয়া। মেয়েটা কি আজ একটু বেশিই ধিরে হাঁটছে? কিছুদুর যাওয়ার পর দেখি হঠাত দাঁড়িয়ে পরল সে। কেমন যেন সন্দেহ হল আমার। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটি দরজার আড়ালে থেকে লক্ষ্য করতে লাগলাম ওকে। সঙ্গিকে হাতের ইশারায় একটু দাঁড়াতে বলে সে ফিরে আসছে গুটি গুটি পায়ে। বার বার এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে কেউ তাকে দেখছে কিনা। ধীরে ধীরে সে এসে দাঁড়াল অফিস রুমের দরজার কাছে। স্কুল ব্যাগটা এক পাশে রেখে  দাঁড়িয়ে দরজার আড়াল থেকে সে  চুপি চুপি উঁকি দিতে লাগল ভেতরে। কয়েকবার উঁকি দিয়ে কি যেন দেখার চেস্টা করে সে ভারি ব্যাগটা নিয়ে এক দৌড়ে চলে গেল অপেক্ষায় থাকা তার সাথীর দিকে। কেন যেন দুই চোখ ঝাপসা হয়ে গেল আমার। জগতের আর কেউ জানুক বা না জানুক আমি তো জানি দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে কি মুল্যবান রত্নটি অনুসন্ধান করছে তার ছোট্ট দুটি তৃষ্ণার্ত আঁখি। ঠিক এই মুহুর্ত টিতে সব অভিমান, কস্ট আর অপমানবোধ হেরে গিয়েছে পিতৃস্নেহের কাছে। বাবাকে এক নজর দেখার অদম্য গোপণ ইচ্ছাটিই বালিকাকে এখানে এনে দার করিয়েছে। পৃথিবীতে খারাপ বাবা নাকি একটিও নেই আজ বুঝি সেটাই প্রমাণিত হল আরেকবার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে আসি আমি আর সৃস্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি পাহাড় সমান অভিমান আর পিতৃস্নেহের তৃষ্ণা এই দুই এর মাঝে নিস্পেসিত এই বালিকাটির মনের সকল কস্ট যেন উনি লাঘব করেন এবং তাঁকে সকল দ্বিধা, সকল দ্বন্দ্ব ভুলে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দান করুন। বড়দের ভুল সিদ্ধান্ত আর হঠকারিতার বলি হয়েও সে যেন মানুষের প্রতি আস্থা না হারিয়ে ফেলে। এই দোয়াটি করা ছাড়া আমার মত একজন সামান্য শিক্ষিকার আর কিই বা করার আছে??

(শামা নামটি ছদ্ম নাম। সঙ্গত কারণেই মেয়েটির নাম এবং অন্যান্য ব্যাক্তিগত তথ্য গোপন করা হয়েছে।)

Most Popular

To Top