ইতিহাস

কে ছিল ভিঞ্চির সেই মোনালিসা?

কে ছিল ভিঞ্চির সেই মোনালিসা?- নিয়ন আলোয়

মোনালিসার প্রকৃত ইতিহাস এর রহস্যময় হাসির মতোই রহস্যের চাদরে মোড়া। এই প্রতিকৃতির সবচেয়ে পুরনো বর্ণনা পাওয়া যায় গিওর্গিও ভাসারির লেখায়। ভাসারি যদিও মোনালিসা নিয়ে দারুণভাবে উচ্ছ্বসিত ছিলেন, কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে তিনি কখনোই মোনালিসাকে স্বচক্ষে দেখেননি। কারণ তিনি যখন দা ভিঞ্চির জীবনী লেখেন তখন মোনালিসা ছিল ফ্রান্সে। অবশ্য ভাসারি লিওনার্দোর শিষ্য এবং পরবর্তীতে তার সমস্ত শিল্পকর্মের উত্তরাধিকারী ফ্রান্সেসকো মেলজির সাথে সাক্ষাৎ করেন। মেলজিই তাকে মোনালিসা সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করেন।

ভাসারি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, লিসা ছিলেন ফ্লোরেন্সের অত্যন্ত প্রতিপত্তিশালী রেশম ব্যবসায়ী ফ্রান্সেসকো ডেল গিওকন্ডোর চতুর্থ স্ত্রী। প্রতিকৃতিটি আঁকা প্রায় শেষ হওয়ার সময়ে লিসার বয়স ছিল ছাব্বিশ বা সাতাশ। এক সন্তানের জননী ছিল সে। অবশ্য তার সেই সন্তান জন্মের পর পরই মারা যায়। লিওনার্দো তাঁর এই প্রতিকৃতিটির কোন নামকরণ করেন নাই। যেহেতু লিসা ছিল গিওকন্ডোর স্ত্রী, সে কারণে ইটালিতে এই চিত্রকর্মকে ডাকা হয় লা গিওকন্ডো নামে। ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলে লিসার নামে ছবিটির নাম হয়ে যায় মোনালিসা। ইটালিয়ান ভাষায় মোনা হচ্ছে সম্মানসূচক পদবি। অনেকটা ম্যাডামের মত। আর এ কারণেই এই প্রতিকৃতিকে মোনালিসা নামে ডাকা হয়ে থাকে।

ভাসারি আরো উল্লেখ করেছেন যে, ছবি আঁকার সময় মোনালিসার মনোরঞ্জনের জন্য লিওনার্দো ভাড়া করা লোকজন দিয়ে গানবাজনার ব্যবস্থা করে ছিলেন। এমনকি তাকে হাসিখুশি এবং উৎফুল্ল রাখার জন্য পেশাদার ভাঁড়েরও ব্যবস্থা ছিল। অনেকে অবশ্য মনে করেন যে, মোনালিসার হাসি লিওনার্দোর একধরনের তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। ইটালিতে গিওকন্ডো শব্দের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে, উৎফুল্ল, উল্লসিত, আনন্দিত। লিওনার্দো হয়তো তাঁর নামকেই কৌতুকের আকারে হাসির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এ ধরনের কৌতুকের প্রতি ভিঞ্চির যে বেশ অনুরাগ ছিল তা ইতিহাসই প্রমান দেয়।

ভাসারির সুস্পষ্ট বর্ণনা সত্ত্বেও শত শত বছর ধরে প্রায় ডজন খানেক নারী আলোচনায় উঠে এসেছে মোনালিসা হওয়ার দাবিদার হয়ে। কেউ কেউ আবার এই প্রতিকৃতিটিতে কোন মডেলই ব্যবহৃত হয়নি বলে মনে করেন। তাদের ধারণা লিওনার্দো কলপনা থেকে তার আদর্শ রমণীর ছবি এঁকেছেন।

বহুদিন আগে থেকে আবার বেশ কিছু সংখ্যক লোক দাবি করে আসছিলেন যে মোনালিসা ভিঞ্চিরই নিজস্ব চেহারার রমণীয় রূপ। এই ধারণাটির রহস্য উদঘাটনে গ্রাফিক আর্টিষ্ট লিলিয়ান শোয়ার্জ ১৯৯৮ সালে কম্পিউটার ভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটান। শোয়ার্জ লিওনার্দোর নিজের আঁকা নিজেরই প্রতিকৃতি নিয়ে একে উল্টে দেন এবং কম্পিউটার স্ক্রিনে মোনালিসার প্রতিকৃতি পাশাপাশি রেখে তুলনা করেন। তিনি দেখতে পান যে, মোনালিসা এবং লিওনার্দোর নাক, মুখ, কপাল, চোয়ালের হাড়, চোখ এবং ভ্রু সবকিছুই একেবারে সরলরেখায় অবস্থান করছে। লিলিয়ান এই বলে তাঁর উপসংহার টানেন যে, লিওনার্দো নারী মডেল নিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই মডেলকে আর না পাওয়া যাওয়াতে তিনি নিজের চেহারার রমণীয় রূপকেই ব্যবহার করেছিলেন।

এডেলেইডের অপেশাদার শিল্প ঐতিহাসিক মেইকি ভোগট-লুয়েরসেন এর দৃঢ় বিশ্বাস যে তিনি মোনালিসার পরিচয় এবং সেই সাথে তার বিষন্নতা এবং রহস্যময় হাসির পিছনের কারণটি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন।

রেঁনেসার সময়কার শিল্পকলার প্রতি সুগভীর প্রণয়ের কারণে মেইকি তার এই গবেষণা প্রজেক্ট হাতে নেন, যার সূত্রপাত হয়েছিল জার্মানিতে। প্রায় সতের বছরের গবেষণার পর মেইকি এই বিশ্বাসে উপনীত হন যে, মোনালিসা ফ্লোরেন্সের ধনাঢ্য রেশম ব্যবসায়ীর স্ত্রী নন। বরং সে হচ্ছে লিওনার্দোর প্রেমাকাংখী মিলানের প্রাক্তন ডাচেস ইসাবেলা অব এ্যারাগন।

মেইকির এই গবেষনার ফলাফল জার্মানিতে “Who is Mona Lisa? In Search of Her Identity” নামে গ্রন্থাকারে বের হয়েছে।
মেইকি বলেন যে, মোনালিসার পরিচয়ের সূত্র, মোনালিসা চিত্রকর্মসহ সেই সময়কার অন্যান্য চিত্রকর্ম, ডায়েরি এবং তৎকালীন সরকারি ও বেসরকারি রেকর্ডের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

ফ্যাকাশে হাসি এবং মোনালিসার সারা শরীরের গহনার অনুপস্থিতি ছাড়াও তার পরনে রয়েছে গভীর শোকের পোশাক। মোনালিসাকে যে বছর আঁকা হয় তার আগের বছরই ইসাবেলার মা মারা যায়। সেই সময় ডাচেসের বয়স ছিল মাত্র সতের বছর এবং তিনি ছিলেন সুদর্শন কিন্তু অসৎ চরিত্রে অধিকারী ডিউক অব মিলান গিয়ান গালিয়াজো মারিয়া ফোরজার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী।
মোনালিসার সাদাসি্ধে বাদামি পোশাকের দৃশ্যমান উর্ধ্বাংশ হচ্ছে ফোরজা পরিবারের প্রতীক এবং এর নীচের সংযুক্ত গিটসমূহ এবং সূতাগুলো ভিসকন্টি এবং ফোরজা পরিবারের বন্ধনকে প্রতিনিধিত্ব করছে। মেইকি উল্লেখ করেন যে, এই প্রতীকের কারণে মোনালিসা হতে পারে এমন মহিলার সংখ্যা মাত্র আটজনে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তিনি সংশ্লিষ্ট মহিলাদের বেশ কিছু প্রতিকৃতি চিহ্নিত করেন। এদের মধ্যে রয়েছে ক্যাটরিনা ফোরজা, যার চুল ছিল হালকা লাল রং এর, ইসাবেলার শ্বাশুড়ী বোনা অব স্যাভয় এবং ইসাবেলার ননদ এ্যানা-মারিয়া, এঞ্জেলা, ইপোলিটা, বিয়ানকা, এমপ্রেস এবং বিট্রিসা। বলা বাহুল্য এদের কারো সাথেই মোনালিসার চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া যায় নি। কাজেই, খুব স্বাভাবিকভাবেই মোনালিসা হওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র দাবিদার হয়ে পড়েন ইসাবেলা।
মেইকির ধারণা যে তিনি মোনালিসার বিষন্নতা এবং উৎফুল্লতার পিছনের কারণও বের করতে পেরেছেন।

কেন মোনালিসা এতো বিষন্ন? ১৪৮৮ সালের শেষের দিকে ইসাবেলা যখন মিলানে আসে তখনই তার বিয়ে হয় ডিউক অব মিলানের সাথে। কিন্তু তাদের বৈবাহিক জীবনে বড় ধরনের সমস্যা ছিল। তার স্বামী ছিল মদ্যপ, নপুংসক এবং স্ত্রী নির্যাতনকারী।

মেইকি বলেন যেঃ
সেই সময়কার ডায়েরি লেখকেরা ডাচেস অব মিলান নামের চমৎকার এক রমণীর দুঃখগাথা লিখে গেছে, যে তার মদ্যপ স্বামীর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হয়ে কাঁদতো। কিন্তু সেই রমণী ছিল দা ভিঞ্চির ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সম্ভবত তার চেয়েও বেশি কিছু। সে কারণেই অসংখ্য আগ্রহী ক্রেতা থাকা সত্ত্বেও ভিঞ্চি তার মোনালিসাকে হাতছাড়া করেননি কিছুতেই। এটা ছিল প্রেমের গল্প। কিন্তু খুবই দুরূহ এক প্রেমের গল্প। ইসাবেলা ছিলেন সমাজের অতি উচ্চ পর্যায়ের এবং শক্তিশালী অবস্থানের অংশ। অন্যদিকে ভিঞ্চি ছিলেন নেহায়েতই এক শিল্পী। তখনকার সমাজ এ ধরনের অসম সামাজিক অবস্থানের প্রেমকে মেনে নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না।
ফ্লোরেন্সের রেশম ব্যবসায়ীর স্ত্রী লা গিওকন্ডো মোনালিসা ছিলেন এই ব্যাপক স্বীকৃত ধারণাকে প্রত্যাখান করেছেন মেইকি। তার মতে, গিওর্গি ভাসারির লিখিত বর্ণনার উপর ভিত্তি করে এটা ছিল ল্যুভর মিউজিয়ামের নিজস্ব অনুমান মাত্র।

মেইকির নিজের ভাষায়ঃ

তারা জানতো না মোনালিসা কে। কাজেই প্রথম যে বর্ণনা তারা পেয়েছে সেটাকেই তারা গ্রহণ করে নিয়েছে। এই বর্ণনা সাদামাটাভাবে মোনালিসার সাথে খাপও খেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে আসলে তা খাপ খায় নি। ল্যুভর যা কিছু বলেছে তার সব কিছুই অপ্রমাণিত এবং শুরু থেকেই বেশ কিছু শিল্প ঐতিহাসিকেরা এর বিরোধিতা করে এসেছেন। মোনালিসা এবং ভাসারির বর্ণনাকৃত লা গিওকন্ডোর প্রতিকৃতির বর্ণনার মধ্যে গড়মিল রয়েছে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার ক্রিস মার্শালদের মত শিল্প সমঝদারেরা অবশ্য মেইকির গবেষনা কর্মের সাথে একেবারেই পরিচিত নন এবং তার দৃষ্টিভঙ্গির সাথেও মোটেই একমত নন। ডঃ মার্শাল বলেন যেঃ

যেহেতু ভাসারি তার সমৃতির উপর নির্ভর করে ষষ্টদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মোনালিসার বর্ণনা লিখেছেন, সে কারণেই লা গিওকন্ডো তত্ত্ব এখনো চালু রয়েছে।

গুইসেপ পালান্টি নামের ফ্লোরেন্সের একজন শিক্ষক শহরের আর্কাইভগুলোতে দীর্ঘ পঁচিশ বছর গবেষণার পর সুস্পষ্ট প্রমাণ খুঁজে পান যে লিওনার্দোর পরিবার এবং রেশম ব্যবসায়ী ফ্রান্সেসকো গিওকন্ডোর পরিবার ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল।

ভাসারির যে দাবি করেছিলেন মোনালিসা হচ্ছে গিওকন্ডোর স্ত্রী, সে বিষয়ে পালান্টির মনে কোন সন্দেহ নেই। কেননা ভাসারি ব্যক্তিগতভাবে গিওকন্ডো পরিবারের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। লিসার বয়স যখন চব্বিশ তখন এই প্রতিকৃতিটি আঁকা হয় এবং খুব সম্ভবত লিওনার্দোর বাবাই তাকে এই কাজটি জুটিয়ে দিয়েছিল। এ ধরনের কাজ লিওনার্দোর বাবা আগেও অন্তত একবার করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। টাকা পয়সার ব্যাপারে লিওনার্দো এতোই অগোছালো ছিল যে তাঁর বাবাকে এ ধরনের সাহায্যের হাত মাঝে মাঝেই বাড়িয়ে দিতে হয়েছিল।

পালান্টির ভাষ্য অনুযায়ী লিসা পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। লিসা এবং ফ্রান্সেসকো দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে চার সন্তানেরই জন্মের রেকর্ড উদ্ধার করেছিলেন তিনি। পালান্টি তার গবেষণার ফলাফল ছোট্ট একটি বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

মোনালিসাকে তার রহস্য উদ্ধার করার জন্য অন্যান্য পণ্ডিত এবং গবেষকেরা পালান্টির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছেন। রিকার্ডো নেনচিনি বলেন যেঃ

এই গবেষনা হয়তো সম্পুর্ন সন্দেহমুক্তভাবে প্রমান করতে পারবে না যে লিসা এবং মোনালিসা একই রমণী। কিন্তু যে ধরনের তথ্য প্রমান হাজির করা হয়েছে তাতে এরা যে একই নারী তা প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছে।

Most Popular

To Top