গল্প-সল্প

আমার বন্ধু “মাথাব্যথা”

আমার বন্ধু "মাথাব্যথা"

ছোট থাকতেই আমার খুব মাথাব্যথা হত। একদিন ভোর বেলা সবাই মিলে পি জি তে গেলাম। ডাক্তার দেখে (আসলে শুনে, কারণ ডাক্তার আমার দিকে তাকায়নি) এইস আর ভিটামিন দিয়ে দিল। তখন থেকেই এইস আমার বন্ধু। তিন বেলায় তিনটা। সবাই বলত আমার নাকি মাথাব্যথা নেই, পড়ার ভয়ে একথা বলি। দিনদিন ব্যাথা বাড়তেই থাকল। মাথায় ব্যাথা নেই, এমন কোনো মুহুর্ত ছিল না। কখনো কম কখনো বেশি।

নাইন টেনের দিকে আর সহ্য হল না। আবার গেলাম পি জি তে। এবার একা। (হরতালের মধ্যে, আসার সময় প্রায় ১০ কিলো হেঁটে আসতে হয়েছিল।) ডাক্তার এবার কয়েকটা পরীক্ষা দিল আর এইসকে প্রমোশন দিয়ে করল এইস প্লাস। ভিটামিন তো ছিলই। পরীক্ষা করে ডাক্তার কিছু পেল না। আরো কিছু ওষুধ দিয়ে দু’ মাস পরে যেতে বলল। আর নাকের ডগায় একখান চশমা বসিয়ে দিল। কিন্তু যাওয়া হইনি, ততদিনে মিঃ মাথাব্যথা আমার বন্ধু সবসময় থাকত।

মাঝেমাঝে ব্যাথাটা না থাকলেই আরও অদ্ভুত লাগত। ওষুধ হিসেবে নিজেদের কিছু ওস্তাদিও তখন চলত। ভাইয়াকে ডাক্তার ‘পিজো এ’ দিয়েছিল, সহ্য করতে না পারলে ওটা খেতাম, আর ছিল সিংগাপুর থেকে আনা একখান বাম। তিনবেলা এইস প্লাস তো ছিলই। এসব ওষুধের সাথে আরো খেতাম বকা মাথাব্যথার ঢং করার জন্য আর মুড়ির মতো ওষুধ খাওয়ার জন্য।

ইন্টারে অবস্থা খুব খারাপ হয়। এবার বেসরকারি। ডাক্তার খুব আন্তরিক ছিলেন। অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে পাননি কোনো রোগ। এম আর আই করতে দিলেন, অনেক টাকা লাগে। আমি ভাবলাম অপারেশন, তাই করতে যাইনি। আম্মা খুব রাগ করেছিল সেবার। এক চোখের ডাক্তারও দেখানো হল। উনি একটা উপকার করলেন, চশমার বোঝা আর সইতে হল না।

ভার্সিটিতে ব্যাথা হলে চিন্তা করতাম কখন বাসায় যাবো। বাসায় আম্মা মাথায় বামটা ঘসে দিত, তারপর লাইট অফ করে ফুল ফ্যান দিয়ে ঘুম। ব্যাগে সবসময় এইস প্লাস থাকত। এই সময় থেকে শুরু অনিয়ন্ত্রিত, জ্ঞানশুন্য রাগ। সবকিছু তখন এলোমেলো হয়ে যেত।
সেকেন্ড ইয়ারের শেষের দিকে, শুরু হল আরেক যন্ত্রণা। হাঁটতে পারি না। দুই কদম হাটার পর পা আর চলত না। অদ্ভুত এক ব্যাথায় পা অবশ হয়ে যেত। কয়েকটা দিন কি কষ্ট যে করেছি, বলার মত না। একদিন মাথাব্যথা, পা ব্যাথা দুইটাই ছিল। আমি রুমে এসে শুয়ে আছি। হঠাত খুব পানির পিপাসা লাগল। উঠে জগের দিকে হাত বাড়াতেই, ধপাস। অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম। তখন পান্থপথ থাকতাম, সাথে থাকত ভাইয়া আর ভাইয়ার দুই বন্ধু। সবাই মিলে জোর করে ডাক্তারের কাছে পাঠাল। কাছেই স্কয়ার। গেলাম, খুব নাম করা ডাক্তার। কিছু কথা বলল, পা টিপেটুপে দেখল। তারপর ধরিয়ে দিল ১০ হাজার টাকার পরীক্ষা। ফলাফল আগের মতই রোগ ধরতে পারেনি। মাইগ্রেনের আর দুর্বলতার কিছু ওষুধ দিল। আর বলল সাইকায়াট্রিস্ট দেখাতে।

ওদিক আর যাইনি। নিজেই নিজের চিকিৎসা শুরু করলাম। ডাক্তারের দেয়া ওষুধ নিয়মিত খাওয়ার পর, মাথাব্যথাটা কেমন যেন ঠিক হয়ে গেল। সেই অসহ্য কষ্টটা ছিল না। মাঝেমাঝে ব্যাথা হত। কিন্তু সারাদিন ধরে যে ব্যাথা সেটা চলে গেল, (আলহামদুলিল্লাহ্‌)। মাথাটা অদ্ভুত ফাঁকা লাগত। আর এদিকে অন্য সমস্যাগুলোও ঠিক হল। এতদিনের সঙ্গী এইস প্লাস আর ব্যাগে রাখতাম না। এজন্য কখনো কখনো ঝামেলায় পড়েছি। একবার পরীক্ষার সময় ব্যাথা শুরু হল। শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে লিয়নকে কল করতে হয়েছিল ওষুধ আনার জন্য।

ওষুধ খাওয়া একরকম বাদ দিলাম, খুব বেশি না হলে খাই না। ওই বাম টা দিতাম, তাতেই হত।

চাকরী শুরু করার প্রথম দিন প্রচন্ড মাথাব্যথা। ভাবলাম নিয়মের পরিবর্তন, জায়গার পরিবর্তন তাই হয়তো। দিনদিন বাড়তে থাকল, কিন্তু সহ্যের মধ্যে ছিল। মাঝেমাঝে বেশি হলে অর্ধেক দিন ছুটি নিতাম। এবার মাইগ্রেনের সাথে যুক্ত হল সাইনাস। আরেক বিষ।
সপ্তাহ দুই আগের কথা প্রচন্ড মাথাব্যথা শুরু হয়। ছুটি নিলাম, বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যেত, তখন। কিন্তু এই ব্যাথা থামল না। আবার আগের যন্ত্রণা, মাথার এককোণে সবসময় ব্যাথাটা থাকত। সেই রাগ আর দুর্বলতা ফিরে আসল। আরো ভয়ানক ভাবে। রাগ হলে, কি করতাম নিজেই বুঝতাম না। মাথায় কি যেন একটা হয়ে যেত।

আবার ডাক্তার দেখানো, একগাদা টেস্ট। ভালো লাগছেনা। জানি ফলাফল একই হবে, কেউ কিছু ধরতে পারবে না।

বিঃদ্রঃ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমার আশেপাশের লোক কখনোই মানতে পারেনি, আমি অসুস্থ। আগে ভাবত পড়ার ভয়ে, এখন ভাবে কাজের ভয়ে। মাথা ব্যাথার সময় হাসি গল্পের মধ্যে থাকলে, ব্যাথাটা ভুলে থাকা যায়। আমি তাই তখন গল্প বেশি করি বা মোবাইলে গুঁতাগুঁতি করি। সেটাকেই মানুষ ঢং মনে করে। তাদের অবশ্য দোষ নেই, আমি হলেও একই কথা ভাবতাম।

লেখকঃ শামীম ইসলাম

Most Popular

To Top